• ই-পেপার

বাংলাসহ ২০ ভাষায় হজের খুতবার অনুবাদ

মা-বাবার অবহেলাকারীকে মহানবী (সা.)-এর অভিশাপ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মা-বাবার অবহেলাকারীকে মহানবী (সা.)-এর অভিশাপ
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে মানুষ যাঁদের ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারবে না, তাঁরা হলেন মা-বাবা। সন্তান যখন নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও সচেতন নয়, তখন মা তাকে নিজের রক্ত-মাংস দিয়ে গড়ে তোলেন। মায়ের গর্ভধারণের কষ্ট, প্রসবের যন্ত্রণা, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটানো এবং বাবার নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করার প্রতিদান পৃথিবীর কোনো সন্তানই পূর্ণভাবে দিতে পারে না।


এ কারণেই ইসলাম আল্লাহর হকের পরপরই মায়ের হককে গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বোলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বোলো।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)

অন্য আয়াতে মায়ের কঠিন ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৪)

কোরআনের এই বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন মা। অথচ আজ অনেক সন্তান বৃদ্ধা মাকে বোঝা মনে করে, তার প্রয়োজনের খোঁজ নেয় না, এমনকি কখনো কখনো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করে। অথচ ইসলাম এটিকে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) একদা তিনবার বললেন, আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করব না? সবাই বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! অবশ্যই বলুন। তিনি বলেন, আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং মা-বাবার অবাধ্য হওয়া।
(বুখারি, হাদিস : ২৬৫৪)

নাউজুবিল্লাহ! মা-বাবাকে অবহেলা করা কতটা জঘন্য অপরাধ হলে এই হাদিসে শিরকের পরপরই মা-বাবার অবাধ্যতার কথা বলা হয়েছে। ইসলাম মা-বাবার অধিকারকে এতটাই প্রাধান্য দিয়েছে যে নফল ইবাদত রেখে তাঁদের আদেশ পালন করা বা তাঁদের খিদমত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বনি ইসরাঈলের বিখ্যাত আবেদ জুরাইজের ঘটনা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। তিনি নির্জনে ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন তাঁর মা তাঁকে ডাকলেন। তিনি নফল নামাজে ছিলেন। মা কয়েকবার ডাকলেও তিনি নামাজ ছেড়ে সাড়া দিলেন না। এতে মা কষ্ট পেয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে মৃত্যু দিয়ো না, যতক্ষণ না তাকে ব্যভিচারিণীদের মুখোমুখি করো।’ মায়ের এই কষ্টের পরিণতিতে জুরাইজ ভয়াবহ পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এক ব্যভিচারিণী নারী তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দেয় যে তার গর্ভের সন্তানের পিতা জুরাইজ। লোকেরা তাঁর ইবাদতখানা ভেঙে দেয়, তাঁকে অপমানিত করে এবং জনসমক্ষে হেয় করে। পরে আল্লাহ অলৌকিকভাবে নবজাতক শিশুর মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশ করেন এবং জুরাইজ নির্দোষ প্রমাণিত হন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৮২)

আরো পড়ুন
ইমাম তাবারি (রহ.) : জ্ঞান, সাধনা ও কর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

ইমাম তাবারি (রহ.) : জ্ঞান, সাধনা ও কর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

 

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কারো ইবাদত, ইলম, পদবি অনেক বড় থাকলেও মায়ের মনে কষ্ট দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব নয়। এর বিপরীতে কোনো ঈমানদার যদি তার মায়ের যত্ন নিতে পারে, তাহলে তা তার জন্য জান্নাতের দ্বার খুলে দিতে পারে। কেননা হাদিস শরিফে এসেছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। (নাসায়ি, হাদিস : ৩১০৪)

অর্থাৎ যে সন্তান মায়ের সেবা করবে, তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ হবে। আর যে ব্যক্তি সেই জান্নাত লাভের সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করবে, মা-বাবাকে অবহেলা করবে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাঁদের যত্ন নেবে না— তাদেরকে মহানবী (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন। তারা সেই অভিশাপের আগুনে ছারখার হয়ে যাবে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক (সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক), আবার সে ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক, আবার তার নাক ধূলিমলিন হোক।’ জিজ্ঞেস করা হলো, কার হে আল্লাহর রাসুল (সা.)। তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে কিংবা তাদের একজনকে বার্ধক্যজনিত অবস্থায় পেল, এরপরও সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪০৫)

আহ! কত হৃদয়বিদারক কথা! বৃদ্ধ মা-বাবা ঘরে থাকা মানে জান্নাত অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ ঘরে থাকা। অথচ অনেকেই এই সুযোগকে বোঝা মনে করে। তাদের দূরে সরিয়ে দেয় এবং নিজেকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করে—নিজেকে দুনিয়াতে লাঞ্ছনাকর কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করে। কেননা হাদিসের ভাষ্য মতে, যেসব পাপের সাজা মহান আল্লাহ দুনিয়ায়ও দেন, তার একটি হলো মা-বাবার অবাধ্যতা ও অবহেলা।

মা-বাবার অবাধ্যতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—এর শাস্তি শুধু আখিরাতে নয়, দুনিয়াতেও আসে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তার মর্জিমাফিক গুনাহসমূহের মধ্যে যেকোনো গুনাহের শাস্তি প্রদান কিয়ামত পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারেন। কিন্তু তিনি বিদ্রোহ, মা-বাবার অবাধ্যাচরণ ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার গুনাহর শাস্তি অপরাধীর মৃত্যুর আগেই এই দুনিয়াতে দিয়ে থাকেন।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫৯৪)

আরো পড়ুন
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ১২ গুণ

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ১২ গুণ

 

ইতিহাস সাক্ষী, যে সন্তান মায়ের চোখের পানি ঝরিয়েছে, তার জীবন থেকে বরকত উঠে গেছে; আর যে সন্তান মায়ের দোয়া অর্জন করেছে, আল্লাহ তার জন্য এমন দরজা খুলে দিয়েছেন, যা সে কল্পনাও করেনি।

তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত যদি মা-বাবা জীবিত থাকেন, তবে তাঁদের পাশে বসা, তাঁদের কথা শোনা, তাঁদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা, তাঁদের জন্য সময় বের করা। আর যদি তাঁরা পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তাঁদের জন্য দোয়া করা, সদকা করা এবং তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা কোটি কোটি টাকা খরচ করেও মায়ের একটি দোয়া ফিরে পাবে না। কিন্তু যার মা জীবিত আছেন, তার কাছে এখনো জান্নাতের একটি দরজা খোলা আছে। সে একটু চেষ্টা করলেই মা-বাবার খিদমতের মাধ্যমে সে দরজা অতিক্রমের চাবি সংগ্রহ করতে পারে।

তাই প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য, মা-বাবাকে অবহেলা নয়, ভালোবাসা দেওয়া; বিরক্তি নয়, সম্মান দেওয়া; কষ্ট নয়, শান্তি দেওয়ার চেষ্টা করা। কারণ মা-বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর মা-বাবার চোখের পানির মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে দুনিয়া ও আখিরাতের অকল্যাণ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেসব অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন। মহানবী (সা.)-এর অভিশাপ থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৪ জুন ২০২৬

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ৪ জুন ২০২৬
সংগৃহীত ছবি

আজ বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ১৭ জিলহজ ১৪৪৭।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০০ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৩৬ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৪৭ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১২ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৭ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪২ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১০ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা। 

ইমাম তাবারি (রহ.) : জ্ঞান, সাধনা ও কর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইমাম তাবারি (রহ.) : জ্ঞান, সাধনা ও কর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ও কর্ম যুগে যুগে জ্ঞানপিপাসু মানুষের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে। তাঁদেরই অন্যতম হলেন মুহাম্মাদ ইবনে জারির আত-তাবারি। তিনি ছিলেন হাদিস, তাফসির, ফিকহ, ইতিহাস, ভাষা ও সাহিত্যসহ ইসলামী জ্ঞানের বহু শাখায় সমান পারদর্শী এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ছিল অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ, জ্ঞানচর্চা এবং আল্লাহভীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারে তাঁর অবদান এতই ব্যাপক যে শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম হওয়ার পরও তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

শৈশব ও ইলম অন্বেষণে যাত্রা  
ইমাম তাবারি (রহ.) ২২৪ হিজরিতে তাবারিস্তানের  আমুল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রবল আগ্রহ দেখা যায়। অল্প বয়সেই তিনি কোরআন হিফজ করেন এবং হাদিস ও অন্যান্য ইসলামী শাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করেন। জ্ঞানের পিপাসা তাঁকে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন জ্ঞানকেন্দ্রে সফর করে অসংখ্য আলেমের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর এই জ্ঞানসন্ধানী জীবন তাঁকে শেষ পর্যন্ত বাগদাদ শহরে নিয়ে আসে, যেখানে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং জ্ঞানচর্চা ও গ্রন্থ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।

কর্মনিষ্ঠার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত
ইমাম তাবারি (রহ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর সময়ের সদ্ব্যবহার। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি টানা চল্লিশ বছর প্রতিদিন গড়ে চল্লিশ পৃষ্ঠা করে লিখেছেন। এ হিসাব অনুযায়ী তাঁর লিখিত পৃষ্ঠার সংখ্যা কয়েক লক্ষে পৌঁছায়। তাঁর কাছে সময় ছিল আল্লাহর এক মহামূল্যবান আমানত। তাই তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে জ্ঞানার্জন, গবেষণা, শিক্ষা প্রদান এবং গ্রন্থ রচনায় ব্যয় করেছেন। আজকের যুগে যখন সামান্য সময় অপচয়ও আমাদের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, তখন ইমাম তাবারির জীবন আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত সফলতা তার সময়ের সঠিক ব্যবহারের মধ্যেই নিহিত।

তাফসির শাস্ত্রে অমর কীর্তি
ইমাম তাবারির শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কোরআন। ইসলামী ইতিহাসে এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রাচীনতম তাফসির গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। এই গ্রন্থ রচনার পূর্বে তিনি তিন বছর ধরে ইস্তেখারা করেছেন এবং আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। এরপর আল্লাহর তাওফিকে তিনি এই সুবিশাল তাফসির সংকলন করেন। এ গ্রন্থে তিনি সাহাবি, তাবেয়ি ও পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের মতামত সংগ্রহ করে গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোরআনের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। আজও বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর এই তাফসির অন্যতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়।

ইতিহাস রচনায় অনন্য অবদান
ইমাম তাবারির আরেকটি অমর কীর্তি হলো তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক। একদিন তিনি তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি আদম (আ.) থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস লিখতে চাই।’ ছাত্ররা জানতে চাইল, ‘গ্রন্থটি কত বড় হবে?’ তিনি বললেন, ‘প্রায় ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠা।’ এ কথা শুনে ছাত্ররা বলল, ‘এত বড় গ্রন্থ তো মানুষের আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই পড়া সম্ভব হবে না!’

তখন ইমাম তাবারী গভীর বেদনার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মহৎ হিম্মতের মৃত্যু ঘটেছে।’এই ঘটনাটি তাঁর দূরদৃষ্টি, সাহসী চিন্তা এবং জ্ঞানের প্রতি অসীম ভালোবাসার পরিচয় বহন করে। পরে তিনি সংক্ষিপ্ত আকারে প্রায় তিন হাজার পৃষ্ঠায় গ্রন্থটি সম্পন্ন করেন। আজও এটি ইসলামের ইতিহাস গবেষণার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃত।

আত্মমর্যাদা ও দুনিয়াবিমুখতা
ইমাম তাবারি (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি। শাসকগোষ্ঠী ও রাজা-বাদশাহরা তাঁকে সম্মান করতেন এবং বিভিন্ন উপঢৌকন প্রদান করতে চাইতেন। কিন্তু তিনি কখনো এসব গ্রহণ করেননি। তাঁর পিতা যে সামান্য জমিজমা রেখে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি মনে করতেন, জ্ঞানকে দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। এ কারণে তিনি স্বাধীনচেতা ও নির্ভীকভাবে সত্য কথা বলতে পেরেছিলেন।

মৃত্যুশয্যায় জ্ঞান অন্বেষণ
মৃত্যুশয্যাতেও তাঁর জ্ঞানপিপাসা শেষ হয়নি। ৩১০ হিজরিতে যখন তাঁর ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তিনি উপস্থিত একজন ব্যক্তির কাছে একটি দোয়া সম্পর্কে জানতে চান। দোয়াটি শুনে আশ্বস্ত হন। তারপর কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করতে করতে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে নশ্বর এই পৃথিবী ত্যাগ করেন।

ইমাম তাবারি (রহ.) ছিলেন এক চলমান জ্ঞান-সভ্যতা। তাঁর কলমের কালি আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের পথপ্রদর্শক। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, একজন মানুষের জীবনকাল সীমিত হলেও তার জ্ঞান, চিন্তা ও কর্মের প্রভাব যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে পারে। এভাবে ইমাম তাবারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের জীবনে সফল হতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অধ্যবসায়, জ্ঞানসাধনা এবং আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার এক জীবন্ত পাঠ শিক্ষা দেয়।

আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার উপায়
সংগৃহীত ছবি

প্রত্যেক মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো মহান আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র হওয়া। দুনিয়ার মানুষের ভালোবাসা সীমিত, স্বার্থনির্ভর এবং ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসা চিরস্থায়ী, কল্যাণময় এবং মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদানকারী। যে বান্দাকে আল্লাহ ভালোবাসেন, তার জীবন বরকতময় হয়, তার অন্তরে প্রশান্তি নেমে আসে, তার দোয়া কবুল হয় এবং আখিরাতে তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ থাকে। আর আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পথ শুরু হয় আন্তরিক তাওবা, আত্মশুদ্ধি এবং জীবন সংশোধনের মাধ্যমে। মানুষ ভুল করবে, গুনাহে জড়িয়ে পড়বে—এটাই মানবীয় দুর্বলতা। কিন্তু প্রকৃত সৌভাগ্যবান সে, যে ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসে এবং নিজের জীবনকে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী গড়ে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তবে যারা এরপর তাওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে, তাহলে আল্লাহ তো অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : নুর : আয়াত : ৫)

আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পাঁচ আমল 

১. আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা : আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার প্রথম শর্ত হলো আন্তরিক তাওবা। তাওবা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; বরং হৃদয়ের গভীর অনুতাপ, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অগ্রসর হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তাওবা করে, সে এমন ব্যক্তির মতো যার কোনো গুনাহই নেই।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৪২৫০)

অতএব, অতীতের ভুলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসাই মুমিনের কর্তব্য।

২. আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র সংশোধন করা : আল্লাহ তাআলা শুধু তাওবার কথা বলেননি; বরং বলেছেন—‘যারা নিজেদের সংশোধন করে।’ প্রকৃত তাওবার প্রমাণ হলো জীবনের পরিবর্তন। নামাজে যত্নশীল হওয়া, হারাম কাজ বর্জন করা, মানুষের হক আদায় করা, চরিত্র সুন্দর করা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলাই হলো আত্মসংশোধনের নিদর্শন। আল্লাহ সেই বান্দাকে ভালোবাসেন, যে প্রতিনিয়ত নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করে।

৩. আল্লাহর আদেশ মেনে চলা ও নিষেধ থেকে বিরত থাকা : আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম উপায় হলো তাঁর আনুগত্য করা। যারা আল্লাহর আদেশ পালন করে এবং হারাম থেকে দূরে থাকে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৪)


৪. নিয়মিত নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা : ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং দান-সদকা বান্দাকে আল্লাহর আরো নিকটবর্তী করে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার এত নিকটবর্তী হয় যে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৫০২)

৫. কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া : শয়তানের অন্যতম কৌশল হলো মানুষকে হতাশ করে দেওয়া। কিন্তু মুমিন জানে, আল্লাহর রহমত তার সকল গুনাহের চেয়ে বড়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া কোনো অসম্ভব বিষয় নয়; বরং এটি প্রত্যেক মুমিনের জন্য উন্মুক্ত একটি পথ। এই পথের সূচনা হয় আন্তরিক তাওবা দিয়ে, আর তা পরিপূর্ণ হয় আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, ইবাদত, উত্তম চরিত্র এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্যের মাধ্যমে। মানুষ যত বড় গুনাহগারই হোক না কেন, যদি সে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং নিজের জীবনকে সংশোধন করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন, ভালোবাসেন এবং তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেন।

অতএব, আমাদের প্রত্যেকের উচিত প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে আছি? আমি কি আমার ভুলগুলো সংশোধনের চেষ্টা করছি? যদি আমরা আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি, তাহলে তিনিই আমাদের হাত ধরে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাবেন। কারণ তিনি ‘অতিশয় ক্ষমাশীল’ এবং ‘পরম দয়ালু’। তাঁর ভালোবাসাই একজন মুমিনের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন এবং আখিরাতের সর্বোচ্চ সফলতা বয়ে আনে।
 

বাংলাসহ ২০ ভাষায় হজের খুতবার অনুবাদ | কালের কণ্ঠ