বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ‘জনগণের আস্থা’। আর এই আস্থা রক্ষা করাই বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে মনে করেন সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকের আসন থেকে অবসরে যাওয়া বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম। আজ মঙ্গলবার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
সংবর্ধনা পাওয়ার পর বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ণ থাকবে।’
সুপ্রিম কোর্টে দুই দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন উল্লেখ করে এই বিচারপতি বলেন, ‘বিচার বিভাগের শক্তি এককভাবে কোনো বিচারক বা কোনো আইনজীবীর শক্তি নয়। বিচার বিভাগ আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। তাই ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একসঙ্গে কাজ করবে, এই প্রত্যাশা করি।’
অবসর গ্রহণকে নতুন অধ্যায়ের সূচনা উল্লেখ করে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘বিচারকের পদ থেকে অবসর নেওয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে নয়। যত দিন সামর্থ্য থাকবে, তত দিন দেশের কল্যাণে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের উন্নয়নে আমার অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য দিয়ে অবদান রাখার চেষ্টা করব।’
বিচার ব্যবস্থাকে আরো দ্রুত ও কার্যকর করার তাগাদা দিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে বিচার বিভাগকে আরো দক্ষ, আরো আধুনিক এবং আরো সেবামুখী হতে হবে। বিচার শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই যথেষ্ট নয়; মানুষকেও তা দেখতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে যে বিচার হয়েছে। বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা। আর এই আস্থা রক্ষা করাই বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বিচক্ষণভাবে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বিচার বিভাগের দক্ষতা বাড়াবে, মানুষের ভোগান্তি কমাবে এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার আরো সহজ করবে। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতাও আরো বাড়বে।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, আইনজ্ঞ আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনকে উদ্বৃত করে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়; বিচার বিভাগের শক্তি নিহিত থাকে বিচারবোধ, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থায়।’
‘সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দলিল নয়’ মন্তব্য করে এই বিচারপতি আরো বলেন, ‘এটি আমাদের স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। বিচার বিভাগের দায়িত্ব সেই অঙ্গীকারকে সমুন্নত রাখা।’
সংবিধানের ৯৬(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে একজন বিচারক পদের মেয়াদ ৬৭ বছর পর্যন্ত। বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১৫ জুলাই। সে হিসাবে গতকাল ছিল তাঁর শেষ কর্মদিবস। এ উপলক্ষে তাঁকে ‘বিদায় সংবর্ধনা’ দেয় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচার কক্ষে অনুষ্ঠিত এই সংবর্ধনায় বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের জীবন বৃত্তান্ত ও কর্মজীবনের নানা দিক তুলে ধরে বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ আপিল বিভাগের বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।
উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৩ সালে জেলা আদালত ও ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন মো. আশফাকুল ইসলাম।
২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। দুই বছর পর ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট তাঁর নিয়োগ স্থায়ী করা হয়। ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।





