এত দিন ওয়েব নির্মাতাদের দুই ধরনের ওয়েব ভিজিটর নিয়ে ভাবতে হতো—মানুষ এবং বট। মানুষের জন্যই ওয়েবসাইটগুলো তৈরি করা হতো, বট ট্রাফিক যতটা সম্ভব কমানোই ছিল সাইট ডিজাইনের লক্ষ্য। ওয়েব ট্রাফিকের বেশির ভাগই ছিল মানুষ। এখন ওয়েব ট্রাফিকের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। এজেন্টিক এআই প্রযুক্তির প্রভাবে এখন ইন্টারনেটে মানুষের চেয়ে বট বেশি। তবে এগুলো গতানুগতিক তথ্য সংগ্রহকারী ‘ক্রলার’ বট বা স্প্যামার স্ক্রিপ্ট নয়, বরং ব্যবহারকারীদের সাহায্যকারী ‘এআই এজেন্ট’।
তৃতীয় ধরনের ওয়েব ভিজিটর
যেকোনো স্বয়ংক্রিয় বা ‘যান্ত্রিক’ ভিজিটরকেই বট ধরা হয়ে থাকে। ওয়েবমাস্টারদের জন্য বট ট্রাফিক বড় মাথাব্যথার কারণ, কেননা এগুলো লাভজনক ট্রাফিক জেনারেট করে না। তবে জেনারেটিভ এআই বটের ধরন বদলে দিয়েছে। ব্যবহারকারীর সাহায্যকারী হিসেবে তাদের পক্ষে ওয়েবসাইট ব্রাউজ করছে এআই এজেন্ট, ই-কমার্স থেকে পণ্য ও সেবা অর্ডার করছে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও করছে কমেন্ট বা মেসেজ চালাচালি। ইমপারভার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে এআই এজেন্টকে আর ‘বট’ বলা উচিত নয়। বরং মানুষ ও বটের পাশাপাশি আরো এক ধরনের ব্যবহারকারী হিসেবে এআই এজেন্টকে আখ্যায়িত করা উচিত। এজেন্টগুলো মানুষ ট্রাফিকের স্থান নিয়ে নিয়েছে বলা যায়। তাই ওয়েবসাইট ডিজাইনে এখন থেকে মানুষ ও বটের পাশাপাশি এজেন্টিক এআইয়ের জন্যও ডিজাইন করা জরুরি।
পুরনো ব্যবস্থা এখন অকার্যকর
দীর্ঘদিন পর্যন্ত মানুষ ও বট আলাদা করার প্রচলিত উপায় ছিল ক্যাপচা পূরণ। কিন্তু আধুনিক এআইচালিত বটের অনেকটিই এসব পরীক্ষা সফলভাবে অতিক্রম করতে পারে। ফলে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যবহারকারীর পুরো সেশন বিশ্লেষণের দিকে ঝুঁকছে। এর মধ্যে আছে ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রিকারসর (Precursor) প্রযুক্তি। ওয়েবসাইটে প্রবেশ থেকে প্রস্থান করা পর্যন্ত ব্যবহারকারীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তবেই মানুষ না বট সেটি মূল্যায়ন করে এটি। মাউস ব্যবহারের ধরন, স্ক্রল করার গতি, এক পাতায় কত সময় অবস্থান করা হচ্ছে বা টাইপ করার ছন্দ বিশ্লেষণ করে মানুষ ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করা হয়।
সব বট ক্ষতিকর নয়
বট ডিটেকশন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি, কেননা সব বট ওয়েবসাইটের জন্য ক্ষতিকর নয়। সার্চ ইঞ্জিনের ক্রলার, বিভিন্ন গবেষণা ও স্বয়ংক্রিয় সেবার বৈধ বটগুলোকে কাজ করতে না দিলে বরং ওয়েবসাইটের ট্রাফিক আরো কমে যাবে। ঠেকাতে হবে কপিরাইট করা কনটেন্ট চুরি, পরিচয় জালিয়াতি, অ্যাকাউন্ট দখল, স্প্যাম কিংবা স্বয়ংক্রিয় আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত ক্ষতিকর বট। ইমপারভার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বট আক্রমণের ২৭ শতাংশই পরিচালিত হয়েছে সরাসরি এপিআইয়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ ওয়েবসাইটের দৃশ্যমান অংশ এড়িয়ে অনেক আক্রমণ এখন সরাসরি ব্যাকএন্ড সিস্টেমকে লক্ষ্যবস্তু করছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
ওয়েব বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে মানুষ ও মেশিনের সহাবস্থানকে কেন্দ্র করে। নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো বেশি আচরণনির্ভর হবে, প্রকাশকদের কনটেন্ট ব্যবহারের নিয়ম বদলাবে এবং এআই এজেন্টের জন্য নতুন নীতিমালা তৈরি হবে। একই সঙ্গে ওয়েবসাইট পরিচালকদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, কোন সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর স্বার্থে কাজ করছে, আর কোনটি তথ্য সংগ্রহ, প্রতারণা বা আক্রমণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। একসময় ইন্টারনেটকে মানুষের নেটওয়ার্ক বলা হতো। এখন সেটি ধীরে ধীরে মানুষ ও মেশিন উভয়ের জন্য ব্যবহৃত একটি অবকাঠামোয় রূপ নিচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের নতুন প্রতিযোগিতা আর শুধু দ্রুততর সেবা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই দুই ধরনের ব্যবহারকারীকে নির্ভুলভাবে আলাদা করাও হয়ে উঠছে ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।