• ই-পেপার

পাকিস্তানের গৃহবিবাদ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা

  • ড. ফরিদুল আলম

বৈশ্বিক কার্বন মার্কেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ

ড. মো. ম‌সিউর রহমান

বৈশ্বিক কার্বন মার্কেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন আইন ও চুক্তি গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে ইউএনএফসিসি, কিয়োটো প্রটোকল, প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট উল্লেখযোগ্য। এই চুক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে কার্বন ট্রেডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে কার্বন বিজনেসের মাধ্যমে পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, ঘনবসতি এবং ভৌগোলিক ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কার্বন ট্রেডিং’ বা কার্বন মার্কেট একটি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের পরিমিত প্রয়োগের মতো উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের জন্য এই খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুই মানবসভ্যতার টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে কার্বন ট্রেডিং বা কার্বন বিজনেস একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারণা হিসেবে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, এই খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে—বিশেষ করে বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের পরিমিত প্রয়োগের মাধ্যমে।

বনায়ন কার্বন শোষণের একটি কার্যকর প্রাকৃতিক উপায়। গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং তা তাদের দেহে সংরক্ষণ করে। ফলে বনায়ন ও পুনর্বনায়ন কার্যক্রম কার্বন নির্গমন হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকায় বৃহৎ পরিসরে বনায়নের সুযোগ রয়েছে। সামাজিক বনায়ন ও অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে কার্বন ক্রেডিট তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিক লাভ অর্জন করা যেতে পারে। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন এরই মধ্যে সফল হয়েছে। এখন এটিকে কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তা কার্বন ক্রেডিট তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

কৃষিতে কম পানি ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। বিশেষ করে ধান চাষে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি স্বল্প নির্গমন প্রযুক্তি। এটি মিথেন নির্গমন কমায় এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনে সহায়ক। এডব্লিউডি পদ্ধতি প্রয়োগ করলে পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি মিথেন গ্যাসের নির্গমন হ্রাস পায়। মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে বোরো ধান চাষে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে তা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই লাভজনক হবে। কম নির্গমন মানেই কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ, যা ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস হতে পারে।

নাইট্রোজেন সারের পরিমিত ব্যবহার কার্বন বিজনেসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আইপিসিসি অনুযায়ী নাইট্রোজেন নির্গমন কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তি; যেমন—লিফ কালার চার্ট (এলসিসি), ইউরিয়া ডিপ প্লেসমেন্ট (ইউডিপি) এবং প্রিসিশন ফার্টিলাইজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সারের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ কমে, অন্যদিকে পরিবেশদূষণ হ্রাস পায় এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এফএও এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার (সিএসএ) কার্বন হ্রাস ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক, যা কার্বন বাজার কৃষকদের অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করতে পারে। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও সাসটেইনেবল রাইস প্রোডাকশন পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য কার্বন ক্রেডিট তৈরি করতে সক্ষম। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী কৃষি, বন ও ভূমি ব্যবহার খাত (এএফওএলইউ) বৈশ্বিক কার্বন হ্রাসে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।

কার্বন বিজনেস মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশ যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে পারে বা কার্বন শোষণ বাড়াতে পারে, তাহলে তারা ‘কার্বন ক্রেডিট’ অর্জন করে। এই ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়। একেকটি কার্বন ক্রেডিট এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন হ্রাসকে নির্দেশ করে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজার (ভলান্টারি কার্বন মার্কেট) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে। বাংলাদেশের জন্য এই খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের বৃহৎ কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী, জলবায়ু অভিযোজনমূলক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে কার্বন বিজনেস দ্রুত বিকাশ লাভ করতে পারে। এরই মধ্যে ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার ক্লাইমেট এবং প্রসপারিটি প্ল্যানের মতো উদ্যোগ এই খাতে ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে; যেমন—কার্বন

নিরূপণ ও যাচাইকরণ (এমআরভি) ব্যবস্থার দুর্বলতা, কৃষক পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার ঘাটতি।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কার্বন বাজার নীতিমালা প্রণয়ন, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্রদান এবং পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

সব শেষে বলা যায়, বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা শুধু পরিবেশ সুরক্ষায় নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্বন বিজনেস দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনীতিতে একটি টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগটি কার্বন ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং এটি থেকে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কার্বন ক্রেডিট আয়ের সুযোগ রয়েছে। এই উদ্যোগ সরাসরি যে ভূমিকাগুলো রাখবে—

কার্বন শোষণ ও ক্রেডিট তৈরি : গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। রোপণ করা গাছগুলো বড় হলে তা বিশাল পরিমাণ কার্বন সিংক তৈরি করবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সফলভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বার্ষিক প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের কার্বন ক্রেডিট অর্জন করতে পারবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এর ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করতে পারবে। তবে এই উদ্যোগ থেকে পুরোপুরি কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধা পেতে হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বৃক্ষরোপণের স্থানগুলোর নিবন্ধন এবং যথাযথ মেজারমেন্ট, রিপোর্টিং, ভেরিফিকেশন (এমআরভি) সিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো হলো, বাংলাদেশের এমআরভি সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি জটিল। কৃষকদের সংগঠিত করা অনেক কঠিন। দেশে এজাতীয় নীতিমালার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

আমাদের করণীয় হলো জাতীয় কার্বন ট্রেডিং নীতিমালা প্রণয়ন। এমআরভি সিস্টেমের উন্নয়ন (ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার) এবং দেশের জন্য তা প্রয়োগযোগ্য করা। এ ক্ষেত্রে  আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা গ্রহণ করা। পাইলট প্রকল্প চালু করা এবং কৃষকদের জন্য ইনসেনটিভ ও প্রশিক্ষণ প্রদান। এ জন্য বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য কার্বন বিজনেস একটি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। কার্বন বিজনেস শুধু একটি পরিবেশগত উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টের আলোকে কৃষি খাতে কার্বন ক্রেডিট উন্নয়ন করলে তা শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সঠিক নীতিমালা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কার্বন বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। বনায়ন, পানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং সারের সুষম ব্যবহার—এই তিনটি পদক্ষেপ একযোগে বাস্তবায়ন করা গেলে তা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্বন বিজনেসে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

 

লেখক : মুখ‌্য বৈজ্ঞা‌নিক কর্মকর্তা, উদ‌্যানতত্ত্ব গ‌বেষণা কেন্দ্র, বাংলা‌দেশ কৃ‌ষি গ‌বেষণা ইন‌স্টি‌টিউট

 

ডেপুটি কমিশনার কেন জেলা প্রশাসক

নির্মল চক্রবর্তী

ডেপুটি কমিশনার কেন জেলা প্রশাসক

একটি জেলার সর্বোচ্চ অধিকর্তা হচ্ছেন জেলা প্রশাসক, যাঁকে আমরা ডিসি বলে অভিহিত করি। দেশের ৬৪ জেলায়  প্রশাসনিক  প্রধান  হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই সরকারি কর্মকর্তাকে ডিসি সম্বোধনের যৌক্তিকতা কতটুকু, তা আবার নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ইংরেজি পদনাম এই ডিসি হচ্ছে ডেপুটি কমিশনার-এর সংক্ষেপ। অথচ বাংলায় বলা হচ্ছে জেলা প্রশাসক, যা দেশের কোনো আইন-বিধিতে  নেই। তবে এর যৌক্তিকতা অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য পদবির পরিভাষা শীর্ষক প্রকাশনার ৬২ নম্বর পৃষ্ঠায়  ডেপুটি কমিশনার-এর বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে  জেলা প্রশাসক। কিন্তু একই পৃষ্ঠায় ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস-এর বাংলা পদনাম করা হয়েছে উপকর কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার অব কাস্টমসকে বলা হয়েছে উপকর কমিশনার, কাস্টমস, ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশকে বলা হয়েছে উপপুলিশ কমিশনার। এই অনুসন্ধানেও ডেপুটি কমিশনার-এর বাংলা পদনাম জেলা প্রশাসক শব্দটি অমীমাংসিতই রয়ে যায়।

এখন সময় এসেছে সুদীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই অমীমাংসিত শব্দটিতে একটা মীমাংসায় আসার। কারণ কোনো অমীমাংসিত পথে হাঁটা মানেই একটি ভুল পথে পরিচালিত হওয়া। আর ভুল পথে থাকা মানেই ইচ্ছাকৃত শুদ্ধতার পথ পরিহার করা, যা কোনোমতেই একটি ভালো প্রশাসননীতি হতে পারে না। অর্থাৎ ভুলে যাদের জীবন গড়া প্রচলিত বাক্যটির মতোই একটি জগদ্দল পাথর বয়ে বেড়ানো। তাই এই সংস্কারটিকে এখন জরুরি বলেই মনে করি।  

প্রসঙ্গত, একটু পেছন ফিরে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, ২০২৪ সালের ডিসি সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদসচিব মাহবুব হোসেন ব্রিফিংয়ে এলে তাঁকে এই প্রশ্নটির মুখে পড়তে হয়।  সেদিনও তিনি  জেলা প্রশাসক পদনামটির আইনি ভিত্তি সম্পর্কে জবাব দিতে পারেননি। তাঁর পাশে সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব মিলিয়ে উপস্থিত অন্তত আটজন কর্মকর্তাও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এক পর্যায়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন,  এটি যাঁরা করেছেন, তাঁদের কাছে জেনে নিতে পারেন। এভাবে দায়সারা জবাব দিয়ে তিনি সেদিন বিষয়টি এড়িয়ে যান।

তাহলে এখন সেই বাংলা অনুবাদের দিকেই দৃষ্টি দেওয়া যাক। এখানেও দেখা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষের (বাবাকো) যাঁরা সরকারি কর্মচারীদের পদবির পরিভাষা ২০১৮ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁরাও বিষয়টি পরিষ্কার করেননি। তবে সেখান থেকে একটি কথা পাওয়া গেছে, তা হচ্ছেওপরের নির্দেশে জেলা প্রশাসক করা হয়েছে। কিন্তু এটি সঠিক অনুবাদ নয়। মজার বিষয় হচ্ছে, ডেপুটি কমিশনার-এর ঊর্ধ্বতন হিসেবে বিভাগীয় প্রশাসনে যিনি দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর পদবি কমিশনার, বাংলা পরিভাষায় যা কমিশনারই রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সেখানে কমিশনারকে বিভাগীয় প্রশাসক বলা হয়নি।

আবার এরপর জেলা প্রশাসক সম্মেলন ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও এর মীমাংসিত উত্তর দিতে পারেননি মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ। তিনি স্বীকারও করলেন, আইন-বিধিতে জেলা প্রশাসক শব্দটি নেই। অবশ্য জেলা প্রশাসক শব্দটি নিয়ে কঠিন মন্তব্য করেছিলেন সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। তিনি বলেছিলেন, জোর যার মুল্লুক তার নীতি ঔপনিবেশিক আমল থেকে প্রয়োগ হচ্ছে। বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে সেটি রয়ে গেছে। ডিসিদের  জেলা প্রশাসক পদবি বহাল রাখা তারই ধারাবাহিকতা। প্রশাসক শব্দের মাধ্যমে একটি মাতবরি বা মোড়লিপনার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা। এই পদনামটি পরিবর্তন হওয়া উচিত।

এ কথাটি স্পষ্ট যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক বা প্রশাসক হন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। সংবিধানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক শাসনের ভার প্রদানের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক ইউনিটগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধির নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। দেশের প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর অন্যতমউপজেলা, জেলা ও বিভাগ। আজ বাস্তবতা হচ্ছে, এর কোনোটিই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না। উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ গঠন করা হলেও কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানকে আলংকারিক করে রাখা হয়েছে।

একসময় ডিসি ছিলেন, পরে সচিব হিসেবে অবসর নেন এমন একজন এ কে এম আব্দুল আওয়াল মজুমদারের ভাষ্য ছিল—‘ডেপুটি কমিশনার-এর বাংলা কোনোভাবেই  জেলা প্রশাসক হতে পারে না। তবে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলা পরিভাষা হিসেবে জেলা প্রশাসক ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে আরেকটি প্রশ্নের উদ্ভব হয়, তা হচ্ছেবিভিন্ন জেলার ওয়েবসাইটগুলোতে ঢুকলে দেখা যায়, ডিসিরা তাঁদের পরিচয় লিখেছেন, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। প্রশ্ন হচ্ছে, জেলা প্রশাসক শব্দদ্বয় যদি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট-এর বাংলা পরিভাষা হবে, তাহলে একই বিষয় দুইবার করে লেখার কী দরকার।

 

আমরা সাধারণত দেখতে পাই, ডিসিদের জেলায় তিন ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কমিশনার। অর্থাৎ রাজস্ব আদায়, বিচারসংক্রান্ত এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের সমন্বয়। প্রথম ও দ্বিতীয় দায়িত্বটি ২০০ বছরের বেশি সময় আগের, যা ব্রিটিশ কম্পানি শাসনামলের। শেষোক্ত দায়িত্বটি যোগ হয়েছে পাকিস্তান আমলে। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথককরণ হলে ডিসিরা শুধু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসির দায়িত্বে থাকেন, অথচ তা-ও সংবিধান সম্মত নয়। বিষয়টি নিয়ে আদালতের রায় এখনো অপেক্ষমাণ। আর এসব নানা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে জেলা প্রশাসক পদনামটিই ব্যবহার হয়ে চলেছে। কেন পদনামটির যথার্থ সংস্কারটি হচ্ছে না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বিড়ালের গলায়  ঘণ্টা পরাবেন এমন কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই এরূপ বলেছেনএমন সংস্কারমূলক কাজের জন্য যে মানদণ্ডের কর্মচারী প্রয়োজন, প্রশাসনে তেমন ব্যক্তিদের দেখা যায় না।

ফিবছরের মতো এ বছরও মে-তে অনুষ্ঠিত হয়েছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন। ডিসি সম্মেলনে প্রতিবছরই বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব ওঠে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সম্মেলনের প্রথম দিনে তাঁদের পক্ষ থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৯০ ধারার অধীনে বিচারিক ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার দাবি ওঠে। ডিসি সম্মেলনে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, বিচার বিভাগ পৃথককরণের পর মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা বাড়াতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০(১)(এ)(বি)(সি) (ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা) ধারায় ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন। সম্মেলনে মুক্ত আলোচনায় একাধিক বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসি বলেন, বিচার বিভাগ পৃথককরণের পর ডিসির বিচারিক ক্ষমতা কমলেও শান্তি-শৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনে এখনো অনেক করণীয় আছে। অপরাধ দমন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা পুলিশকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখার নির্দেশ আছে। জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দায়ী। গুলিবর্ষণের তাৎক্ষণিক রিপোর্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত সরকারকে অবহিত করে থাকেন। গুলিবর্ষণ-পরবর্তী প্রশাসনিক তদন্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালনার নির্দেশ রয়েছে। এ জন্য ১৯০ ধারার ক্ষমতার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তিনি ডিসিদের বলে দেন, এ বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

একটি জেলায় ডিসিই হচ্ছেন সর্বেসর্বা। বাংলাদেশ ৬৪ জেলার দেশ। বলা যায়, ৬৪ জন ডিসির ওপর থাকে পুরো দেশটির ভার। এবারের ডিসি সম্মেলনে কিভাবে অনৈতিক চাপ ও দলীয় প্রভাব থেকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডকে দূরে রাখা যায়, এই বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। ডিসিরা জানান, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করেই উন্নয়ন ও জনসেবা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে; তবে অবৈধ তদবির, প্রভাব বিস্তার ও অন্যায্য সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এবারের সম্মেলনে জেলা প্রশাসকরা ৪৯৮টি প্রস্তাব পেশ করেন। এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মাঠপ্রশাসনে ভালোভাবে কাজ করতে ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছেপ্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণপূর্বক প্রতিরোধ ও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, যা ডিসি সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের সমস্যা, প্রত্যাশা ও প্রস্তাব শুনে সমাধানের উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জেলা প্রশাসকরা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তা নিঃসন্দেহে সবার কাছেই অনুমেয়। জেলা প্রশাসকরা নিজেদের দাবিদাওয়া বলেন, আদায়ও করেন। অন্যদিকে সরকারও জেলা প্রশাসকদের দিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু পদনামটির ভুলের আর পরিবর্তন হয় না। আর এক ভুলের শরীর বেয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে হাজারো ভুল। তাই এবার এই ভুলের একটা সুরাহা হওয়া উচিত।

তথ্য মতে, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য ২৬টি সংস্কার কমিশন বা কমিটি গঠন করা হলেও বাংলাদেশে এখনো গতানুগতিক জনপ্রশাসন ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। ফলে এর ফাঁক গলিয়ে জনপ্রশাসনে মেধা ও দক্ষতার গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ-পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতার স্থান নিয়েছে দলীয় আনুগত্য ও চাটুকারিতা। এবার এর অবসান হওয়া উচিত। পদনামটির সঠিক ও গ্রহণযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই হোক তার সূচনা। 

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান : আমার জুলাই স্মৃতি

সাঈদ খান

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান : আমার জুলাই স্মৃতি

এই রাষ্ট্র তার সন্তানদের বুলেট উপহার দিচ্ছে’—আমি শুধু সত্যটি লিখেছিলাম। এটিই ছিল আমার অপরাধ। তিন ঘণ্টা ধরে আমাকে পেটানো হয়েছে। সেই পিটুনির দাগ আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনো মাঝে মাঝে কোমরে- হাঁটুতে তীব্র ব্যথা হয়।

সাংবাদিকতাকে আপনি নিছক একটি চাকরি হিসেবে দেখতে পারবেন না। আপনি সাদাকে সাদা বলবেন, কালোকে কালো বলবেন, অন্যায়কে অন্যায় বলবেন এবং সাংবাদিকতা হবে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। যখন গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়, তখন গণমাধ্যম হয় সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা।

আমি জার্মানভিত্তিক দ্য মিরর এশিয়ার ঢাকা ব্যুরোতে কর্মরত ছিলাম, যার কারণে আমার অফিসের ওপর সরাসরি সেন্সরশিপ আরোপ করা শেখ হাসিনা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ এটি জার্মানির বন শহর থেকে প্রকাশিত হতো। ফলে এই খবরগুলো জার্মানি থেকে অ্যাজ ইট ইজ পাবলিশ করা যেত, যেটি অনেকেই সাহস করে ছাপতে পারেননি।

১৫ জুলাইয়ের পর, যখন বাংলাদেশের কালো পিচঢালা রাজপথ আমার দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখনো কিন্তু আমাদের হাতে কলম ছিল, চোখে দৃষ্টি ছিল, আমাদের ক্যামেরায় লেন্স ছিল, ব্যাটারিও ছিল। কিন্তু আমরা অনেকেই তা দেখাতে পারিনি। আমি সেটুকু দেখানোর চেষ্টা করেছি। যাঁরা করেননি, তাঁদের বিষয়টি আলোচনা করব না। কারণ এমন মানুষদের নিয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান : আমার জুলাই স্মৃতি১৮ জুলাইয়ের পরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রথমে আমি অন্য গণমাধ্যমের বিশেষ ব্যবস্থার ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে খবর পাঠানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। পরে সেই ব্যান্ডউইথও সংকুচিত করে দিলে ছবি বা ভিডিও কিছুই পাঠানো যাচ্ছিল না। তখন আমি সরাসরি মোবাইল ফোনে এখান থেকে জার্মানিতে ৪৯ টাকা মিনিটে কল করে সংবাদ দিচ্ছিলাম এবং বন শহরের অফিসে বসে দিনরাত জার্মানিতে কর্মরত সাংবাদিক মারুফ মল্লিক তা লিখে নিচ্ছিলেন। সেই সময় হাসপাতাল থেকে ডেথ রেজিস্টার গায়েব করা হচ্ছিল, পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ ফেরত দেওয়া হচ্ছিল, সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা লুকানো হচ্ছিল। এমনকি পুলিশেরও কিছু সদস্য জনরোষে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এই খবরগুলো যখন দ্য মিরর এশিয়ার রেফারেন্সে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ হতে থাকে, তখন ইউরোপ-আমেরিকার বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ওই নিউজ প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীদের গণহারে হত্যার এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে শেখ হাসিনা মেট্রো রেল পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, যারা বিদেশে তথ্য পাচার করছে, তাদের চিহ্নিত করেছি, শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।

২৫ জুলাই ২০২৪, বৃহস্পতিবার, আমি, কাদের গণি চৌধুরী (সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ওই সময়ের সদস্যসচিব), সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজী, ডিইউজের সহসভাপতি রাশেদুল ইসলামসহ আমরা প্রতিদিন প্রেস ক্লাবের সামনে এই হত্যার প্রতিবাদে সমাবেশ করেছি, বক্তব্য দিয়েছি। রাত ১১টার দিকে আমি মগবাজারে আমার বাসায় ফিরি। আমার সাত বছর বয়সী ছোট সন্তান সাঈফ খুবই অসুস্থ, তার গলায় অপারেশন হয়েছে। বড় ছেলে সাঈম তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি আমার স্ত্রী ইতীকে বলি, আমার বন্ধু মেহের কায়সার রানার কাছে কিছু টাকা রাখা আছে—‘আমি সেফ জায়গায় চলে যাব। ঠিক ১০ মিনিটের মধ্যে আমি ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যাবওই সময়েই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) আমাকে ফোন করেন ওই সময়ের পরিস্থিতি জানার জন্য। এর কিছুক্ষণ আগে অবশ্য বেইলি রোডে রানার বাসার ছাদে বসে বিএনপির ওই সময়কার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ২৯ মিনিট নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং আন্দোলন যাতে বন্ধ না হয়, সেই নির্দেশনা দেন। আমার ফোন থেকে বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সহসম্পাদক ডা. পারভেজ রেজা কাকনও আহতদের চিকিৎসাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং তারেক রহমানের নির্দেশনা গ্রহণ করেন।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি যে ১৮ জুলাই শেখ হাসিনা ছাত্রদের দাবি মেনে নেন, ছাত্ররা ক্যাম্পাস এবং হল খুলে দিতে বলে, আন্দোলন যখন প্রায় শেষ, ঠিক তখনই তারেক রহমান নির্দেশ দেন পদধারী নেতারা যাতে সামনে না পড়ে, কর্মীদের নেতৃত্বের নির্দেশ দিতে বলেন। ততক্ষণে আন্দোলন ছাত্রদের হাতছাড়া হয়ে গণ-আন্দোলন হিসেবে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে।

১০ জুলাই থেকে প্রতিদিনই তারেক রহমান আমাকে বলেছিলেন, দুই ঘণ্টা পর পর আমি যেন পরিস্থিতি উনাকে অবহিত করি। নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মোবাইলের ব্যালান্স সংকটে পড়ে যাই। বন্ধু সাইফুর রহমান আসাদ সেগুনবাগিচা এলাকায় একা একা আন্দোলনের নানা দিক নিয়ে কৌশলে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং ছাত্র-জনতাকে রাস্তা ছাড়তে নিষেধ করছিলেন। আসাদকে বললাম, মোবাইলে ব্যালান্স কই পাব। সে আমাকে ১৫ হাজার টাকা লোডের ব্যবস্থা করে দেয়। সেই টাকা দিয়েই লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির শীর্ষ নেতাকে অবহিত করি সার্বিক পরিস্থিতি। সেই আলাপ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ট্র্যাক করে ফেলে। এর পর থেকেই তারা আমাকে সন্দেহ করতে থাকে এই নাশকতার পরিকল্পনাকারী হিসেবে।

হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়া হয়। বাইরে থেকে বলা হয়, ইন্টারনেটের ওয়াই-ফাই ঠিক করতে এসেছি। এই অজুহাতে দরজা খুলতেই ১৫-১৬ জন সাদা পোশাকধারী লোক ঘরে ঢুকে পড়ে। আমার অসুস্থ ছোট সন্তান ও বড় ছেলের সামনে তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এমন অশ্লীল ও জঘন্য ভাষাকেউ কল্পনাও করতে পারবে না। তারা সবাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সদস্যবিসিএস ক্যাডার, কমিশনড অফিসার, বিভিন্ন বাহিনীর মিশ্রণ। আমার স্ত্রীকেও তারা এমন ভাষায় গালি দেয়, যা আমরা সবচেয়ে তিক্ত পরিস্থিতিতেও কোনো নারীকে বলি না। আমার ছেলেকেও তারা তুলে নিতে চায়।

আমি অনুরোধ করি, আমাকে নিয়ে যান, আমাকে যা খুশি করেন, কিন্তু আমার পরিবারকে স্পর্শ করবেন না, প্লিজ। পরে তারা আমাকে গাড়িতে তোলে। চোখ বেঁধে, দুই হাত পেছনে বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে, মাথায় একটি কালো টুপি পরিয়ে দেয়। আমি নিজেই বহুবার এই টুপির সংবাদ করেছি।

আমি বললাম, আমি তো কোনো সন্ত্রাসী না, আমাকে কেন এভাবে নিচ্ছেন? তখন পেছন থেকে একটি শক্ত কিছু দিয়েসম্ভবত লাঠি বা শটগানের বাঁটআমার ঘাড়ের পেছনে ১৫ থেকে ২০ বার আঘাত করা হয়। আমার মনে হচ্ছিল চোখ বেরিয়ে আসবে, দাঁত খসে যাবে। আমি একপ্রকার অচেতন হয়ে যাই। তারপর তারা আমার পাঁজরের পেছনে বেশ কয়েকবার বক্সিংয়ের মতো আঘাত করে। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তখনই বুঝে যাইএদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই, চুপ থাকাই ভালো।

দুই ঘণ্টা এভাবে ঘোরানোর পর তারা আমাকে কোথায় যেন নিয়ে যায়। চোখ ও হাত বাঁধা। একটি ঘরে ঢুকিয়ে রেখে কেউ কিছু বলে না, শুধু ঘোরাঘুরি করে। হঠাৎ একজন এসে বলে—‘আসেন। তখনো চোখ বাঁধা। দুজন আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে দুই হাত বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেই রাতটি আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ রাত। পুরো রাত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে চাপে রাখা হয়, যেন জোর করে কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। অথচ যেদিন মেট্রো রেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, সেদিন আমি ছিলাম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে। বহু সহকর্মী ছিলেন, রেজিস্টার খাতা ও প্রবেশ-প্রস্থান লগে আমার নাম আছে। তবু আমাকে সেই মামলার প্রধান আসামি বানানো হয়। পরদিন আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। আমি একা নই। এই জুলাই স্মৃতি বহু সাংবাদিক ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের জন্যই এক আতঙ্কের নাম। জুলাই মাসজুড়েই সাংবাদিকসমাজ ছিল আতঙ্কে। পাঁচ সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন, দুই শতাধিক আহত, আর অসংখ্য গুম, গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা হয়েছে।

আমাকে যেভাবে মধ্যরাতে তুলে নেওয়া হলো, আমার স্ত্রী-সন্তানের চোখের সামনে যেভাবে অসম্মান করা হলো, তা শুধু ব্যক্তি সাঈদ খানের ওপর নয়, সাংবাদিকতা, মত প্রকাশ, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার নগ্ন প্রকাশ। সেদিন আমি অনুভব করেছি১৫ বছর সাত মাস ধরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনে রাজনৈতিক কর্মীরা যেসব ভয়াবহ নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, আমি তার এক ক্ষুদ্র ঝলক মাত্র দেখেছি।

শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে বা ভিন্নমত পোষণ করলেই একটি রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ধরে নিয়ে যায়, দিনের পর দিন বন্দি করে রাখে, নির্মম-নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং অবর্ণনীয় নির্যাতনে হত্যা করে, তারপর নিথর দেহটি পর্যন্ত গুম করে ফেলে! এই বর্বরতা থেকে রাষ্ট্র কী আনন্দ পায়?

রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিএতটা নিষ্ঠুর কিভাবে হতে পারেন? কোথায় তাঁদের হৃদয়? যাঁরা এই ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে জড়িতশেখ হাসিনা, তাঁর নির্দেশনাধীন পুলিশ, র‌্যাব এবং সাদা পোশাকের নানা বাহিনীর নির্দয় পাষণ্ড সদস্যরাতাঁরা কি একটিবারও ভেবেছেন, যাকে তুলে নিয়েছে, হত্যা করছে, সে-ও কোনো বাবার সন্তান, কোনো মায়ের বুকের ধন, কোনো স্ত্রীর স্বামী কিংবা বোনের ভাই। তাঁদের অন্তরে কি একটুও মানবিক অনুভূতি অবশিষ্ট ছিল না?

আয়নাঘরের ইতিহাস আমাদের সামনে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, যেখানে প্রতিটি গুম, প্রতিটি নিষ্ঠুরতা আর প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে মানবতা বারবার হেরে গেছে রাষ্ট্রীয় পাশবিকতার কাছে। এই ভয়ংকর ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কি বর্তমান সরকার ও তার নিরাপত্তা বাহিনী কোনো শিক্ষা নেবে, নাকি আগের মতোই নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই পথে হাঁটছেন না বা কখনোই হাঁটবেন নাএ বিশ্বাসও আমাদের আছে।

দেশের মানুষ কত আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি আন্তরিক সমর্থন জানিয়েছিল। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর এ দেশের প্রতিটি মানুষ নতুন এক আশায় বুক বেঁধেছে। তারা ভেবেছে, এবার সবাই মিলিয়ে একটি কাঙ্ক্ষিত দেশ গড়ে তুলব, যেখানে কোনো বৈষম্য, দুর্নীতি, লুটপাট, খুন-ধর্ষণ, নিপীড়ন-নির্যাতন থাকবে না, জনগণ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে দেশ আবারও এবং ধর্মীয় মৌলবাদী ফ্যাসিজমের কবলে পড়ে। দাবিদাওয়া আদায়ের নামে বা বাকস্বাধীনতা বা অধিকারের নামে হামলা-মামলা, মব, সন্ত্রাস, গুম, হত্যা ও দমন-পীড়নের চক্রে ফিরে যায়, যা জন-আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আয় ও বেতন বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য-পানি, পরিবেশ রক্ষাকোনোটিরই উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণে সফল হয়নি। 

বিএনপি সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে একটি নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। একইভাবে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেও একটি নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রশাসনিক কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রয়াস দীর্ঘ মেয়াদে সফল হলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় একটি নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি পুনর্গঠনের ৩১ দফা রূপরেখা, ভিশন ২০৩০ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের কাজ দৃশ্যমানভাবে চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। জনগণের হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র ও মানুষের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনএই তিনটি লক্ষ্য আজকের রাজনীতির মূল চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ জনগণকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা, প্রশাসনকে জবাবদিহিমূলক করা, বিচারব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতি এবং একটি জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের কাজ আরো গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর করা প্রয়োজন। অর্থাৎ যা ছিল মহান স্বাধীনতা, নব্বই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল দর্শন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই চব্বিশ কারো কাছে ক্ষমতার সিঁড়ি, কারো কাছে রাজনৈতিক কলঙ্ক মোচনের হাতিয়ার, আবার কারো কাছে শুধুই ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু আমার কাছে চব্বিশ মানেপুনরায় বেঁচে ফেরা, আমার দুই সন্তানের কাছে বাবাকে ফিরে পাওয়া, আমার মা-বাবার কাছে সন্তানের ফিরে আসা, আমার স্ত্রীর বিধবা না হওয়া। দেশবাসীর কাছে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যে পৌঁছানোর শেষ সুযোগটি হাতে পাওয়া। 

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

বর্তমান সরকারের গতি-প্রকৃতি ও জনপ্রত্যাশা

ড. শাহরীনা আখতার

বর্তমান সরকারের গতি-প্রকৃতি ও জনপ্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম ১০০ দিন ছিল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে যাত্রার সূচনা। এ সময় অর্থনীতি, কৃষি, প্রশাসন, বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক, বিভিন্ন খাতে নতুন দিকনির্দেশনার চেষ্টা দেখা গেছে। তবে উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তব ফল, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সুশাসনের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

শুরুটা ছিল প্রত্যাশার : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের সামনে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের সুযোগও এসেছে। বিরোধী রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ প্রত্যাশা ছিল। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রতীক, আর সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, দলীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে তিনি কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতায় রূপ দিতে পারবেন।

প্রথম ১০০ দিনে সরকার যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দিতে চেয়েছে, তা হলো গতি ও সমন্বয়ের। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়মিত আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ, অর্থনীতি, কৃষি, বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগএসব উদ্যোগ একটি সক্রিয় প্রশাসনিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে তিনি মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয়। যদিও এই উদ্যোগগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল মূল্যায়নের জন্য আরো সময় প্রয়োজন, তবু প্রথম ১০০ দিনের অভিজ্ঞতা বলছে, নতুন সরকার অন্তত শুরুতেই একটি কর্মমুখী, সিদ্ধান্তনির্ভর এবং ফলাফলকেন্দ্রিক প্রশাসনের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

অর্থনীতিতে আস্থার বার্তা : নতুন সরকারের সামনে প্রথম ও সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। প্রথম ১০০ দিনে সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে নীতিগত সহায়তার ওপর জোর দেয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার, প্রবাসী বিনিয়োগকারী এবং দেশীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সক্রিয় করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নীতিগত ঘোষণা ইতিবাচক হলেও এর প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়ন করতে সময় লাগবে। কারণ মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো সূচকে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাজারে আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

কৃষিতে উদ্যোগ, কিন্তু প্রশ্নও আছে : তারেক রহমানের সরকার কৃষিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে স্মার্ট কৃষি, ডিজিটাল কৃষক নিবন্ধন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিঋণ সহজীকরণের মতো উদ্যোগের কথা বলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তবে দীর্ঘদিন কৃষি খাতের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই খাতের সবচেয়ে বড় সংকট প্রকল্পের সংখ্যা নয়, বরং নেতৃত্ব ও সুশাসন। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়ের অভাব, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব, স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রভাব এবং জবাবদিহির ঘাটতি নীতির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি কোথাও কোথাও সেই পরিবর্তনকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধার জন্য ব্যবহার করার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এই বাস্তবতায় শুধু পদ পরিবর্তন বা নতুন প্রকল্প ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কর্মদক্ষতা, সততা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা। কৃষি খাতে টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে অনিয়মের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, দক্ষ নেতৃত্বের বিকাশ এবং মাঠ পর্যায়ে নীতির সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

প্রশাসনিক সংস্কারের ইঙ্গিত : প্রশাসনকে আরো গতিশীল করার ঘোষণা নতুন সরকারের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, ফাইল নিষ্পত্তির সময় কমানো এবং কর্মদক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের ইঙ্গিত বহন করে। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনো সেই পুরনো কর্মসংস্কৃতি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্রভাবনির্ভর চর্চার ছাপ রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা স্বার্থান্বেষী নেটওয়ার্ক ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয় সংস্কারের গতিকে ধীর করে দেয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রাতিষ্ঠানিক আচরণেও পরিবর্তন আসবে।

একই প্রশাসনিক মানসিকতা ও জবাবদিহিহীন চর্চা বহাল থাকলে নতুন নীতির সুফলও সীমিত হয়ে পড়বে। তাই দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব বণ্টন এবং অনিয়ম, প্রভাবের অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণই হবে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রকৃত মানদণ্ড।

পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যের চেষ্টা : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শুরু থেকেই অর্থনৈতিক কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং জলবায়ু অর্থায়ন আকর্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড হবে সমঝোতা স্মারক নয়, বরং বাস্তব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি আয়ে তার দৃশ্যমান প্রতিফলন।

প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে সরকারের কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। সক্রিয় নেতৃত্বের ইঙ্গিত, অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা, কৃষি ও জলবায়ু অভিযোজনকে অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে জোরদার করার চেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। ঘোষিত সংস্কারের অনেকগুলোর বাস্তব প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়, মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবেই রয়েছে। কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তবায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মাঠ পর্যায়ের কার্যকারিতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, সেটি কমানোই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম ১০০ দিনের সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দৃশ্যমান ফলাফলের ওপর।

প্রথম ১০০ দিনে সরকার নীতিগত সক্রিয়তার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ এবং ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করেছে। একই সঙ্গে কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি, জলবায়ুসহনশীল উৎপাদনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনে সেবার গতি বাড়াতে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আলোচনা নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সামনে আসল পরীক্ষা : প্রথম ১০০ দিন কোনো সরকারের সাফল্যের মানদণ্ড নয়, বরং এটি সরকারের অগ্রাধিকার, নীতিগত দর্শন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি প্রাথমিক সূচক। এই সময়ে সরকার অর্থনীতি, কৃষি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সক্রিয়তার বার্তা দিয়েছে, যা জনমনে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তবে নীতিগত ঘোষণা ও বাস্তব পরিবর্তনের মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, সফল সরকার সেই, যারা নীতিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে এবং প্রতিশ্রুতিকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ দিতে পারে। তারেক রহমানের সরকারের ক্ষেত্রেও প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কৃষকের আয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং জনসেবার মানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস উদ্যোগ বা ঘোষণাকে নয়, বরং মানুষের জীবনে আনা বাস্তব পরিবর্তনকেই স্মরণে রাখে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি