• ই-পেপার

ডেপুটি কমিশনার কেন জেলা প্রশাসক

  • নির্মল চক্রবর্তী

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান : আমার জুলাই স্মৃতি

সাঈদ খান

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান : আমার জুলাই স্মৃতি

এই রাষ্ট্র তার সন্তানদের বুলেট উপহার দিচ্ছে’—আমি শুধু সত্যটি লিখেছিলাম। এটিই ছিল আমার অপরাধ। তিন ঘণ্টা ধরে আমাকে পেটানো হয়েছে। সেই পিটুনির দাগ আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনো মাঝে মাঝে কোমরে- হাঁটুতে তীব্র ব্যথা হয়।

সাংবাদিকতাকে আপনি নিছক একটি চাকরি হিসেবে দেখতে পারবেন না। আপনি সাদাকে সাদা বলবেন, কালোকে কালো বলবেন, অন্যায়কে অন্যায় বলবেন এবং সাংবাদিকতা হবে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। যখন গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়, তখন গণমাধ্যম হয় সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা।

আমি জার্মানভিত্তিক দ্য মিরর এশিয়ার ঢাকা ব্যুরোতে কর্মরত ছিলাম, যার কারণে আমার অফিসের ওপর সরাসরি সেন্সরশিপ আরোপ করা শেখ হাসিনা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ এটি জার্মানির বন শহর থেকে প্রকাশিত হতো। ফলে এই খবরগুলো জার্মানি থেকে অ্যাজ ইট ইজ পাবলিশ করা যেত, যেটি অনেকেই সাহস করে ছাপতে পারেননি।

১৫ জুলাইয়ের পর, যখন বাংলাদেশের কালো পিচঢালা রাজপথ আমার দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখনো কিন্তু আমাদের হাতে কলম ছিল, চোখে দৃষ্টি ছিল, আমাদের ক্যামেরায় লেন্স ছিল, ব্যাটারিও ছিল। কিন্তু আমরা অনেকেই তা দেখাতে পারিনি। আমি সেটুকু দেখানোর চেষ্টা করেছি। যাঁরা করেননি, তাঁদের বিষয়টি আলোচনা করব না। কারণ এমন মানুষদের নিয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান : আমার জুলাই স্মৃতি১৮ জুলাইয়ের পরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রথমে আমি অন্য গণমাধ্যমের বিশেষ ব্যবস্থার ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে খবর পাঠানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। পরে সেই ব্যান্ডউইথও সংকুচিত করে দিলে ছবি বা ভিডিও কিছুই পাঠানো যাচ্ছিল না। তখন আমি সরাসরি মোবাইল ফোনে এখান থেকে জার্মানিতে ৪৯ টাকা মিনিটে কল করে সংবাদ দিচ্ছিলাম এবং বন শহরের অফিসে বসে দিনরাত জার্মানিতে কর্মরত সাংবাদিক মারুফ মল্লিক তা লিখে নিচ্ছিলেন। সেই সময় হাসপাতাল থেকে ডেথ রেজিস্টার গায়েব করা হচ্ছিল, পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ ফেরত দেওয়া হচ্ছিল, সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা লুকানো হচ্ছিল। এমনকি পুলিশেরও কিছু সদস্য জনরোষে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এই খবরগুলো যখন দ্য মিরর এশিয়ার রেফারেন্সে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ হতে থাকে, তখন ইউরোপ-আমেরিকার বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ওই নিউজ প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীদের গণহারে হত্যার এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে শেখ হাসিনা মেট্রো রেল পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, যারা বিদেশে তথ্য পাচার করছে, তাদের চিহ্নিত করেছি, শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।

২৫ জুলাই ২০২৪, বৃহস্পতিবার, আমি, কাদের গণি চৌধুরী (সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ওই সময়ের সদস্যসচিব), সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজী, ডিইউজের সহসভাপতি রাশেদুল ইসলামসহ আমরা প্রতিদিন প্রেস ক্লাবের সামনে এই হত্যার প্রতিবাদে সমাবেশ করেছি, বক্তব্য দিয়েছি। রাত ১১টার দিকে আমি মগবাজারে আমার বাসায় ফিরি। আমার সাত বছর বয়সী ছোট সন্তান সাঈফ খুবই অসুস্থ, তার গলায় অপারেশন হয়েছে। বড় ছেলে সাঈম তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি আমার স্ত্রী ইতীকে বলি, আমার বন্ধু মেহের কায়সার রানার কাছে কিছু টাকা রাখা আছে—‘আমি সেফ জায়গায় চলে যাব। ঠিক ১০ মিনিটের মধ্যে আমি ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যাবওই সময়েই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) আমাকে ফোন করেন ওই সময়ের পরিস্থিতি জানার জন্য। এর কিছুক্ষণ আগে অবশ্য বেইলি রোডে রানার বাসার ছাদে বসে বিএনপির ওই সময়কার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ২৯ মিনিট নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং আন্দোলন যাতে বন্ধ না হয়, সেই নির্দেশনা দেন। আমার ফোন থেকে বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সহসম্পাদক ডা. পারভেজ রেজা কাকনও আহতদের চিকিৎসাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং তারেক রহমানের নির্দেশনা গ্রহণ করেন।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি যে ১৮ জুলাই শেখ হাসিনা ছাত্রদের দাবি মেনে নেন, ছাত্ররা ক্যাম্পাস এবং হল খুলে দিতে বলে, আন্দোলন যখন প্রায় শেষ, ঠিক তখনই তারেক রহমান নির্দেশ দেন পদধারী নেতারা যাতে সামনে না পড়ে, কর্মীদের নেতৃত্বের নির্দেশ দিতে বলেন। ততক্ষণে আন্দোলন ছাত্রদের হাতছাড়া হয়ে গণ-আন্দোলন হিসেবে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে।

১০ জুলাই থেকে প্রতিদিনই তারেক রহমান আমাকে বলেছিলেন, দুই ঘণ্টা পর পর আমি যেন পরিস্থিতি উনাকে অবহিত করি। নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মোবাইলের ব্যালান্স সংকটে পড়ে যাই। বন্ধু সাইফুর রহমান আসাদ সেগুনবাগিচা এলাকায় একা একা আন্দোলনের নানা দিক নিয়ে কৌশলে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং ছাত্র-জনতাকে রাস্তা ছাড়তে নিষেধ করছিলেন। আসাদকে বললাম, মোবাইলে ব্যালান্স কই পাব। সে আমাকে ১৫ হাজার টাকা লোডের ব্যবস্থা করে দেয়। সেই টাকা দিয়েই লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির শীর্ষ নেতাকে অবহিত করি সার্বিক পরিস্থিতি। সেই আলাপ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ট্র্যাক করে ফেলে। এর পর থেকেই তারা আমাকে সন্দেহ করতে থাকে এই নাশকতার পরিকল্পনাকারী হিসেবে।

হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়া হয়। বাইরে থেকে বলা হয়, ইন্টারনেটের ওয়াই-ফাই ঠিক করতে এসেছি। এই অজুহাতে দরজা খুলতেই ১৫-১৬ জন সাদা পোশাকধারী লোক ঘরে ঢুকে পড়ে। আমার অসুস্থ ছোট সন্তান ও বড় ছেলের সামনে তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এমন অশ্লীল ও জঘন্য ভাষাকেউ কল্পনাও করতে পারবে না। তারা সবাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সদস্যবিসিএস ক্যাডার, কমিশনড অফিসার, বিভিন্ন বাহিনীর মিশ্রণ। আমার স্ত্রীকেও তারা এমন ভাষায় গালি দেয়, যা আমরা সবচেয়ে তিক্ত পরিস্থিতিতেও কোনো নারীকে বলি না। আমার ছেলেকেও তারা তুলে নিতে চায়।

আমি অনুরোধ করি, আমাকে নিয়ে যান, আমাকে যা খুশি করেন, কিন্তু আমার পরিবারকে স্পর্শ করবেন না, প্লিজ। পরে তারা আমাকে গাড়িতে তোলে। চোখ বেঁধে, দুই হাত পেছনে বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে, মাথায় একটি কালো টুপি পরিয়ে দেয়। আমি নিজেই বহুবার এই টুপির সংবাদ করেছি।

আমি বললাম, আমি তো কোনো সন্ত্রাসী না, আমাকে কেন এভাবে নিচ্ছেন? তখন পেছন থেকে একটি শক্ত কিছু দিয়েসম্ভবত লাঠি বা শটগানের বাঁটআমার ঘাড়ের পেছনে ১৫ থেকে ২০ বার আঘাত করা হয়। আমার মনে হচ্ছিল চোখ বেরিয়ে আসবে, দাঁত খসে যাবে। আমি একপ্রকার অচেতন হয়ে যাই। তারপর তারা আমার পাঁজরের পেছনে বেশ কয়েকবার বক্সিংয়ের মতো আঘাত করে। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তখনই বুঝে যাইএদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই, চুপ থাকাই ভালো।

দুই ঘণ্টা এভাবে ঘোরানোর পর তারা আমাকে কোথায় যেন নিয়ে যায়। চোখ ও হাত বাঁধা। একটি ঘরে ঢুকিয়ে রেখে কেউ কিছু বলে না, শুধু ঘোরাঘুরি করে। হঠাৎ একজন এসে বলে—‘আসেন। তখনো চোখ বাঁধা। দুজন আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে দুই হাত বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেই রাতটি আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ রাত। পুরো রাত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে চাপে রাখা হয়, যেন জোর করে কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। অথচ যেদিন মেট্রো রেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, সেদিন আমি ছিলাম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে। বহু সহকর্মী ছিলেন, রেজিস্টার খাতা ও প্রবেশ-প্রস্থান লগে আমার নাম আছে। তবু আমাকে সেই মামলার প্রধান আসামি বানানো হয়। পরদিন আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। আমি একা নই। এই জুলাই স্মৃতি বহু সাংবাদিক ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের জন্যই এক আতঙ্কের নাম। জুলাই মাসজুড়েই সাংবাদিকসমাজ ছিল আতঙ্কে। পাঁচ সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন, দুই শতাধিক আহত, আর অসংখ্য গুম, গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা হয়েছে।

আমাকে যেভাবে মধ্যরাতে তুলে নেওয়া হলো, আমার স্ত্রী-সন্তানের চোখের সামনে যেভাবে অসম্মান করা হলো, তা শুধু ব্যক্তি সাঈদ খানের ওপর নয়, সাংবাদিকতা, মত প্রকাশ, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার নগ্ন প্রকাশ। সেদিন আমি অনুভব করেছি১৫ বছর সাত মাস ধরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনে রাজনৈতিক কর্মীরা যেসব ভয়াবহ নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, আমি তার এক ক্ষুদ্র ঝলক মাত্র দেখেছি।

শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে বা ভিন্নমত পোষণ করলেই একটি রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ধরে নিয়ে যায়, দিনের পর দিন বন্দি করে রাখে, নির্মম-নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং অবর্ণনীয় নির্যাতনে হত্যা করে, তারপর নিথর দেহটি পর্যন্ত গুম করে ফেলে! এই বর্বরতা থেকে রাষ্ট্র কী আনন্দ পায়?

রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিএতটা নিষ্ঠুর কিভাবে হতে পারেন? কোথায় তাঁদের হৃদয়? যাঁরা এই ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে জড়িতশেখ হাসিনা, তাঁর নির্দেশনাধীন পুলিশ, র‌্যাব এবং সাদা পোশাকের নানা বাহিনীর নির্দয় পাষণ্ড সদস্যরাতাঁরা কি একটিবারও ভেবেছেন, যাকে তুলে নিয়েছে, হত্যা করছে, সে-ও কোনো বাবার সন্তান, কোনো মায়ের বুকের ধন, কোনো স্ত্রীর স্বামী কিংবা বোনের ভাই। তাঁদের অন্তরে কি একটুও মানবিক অনুভূতি অবশিষ্ট ছিল না?

আয়নাঘরের ইতিহাস আমাদের সামনে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, যেখানে প্রতিটি গুম, প্রতিটি নিষ্ঠুরতা আর প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে মানবতা বারবার হেরে গেছে রাষ্ট্রীয় পাশবিকতার কাছে। এই ভয়ংকর ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কি বর্তমান সরকার ও তার নিরাপত্তা বাহিনী কোনো শিক্ষা নেবে, নাকি আগের মতোই নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই পথে হাঁটছেন না বা কখনোই হাঁটবেন নাএ বিশ্বাসও আমাদের আছে।

দেশের মানুষ কত আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি আন্তরিক সমর্থন জানিয়েছিল। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর এ দেশের প্রতিটি মানুষ নতুন এক আশায় বুক বেঁধেছে। তারা ভেবেছে, এবার সবাই মিলিয়ে একটি কাঙ্ক্ষিত দেশ গড়ে তুলব, যেখানে কোনো বৈষম্য, দুর্নীতি, লুটপাট, খুন-ধর্ষণ, নিপীড়ন-নির্যাতন থাকবে না, জনগণ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে দেশ আবারও এবং ধর্মীয় মৌলবাদী ফ্যাসিজমের কবলে পড়ে। দাবিদাওয়া আদায়ের নামে বা বাকস্বাধীনতা বা অধিকারের নামে হামলা-মামলা, মব, সন্ত্রাস, গুম, হত্যা ও দমন-পীড়নের চক্রে ফিরে যায়, যা জন-আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আয় ও বেতন বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য-পানি, পরিবেশ রক্ষাকোনোটিরই উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণে সফল হয়নি। 

বিএনপি সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে একটি নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। একইভাবে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেও একটি নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রশাসনিক কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রয়াস দীর্ঘ মেয়াদে সফল হলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় একটি নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি পুনর্গঠনের ৩১ দফা রূপরেখা, ভিশন ২০৩০ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের কাজ দৃশ্যমানভাবে চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। জনগণের হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র ও মানুষের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনএই তিনটি লক্ষ্য আজকের রাজনীতির মূল চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ জনগণকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা, প্রশাসনকে জবাবদিহিমূলক করা, বিচারব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতি এবং একটি জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের কাজ আরো গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর করা প্রয়োজন। অর্থাৎ যা ছিল মহান স্বাধীনতা, নব্বই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল দর্শন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই চব্বিশ কারো কাছে ক্ষমতার সিঁড়ি, কারো কাছে রাজনৈতিক কলঙ্ক মোচনের হাতিয়ার, আবার কারো কাছে শুধুই ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু আমার কাছে চব্বিশ মানেপুনরায় বেঁচে ফেরা, আমার দুই সন্তানের কাছে বাবাকে ফিরে পাওয়া, আমার মা-বাবার কাছে সন্তানের ফিরে আসা, আমার স্ত্রীর বিধবা না হওয়া। দেশবাসীর কাছে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যে পৌঁছানোর শেষ সুযোগটি হাতে পাওয়া। 

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, কালের কণ্ঠ

বর্তমান সরকারের গতি-প্রকৃতি ও জনপ্রত্যাশা

ড. শাহরীনা আখতার

বর্তমান সরকারের গতি-প্রকৃতি ও জনপ্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম ১০০ দিন ছিল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে যাত্রার সূচনা। এ সময় অর্থনীতি, কৃষি, প্রশাসন, বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক, বিভিন্ন খাতে নতুন দিকনির্দেশনার চেষ্টা দেখা গেছে। তবে উদ্যোগের পাশাপাশি বাস্তব ফল, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সুশাসনের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

শুরুটা ছিল প্রত্যাশার : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের সামনে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের সুযোগও এসেছে। বিরোধী রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ প্রত্যাশা ছিল। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রতীক, আর সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, দলীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে তিনি কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতায় রূপ দিতে পারবেন।

প্রথম ১০০ দিনে সরকার যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দিতে চেয়েছে, তা হলো গতি ও সমন্বয়ের। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়মিত আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ, অর্থনীতি, কৃষি, বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগএসব উদ্যোগ একটি সক্রিয় প্রশাসনিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে তিনি মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয়। যদিও এই উদ্যোগগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল মূল্যায়নের জন্য আরো সময় প্রয়োজন, তবু প্রথম ১০০ দিনের অভিজ্ঞতা বলছে, নতুন সরকার অন্তত শুরুতেই একটি কর্মমুখী, সিদ্ধান্তনির্ভর এবং ফলাফলকেন্দ্রিক প্রশাসনের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

অর্থনীতিতে আস্থার বার্তা : নতুন সরকারের সামনে প্রথম ও সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। প্রথম ১০০ দিনে সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে নীতিগত সহায়তার ওপর জোর দেয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার, প্রবাসী বিনিয়োগকারী এবং দেশীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সক্রিয় করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নীতিগত ঘোষণা ইতিবাচক হলেও এর প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়ন করতে সময় লাগবে। কারণ মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো সূচকে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাজারে আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

কৃষিতে উদ্যোগ, কিন্তু প্রশ্নও আছে : তারেক রহমানের সরকার কৃষিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে স্মার্ট কৃষি, ডিজিটাল কৃষক নিবন্ধন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিঋণ সহজীকরণের মতো উদ্যোগের কথা বলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তবে দীর্ঘদিন কৃষি খাতের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই খাতের সবচেয়ে বড় সংকট প্রকল্পের সংখ্যা নয়, বরং নেতৃত্ব ও সুশাসন। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়ের অভাব, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব, স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রভাব এবং জবাবদিহির ঘাটতি নীতির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি কোথাও কোথাও সেই পরিবর্তনকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধার জন্য ব্যবহার করার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। এই বাস্তবতায় শুধু পদ পরিবর্তন বা নতুন প্রকল্প ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কর্মদক্ষতা, সততা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা। কৃষি খাতে টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে অনিয়মের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, দক্ষ নেতৃত্বের বিকাশ এবং মাঠ পর্যায়ে নীতির সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

প্রশাসনিক সংস্কারের ইঙ্গিত : প্রশাসনকে আরো গতিশীল করার ঘোষণা নতুন সরকারের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, ফাইল নিষ্পত্তির সময় কমানো এবং কর্মদক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের ইঙ্গিত বহন করে। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনো সেই পুরনো কর্মসংস্কৃতি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্রভাবনির্ভর চর্চার ছাপ রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা স্বার্থান্বেষী নেটওয়ার্ক ও অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার বলয় সংস্কারের গতিকে ধীর করে দেয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রাতিষ্ঠানিক আচরণেও পরিবর্তন আসবে।

একই প্রশাসনিক মানসিকতা ও জবাবদিহিহীন চর্চা বহাল থাকলে নতুন নীতির সুফলও সীমিত হয়ে পড়বে। তাই দক্ষতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব বণ্টন এবং অনিয়ম, প্রভাবের অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণই হবে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রকৃত মানদণ্ড।

পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যের চেষ্টা : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শুরু থেকেই অর্থনৈতিক কূটনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং জলবায়ু অর্থায়ন আকর্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড হবে সমঝোতা স্মারক নয়, বরং বাস্তব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি আয়ে তার দৃশ্যমান প্রতিফলন।

প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে সরকারের কিছু ইতিবাচক দিক স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। সক্রিয় নেতৃত্বের ইঙ্গিত, অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা, কৃষি ও জলবায়ু অভিযোজনকে অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে জোরদার করার চেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। ঘোষিত সংস্কারের অনেকগুলোর বাস্তব প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়, মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবেই রয়েছে। কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তবায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মাঠ পর্যায়ের কার্যকারিতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, সেটি কমানোই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম ১০০ দিনের সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দৃশ্যমান ফলাফলের ওপর।

প্রথম ১০০ দিনে সরকার নীতিগত সক্রিয়তার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ এবং ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করেছে। একই সঙ্গে কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি, জলবায়ুসহনশীল উৎপাদনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনে সেবার গতি বাড়াতে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আলোচনা নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সামনে আসল পরীক্ষা : প্রথম ১০০ দিন কোনো সরকারের সাফল্যের মানদণ্ড নয়, বরং এটি সরকারের অগ্রাধিকার, নীতিগত দর্শন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি প্রাথমিক সূচক। এই সময়ে সরকার অর্থনীতি, কৃষি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সক্রিয়তার বার্তা দিয়েছে, যা জনমনে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তবে নীতিগত ঘোষণা ও বাস্তব পরিবর্তনের মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, সফল সরকার সেই, যারা নীতিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে এবং প্রতিশ্রুতিকে পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপ দিতে পারে। তারেক রহমানের সরকারের ক্ষেত্রেও প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কৃষকের আয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং জনসেবার মানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস উদ্যোগ বা ঘোষণাকে নয়, বরং মানুষের জীবনে আনা বাস্তব পরিবর্তনকেই স্মরণে রাখে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

বর্ষাকালীন কৃষি : আশা-নিরাশার দোলাচলে কৃষক

ড. জাহাঙ্গীর আলম

বর্ষাকালীন কৃষি : আশা-নিরাশার দোলাচলে কৃষক

ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে ছয়টি ঋতু। সেগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বর্ষাকাল। গ্রীষ্মের দিনগুলোতে মানুষ যখন অসহ্য গরমে ছটফট করতে থাকে, তখন বৃষ্টির বর্ষণ এসে বুলিয়ে দেয় শীতল পরশ। এ দেশে বৃষ্টি হয়ে থাকে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে। বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মৌসুমি বায়ু অনেক জলীয় বাষ্প বয়ে আনে। এরপর তা হিমালয়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে এ দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, যার ফলে বর্ষা শুরু হয়।

পঞ্জিকান্তরে আষাঢ় ও শ্রাবণএই দুই মাস বর্ষাকাল। কিন্তু বাংলাদেশে এ ঋতুর আগমন আগেই ঘটে যায়, শেষ হয় দেরিতে। এ দেশে সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে বর্ষণ শুরু হয়ে আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। হাওর এলাকায় এর স্থায়িত্ব আরো বেশি হয়, ছয় মাসেরও অধিক। দেশের মধ্য অঞ্চলে এর স্থায়িত্ব কম, প্রায় চার মাস। তখন মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর, খাল-বিল ও নদী-নালা জলপূর্ণ থাকে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে যায় সব ময়লা-আবর্জনা। এ সময় তরুলতা ও গাছপালা খুব সতেজ হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে দেখা যায় নানা রকম ফলের সম্ভার, ঘটে বিচিত্র ফুলের সমারোহ। বর্ষাই এই বাংলাকে করেছে শস্য-শ্যামল। এ ঋতুতে কৃষকরা বীজতলা প্রস্তুত করেন। বীজ বোনার পর চারাগাছ তুলে তা রোপণ করেন। এ ঋতুই ধান কাটা ও পাট কাটার উপযুক্ত সময়। এ সময় কৃষকরা বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলানোর জন্য ব্যস্ত থাকেন। তখন জলমগ্ন প্লাবনভূমিগুলো মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল আবাসক্ষেত্রে পরিণত হয়। জেলেদের হাতে ধরা পড়ে বিভিন্ন জাতের মাছ।

বর্ষাকালীন কৃষি : আশা-নিরাশার দোলাচলে কৃষকবাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান। তিনটি প্রধান ধানের মধ্যে দুটিই উৎপাদিত হয় বর্ষাকালে। এ মৌসুমে আউশ ও আমন ধানের চাষ হয়। আর বোরো ধানের চাষ হয় শীতকালে। মোট ধান উৎপাদনের দিক থেকে আউশের অবস্থান তৃতীয়, শতকরা আট ভাগ। আমন ধানের শরিকানা ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ধানের শতকরা ৪৬ ভাগ উৎপাদিত হয় বর্ষা মৌসুমে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বোরো ধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। ফলে আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। এখন অতিরিক্ত সেচনির্ভরতা ও উৎপাদন খরচের কারণে বোরো ধানের প্রতি কৃষকের নিরবচ্ছিন্ন আগ্রহ কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে। আউশ ও আমনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এই দুটি ধানের ক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে তা সম্প্রসারণের ফলে একরপ্রতি ফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বর্ষায় ঘন ঘন বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে খরার কারণে অনেক সময় ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হন এই দুটি ধানের উৎপাদনকারী কৃষকরা।

এবার আউশের উৎপাদন বিঘ্নিত হয়েছে বন্যার কারণে। আমনের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের প্রাথমিক বন্যায়। স্থানভেদে কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে মূল জমিতে আমনের চারা রোপণ কার্যক্রম। এরই মধ্যে প্রাপ্ত হিসাবে ১৫ শতাংশ আউশ ধানের উৎপাদন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগে বোরো ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাওরের বন্যায়। ফলে ছয়-সাত লাখ টন চালের উৎপাদন কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বাজারে চালের সরবরাহ হ্রাস পেতে পারে। দামও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বেড়ে যেতে পারে আমদানির পরিমাণ। সামনের আগস্ট পর্যন্ত এখনো বন্যার আশঙ্কা আছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। বন্যা হতে পারে উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও। এর জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। আউশ ধানের বন্যাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ও আমন ধানের ঘাতসহিষ্ণু বিলম্বিত জাত সম্প্রসারণের প্রতি যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। তা ছাড়া উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের অধীন এলাকা সম্প্রসারিত করতে হবে। হাওরের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে লাগসই গভীর পানি সহনশীল আমন জাতের। এর জন্য গুরুত্ব দিতে হবে গবেষণার ওপর। বর্ষাকালীন ধান অনেক সময় মার খায় বন্যার কারণে। এর জন্য শস্য বীমা চালু করা উচিত। এতে কৃষকদের হতাশা হ্রাস পাবে। বর্ষাকালীন কৃষির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে কৃষকদের।

বর্ষাকালীন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাট। এটি বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। রপ্তানি বাণিজ্যে পাটের অবস্থান দ্বিতীয়। একসময় ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয় আসত পাট থেকে। এখন তা নেমে এসেছে ৩ শতাংশে। রপ্তানি বাণিজ্যে গার্মেন্টস পণ্যসামগ্রীর আধিপত্যের কারণে পাটের শরিকানা কমেছে। কিন্তু নিরঙ্কুশ অঙ্কে তা বেড়েছে। পাটের আওতায় চাষকৃত জমির পরিমাণও কমেছে। তবে ফলন বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ একর জমিতে পাটের চাষ হয়। উৎপাদিত হয় প্রায় ৮৪ লাখ বেল পাট। বাংলাদেশে পাট গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য আছে। সম্প্রতি সাদা পাটের ১২টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। তোষা পাটের আটটি, কেনাফের চারটি এবং মেস্তার তিনটি উচ্চ ফলনশীল জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এগুলোর সম্প্রসারণ চলছে মাঠ পর্যায়ে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়া এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এ দেশের কৃষি পরিবেশে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। এখন আমাদের লবণাক্ততা, খরা ও শীত সহিষ্ণু জাতের পাট উদ্ভাবন করা দরকার। এরই মধ্যে দুইবার অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে পাট বোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তবে গবেষণার মাঠে নতুন উদ্ভাবিত পাটজাতের ফলন যত বেশি, কৃষকের মাঠে তত বেশি নয়। এই ফারাক কমিয়ে আনতে হবে। এর জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণের মধ্যে জোরালো সমন্বয় দরকার। পাট গবেষণা ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।

দেশের বিভিন্ন জেলায় মাটির ধরন, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার পার্থক্যের কারণে পাটের উৎপাদন, গুণাগুণ ও মানের তারতম্য ঘটে। পাট পচানোর ওপর নির্ভর করে এর রং ও ঔজ্জ্বল্য। পরিষ্কার পানিতে পাট পচালে ও ধুলে এর রং ভালো ও উজ্জ্বল হয়। বর্তমানে আমাদের কৃষকের বড় সমস্যা পাট পচানো। বর্ষার পানি অনেক সময় দ্রুত নেমে যাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাবে ঠিকভাবে পাট জাগ দিতে পারেন না কৃষকরা। পুকুর, ডোবা, খাল-বিল, দিঘি ও নালায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এই সমস্যা হয়। এবার সে সমস্যা নেই। অনবরত ভারি বৃষ্টিতে খাল-বিল-ডোবা পানিতে ভরপুর। দামও ভালো পাটের। এতে লাভবান হবেন কৃষক। পাটের বীজের অপ্রতুলতা এ দেশে পাট চাষের একটি বড় সমস্যা। দেশে উৎপাদিত বীজে চাষ হয় প্রায় ২০ শতাংশ জমি। বাকি জমি চাষ হয় আমদানীকৃত বীজ দিয়ে, যার গুণগত মান সম্পর্কে অনেক সময় কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

বর্ষাকালের অন্যতম ফসল সবজি। অনেক সময় তা বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এর দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশে শীত মৌসুমেই সবজির উৎপাদন হয় বেশি। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় এর উৎপাদন কিছুটা কম হয়। এ সময়ে উৎপাদিত সবজির মধ্যে রয়েছে ঢেঁড়স, পটোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, ডাঁটা, লালশাক, পুঁইশাক, করলা, শসা ইত্যাদি। কিছু সবজি সব মৌসুমে উৎপাদিত হয়। এগুলোর মধ্যে আছে বেগুন, কচু, পেঁপে, কাঁচকলা, শজনে ইত্যাদি। বর্ষাকালে মরিচ হয় কম। তাই দাম থাকে বেশি। পেঁয়াজ, রসুন, টমেটোএগুলোর প্রাপ্যতাও বর্ষাকালে থাকে কম। তাই বাজারমূল্য বেশি থাকে। তবে শীতকালীন কিছু সবজি; যেমনফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, টমেটো এখন গ্রীষ্মকালেও উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে। এগুলোর ওপর আরো গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সবজির হিমায়িত সংরক্ষণাগার স্থাপন প্রয়োজন। এতে সারা বছর সবজির সরবরাহ ঠিক রাখা এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। এবার বন্যা ও ভারি বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে শাক-শবজির উৎপাদন বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে দাম বেড়ে গেছে। শীতকালীন শবজি ওঠা পর্যন্ত শবজির দাম কিছুটা চড়াই থাকবে।

বর্ষায় ফলের সরবরাহ থাকে প্রচুর। দামও থাকে ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে। গ্রীষ্মকালে শুরু হয়ে বর্ষার শেষ নাগাদ পাওয়া যায় অনেক দেশি ফল। এর মধ্যে আছে আম, কাঁঠাল, আনারস, তাল, আমড়া, পেয়ারা ও সবুজ মাল্টা। গবেষণার মাধ্যমে এগুলোর নতুন জাত উদ্ভাবিত হচ্ছে। উৎপাদনও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা বৃদ্ধি পেলে ফল উৎপাদনে অচিরেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে বাংলাদেশ।

বর্ষায় নানা ধরনের ফুল ফোটে। বিভিন্ন ফুলের গন্ধে বিমোহিত থাকে প্রকৃতি। আবেগপ্রবণ হয় মানুষের মন। বর্ষাকালে ফোটা ফুলগুলোর মধ্যে রয়েছে কদম, কেয়া, কামিনী, লিলি, বেলি, বকুল, দোলনচাঁপা, শাপলা, সন্ধ্যামালা, হাসনাহেনা প্রভৃতি। দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলে এখন বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে অনেক ফুলের বাগান। ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরে এর ব্যবসা বেশ জমজমাট। বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে ফুল। এতে উৎসাহিত হচ্ছেন ফুল চাষিরা। তাঁদের উৎপাদনে ধরে রাখা ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে উন্মুক্ত জলাশয় ও নদী-নালা বর্ষার পানিতে ভরপুর থাকে। এতে পাওয়া যায় অনেক ধরনের মাছ। তখন জেলেদের মধ্যে মাছ ধরার ধুম পড়ে যায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনের হার কম। অতিরিক্ত মাছ আহরণই এর প্রধান কারণ। প্রতিকার হিসেবে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। এবার বন্যার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে অনেক মাছের ঘের ভেসে গেছে। পুকুর থেকেও বেরিয়ে গেছে মাছ। এই চাষিদের পুনর্বাসনের জন্য সহায়তা প্রয়োজন।

পশুপাখির প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বর্ষাকালে বেশ সতর্ক থাকতে হয় কৃষকদের। এ সময় পশুপাখির রোগ বেশি হয়। খাদ্য সমস্যা হয় প্রকট। কাঁচা ঘাসের অপ্রতুলতা দেখা দেয়। ফলে পশুপাখির উৎপাদন কমে যায়। মূল্য বৃদ্ধি পায় পশুপাখিজাত পণ্যের। এ সময় বিভিন্ন রোগের প্রতিকারে এবং সাইলেজ তৈরির জন্য কৃষকদের সহায়তা দেওয়া দরকার। তা ছাড়া বর্ষাকালে সবুজ আকার ধারণ করে বনরাজি। এ সময় বেশি করে গাছ লাগানো দরকার। সামাজিক বনায়নে সহায়তা দিয়ে কৃষকদের উৎসাহিত করা দরকার।

বর্ষাকাল কৃষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন মৌসুম। এ সময়ের ফসল বৃষ্টিনির্ভর। খাদ্যপণ্য, ফল, ফুল, শাক-সবজির উৎপাদন হয় অপেক্ষাকৃত কম খরচে। মাছের সরবরাহ থাকে প্রচুর। পশুপাখির উৎপাদন হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। তবে এ মৌসুমে সমস্যা আছে অনেক। সম্ভাবনাও কম না। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সমর্থন দিয়ে বর্ষাকালীন কৃষির উন্নয়ন সাধন অপরিহার্য। এতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে দেশ। অর্জিত হবে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ। সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট

জিআই পণ্যের প্রসারে কিছু প্রস্তাব

আবু তাহের খান

জিআই পণ্যের প্রসারে কিছু প্রস্তাব

ঐতিহ্য পরম্পরায় জামদানি বা মসলিন যেমন বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য, বাটিক যেমন ইন্দোনেশিয়ার কিংবা শাল কাশ্মীরেরতেমনি পৃথিবীর সব দেশেরই নিজস্ব ঐতিহ্যসংবলিত এমন কিছু পণ্য রয়েছে, যেগুলো ওই দেশ বা অঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু মুনাফার একচেটিয়াত্বের লোভে পুঁজির মালিকরা যখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন, তখন আর তাঁদের ওইসব ঐতিহ্যের দিকে তাকাবার ফুরসত থাকে না। মুনাফার লোভে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সব ন্যায্যতাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে তাঁরা তখন সম্মুখবর্তী সব কিছুকেই নিজেদের মালিকানায় নিয়ে নিতে চান। আর তেমন অবস্থায়ই সম বা কাছাকাছি ঐতিহ্যের দেশগুলোর মধ্যে মাঝে মাঝেই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিপেনডেন্সজিআই) এসব পণ্যের মালিকানা নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যায়, যেমনটি জামদানি নিয়ে ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ঐতিহ্যগতভাবে জামদানি বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হওয়া সত্ত্বেও ভারত তখন এটিকে নিজেদের পণ্য বলে দাবি করে এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে এর আইনি মীমাংসার জন্য বাংলাদেশকে বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা (ডব্লিউআইপিও) পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউআইপিও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র, তথ্য ও বিষয়াদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শেষ পর্যন্ত এটিকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবেই স্বীকৃতি প্রদান করে।

এ ধরনের বিরোধ ও বিবাদের মোকাবেলা বাংলাদেশকে পরবর্তীতে আরো একাধিকবার করতে হয়েছে। তবে এর জন্য ভারতীয় ব্যবসায়ীদের লোভ যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অজ্ঞতা, অনুদ্যোগ ও অদক্ষতা। দেখা গেছে, ২০১৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব পণ্যের জিআই স্বত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে বিরোধ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিষয়টি ঘটেছে আগে থেকে এসব পণ্যকে বাংলাদেশের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা না করার কারণে। লক্ষ করা গেছে যে ভারত যখনই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কোনো পণ্যকে তাদের জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখনই বাংলাদেশের হুঁশ হয়েছে যে এ কাজটি আরো আগেই করা উচিত ছিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধারার অদক্ষতার সর্বশেষ উদাহরণ ২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়িকে বাংলাদেশের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আরো একবার ডব্লিউআইপিও পর্যন্ত যাওয়া। ২০১৫ সালে জামদানির জিআই স্বত্বের মীমাংসার জন্য বাংলাদেশকে যে পরিমাণ দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছিল, সেটি মনে রেখে বাংলাদেশ যদি পরবর্তী সময়ের কাজগুলো যথাসময়ে করে ফেলত, তাহলে আর ২০২৪ সালে এসে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে পুনরায় বিবাদে লিপ্ত হতে হতো না।

২০২৪ সালে টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগটিও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেনি। এমনকি টাঙ্গাইল শাড়িকে ভারত যে সে সময় তাদের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে বসল, সেটি বাংলাদেশের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিআইটি) জানতই না। এ তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা যখন বিষয়টির প্রতি ডিপিআইটির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তখনই প্রথম বোঝা যায় যে এ বিষয়ে কোনো খোঁজখবরই তারা রাখেন না। যাহোক, এরপর মাত্র এক বছরের মধ্যে ডিপিআইটি আরো ৩৩টি পণ্যকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, যেগুলোর মধ্যকার অন্তত ১০টিই উক্ত দপ্তরে এক থেকে সাত বছর যাবৎ অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়েছিল। কিন্তু জনমতের চাপজনিত উত্তেজনা থিতিয়ে যেতেই আবার সেই পুরনো স্থবিরতা ভর করে বসেছে। ২০২৪ সালে আবেদনকৃত মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়কে ৬৪তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের পর আর এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি আছে বলে জানা যায়নি। এ বিষয়ে ডিপিআইটি হয়তো বলবে যে তাদের কাছে এসংক্রান্ত আর কোনো আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে নেই; অতএব তারা অভিযোগমুক্ত।

তথ্যগতভাবে ডিপিআইটির উপরোক্ত সম্ভাব্য  বক্তব্যের মধ্যে হয়তো কোনোই ভুল নেই, যেমন ভুল থাকে না পুলিশের বক্তব্যের মধ্যেও। কোনো অপরাধ বা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে পুলিশকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় এ ব্যাপারে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন, তখন তাদের অকপট জবাব হচ্ছে, এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। জিআই পণ্যের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ডিপিআইটিও কি সেই একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে যে তাদের কাছে কেউ আবেদন না করা পর্যন্ত এ ব্যাপারে তাদের কোনো দায় নেই? তারা কি এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জিআই সনদ সংগ্রহের জন্য উদ্যোক্তাদের আরো উৎসাহিত করতে পারেন না? কেউ তাদের কাছে সাহায্য না চাওয়ায় এ বিষয়ে তাদের কোনো দায় নেই বা তারা স্বতঃস্ফুর্ত হয়ে উদ্যোক্তার কাছে এগিয়ে যাবেন নাএটি তো অগ্রসর চিন্তাসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রসেবকের দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে না।

দেশে এখন স্বীকৃত জিআই পণ্যের সংখ্যা ৬৪টি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিল্প ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পশ্চাৎ সারির দেশ হলেও এর দীর্ঘ ও বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী পটভূমি রয়েছে। তা সত্ত্বেও ডিপিআইটি ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিদান বা স্বীকৃতির জন্য সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে নতুন কোনো ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও সৃজনশীল সেবামূলক কর্মকাণ্ড খুঁজে পাচ্ছেন না কেন? এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বহুধাবিস্তৃত ও বহুমাত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে আরো বহুসংখ্যক নতুন জিআই পণ্য খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে নিম্নে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হলো।

এক. শিল্পনীতিতে উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) শিল্পের পাশাপাশি সেবা কার্যক্রমকেও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে (যদিও এটি একটি অনেক বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত)। অন্যদিকে রুগ্ণ শিল্প চালুকরণ ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে, সেখানেও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমকে সহায়তাদানের কথা বলা হয়েছে। আর সরকারের এরূপ নীতি ও সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে এখন অতি সহজেই জিআই পণ্য/সেবা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা যেতে পারে।

দুই. জিআই পণ্যের বর্তমান তালিকায় ইলিশ বা চিংড়ির মতো মাছের নাম থাকলেও এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যোগ করা প্রয়োজন রূপচাঁদা, লইট্টা, কোরাল, টুনা ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছের নাম, যেগুলোর জিআই স্বত্ব নিয়ে যেকোনো সময় মিয়ানমার, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া চলনবিলের শিং, কই, শোল, টাকি; বেলাই বিলের আইড়, মাগুর, বাইন, গুতুম, পাবদা, টেংরা; সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের সরপুঁটি, মহাশোল, পাঙ্গাশ, কাচকি, রিটা, ঘাউরা, বাচা ইত্যাদি মিঠাপানির মাছের নাম যুক্ত করা যেতে পারে। অধিকন্তু কিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি ও কক্সবাজারের শুঁটকির নামও এ ক্ষেত্রে অনায়াসে আসতে পারে।

তিন. বাংলাদেশে রান্নাবান্না ও খাদ্যের কিছু নিজস্ব ধরন ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলাদেশের পিঠা-পায়েসের সুনাম উপমহাদেশজুড়েই বিস্তৃত। এর বাইরে এ দেশের কাচ্চি বিরিয়ানির নামদাম এখন ভারত, নেপাল, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুরের পাপর কিংবা যশোরের নলেন গুড়ের সন্দেশসহ আরো অনেক খাদ্যপণ্যের নামই এখন পর্যন্ত জিআই পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ওইসব পিঠা-পায়েস, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, হালিম, পাপর, সন্দেশ ইত্যাদি খাদ্যপণ্যকে জিআই সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

চার. ডিপিআইটির ৬৪টি জিআই পণ্যের তালিকায় কোনো কোনো আম বিশেষত আশ্বিনার মতো কম স্বাদের আম থাকলেও আম্রপালি, গোপালভোগ ইত্যাদির নাম নেই। ফলে এ আমগুলোর নাম উক্ত তালিকায় অবশ্যই যোগ করা প্রয়োজন। তদুপরি শেরপুরের বেগুন, শ্রীমঙ্গলের চা ও আনারস, নরসিংদীর সাগর কলা, ভোলা ও পটুয়াখালীর তরমুজ, কাপাসিয়ার বেল ইত্যাদি কৃষিপণ্যকেও সেখানে যুক্ত করা যেতে পারে।

পাঁচ. বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকায় ধামরাইয়ের তামা-কাঁসার তৈজসপত্র, সিলেটের বেতের আসবাব, কক্সবাজারের ঝিনুকজাত হস্তশিল্প, জলিরপারের কৃত্রিম গহনা, ভৈরবের পাদুকা, রায়েরবাজারের তৈজসপত্র ইত্যাদি যুক্ত করাটা শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়জরুরিও বটে। কারণ এসব পণ্যের বেশির ভাগই এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং জিআই পণ্যের তালিকায় এসব নাম যুক্ত হলে এগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনা আরো বহুলাংশে বেড়ে যাবে।

ছয়. বাংলাদেশের জিআই পণ্য তালিকার একেবারে প্রথমেই জামদানির নাম থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর মারমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক থামি ইত্যাদির নাম এখনো যুক্ত হয়নি। জিআই পণ্যের তালিকায় এসবের সংযুক্তি এগুলোর গুরুত্বই শুধু বাড়াবে না, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যকার পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় থাকার একটি ইতিবাচক বার্তাও দেশে-বিদেশে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে তাই বলব, বাংলাদেশের জিআই পণ্যের তালিকা আরো ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারিত করার যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ ও তৎপরতায় এখনো ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অথচ সে সম্ভাবনাগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে এসবের মধ্য দিয়ে দেশের সামাজিক ঐতিহ্যই শুধু রক্ষা পাবে না, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাও আরো বেগবান হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে এসব পণ্য ও সেবা জিআই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনাও বহুলাংশে বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে নিবেদিতপ্রাণ সেবার মানসিকতা নিয়ে ও পেশাদারিপূর্ণ দক্ষতার সঙ্গে কাজগুলো করতে সচেষ্ট হয়, তাহলে সহসাই এ ক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যযোগ্য বড় অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব হবে বলে মনে করি।

লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়; অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি