• ই-পেপার

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা

  • ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায় দেশ-দুনিয়া

ইকরামউজ্জমান

বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায় দেশ-দুনিয়া

আবার ঘরে ঘরে ফুটবল। রাত জাগার ফুটবল। আনন্দ, বেদনা, আশা ও নিরাশার ফুটবল। ঘরে ঘরে তর্ক, মান-অভিমান, আবার মধুর মিলনের ফুটবল। অঘটন, অনিশ্চয়তা আর অপ্রত্যাশিত ফুটবলের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ উৎসবের রঙে রাঙিয়ে এখন অপেক্ষা।

ফুটবল মাঠে নামতে আর মাত্র কয়েকটি প্রহরের অপেক্ষা। এরপর সারা দুনিয়ার মানুষ চঞ্চল হয়ে উঠবে। ফুটবলের বলয়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলবে। ফুটবল আমাদের জীবনে ঈদ ও বড় পূজার উৎসবের মতোযা বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়।

হাজার হাজার মাইল দূরে অনুষ্ঠিত ফুটবলের সুরে আমরা সবাই আটকে যাব। দুনিয়াজুড়ে তো একই অনুভূতি ও আবেগ। ফুটবলের সম্মোহন সত্যিই অসাধারণ। এমনিতে তো আর পরিচিতি হয়নি খেলার রাজা, বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর জীবনধর্মী খেলা হিসেবে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায় দেশ-দুনিয়াবিশ্বকাপ ফুটবল তো শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বজনীন এক মহোৎসব। খেলাটি পুরো দুনিয়াকে একত্র করছে একই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে। মানুষ জীবনের রং খুঁজে পায় এই খেলার মধ্যে। এই খেলার ভাষা ও জয়-পরাজয়ের অনুভূতি আর আবেগের মধ্যে পার্থক্য নেই। বিশ্বকাপে যারা সরাসরি জড়িত তাদের চেয়ে আমাদের আবেগ-উৎকণ্ঠা, এমনকি উন্মাদনা কোনো অংশে কম নয়। এখানেই এই খেলার সবচেয়ে বড় জয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, খেলার প্রতি নিরলস ভালোবাসা আর আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ফুটবল সব সময় মানুষকে কাছে টানেমিলায়। খেলার মঞ্চে সামর্থ্য, শৈলী, বীরত্ব, বুদ্ধি ও মানবতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

ফুটবলের আসল মানচিত্রে আমাদের স্থান নেই। আমাদের স্থান আছে বড় গণমানচিত্রে। তা সত্ত্বেও এই যে আমরা ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছিএর সবকিছুই খেলার দর্শনের মধ্যে আছে। প্রাণের টান আর ভালোবাসাকে কি অস্বীকার করা যায়? অভিমান, বিচ্ছেদ, এর পরও ভালোবাসার তো মৃত্যু নেই।

অদ্ভুত এক খেলা! পথের ভিখারি ভালোবাসে ফুটবলকে, আবার ভালোবাসে সমাজের বিত্তশালী মানুষটিও। কোনো তফাত নেই। উভয়েই ফুটবলের ভালোবাসার কাঙাল। প্রত্যেকে তার নিজস্ব অবস্থান থেকে খেলাটিকে দেখে। খেলাটি নিয়ে ভাবে। কখনো অনুশোচনা করে, কখনো আনন্দিত হয়।

চার বছর পর পর মানুষের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার আলোতে উৎসাহিত হয় ফুটবলের মহাযজ্ঞ। উত্তেজনা, আনন্দ আর উৎকণ্ঠার কড়াই যত গরম হচ্ছে, মানুষ ততই চঞ্চল হয়ে উঠছে। বাতাসভর্তি গোলকপিণ্ড এক মাসের বেশি সময় ধরে মানুষের দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ রাখবে। আমাদের মতো দেশে ফুটবল অনেক ইস্যুর ওপরে স্থান পাবে। ফুটবল নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে রীতিমতো পাগলামি ও উন্মাদনার জন্ম হবে। ফুটবল নিয়ে এখন শুধু বিশেষজ্ঞ, পণ্ডিত ও মৌসুমি ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মাথা ঘামাচ্ছেন না; মাথা ঘামাচ্ছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরাও। তাঁরাও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। বিগত বিশ্বকাপগুলোর সময় লক্ষ করেছি, গণকদের গণনা করে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন দলের নাম ঘোষণা করে আলোচনার জন্ম দিতে। ১৬০ জন অর্থনীতিবিদের পূর্বাভাস হলো, গতবারের রানার্স আপ ফ্রান্স ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনকে পরাজিত করে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি জয় করবে। আর এই ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি প্রমাণিত হয় তাহলে তো ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের খবর আছে। রয়টার্সের প্রেস আইটেমে দেখেছি, অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করেছেন, মূল্যস্ফীতির কঠিন হিসাব কষা যত না কঠিন, তার চেয়েও বেশি কঠিন বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম বলা। যা হোক, এই ভবিষ্যদ্বাণী অবশ্য বড় ধাক্কা ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, জার্মানি ও পর্তুগালের ফুটবল দলের জন্য। তবে ফুটবল-রসিকরা নিশ্চয়ই মনে রাখবেন, ফুটবল মাঠের দুই পায়ের খেলা। খেলার আসল গায়েন হলেন খেলোয়াড়রা। খেলোয়াড়রাই মাঠের রং বারবার পাল্টে দিয়েছেন। পাল্টে দিয়েছেন অনেক হিসাব-নিকাশ। মানুষ মাঠের ফুটবলের ওপর ভরসা রেখেছে। দলগত শক্তি, সামর্থ্যের বাস্তবায়ন আর তারকা খেলোয়াড়ের সময়মতো জ্বলে ওঠার কথা ভেবেছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায় দেশ-দুনিয়াএবারই প্রথম তিন দেশ মিলিয়ে (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) বিশ্বকাপের আয়োজক। অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হয়েছে। ম্যাচ এখন ১০৪টি। ম্যাচ বাড়াতে খেলার দিনও বেড়েছে। বিশ্বায়নের দোহাইয়ের পেছনে ফিফার আয়ও এবার বেড়েছে। আবার এই আয় দুনিয়াজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা হবে বলে অনেক আগেই ফিফা জানিয়েছে। ফিফার কাছ থেকে আমাদের বরাদ্দ বাড়বে বলে ফুটবল ফেডারেশনের গভর্নিং বডির একজন সদস্য জানিয়েছেন। তবে কোন কোন খাতে ফিফা বরাদ্দ বাড়াবেএ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানিয়েছেন।

বিশ্বকাপ ফুটবল ৯৬ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। শুরু সেই ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে থেকে। স্বাগতিক উরুগুয়ে ৪-২ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই সময় থেকে বিগত ২২টি বিশ্বকাপে মাত্র ছয়বার স্বাগতিক দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দেশগুলো হলো উরুগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। ২৩তম বিশ্বকাপের (২০২৬) স্বাগতিক দেশ তিনটি, তারা বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হবে এমন স্বপ্ন কখনো দেখছে না।

বিভিন্ন কারণে ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞরা অনেক হিসাব-নিকাশ ও আগ-পিছ ভেবে কথা বলেন। এবার তাঁদের বেশির ভাগের ভবিষ্যদ্বাণী হলো, যে আটটি দেশ এর আগে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে, এর বাইরে যাচ্ছে না আসন্ন বিশ্বকাপের ট্রফি। পণ্ডিতরা কেউ কেউ সরাসরি বলেছেন, লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা গতবার কাতার বিশ্বকাপে বিজয়ী দল এবং ব্রাজিল, যারা ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখছে, অপেক্ষা করে আছে ২৪ বছর ধরেতাদের কোনো সম্ভাবনা নেই। এতে ধরে নেওয়া যায়, বিশ্বকাপ আবার ইউরোপের কবজায় চলে যাচ্ছে। ১৯৫৮ সালে সুইডেন থেকে প্রথম লাতিন দল ব্রাজিল কাপ জিতেছিল ইউরোপের সুইডেনকে ৫-২ গোলে পরাজিত করে। এর ৫৬ বছর পর ২০১৪ সালে ব্রাজিল থেকে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে জার্মানির লাতিন জয়। বিষয়টি দারুণ।

ফুটবলের পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখিয়ে বলছে, বিশ্বকাপ ফুটবল ডমিনেট করছে ইউরোপ। ইউরোপজুড়ে ফুটবল ভীষণভাবে পাল্টে গেছে। ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানিসব জায়গায় ঘরোয়া লীগে টুর্নামেন্টের খেলায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ফুটবল নিয়ে নতুনভাবে মাথা ঘামিয়ে নতুন এক ধারার ফুটবলের জন্ম দিয়েছেন। এখানে আছে আক্রমণাত্মক ফুটবলের সঙ্গে শৈল্পিক ফুটবলও। আগের দিনগুলোতে লাতিন দেশগুলোর ফুটবলাররা এক ধরনের ফুটবল খেলতেন, আর ইউরোপের দলগুলো খেলছে অন্য ধাঁচের ফুটবল। এখন আর সেই ধারা নেই। লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটবলার এখন ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে ফুটবল খেলছেন। এতে ফুটবল দুনিয়ার সব কিছু মিলেমিশে গেছে। গত ২৫ থেকে ৩০ বছরে ক্লাব ফুটবলে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। যার প্রভাব ইউরোপের সব জাতীয় দলেও লক্ষণীয় হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি ফুটবলের সত্যিকারের বিশ্বায়ন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এমনকি এশিয়ার খেলোয়াড় তাঁদের নিজস্ব খেলার ধারা বাদ দিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনায় ফুটবল খেলছেন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, এশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের অনেক খেলোয়াড় নিজস্ব নাগরিকত্ব বাদ দিয়ে নতুন করে নাগরিকত্ব নিয়ে বিভিন্ন দেশের হয়ে ফুটবল খেলছেন। আসন্ন বিশ্বকাপ ফুটবলে তাঁদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।

এশিয়া থেকে এবার প্রতিনিধিত্ব করবে ৯টি দেশ। ১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়া বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। আর ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া খেলেছে সেমিফাইনালে। এবারের বিশ্বকাপে এশিয়ার দলগুলো কী করবে, এর চেয়েও বেশি কৌতূহল লক্ষণীয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে গিয়ে ইরানের কোন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে মরক্কো সেমিফাইনালে খেলেছিল। দেখার বিষয় এবার মরক্কো কতটুকু এগোতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও আরববিশ্বে ফুটবলের কদর দ্রুত বাড়ছে। এখন দরকার টেকসই ফুটবলে উন্নতি।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে জাপান হারিয়েছে জার্মানি ও স্পেনকে; দক্ষিণ কোরিয়া হারিয়েছে পর্তুগালকে; ক্যামেরুন ব্রাজিলকে; তিউনিশিয়া ফ্রান্সকে। মরক্কো প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে খেলেছে। হারিয়েছে বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালকে। আশা করছি, এশিয়া মহাদেশ থেকে সাহসের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স প্রদর্শন করবে আমাদের প্রতিনিধিরা, যা এশিয়ায় সার্বিক ফুটবলকে অনুপ্রাণিত করবে। বিশ্বকাপের বর্ণিল উৎসবে সবাইকে স্বাগত। শরীরের যত্ন নিন আর খেলা উপভোগ করুন। জীবনের ব্যঞ্জনের নুন হলো আনন্দ।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

ভরণ-পোষণ আইন কি বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারে

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

ভরণ-পোষণ আইন কি বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারে

প্রযুক্তির এই যুগে আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত। কিন্তু একই সঙ্গে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন। আমাদের বন্ধু তালিকায় হাজারো মানুষ, অসংখ্য ফলোয়ার, অসংখ্য ভার্চুয়াল সম্পর্ক; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিজের ঘরের মানুষগুলোর জন্য সময় নেই। আমরা ক্যারিয়ার, পদোন্নতি, ব্যাবসায়িক সাফল্য, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির এক নিরন্তর প্রতিযোগিতার পিছে ছুটছি। এই দৌড়ে আমরা অনেক কিছু অর্জন করছি। কিন্তু অজান্তেই হারিয়ে ফেলছি পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা। ভার্চুয়াল জগতে একটি পোস্টে শত শত লাইক-কমেন্ট রিপ্লাই দেওয়ার সময় পেলেও বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসে দশ মিনিট কথা বলার সময় পাই না। নিজেদের সফল করার প্রতিযোগিতায় আমরা এতটাই ব্যস্ত যে যাঁরা আমাদের সফল হওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, তাঁদের অনুভূতি ও প্রয়োজন অনেক সময় আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে সরে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংবাদ আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কোথাও বৃদ্ধ মা একা বাসায় মৃত্যুবরণ করেছেন, কয়েক দিন পর প্রতিবেশীরা খবর পেয়েছেন। কোথাও বৃদ্ধ বাবা অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছেন, অথচ প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের কারো সময় হয়নি তাঁর খোঁজ নেওয়ার। আবার কোথাও দেখা যায়, সন্তানরা বিদেশে বা দেশের বড় শহরে সুখী ও সফল জীবনযাপন করছেন, আর গ্রামের বাড়িতে থাকা মা-বাবা দিন পার করছেন নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও অপেক্ষার মধ্যে। এমনকি প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে।

ভরণ-পোষণ আইন কি বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারেএসব ঘটনা শুনে আমরা কিছুক্ষণ দুঃখ প্রকাশ করি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ জানাই, তারপর আবার অন্য কোনো আলোচিত ঘটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেদের কাছে প্রশ্ন করি, আমরা আসলে কী করছি। প্রতি বছর মা দিবস ও বাবা দিবস এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যায় আবেগঘন স্ট্যাটাসে। কেউ মায়ের সঙ্গে ছবি দেন, কেউ বাবার ত্যাগের গল্প লেখেন, কেউবা কৃতজ্ঞতার দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করেন। এসব প্রকাশ অবশ্যই সুন্দর। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই ভালোবাসা বাস্তব জীবনের দায়িত্ববোধে পরিণত হয় না।

একজন বৃদ্ধা মা কিংবা বাবার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সব সময় অর্থ নয়। জীবনের একটি পর্যায়ে এসে মানুষের প্রয়োজন হয় সঙ্গ, সম্মান, খোঁজখবর এবং আপনজনের উপস্থিতি। একজন মা হয়তো সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। একজন বাবা হয়তো চান সন্তানের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে। তাঁরা হয়তো আর নতুন কোনো সম্পদ চান না; তাঁরা শুধু অনুভব করতে চান যে তাঁরা এখনো পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দুঃখজনকভাবে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, নগরায়ণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারার কারণে অনেক পরিবারে আবেগগত দূরত্ব বাড়ছে। আমরা অনেকেই মনে করি মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু সম্পর্ক কি শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন? ভরণ-পোষণ কি ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে?

আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সন্তান তাঁদের মা-বাবার চিকিৎসা খরচ বহন করছেন, নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন, কিন্তু মাসের পর মাস তাঁদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলছেন না। ফলে মা-বাবারা আর্থিকভাবে নিরাপদ হলেও মানসিকভাবে একাকী হয়ে পড়ছেন। এই একাকিত্ব অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এমন হয়ে উঠছি? আমরা কি সঠিক রাস্তায় আছি? আমরা ভালো চাকরি, উচ্চ বেতন, বড় বাড়ি, দামি গাড়ি এবং সামাজিক মর্যাদাকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখছি। কিন্তু একজন মানুষ কতটা সফল, তা তাঁর ব্যাংক হিসাব দিয়ে নয়; বরং তিনি তাঁর বাবা-মায়ের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল, সেটি দিয়েও পরিমাপ করা উচিত।

বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার জন্য আইন রয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ কোনো মা-বাবা যেন সন্তানের অবহেলায় অভুক্ত বা অসহায় অবস্থায় না থাকেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন দিয়ে ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা গেলেও ভালোবাসা নিশ্চিত করা যায় না।

আইন কাউকে অর্থ দিতে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু কাউকে আন্তরিক হতে বাধ্য করতে পারে না। আদালত একজন সন্তানকে খরচ বহনের নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু আদালত কি নির্দেশ দিতে পারে যে সে প্রতি সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলবে? অথবা বৃদ্ধ বাবার হাত ধরে হাঁটবে? ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের জন্ম আদালতে নয়; জন্ম পরিবারে, শিক্ষায় এবং সামাজিক মূল্যবোধে।

আজ যারা তাঁদের বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করছেন, তাঁদের একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। সময় কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না। আজ আমরা তরুণ, কর্মক্ষম এবং ব্যস্ত। কিন্তু একদিন আমাদের চুলও সাদা হবে, আমাদের শরীরও দুর্বল হবে, আমাদেরও কারো অপেক্ষায় থাকতে হবে। আজ আমরা আমাদের সন্তানদের সামনে যে আচরণের উদাহরণ তৈরি করছি, আগামীকাল তারাই সেই উদাহরণ অনুসরণ করবে।

একজন শিশু যখন দেখে তাঁর বাবা-মা দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির প্রতি দায়িত্বশীল, তখন সে সম্মান ও মানবিকতার শিক্ষা পায়। আবার যখন দেখে বৃদ্ধদের অবহেলা করা হচ্ছে, তখন সে সেটিকেও স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন শুধু বর্তমানের নৈতিক কর্তব্য নয়; এটি ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণেরও একটি বিনিয়োগ।

একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা বোঝা যায় সে তার শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী এবং বৃদ্ধদের কিভাবে মূল্যায়ন করে তার মাধ্যমে। যে সমাজে বৃদ্ধ মা-বাবা সম্মান, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা নিয়ে জীবন কাটাতে পারেন, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত সমাজ।

তাই মা দিবস বা বাবা দিবসের আবেগঘন পোস্টের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বছরের প্রতিটি দিনে তাঁদের পাশে থাকা। একটি ফোনকল, কিছু সময়, একটি খোঁজখবর, একটি আন্তরিক আলাপএসবের মূল্য অনেক সময় হাজার টাকার চেয়েও বেশি।

আমরা প্রায়ই বলি, মা-বাবার ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। কথাটি সত্য। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা অন্তত করা যায়। তাঁদের বার্ধক্যকে সম্মানজনক করা যায়। তাঁদের নিঃসঙ্গতা কিছুটা হলেও ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভালো সন্তানের পরিচয় দিতে চাই, নাকি বাস্তব জীবনেও সত্যিকার অর্থে দায়িত্বশীল সন্তান হয়ে উঠতে চাই?

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বিষাক্ত ধোঁয়া ও শব্দদূষণে বিপন্ন শৈশব

ড. মো. তারেকুজ্জামান

বিষাক্ত ধোঁয়া ও শব্দদূষণে বিপন্ন শৈশব

রাজধানীর বাড্ডা, বিশেষ করে সাঁতারকুল ও উত্তর বাড্ডা এলাকা একসময় ছিল শান্ত আবাসিক অঞ্চল। কিন্তু বর্তমানে এই এলাকাগুলো অনিয়ন্ত্রিত ফার্নিচার কারখানার কারণে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে পড়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা অসংখ্য অনুমোদনহীন কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, রাসায়নিক গন্ধ এবং তীব্র শব্দ স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।

৫০০ শিশুর ওপর পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন বাতাসে কাঠের গুঁড়া উড়তে দেখে এবং প্রায় ৮৮ শতাংশ শিশু নিয়মিত কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও এলাকাবাসীর দাবি)। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, বাতাসে ভাসমান কেমিক্যালের কারণে তাদের চোখে জ্বালাপোড়া হয় এবং শরীরে চুলকানি সৃষ্টি হয়। শিশুদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে বাস্তব চিত্র—‘স্কুলে যেতে কষ্ট হয়, শ্বাস নিতে সমস্যা হয়, খেলতে গেলেই অসুস্থ লাগে

ফার্নিচার কারখানাগুলোয় ব্যবহৃত থিনার, লেকার এবং আঠা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকে। এসব উপাদান শিশুদের ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে (প্রতিদিনের সংবাদ : বায়ুদূষণ ও সিসার প্রভাববিষয়ক প্রতিবেদন)। জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু চোখে জ্বালাপোড়া ও ত্বকে অস্বস্তির কথা বলেছে। অনেক শিশু বলেছে, চোখ লাল হয়ে যায়; ধোঁয়ার গন্ধে মাথাব্যথা করে’—যা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর গভীর প্রভাব পড়ছে। প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা মনোযোগের সমস্যায় ভুগছে এবং অস্থিরতা অনুভব করে। প্রায় ৯৪ শতাংশ শিশু দূষণের কারণে বাইরে খেলাধুলা করতে ভয় পায়। ফলে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিসেফ ও এসওজিএর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের পেছনে বায়ুদূষণ একটি বড় কারণ (ইউনিসেফ ও এসওজিএ প্রতিবেদন, জুন ২০২৪)।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও এই দূষণের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। আইডিয়াল হোমস স্কুল, সাঁতারকুল স্কুল এবং বাড্ডা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের শিক্ষকদের মতে, দূষণের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে এবং তারা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও এলাকাবাসীর দাবি)। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থতার কারণে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারছে না।

অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকরা কারখানার ভেতরেই বসবাস করে। তারা সেখানেই রান্না করে, ঘুমায় এবং অনেক সময় মশা তাড়াতে বা শীত নিবারণে কাঠ জ্বালায়, যা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায় (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪ : সাঁতারকুলে অগ্নিকাণ্ড প্রতিবেদন; বাড্ডা এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের তথ্যচিত্র)। ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর সাঁতারকুলে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা পুরো এলাকার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪ প্রতিবেদন)।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব কারখানায় কোনো নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মানা হয় না। গভীর রাত পর্যন্ত চলে করাত, ড্রিল মেশিন ও পালিশের কাজ। এতে শিশুদের ঘুম ব্যাহত হয় এবং রোগীদের কষ্ট বাড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাতে শব্দে ঘুমানো যায় না, বাচ্চারা পড়াশোনা করতে পারে না, রাস্তায় বের হলেও নিরাপত্তা নেই

জরিপে শিশুদের মতামতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে। অনেক শিশু বলেছে, কারখানা বাড়ি থেকে দূরে সরানো উচিত, দূষণ বন্ধ করতে হবে, আইন মেনে কারখানা চালাতে হবে। প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি শিশু মনে করে, মানুষ এই সমস্যা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নয় এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। তারা আরো বলেছে, আমরা পরিষ্কার বাতাস চাই, নিরাপদে খেলতে চাই, যা তাদের মৌলিক অধিকারের প্রতিফলন।

এ ছাড়া এলাকাবাসীর দৈনন্দিন জীবনেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সরু রাস্তায় পিকআপ ভ্যান ঢুকে যানজট সৃষ্টি করছে, রাস্তায় লোহা ও কাঠের টুকরা পড়ে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। নর্দমায় কাঠের গুঁড়া ফেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এমনকি আশপাশের খাল-বিলের পানির রং ও গন্ধ পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছেন। প্রথমত, আবাসিক এলাকা থেকে এসব কারখানা সরিয়ে শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করতে হবে (স্থানীয় পর্যবেক্ষণ)। দ্বিতীয়ত, কারখানায় আধুনিক ফিল্টার ও এগজস্ট সিস্টেম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে বায়ুদূষণ কমানো যায় (প্রতিদিনের সংবাদ প্রতিবেদন)। তৃতীয়ত, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার ডিটেক্টর ও নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন জরুরি (বাংলাভিশন/নিউজ বাংলা ২৪; অগ্নিকাণ্ড বিষয়ক তথ্যচিত্র)। চতুর্থত, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে (ইউনিসেফ ও এসওজিএ প্রতিবেদন)। একই সঙ্গে শিশুশ্রম বন্ধ করা এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে বলা যায়, বাড্ডা ও সাঁতারকুল এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। অবহেলা ও অনিয়মের কারণে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই সমস্যা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। শিশুদের নিরাপদ, সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশব নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক : উপপরিচালক, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স (বিটিএস)

ধর্ষণ : বাংলাদেশের জবাবদিহিহীন সংকট

মে. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব)

ধর্ষণ : বাংলাদেশের জবাবদিহিহীন সংকট

ধর্ষণ একটি সমাজের নিজের ওপর করা সবচেয়ে বিধ্বংসী অপরাধগুলোর মধ্যে একটি। এটি একই সঙ্গে সবচেয়ে অন্তরঙ্গ ধরনের ব্যক্তিগত লঙ্ঘন এবং একটি সামাজিক ক্ষত, যা ব্যক্তি ভুক্তভোগীর বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং যেকোনো সভ্য সমাজের ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা নৈতিক মেরুদণ্ডকে পচিয়ে দেয়। এটি যে বাড়ছে-শুধু বেশি রিপোর্ট হচ্ছে তা নয়এই বাস্তবতা বাংলাদেশ আর শুধু ফিসফিসিয়ে আলোচনা করে বা দ্রুত নিভে যাওয়া মোমবাতি মিছিলে সামলাতে পারবে না।

ঐতিহাসিক তথ্য কোনো সান্ত্বনা দেয় না। বাংলাদেশের জাতীয় অপরাধ গবেষণা কেন্দ্র এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দুই দশক ধরে একটি ত্বরান্বিত প্রবণতা নথিভুক্ত করেছে। দেশের অন্যতম সম্মানিত মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২০ সালেই বাংলাদেশে কমপক্ষে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ২০৮ জন গণধর্ষণের শিকার এবং ৪৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু রিপোর্ট করা মামলার প্রতিনিধিত্ব করে এবং এমন একটি সমাজে যেখানে লজ্জা, পারিবারিক চাপ, আইনি ব্যবস্থার ভয় এবং পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভুক্তভোগীকে কখনো সামনে আসতে বাধা দেয়, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি রেকর্ডে যা দেখা যায় তার বহুগুণ বলে বিশ্বাস করা হয়। জাতিসংঘ ধারাবাহিকভাবে অনুমান করেছে যে বিশ্বব্যাপী দশটির মধ্যে একটিরও কম ধর্ষণের মামলা কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট হয়। বাংলাদেশে সেই অনুপাত আরো কম বলে মনে করা হয়।

ধর্ষণ : বাংলাদেশের জবাবদিহিহীন সংকটএই অপরাধ কেন টিকে থাকে এবং বাড়তে থাকে তা বোঝার জন্য কারণগুলোর একটি সৎ ও নির্ভীক পরীক্ষা দরকারযে ধরনের পরীক্ষা ক্ষমতাহীনদের দোষ দিয়ে ক্ষমতাশালীদের রক্ষা করে না, বরং সরাসরি তাকিয়ে দেখে কী প্রকৃতপক্ষে অপরাধী তৈরি করছে। পর্নোগ্রাফির বিস্তার এবং অনলাইনে যৌন উত্তেজক বিষয় বস্তুতে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার একটি সত্যিকারের অবদানকারী কারণ, কিন্তু এটি সঠিকভাবে বুঝতে হবে। সমস্যা এই নয় যে পর্নোগ্রাফি যৌনতাকে চিত্রিত করেসমস্যা হলো বিশ্বের প্রভাবশালী পর্নোগ্রাফি শিল্প অপ্রতিরোধ্যভাবে নারীকে সম্মান করার মানুষ নয়; বরং ব্যবহার করার শরীর হিসেবে চিত্রিত করে এবং প্রায়ই সহিংসতা, জবরদস্তি এবং অবমাননাকে কামোদ্দীপক হিসেবে স্বাভাবিক করে তোলে। যখন বাংলাদেশে ধর্ষণ অপরাধীদের গড় বয়স বছরের পর বছর ধরে কমছেসম্মতি, মর্যাদা এবং সমান মানবতা সম্পর্কে কোনো পাল্টা আখ্যান ছাড়াই এই বিষয়বস্তু গ্রহণ করে, তখন এটি এমনভাবে মনোভাব গঠন করে, যা একাধিক দেশের গবেষকরা নথিভুক্ত করেছেন। অ্যাগ্রেসিভ বিহেভিয়ার জার্নালে প্রকাশিত ২০১৫ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণ, সাতটি দেশের গবেষণা পর্যালোচনা করে পর্নোগ্রাফি ব্যবহার এবং যৌন আগ্রাসন সমর্থনকারী মনোভাব উভয়ের এবং প্রকৃত যৌনভাবে আক্রমণাত্মক আচরণের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে।

এই অপরাধের গভীর কারণগুলো কাঠামোর মধ্যে নিহিত। পিতৃতন্ত্রে একটি ব্যবস্থা হিসেবে যা শৈশব থেকে পুরুষদের শেখায় যে নারীর শরীর পুরুষের ব্যবহারের জন্য উপলব্ধ, যে পুরুষালি পরিচয় আধিপত্য ও যৌন জয়ের সঙ্গে যুক্ত, যে নারীর প্রত্যাখ্যান অতিক্রম করার একটি চ্যালেঞ্জ, সম্মান করার সীমানা নয়। বাংলাদেশে এই পিতৃতান্ত্রিক গঠন একাধিক প্রতিষ্ঠানে একযোগে শক্তিশালী হয়: এমন পরিবারে যেখানে মেয়েদের চুপ থাকতে এবং ছেলেদের সাহসী হতে শেখানো হয়, এমন শিক্ষাক্রমে যেখানে সম্মতি বা শারীরিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে কার্যত কোনো অর্থবহ বিষয়বস্তু নেই, এমন ধর্মীয় ব্যাখ্যায় যা নারীর আচরণ নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় পুরুষের আচরণকে মূলত অপরীক্ষিত রেখে এবং এমন আইনি ও আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থায় যা দশকের পর দশক ধরে ধর্ষণকে ব্যক্তিগত অপরাধমূলক লঙ্ঘনের পরিবর্তে পারিবারিক সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখেছে।

নারীর পোশাক ধর্ষণের কারণএই যুক্তি শুধু অভিজ্ঞতাগতভাবে অসমর্থিত নয়, এটি নৈতিকভাবে ক্ষতিকর। পোশাকবিধি-নির্বিশেষে প্রতিটি দেশে ধর্ষণ ঘটে, প্রতিটি ঋতুতে, সব বয়সের নারীর বিরুদ্ধে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত, পূর্ণ আবরণে নারী এবং পশ্চিমা পোশাকে নারী উভয়ের বিরুদ্ধে। নারীদের জন্য সবচেয়ে রক্ষণশীল পোশাকের দাবি রাখে এমন দেশগুলো সর্বনিম্ন ধর্ষণের হারের দেশ নয়।

নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকেও রক্ষণশীল আলোচনায় দোষ দেওয়া হয়, কিন্তু তথ্য এই থিসিসকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশে, বেশির ভাগ দেশের মতো, বেশির ভাগ ধর্ষণ অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা নয়; বরং ভুক্তভোগীর পরিচিত ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত হয় প্রতিবেশী, আত্মীয়, নিয়োগকর্তা, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। অন্ধকারে ওত পেতে থাকা অপরিচিত ধর্ষকের কল্পকাহিনি আসলে অনেক বেশি সাধারণ বাস্তবতা থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার কাজ করে বিশ্বস্ত ব্যক্তি যে নৈকট্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে। যা প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণ সংস্কৃতি তৈরি ও টিকিয়ে রাখে তা হলো দায়মুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং নারীর প্রতি সামাজিকীকৃত অবজ্ঞার সমন্বয়।

বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্তের হার ঐতিহাসিকভাবে এবং বিপর্যয়করভাবে কম। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্তের হার ছিল ২ শতাংশেরও নিচে। এর মানে হলো বাংলাদেশে একজন পুরুষ যে একজন নারীকে ধর্ষণ করে তার ৯৮ শতাংশেরও বেশি সম্ভাবনা রয়েছে কোনো আইনি পরিণতি না ভোগ করার। এটি শুধু বিচারের ব্যর্থতা নয়, এটি অপরাধের পুনরাবৃত্তির একটি সক্রিয় আমন্ত্রণ।

সমাজের কাঠামোর ওপর প্রভাব গভীর এবং ক্রমবর্ধমান। এমন একটি সমাজ যেখানে নারীরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না, দেরিতে পড়াশোনা করতে পারে না, রাতে কাজ করতে পারে না, তাদের চারপাশের পুরুষদের বিশ্বাস করতে পারে নাসেই সমাজ তার অর্ধেক মানব সম্ভাবনা বিসর্জন দিয়েছে। ভয় একটি কর, যা একচেটিয়াভাবে নারীদের ওপর আরোপিত হয়এটি তাদের গতিশীলতা, সুযোগ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মূল্য নেয়।

ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পর্যন্ত নির্মূলের জন্য একযোগে প্রতিটি স্তরে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আইনিব্যবস্থাকে শিকড় থেকে সংস্কার করতে হবে। শুধু শাস্তি কঠোর করে নয়, কারণ প্রমাণ ধারাবাহিকভাবে দেখায় যে শাস্তির নিশ্চয়তা তার তীব্রতার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে অপরাধ প্রতিরোধ করে; বরং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে, তদন্ত আরো কঠোর করে এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা আরো ব্যাপক করে। পুলিশকে পুনরায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং জবাবদিহিযোগ্য করতে হবে। বেঁচে যাওয়াদের জন্য ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলোকে অর্থায়ন করতে হবে এবং বিস্তৃত করতে হবে।

শিক্ষা প্রয়োগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সম্মতি, শারীরিক স্বায়ত্তশাসন, সুস্থ সম্পর্ক এবং লিঙ্গ সমতা সম্পর্কে ব্যাপক, বয়স-উপযুক্ত শিক্ষা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ছেলেদের শেখাতে হবে স্পষ্টভাবে, বারবার এবং কোনো ক্ষমা ছাড়াই যে নারীরা সম্পূর্ণ মানবতায় তাদের সমান। আধিপত্যের ওপর নির্মিত পুরুষত্ব শক্তি নয়, বরং কাপুরুষতা। মসজিদ, মাদরাসা এবং মন্দিরকে নারী ব্যক্তির পবিত্রতা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে কথা বলতে হবে।

বাংলাদেশের কাছে এটি ঘুরিয়ে দেওয়ার সরঞ্জাম রয়েছে। আইন আছেনারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, যা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। যা ধারাবাহিকভাবে অনুপস্থিত তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, সম্পদ বরাদ্দ এবং এগুলো বাস্তবায়নের সাংস্কৃতিক সততা। আইন পাস করা সহজ অংশ। কঠিন অংশ হলো এমন একটি সমাজ গড়া, যেখানে একজন নারীর শরীরকে তার নিজের হিসেবে গণ্য করা হয়পবিত্র, সার্বভৌম এবং সম্পূর্ণরূপে। সেই সমাজ এক মুহূর্তে গড়া হয় না, কিন্তু এটি অবশ্যই গড়তে হবে।

লেখক : সাবেক সামরিক কূটনীতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক