আবার ঘরে ঘরে ফুটবল। রাত জাগার ফুটবল। আনন্দ, বেদনা, আশা ও নিরাশার ফুটবল। ঘরে ঘরে তর্ক, মান-অভিমান, আবার মধুর মিলনের ফুটবল। অঘটন, অনিশ্চয়তা আর অপ্রত্যাশিত ফুটবলের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ উৎসবের রঙে রাঙিয়ে এখন অপেক্ষা।
ফুটবল মাঠে নামতে আর মাত্র কয়েকটি প্রহরের অপেক্ষা। এরপর সারা দুনিয়ার মানুষ চঞ্চল হয়ে উঠবে। ফুটবলের বলয়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলবে। ফুটবল আমাদের জীবনে ঈদ ও বড় পূজার উৎসবের মতো—যা বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়।
হাজার হাজার মাইল দূরে অনুষ্ঠিত ফুটবলের সুরে আমরা সবাই আটকে যাব। দুনিয়াজুড়ে তো একই অনুভূতি ও আবেগ। ফুটবলের সম্মোহন সত্যিই অসাধারণ। এমনিতে তো আর পরিচিতি হয়নি খেলার রাজা, বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর জীবনধর্মী খেলা হিসেবে।
বিশ্বকাপ ফুটবল তো শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বজনীন এক মহোৎসব। খেলাটি পুরো দুনিয়াকে একত্র করছে একই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে। মানুষ জীবনের রং খুঁজে পায় এই খেলার মধ্যে। এই খেলার ভাষা ও জয়-পরাজয়ের অনুভূতি আর আবেগের মধ্যে পার্থক্য নেই। বিশ্বকাপে যারা সরাসরি জড়িত তাদের চেয়ে আমাদের আবেগ-উৎকণ্ঠা, এমনকি উন্মাদনা কোনো অংশে কম নয়। এখানেই এই খেলার সবচেয়ে বড় জয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, খেলার প্রতি নিরলস ভালোবাসা আর আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ফুটবল সব সময় মানুষকে কাছে টানে—মিলায়। খেলার মঞ্চে সামর্থ্য, শৈলী, বীরত্ব, বুদ্ধি ও মানবতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
ফুটবলের আসল মানচিত্রে আমাদের স্থান নেই। আমাদের স্থান আছে বড় গণমানচিত্রে। তা সত্ত্বেও এই যে আমরা ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছি—এর সবকিছুই খেলার দর্শনের মধ্যে আছে। প্রাণের টান আর ভালোবাসাকে কি অস্বীকার করা যায়? অভিমান, বিচ্ছেদ, এর পরও ভালোবাসার তো মৃত্যু নেই।
অদ্ভুত এক খেলা! পথের ভিখারি ভালোবাসে ফুটবলকে, আবার ভালোবাসে সমাজের বিত্তশালী মানুষটিও। কোনো তফাত নেই। উভয়েই ফুটবলের ভালোবাসার কাঙাল। প্রত্যেকে তার নিজস্ব অবস্থান থেকে খেলাটিকে দেখে। খেলাটি নিয়ে ভাবে। কখনো অনুশোচনা করে, কখনো আনন্দিত হয়।
চার বছর পর পর মানুষের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার আলোতে উৎসাহিত হয় ফুটবলের মহাযজ্ঞ। উত্তেজনা, আনন্দ আর উৎকণ্ঠার কড়াই যত গরম হচ্ছে, মানুষ ততই চঞ্চল হয়ে উঠছে। বাতাসভর্তি গোলকপিণ্ড এক মাসের বেশি সময় ধরে মানুষের দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ রাখবে। আমাদের মতো দেশে ফুটবল অনেক ইস্যুর ওপরে স্থান পাবে। ফুটবল নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে রীতিমতো পাগলামি ও উন্মাদনার জন্ম হবে। ফুটবল নিয়ে এখন শুধু বিশেষজ্ঞ, পণ্ডিত ও মৌসুমি ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মাথা ঘামাচ্ছেন না; মাথা ঘামাচ্ছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরাও। তাঁরাও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। বিগত বিশ্বকাপগুলোর সময় লক্ষ করেছি, গণকদের গণনা করে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন দলের নাম ঘোষণা করে আলোচনার জন্ম দিতে। ১৬০ জন অর্থনীতিবিদের পূর্বাভাস হলো, গতবারের রানার্স আপ ফ্রান্স ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনকে পরাজিত করে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি জয় করবে। আর এই ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি প্রমাণিত হয় তাহলে তো ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের খবর আছে। রয়টার্সের প্রেস আইটেমে দেখেছি, অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করেছেন, মূল্যস্ফীতির কঠিন হিসাব কষা যত না কঠিন, তার চেয়েও বেশি কঠিন বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম বলা। যা হোক, এই ভবিষ্যদ্বাণী অবশ্য বড় ধাক্কা ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, জার্মানি ও পর্তুগালের ফুটবল দলের জন্য। তবে ফুটবল-রসিকরা নিশ্চয়ই মনে রাখবেন, ফুটবল মাঠের দুই পায়ের খেলা। খেলার আসল গায়েন হলেন খেলোয়াড়রা। খেলোয়াড়রাই মাঠের রং বারবার পাল্টে দিয়েছেন। পাল্টে দিয়েছেন অনেক হিসাব-নিকাশ। মানুষ মাঠের ফুটবলের ওপর ভরসা রেখেছে। দলগত শক্তি, সামর্থ্যের বাস্তবায়ন আর তারকা খেলোয়াড়ের সময়মতো জ্বলে ওঠার কথা ভেবেছে।
এবারই প্রথম তিন দেশ মিলিয়ে (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) বিশ্বকাপের আয়োজক। অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হয়েছে। ম্যাচ এখন ১০৪টি। ম্যাচ বাড়াতে খেলার দিনও বেড়েছে। বিশ্বায়নের দোহাইয়ের পেছনে ফিফার আয়ও এবার বেড়েছে। আবার এই আয় দুনিয়াজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা হবে বলে অনেক আগেই ফিফা জানিয়েছে। ফিফার কাছ থেকে আমাদের বরাদ্দ বাড়বে বলে ফুটবল ফেডারেশনের গভর্নিং বডির একজন সদস্য জানিয়েছেন। তবে কোন কোন খাতে ফিফা বরাদ্দ বাড়াবে—এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানিয়েছেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল ৯৬ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। শুরু সেই ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে থেকে। স্বাগতিক উরুগুয়ে ৪-২ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই সময় থেকে বিগত ২২টি বিশ্বকাপে মাত্র ছয়বার স্বাগতিক দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দেশগুলো হলো উরুগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। ২৩তম বিশ্বকাপের (২০২৬) স্বাগতিক দেশ তিনটি, তারা বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হবে এমন স্বপ্ন কখনো দেখছে না।
বিভিন্ন কারণে ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞরা অনেক হিসাব-নিকাশ ও আগ-পিছ ভেবে কথা বলেন। এবার তাঁদের বেশির ভাগের ভবিষ্যদ্বাণী হলো, যে আটটি দেশ এর আগে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে, এর বাইরে যাচ্ছে না আসন্ন বিশ্বকাপের ট্রফি। পণ্ডিতরা কেউ কেউ সরাসরি বলেছেন, লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা গতবার কাতার বিশ্বকাপে বিজয়ী দল এবং ব্রাজিল, যারা ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখছে, অপেক্ষা করে আছে ২৪ বছর ধরে—তাদের কোনো সম্ভাবনা নেই। এতে ধরে নেওয়া যায়, বিশ্বকাপ আবার ইউরোপের কবজায় চলে যাচ্ছে। ১৯৫৮ সালে সুইডেন থেকে প্রথম লাতিন দল ব্রাজিল কাপ জিতেছিল ইউরোপের সুইডেনকে ৫-২ গোলে পরাজিত করে। এর ৫৬ বছর পর ২০১৪ সালে ব্রাজিল থেকে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে জার্মানির লাতিন জয়। বিষয়টি দারুণ।
ফুটবলের পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখিয়ে বলছে, বিশ্বকাপ ফুটবল ‘ডমিনেট’ করছে ইউরোপ। ইউরোপজুড়ে ফুটবল ভীষণভাবে পাল্টে গেছে। ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি—সব জায়গায় ঘরোয়া লীগে টুর্নামেন্টের খেলায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ফুটবল নিয়ে নতুনভাবে মাথা ঘামিয়ে নতুন এক ধারার ফুটবলের জন্ম দিয়েছেন। এখানে আছে আক্রমণাত্মক ফুটবলের সঙ্গে শৈল্পিক ফুটবলও। আগের দিনগুলোতে লাতিন দেশগুলোর ফুটবলাররা এক ধরনের ফুটবল খেলতেন, আর ইউরোপের দলগুলো খেলছে অন্য ধাঁচের ফুটবল। এখন আর সেই ধারা নেই। লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটবলার এখন ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে ফুটবল খেলছেন। এতে ফুটবল দুনিয়ার সব কিছু মিলেমিশে গেছে। গত ২৫ থেকে ৩০ বছরে ক্লাব ফুটবলে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। যার প্রভাব ইউরোপের সব জাতীয় দলেও লক্ষণীয় হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি ফুটবলের সত্যিকারের বিশ্বায়ন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এমনকি এশিয়ার খেলোয়াড় তাঁদের নিজস্ব খেলার ধারা বাদ দিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনায় ফুটবল খেলছেন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, এশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের অনেক খেলোয়াড় নিজস্ব নাগরিকত্ব বাদ দিয়ে নতুন করে নাগরিকত্ব নিয়ে বিভিন্ন দেশের হয়ে ফুটবল খেলছেন। আসন্ন বিশ্বকাপ ফুটবলে তাঁদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।
এশিয়া থেকে এবার প্রতিনিধিত্ব করবে ৯টি দেশ। ১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়া বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। আর ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া খেলেছে সেমিফাইনালে। এবারের বিশ্বকাপে এশিয়ার দলগুলো কী করবে, এর চেয়েও বেশি কৌতূহল লক্ষণীয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে গিয়ে ইরানের কোন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে মরক্কো সেমিফাইনালে খেলেছিল। দেখার বিষয় এবার মরক্কো কতটুকু এগোতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও আরববিশ্বে ফুটবলের কদর দ্রুত বাড়ছে। এখন দরকার টেকসই ফুটবলে উন্নতি।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে জাপান হারিয়েছে জার্মানি ও স্পেনকে; দক্ষিণ কোরিয়া হারিয়েছে পর্তুগালকে; ক্যামেরুন ব্রাজিলকে; তিউনিশিয়া ফ্রান্সকে। মরক্কো প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে খেলেছে। হারিয়েছে বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালকে। আশা করছি, এশিয়া মহাদেশ থেকে সাহসের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স প্রদর্শন করবে আমাদের প্রতিনিধিরা, যা এশিয়ায় সার্বিক ফুটবলকে অনুপ্রাণিত করবে। বিশ্বকাপের বর্ণিল উৎসবে সবাইকে স্বাগত। শরীরের যত্ন নিন আর খেলা উপভোগ করুন। জীবনের ব্যঞ্জনের নুন হলো আনন্দ।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া



এসব ঘটনা শুনে আমরা কিছুক্ষণ দুঃখ প্রকাশ করি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ জানাই, তারপর আবার অন্য কোনো আলোচিত ঘটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেদের কাছে প্রশ্ন করি, আমরা আসলে কী করছি। প্রতি বছর মা দিবস ও বাবা দিবস এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যায় আবেগঘন স্ট্যাটাসে। কেউ মায়ের সঙ্গে ছবি দেন, কেউ বাবার ত্যাগের গল্প লেখেন, কেউবা কৃতজ্ঞতার দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করেন। এসব প্রকাশ অবশ্যই সুন্দর। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই ভালোবাসা বাস্তব জীবনের দায়িত্ববোধে পরিণত হয় না।

এই অপরাধ কেন টিকে থাকে এবং বাড়তে থাকে তা বোঝার জন্য কারণগুলোর একটি সৎ ও নির্ভীক পরীক্ষা দরকার