প্রযুক্তি নির্ভরশীল বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ এখন কৌশলগত পণ্য। সেই দৌড়ে পা রাখতে যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রেয়াতি সুবিধা দিচ্ছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এ প্রস্তাব রাখছেন।
অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ৩০ জুন ২০৩১ পর্যন্ত সেমিকন্ডাক্টর খাতের জন্য আমদানীকৃত উপকরণের ওপর ১ শতাংশের ওপরে কোনো আমদানি শুল্ক, সমুদয় রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আগাম কর সুবিধা স্থগিত রাখা হবে। এই সুবিধাগুলো বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নতুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এই প্রণোদনা প্যাকেজটি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের পূর্ণাঙ্গ ভ্যালু চেইন-ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ডিজাইন, ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ), সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলিং ও টেস্টিং (ওএসএটি) এবং প্যাকেজিং ও ফেব্রিকেশন সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে।
ইলেকট্রনিক যন্ত্রের অত্যাবশ্যকীয় ক্ষুদ্রাংশ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের শীর্ষে অবস্থান করছে তাইওয়ান। প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের ওপরে আছে তাদের নাম। তবে সুখবর হচ্ছে, সেই তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নাম।
ম্যাককিন্সির মতে, গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর বাজার ২১ শতকের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে পৌঁছাবে। এরই মধ্যে খাতটি ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারে ২০২১ সালে ৬০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পোশাকশিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর হতে পারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বড় রপ্তানি খাত। সরকারের এই রেয়াতি সুবিধা সেই পথেই মাইলফলক হয়ে থাকবে।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে সেমিকন্ডাক্টরের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ এখনো এ খাতে তেমন উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে চিপ ডিজাইন করে বছরে প্রায় ছয় মিলিয়ন ডলার আয় করছে বাংলাদেশ। প্রাথমিক পর্যায়ে চিপ ডিজাইন ও টেস্টিং খাতে মনোনিবেশ করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই আয় এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ লক্ষ্যে গত বছরের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীনে গঠিত ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স দীর্ঘমেয়াদি কর অব্যাহতি ও শুল্কছাড় সুবিধার সুপারিশ করেছিল। টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতেই বাজেটে এই প্রস্তাব আনা হয়েছে।
দেশেই হচ্ছে গুগল-অ্যাপলের ডিজাইন
দেশের ক্ষুদ্র পরিসরের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পটি এরই মধ্যে বিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানে ‘উল্কাসেমি’ প্রায় ৩০০ প্রকৌশলী নিয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন করছে। তারা গুগল, অ্যাপল, ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন করছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জানান, আপাতত ডিজাইন পর্যায়ের কাজ করলেও লক্ষ্য উৎপাদনে যাওয়া। এ ছাড়া নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর, প্রাইম সিলিকন, টোটন ইলেকট্রনিকসের মতো কম্পানি কাজ করছে। বড় কম্পানি ওয়ালটন ও এসিআইও এই বাজারে প্রবেশ করতে চলেছে।
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জড়িয়ে আছে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সঙ্গে। বাতি, টিভি, ফ্রিজ, ওভেন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ব্যবহারের মোবাইল হ্যান্ডসেট- যেখানে যা, তার সবকিছুই প্রযুক্তিনির্ভর। আর এই প্রযুক্তি চালায় অতি ক্ষুদ্রাকৃতির সেমিকন্ডাক্টর। শুধু নিত্যব্যবহার্য নয় বরং গুগল-ফেসবুকের মতো ইন্টারফেস পরিচালনায় সেমিকন্ডাক্টরের প্রয়োজন।
তিনটি জটিল ধাপে তৈরি হয় ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রাকৃতির সেমিকন্ডারক্টর। এই প্রক্রিয়ার শুরু ডিজাইন দিয়ে। গবেষণানির্ভর এই কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান উল্কাসেমি।
বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআইএ) সভাপতি এম এ জব্বার বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ। সিলিকন রিভার এবং ব্রেইনগেইনের মাধ্যমে আমরা বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও নেতৃত্বকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা এবং বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।’
সিলিকন রিভার উদ্যোগের প্রধান স্থপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ মোস্তফা হুসাইন বলেন, ‘বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক অংশীদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ওপর। এই রোড শোর মাধ্যমে আমরা শিল্প, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আরো শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই, যা ভবিষ্যতে জ্ঞানবিনিময়, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।’