আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে নারীর অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। কারণ শিল্পের ইতিহাস যেভাবে লেখা হয়েছে, তার মধ্যে রয়ে গেছে লিঙ্গভিত্তিক ও ক্ষমতাকাঠামোর রাজনীতি, যে রাজনীতি উপেক্ষা করে শিল্পকে দেখা সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘ সময় ধরে আধিপত্যবাদী পুরুষ যেভাবে শিল্পের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছে, তাতে নারীর সৃষ্টিশীলতাকে করা হয়েছে উপেক্ষা। একদিকে লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অন্যদিকে ক্ষমতার বলয় শিল্পকে ভাগও করে নিয়েছে উচ্চমার্গ ও নিম্নশ্রেণির দোলাচলে। রাজা বা ধর্মের নিরিখে শিল্পকে মূলধারার শিল্প আর গৃহকোণে তৈরি শিল্পকে অন্তঃপুরশিল্প বা কুটির শিল্প বলে দেওয়া হয়েছে নানা নাম; আর করা হয়েছে শ্রেণিবিভাগ। এই ভাবনা থেকে যে আমরা এখনো মুক্ত হতে পেরেছি, তা কিন্তু নয়। ঔপনিবেশিক ভাবনার পরম্পরায় আমরা এখনো শিল্পকে একইভাবে দেখে চলছি।

ইউরোপের রেনেসাঁ থেকে আধুনিকতাবাদ পর্যন্ত ‘মহান শিল্পী’র (Great Artist) ধারণাটিতে আমরা প্রায় একচেটিয়াভাবে দেখতে পাই পুরুষ শিল্পীদের। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্ন উঠে আসে—নারীরা কি সত্যিই অনুপস্থিত ছিলেন, নাকি শিল্প-ইতিহাস তাঁদের বাদ দিয়েছে? এই প্রশ্নকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দেন Linda Nochlin তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Why Have There Been No Great Women Artists?’-এ (১৯৭১)। নকলিনের মূল যুক্তি হলো, সমস্যাটি নারীর প্রতিভার অভাব নয়;

বরং শিল্পশিক্ষা, একাডেমি, পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রদর্শনব্যবস্থার মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নারীদের দীর্ঘদিন বাইরে রেখেছিল। তবে ইউরোপের এই বোঝাপড়া আবার আমাদের ইতিহাস ভাবনার অবলম্বন; কারণ ঔপনিবেশিক শিক্ষার পরম্পরায় আমাদের মনোজগতে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, ইউরোপের ইতিহাসকে কোনো এক অবস্থান থেকে নিজেদের ইতিহাস বলেই ভাবতে থাকি। আর এখানেই প্রশ্ন আসে, তাহলে কি আমাদের শিল্পের ইতিহাস আলাদা? এবং উত্তর হচ্ছে, অবশ্যই আলাদা। আমাদের ইতিহাস আমরা অনেক ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক কাঠামোতে দেখতে এবং দাঁড় করতে ব্যস্ত। ফলে ইউরোপের শিল্প ইতিহাসের কাঠামোতে আমরা যখন শিল্প ইতিহাসে নারী শিল্পী খুঁজতে যাই, তখন তা আর পাই না। আসলে

ইউরোপের কাঠামোতে তো আমরা আমাদের শিল্পীদেরই নাম পাই না। কারণ এখানকার শিল্পকে কোনো ব্যক্তি শিল্পীর প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়নি; এখানে শিল্পকে দেখা হয়েছে বরাবর সমষ্টির উদ্যাপন হিসেবে। এখানে কৃষি থেকে স্থাপত্য সকল প্রসঙ্গে নারী-পুরুষ একসঙ্গে শ্রম দেয়। এখনো বাংলার যেকোনো গ্রামে কুমারপাড়ায় দেখতে পাই, একটি হাঁড়ি অথবা কলসি তৈরি হয় নারী ও পুরুষের যৌথ শ্রমে। কারণ হাঁড়ি ও কলসির ওপরের মুখ তৈরি হয় কুমারের চাকায়, যাতে কাজ করে পুরুষ, আর নিচের অংশ তৈরি হয় কাঠের তৈরি ছাঁচে পিটিয়ে পিটিয়ে, যা তৈরি করে নারীরা। একটি নিত্যব্যবহার্য পাত্রই যখন নারী-পুরুষের যৌথ শ্রমে তৈরি হয়, সেখানে বাকি শিল্পের আলোচনা তো অবশ্যই দীর্ঘ হবে। এখানেই আমরা আলোচনায় নিয়ে আসতে পারি প্রাসঙ্গিকভাবে আমাদের শহীদ মিনারকে, যা নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমানের একটি যৌথ প্রকল্প। অবশ্য পুরুষকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামো বারবার নভেরা আহমেদকে বাদ দিয়ে হামিদুর রহমানকে উদযাপন করতে চেয়েছে শিল্প ইতিহাসে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত সত্য শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। সবকিছু অতিক্রম করে নভেরা হয়ে উঠেছেন দীপ্তিময়।

শহীদ মিনার তৈরির এই যৌথ প্রকল্পে ভাস্কর হিসেবে ছিলেন নভেরা এবং চিত্রশিল্পী হিসেবে ছিলেন হামিদুর রহমান। যেহেতু শহীদ মিনার ছিল একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো এবং যা চিত্রচর্চার চেয়েও অনেক বেশি মাধ্যম বিবেচনায় ভাস্কর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই অবলীলায় ধারণা করা যায়, এই প্রকল্পে তুলনামূলক বেশি শ্রম দিয়েছিলেন নভেরা। ইতিহাসকে পুনঃপাঠের মধ্য দিয়ে হয়তো এই ধারণার সত্য সামনে আসবে। তবে সবকিছু বাদ দিলেও আমরা যে বিষয়টি এখানে নিয়ে আসতে

পারি, এই শিল্পটি এক নারী ও এক পুরুষ শিল্পীর যৌথ প্রয়াস। নারী আর পুরুষকে সমান অবস্থান থেকে দেখার অভ্যস্ততা এখানে এই সমাজে অত্যন্ত প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তা সমসাময়িক বাস্তবতার কথা ভেবেই আমাদের সামনে আসে। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়েই নভেরার মতো শিল্পী শিল্পচর্চার সূচনা করলেও এখনো আমাদের দেশে নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণ যৎসামান্যই। মূলধারার শিল্পচর্চায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো হাতে গোনা যায়। এমন পরিস্থিতিতে নভেরা আহমেদের মতো শিল্পীদের বারবার উদযাপন প্রয়োজন। কারণ ২০২৪-এর আন্দোলনে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ আমাদের যে আশার আলো দেখিয়েছিল, সেই চব্বিশের আন্দোলনের পরেই নারী হয়েছে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। দেশজুড়ে ভাঙা হয়েছে শত শত ভাস্কর্য। এখানেই আজকের বাংলাদেশের প্রতিটি নগর ও নগরের নাগরিকের জন্য ভাস্কর নভেরাকে অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ নভেরা একই সঙ্গে নারী এবং ভাস্কর।

কিন্তু সমাজের এমন সংকটময় বাস্তবতায় নভেরার জন্য আয়োজিত প্রদর্শনী প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু প্রশংসার পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও করা প্রয়োজন। বছরের এই সময়ে যখন প্রকৃতি মেঘের ঘনঘটায় অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি করে, তখন দর্শক কতটা শিল্প উদযাপনে সক্ষম হয় এবং দর্শকের প্রদর্শনী দেখতে আসার পরিস্থিতির জন্য কতটা অনুকূল? বাংলাদেশে প্রায় সব শিল্পকর্মকাণ্ড যখন ঢাকামুখী, তখন পুরো দেশের মানুষ এমন আয়োজন থেকে উপেক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা কি তৈরি করে না? উপরন্তু প্রদর্শনীতে নভেরার ভাস্কর্যগুলো কি কোনো নির্দিষ্ট ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে সাজানো হয়েছে? নভেরার চিত্রমালায় যতটা উজ্জ্বল রঙের আধিপত্য রয়েছে, বিপরীতে তাঁর ভাস্কর্য অনেক বেশি মৃদু বা হালকা রঙের, ফলে প্রদর্শনীর গ্যালারিতে

শিল্পকর্মের আয়োজনে প্রচণ্ড বৈপরীত্য লক্ষণীয়, যা শিল্পের নান্দনিক সৌন্দর্যকে পূর্ণ উপভোগে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। বেশ কিছু ভাস্কর্য শিল্পকর্ম দৃষ্টিসীমার নিচে রাখা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। উপরন্তু অনেকগুলো স্থিরচিত্র তথ্যবিহীনভাবে উপস্থাপিত। হয়তো এসব অপূর্ণতা প্রকাশনার মাধ্যমে পূর্ণতা পাবে। তবে নভেরা আহমেদের মতো একজন কালজয়ী ভাস্কর, যিনি শুধু বাংলাদেশের নন, সমস্ত দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক শিল্প ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, এমন শিল্পীর প্রদর্শনী আয়োজনের যে প্রদর্শনী টিম, তাতে ভাস্কর্যশিল্পী ও নভেরা গবেষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



