• ই-পেপার

গুন্টার গ্রাস

ফুটবল সাহিত্য ১৯৭৪

  • ভূমিকা ও অনুবাদ : মাসুদুজ্জামান

এ কে এম আবুল কালাম আজাদ

স্মৃতিময় বলেশ্বর

স্মৃতিময় বলেশ্বর

শৈশবের সেই চেনা কলতান, চেনা রূপ তার,

বয়ে আনে স্মৃতির জোয়ার।

মনে পড়ে যায় সেই ডিঙি নৌকা, মাঝির গান,

খেয়া পারাপারে জুড়াত প্রাণ।

 

রোদের দুপুরে মেতে ওঠা নদী, জলের আহ্বান,

সাঁতারে মেতেছে শিশুপ্রাণ।

বাতাসের টানে দূরে চলে যেত পালতোলা সব নাও,

স্মৃতিরা বলে ফিরে চাও।

 

সময়ের চাকা ঘুরে গেছে আজ, বদলেছে দিনক্ষণ,

কেঁপে ওঠে এই মন।

নৌকা ছেড়ে আজ গাড়ি ছুটে চলে ব্রিজের এপার-ওপার,

কমেনি তো বুকে অধিকার।

 

তুমি তো শুধু নদী নও কোনো পিরোজপুরের গায়,

আছ স্মৃতির শেষ আঙিনায়।

কালের নিয়মে রূপ বদলাক, সেতু আসুক বুকে,

বয়ে চলো আপন সুখে।

শাহেদ কায়েস

আষাঢ়স্য দ্বিতীয় দিবসে

আষাঢ়স্য দ্বিতীয় দিবসে

আষাঢ়ের প্রথম মেঘ আজও কালিদাসের পুরনো দূত

ললাটির বিরহকাল কাঁধে নিয়ে ভেসে যায় পশ্চিমে...

যেখানে হিজলের ছায়ায় বসে আছে অনামা প্রতীক্ষা।

 

পঞ্চমীঘাটের সিঁড়িতে বিকেলের নীরব জলরেখা

ব্রহ্মপুত্র আজ অনাদৃত এক দীর্ঘ পত্রের নীরবতা

তার ঢেউয়ে ভেসে ওঠে তোমার দূরদেশি উচ্চারণ।

 

বজ্রপাত ক্ষণিকের সাদা-কালো বালিহাঁস হয়ে—

অন্ধকারের বুক থেকে তুলে আনে পুরনো মুখ।

রাত হলে জোনাকিরা ক্ষুদ্র নক্ষত্র হয়ে জ্বলে

আর বিরহ—অদৃশ্য বাঁশির মতো মাঠে মাঠে বাজে...

 

কদম ফুলেরা জানে, কতশত যোজন দূরে—

অন্য কোনো আকাশে তুমি সন্ধ্যা গুনে যাও

আর আমি মেঘের ভেতর রেখে দিই নীল সংকেত

যেন যক্ষের ব্যথা এখনো ছেড়ে যায়নি পৃথিবী।

 

 

খালেদ হোসাইন

ভালোবাসা ছিল তবে অভ্যাসের দায়?

ভালোবাসা ছিল তবে অভ্যাসের দায়?

জামার পকেটে কিছু ফুলের সৌরভ নিয়ে ঘুরি।

অর্থকড়ি থাকে না তেমন।

অতলান্ত প্রণয়ের অস্থিরতা নিয়ে যারা এসেছিল

তারা খুব দূরে চলে গেছে।

 

সান্নিধ্যের অবিমিশ্র স্মৃতি নেই,

জটিলতা রয়েছে প্রচুর

পৃথিবীর ব্যাস কত? দূর আর তবে কত দূর?

 

বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় আমি কেন বিপর্যস্ত নই?

তারা নয় পর্যুদস্ত বিধ্বস্ত উজ্জ্বল ঠিকানায়।

ভালোবাসা ছিল তবে অভ্যাসের দায়?

 

গুচ্ছ গুচ্ছ আসে প্রেম শ্রাবণের মেঘের মতন

তুচ্ছ হয়ে মিশে যায় শীতের আকাশে।

 

রাত্রি গভীর হয়ে মুখগুলো ভাসে

নক্ষত্রের পাশে নয়, নোনা নোনা সমুদ্রের জলে।

 

 

 

হুমায়ূন আহমেদের গল্পের শেষ নেই

ফরিদুর রেজা সাগর

হুমায়ূন আহমেদের গল্পের শেষ নেই

অসুস্থ হুমায়ূন আহমেদ যখন প্রথম দেশে এলেন, তখন আমরা তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। দখিন হাওয়ায় ঘর ভর্তি মানুষ। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন প্রিয়জনরা। দেখে মনে হচ্ছিল না যে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত কোনো একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। শরীরের এমন অবস্থা কাউকে বুঝতেই দিচ্ছেন না তিনি। হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেই এটা সম্ভব।

সুরের ধারা ও চ্যানেল আইয়ের উদ্যোগে প্রকাশিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ভিসিডি ‘শ্রুতি গীত বিতান’ নিয়ে আমরা সেদিন হাজির হুমায়ূন আহমেদের বাসায়। আমার সঙ্গে অন্যদিনের সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, প্রাবন্ধিক ড. ফজলুল আলম, আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানূর রহমান। রবীন্দ্রনাথের গানের সংকলন শ্রুতি গীত বিতান পেয়ে খুশি হলেন হুমায়ূন আহমেদ। উচ্ছ্বসিত হলেন, আনন্দ প্রকাশ করলেন। কারণ রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় কবি।

একই সময়ে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের পাক্ষিক বিনোদন আনন্দ আলোর বিশেষ সংখ্যাটিও তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হলো। সংখ্যাটির প্রচ্ছদ কাহিনি লেখা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। সঙ্গে ছিল হুমায়ূন আহমেদের ছবি দিয়ে সুদৃশ্য একটি মোড়ক। পত্রিকাটি হাতে পেয়ে হুমায়ূন আহমেদ নিজের ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন— বাহ! চমৎকার। রসিকতা করলেন তাঁকে নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লেখা নিয়ে।

এর আগের দিনের কথা। হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় ইমপ্রেস টেলিফিল্মের চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র বিশেষ প্রদর্শনীতে এলেন। এর আগে ঘেটুপুত্র কমলা দেখার জন্য আবেগঘন এক চিঠি লিখলেন  হুমায়ূন আহমেদ।

‘হে বন্ধু, হে প্রিয় ডাক্তারের কঠিন নিষেধ, বেশি মানুষের ভিড়ে যাওয়া যাবে না। তার পরও সবাইকে নিয়ে ঘেটুপুত্র কমলা দেখার লোভ সামলাতে পারছি না। ছবি দেখে সরাসরি আমাকে গালাগাল করার সুযোগ হেলায় হারাবেন না। আসুন, আমার সঙ্গে ঘেটুপুত্র কমলা দেখুন।’

ছবিটি দেখার পর অনেক দর্শকই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ব্যতিক্রম শুধু হুমায়ূন আহমেদ। বললেন, ‘ছেলেটির মৃত্যু হোক, এটা আমিও চাইনি। কিন্তু মৃত্যু তো আমার হাতে নেই।’

আমরাও জানি—মৃত্যু এমনই, যা মানুষের হাতে নেই। মৃত্যু সময়ে-অসময়ে নিজের করে নেয় সবাইকে।

সেদিন স্টার সিনেপ্লেক্সে নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রটি দেখার সময় ছিলেন অনেক অন্তরঙ্গ। নিজেই দর্শকদের সঙ্গে ছবির শিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। কথার জাদুতে নিজেও হাসলেন, অন্যদেরও হাসালেন।

হুমায়ূন আহমেদ এমনই। তাঁর গল্প বলে কি শেষ করা যাবে।

একবার একজন পাঠক তাঁকে বলেছিলেন—স্যার, আপনি তো বাংলা সাহিত্যকে পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। বাঙালিকে বইমুখো করেছেন। আপনার কারণেই এত পরিমাণ বই বিক্রি হয়।

এই কথা শুনে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন—আসলেই কি বই বিক্রি বেড়েছে? পাঠক বেড়েছে? পাঠক বেড়েছে হুমায়ূন আহমেদের। বইয়ের পাঠক আসলে বাড়েনি।

তাঁর এই কথা আমরা টের পেয়েছি হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার পর। বইমেলায় আসলেই বই বিক্রি আগের তুলনায় কমেছে বৈ বাড়েনি। মেলায় এখনো যেভাবে হুমায়ূন আহমেদের বই বিক্রি হয়, সেই তুলনায় অন্য লেখকদের বই বিক্রি হয় অনেক কম। হুুমায়ূন আহমেদই ঠিক বলেছিলেন।

একবার নিষাদ-নিনিত, মানে হুমায়ূনের দুই পুত্রের জন্মদিনে খুব সুন্দর করে কার্ড ছাপলেন। অসাধারণ এবং অন্য রকম সেই কার্ড। তিনি বলেছিলেন—আমি তো এদের বিয়ে দেখে যেতে পারব না, তাই এ রকম একটি কার্ড ছেপে দিলাম। হুুমায়ূন আহমেদ ভবিষ্যৎ ভাবনা ভাবতেন। তাঁর ভাবনায় ভবিষ্যৎ ছিল। তিনি অনেক কিছু সবার আগে ভাবতেন। ভাবতে পারতেন দার্শনিকের মতো।

আজ তিনি নেই। শূন্যতা চারদিকে। কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ হবে তখনই, যখন হুমায়ূন আহমেদকে আমরা ধারণ করব নিজেদের করে।