• ই-পেপার

শাহেদ কায়েস

আষাঢ়স্য দ্বিতীয় দিবসে

এ কে এম আবুল কালাম আজাদ

স্মৃতিময় বলেশ্বর

স্মৃতিময় বলেশ্বর

শৈশবের সেই চেনা কলতান, চেনা রূপ তার,

বয়ে আনে স্মৃতির জোয়ার।

মনে পড়ে যায় সেই ডিঙি নৌকা, মাঝির গান,

খেয়া পারাপারে জুড়াত প্রাণ।

 

রোদের দুপুরে মেতে ওঠা নদী, জলের আহ্বান,

সাঁতারে মেতেছে শিশুপ্রাণ।

বাতাসের টানে দূরে চলে যেত পালতোলা সব নাও,

স্মৃতিরা বলে ফিরে চাও।

 

সময়ের চাকা ঘুরে গেছে আজ, বদলেছে দিনক্ষণ,

কেঁপে ওঠে এই মন।

নৌকা ছেড়ে আজ গাড়ি ছুটে চলে ব্রিজের এপার-ওপার,

কমেনি তো বুকে অধিকার।

 

তুমি তো শুধু নদী নও কোনো পিরোজপুরের গায়,

আছ স্মৃতির শেষ আঙিনায়।

কালের নিয়মে রূপ বদলাক, সেতু আসুক বুকে,

বয়ে চলো আপন সুখে।

খালেদ হোসাইন

ভালোবাসা ছিল তবে অভ্যাসের দায়?

ভালোবাসা ছিল তবে অভ্যাসের দায়?

জামার পকেটে কিছু ফুলের সৌরভ নিয়ে ঘুরি।

অর্থকড়ি থাকে না তেমন।

অতলান্ত প্রণয়ের অস্থিরতা নিয়ে যারা এসেছিল

তারা খুব দূরে চলে গেছে।

 

সান্নিধ্যের অবিমিশ্র স্মৃতি নেই,

জটিলতা রয়েছে প্রচুর

পৃথিবীর ব্যাস কত? দূর আর তবে কত দূর?

 

বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় আমি কেন বিপর্যস্ত নই?

তারা নয় পর্যুদস্ত বিধ্বস্ত উজ্জ্বল ঠিকানায়।

ভালোবাসা ছিল তবে অভ্যাসের দায়?

 

গুচ্ছ গুচ্ছ আসে প্রেম শ্রাবণের মেঘের মতন

তুচ্ছ হয়ে মিশে যায় শীতের আকাশে।

 

রাত্রি গভীর হয়ে মুখগুলো ভাসে

নক্ষত্রের পাশে নয়, নোনা নোনা সমুদ্রের জলে।

 

 

 

গুন্টার গ্রাস

ফুটবল সাহিত্য ১৯৭৪

ভূমিকা ও অনুবাদ : মাসুদুজ্জামান

ফুটবল সাহিত্য ১৯৭৪

পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির আদর্শিক অবস্থান হিসেবে এই ম্যাচটির (পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির ম্যাচ) গুরুত্ব সময়ের ব্যবধানে বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্ব জার্মানির গোপন পুলিশ ‘স্টাসি’ তাদের গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্ক ফুটবল ক্লাবগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত করে এবং টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডের এই ম্যাচে শত শত অনুগত সমর্থকের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। পূর্ব বার্লিনের আলেকজান্ডার ওসাং অনেক পরে তাঁর ‘দ্য থিংকিং ফ্যানস গাইড টু দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ (২০০৬) শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, জিডিআরের বিজয়ের পর তিনি তাঁর ‘নতুন তৈরি পূর্ব জার্মান ফ্ল্যাটের গাঢ় বাদামি মেঝেতে’ আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিলেন। যদিও তিনি তখন পশ্চিম জার্মান ফুটবল তারকা বায়ার্ন মিউনিখের ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও জার্ড মুলারকে দেবতুল্য ফুটবলার মনে করতেন এবং অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। তাঁর মনে পড়ে যায়, ‘পশ্চিম জার্মান ভূখণ্ডটি অনেক বড়, সেখানকার তৈরি গাড়িগুলো কী চমৎকার, চকোলেট সুস্বাদু, চুইংগাম তৃপ্তিদায়ক, স্নিকার্সগুলো কত ভালো! কিন্তু ১৯৭৪ সালের সেই গ্রীষ্মের সন্ধ্যায়, হামবুর্গে, আমরা তাদের হারিয়েছিলাম। আমি তাদের হারিয়েছিলাম।’

ফুটবল সাহিত্য ১৯৭৪এই ফলাফলের কারণে পশ্চিম জার্মানির অবশ্য বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে এগিয়ে যাওয়া আটকে থাকেনি এবং তারা তাদের জয় করা তিনবারের (তখন পর্যন্ত) বিশ্বকাপের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো জয় লাভ করতে সক্ষম হয়। তবু এরই মধ্যে সেই ম্যাচের জয়সূচক গোলদাতা স্পারওয়াসার ১৯৮৮ সালে পালিয়ে পশ্চিম জার্মানিতে চলে আসেন। ১৯৯০ সালে দুই জার্মানি এক হয়ে যায়। এর পরও পূর্ব জার্মানি অংশের ফুটবলাররা খারাপ খেলোয়াড় বলে এক ধরনের হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালের সময় পূর্ব জার্মানির ১৯৭৪ সালের কয়েকজন ফুটবলার স্মারক হিসেবে লাইপজিগে একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছিলেন। জার্মান ম্যাগাজিন ‘ডের স্পিগেলে’র প্রতিবেদন অনুসারে সেই ম্যাচে গ্যালারিতে মাত্র ‘কয়েক শ দর্শক’ উপস্থিত ছিলেন। এভাবেই মূলত পূর্ব জার্মান অংশের খেলাধুলার বিদায়ঘণ্টা বেজে যায়।

টেলিভিশনের পর্দার সামনে যখন কেউ নিজেকে দ্বিখণ্ডিত দেখে, তখন তার কেমন লাগে? কেউ যদি দ্বিমুখী নীতি বজায় রাখাকেই নিজের কাজ বানিয়ে ফেলে, তাহলে বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজের ‘আমি’কে দ্বিখণ্ডিত দেখে সে আসলে বিরক্ত হতে পারে না। পারে শুধু কিছুটা অবাক হতে। কঠোর প্রশিক্ষণ থেকে তো বটেই, জীবন থেকেও মানুষ শেখে কিভাবে নিজের সঙ্গে এবং নিজের দ্বৈত পরিচয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।

রাইনবাখের একটি কারাগারে চার বছর কাটানোর পর দীর্ঘ জটিল প্রক্রিয়া শেষে জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে একটি টেলিভিশন সেট রাখার অনুমতি দেয়। তখনই আমি আমার দ্বৈত অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার প্রভাব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন হয়ে উঠি। ১৯৭৪ সালে আমি কোলোন-ওসেনডর্ফ কারাগারে বিচারের অপেক্ষায় বন্দি ছিলাম। সে সময় বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের খেলা দেখার জন্য আমার কারাকক্ষে একটি টেলিভিশন সেট রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। পর্দার ঘটনাগুলো তখন আমার অন্তর্গত সত্তাকে নানা দিক থেকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছিল।

ওই টুর্নামেন্টে মুষলধারের বৃষ্টির মধ্যে পোল্যান্ড যখন দুর্দান্ত খেলছিল তখন নয়, কিংবা অস্ট্রেলিয়া যখন হেরে গেল বা চিলির সঙ্গে ম্যাচটি ড্র হলো তখনো নয়—এটা ঘটেছিল যখন এক জার্মানি মুখোমুখি হয়েছিল আরেক জার্মানির। সত্যিই জার্মানরা তখন কোন পক্ষ নেবে? আমি বা আমার ভেতরের অন্য আমি কোন পক্ষে ছিলাম? এই ম্যাচে আমি কাকে উৎসাহিত করতে পারতাম? স্পারওয়াসার যখন গোলটি করলেন, তখন আমার মধ্যে কি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়নি? কী সেই শক্তি, যা আমাকে দুদিকেই টানছিল?

আমাদের জন্য কি সেটা সংকট ছিল না? আমাদের বিরুদ্ধে কি আমরা দাঁড়িয়ে যাইনি? যেহেতু আমাকে প্রতিদিন সকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যাড গোডেসবার্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তদন্ত ব্যুরোর লোকজন নিশ্চয়ই অবগত ছিলেন যে আমি এই ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে জানি। আসলে এটা কোনো পরীক্ষাই ছিল না, ছিল শুধু জার্মান রাষ্ট্রসত্তার পরিচয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আচরণ করছি কি না, সেই পরীক্ষা। আমি আসলেই তখন দ্বৈত দায়িত্ব পালন করছিলাম। যত দিন আমার দায়িত্ব ছিল চ্যান্সেলরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহযোগী হওয়া, অনানুষ্ঠানিক পরিস্থিতিতে তাঁর দ্বিমুখী কথোপকথনের সঙ্গী হওয়া, তত দিন আমি সেই মানসিক চাপ সামলাতে পেরেছিলাম। আসলে আমি কোনো দ্বন্দ্বে ভুগিনি, চ্যান্সেলর আমার কাজে বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন। আমার যোগাযোগ রক্ষা করা ব্যক্তিদের মতে বার্লিন অফিসও সন্তুষ্ট ছিল। সেখানকার উঁচু মহলেও আমার কাজ প্রশংসিত হচ্ছিল। তাদের ধারণা ছিল, আমি নিজেকে ‘শান্তির চ্যান্সেলর’ হিসেবে বিবেচনা করছি এবং আমি ‘শান্তির গুপ্তচর’ হিসেবে একটি মিশন চালাচ্ছি। আমাদের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। সময়টা ভালোই ছিল, চ্যান্সেলরের জীবনী লেখার কাজটি তাঁর সহকারী করছিলেন। আমরা দুজনেই আমাদের কাজকে গুরুত্ব দিচ্ছিলাম।

কিন্তু ২২ জুন যখন ষাট হাজার দর্শকের সামনে রেফারি হামবুর্গের ভল্কস্পার্ক স্টেডিয়ামে জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক ও ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানির মধ্যকার ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজালেন, তখন আমি পুরোপুরি এবং চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। প্রথমার্ধে কোনো পক্ষই গোল করতে পারেনি, কিন্তু যখন ৪০তম মিনিটে সেই চটপটে ছোট্ট মুলার ফেডারেল রিপাবলিকের পক্ষে প্রায় গোল দিয়ে ফেলেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত বলটি যখন গোলপোস্টে আঘাত করল, আমি পরমানন্দে চিৎকার করে উঠেছিলাম—‘গোল! গোল! গো-ও-ও-ল!’ অন্যদিকে আরেকবার বিচ্ছিন্ন পূর্ব জার্মানির এগিয়ে যাওয়াকেও তীব্র উল্লাসে উদযাপন করতে যাচ্ছিলাম, যখন ফুটবলার লাউক ওভারথকে ছাড়িয়ে (ম্যাচের পরের দিকে তিনি মহান নেটজারকেও এড়িয়ে যান) ফেডারেল রিপাবলিকের বিরুদ্ধে প্রায় গোল করে ফেলছিলেন।

এদিক-ওদিক, এদিক-সেদিক। এমনকি উরুগুয়ের রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতের অভিযোগ করছিলাম—কখনো তিনি এক জার্মানির পক্ষে সিদ্ধান্ত দিচ্ছিলেন, আরেকবার অন্য জার্মানির পক্ষে। আমি নিজেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভক্ত অনুভব করছিলাম। তবু সেই সকালে যখন চিফ ডিটেকটিভ অফিসার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন, আমি আমার গত্বাঁধা বয়ানেই অটল ছিলাম। আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির কট্টরপন্থী হেসেন-সুড শাখার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিয়ে, যার সদস্যরা আমাকে একজন কঠোর পরিশ্রমী কিন্তু রক্ষণশীল কমরেড হিসেবে দেখতেন। তাঁরা যাতে মনে করেন আমি ডানপন্থী এবং আরো বাস্তববাদী অংশের অন্তর্ভুক্ত—সেভাবেই জবাব দিচ্ছিলাম। জিজ্ঞাসাবাদকে আমি বেশ উপভোগও করেছি। কিন্তু এর পর আমার ডার্করুমের সরঞ্জামগুলো আমার সামনে আনা হলো, যার সবই আগে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। এ রকম ক্ষেত্রে যা করতে হয় তা হলো অভিযোগগুলোকে তুচ্ছ জ্ঞান করে উড়িয়ে দেওয়া; যেন বলতে পারে আমি একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার। ছুটি কাটানোর ছবিগুলো দেখিয়ে প্রমাণ করতে পারি, ফটোগ্রাফি এখনো আমার শখ হয়েই আছে। কিন্তু এর পর প্রসিকিউশন একটি অত্যাধুনিক সুপার-৮ ক্যামেরা এবং অত্যন্ত দ্রুতগতির দুটি ফিল্মের রোল বের করে দাবি করলেন, ‘গোপন অপারেশন চালানোর জন্য এগুলো তো বেশ কাজের, তাই না?’ আমি সেগুলোকে শুধু পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বলে খারিজ করে দিলাম। জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিজের কথায় আমি কোনো অসংগতি রাখিনি—আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমার সেলে ফিরে এসে ম্যাচ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।

এখানে বা ওখানে কেউই সন্দেহ করতে পারেননি যে আমি ফুটবলের ভীষণ ভক্ত। আমি নিজেও জানতাম না যে জার্গেন স্পারওয়াসার আমাদের নিজেদের ম্যাগডেবার্গ দলের একজন নির্ভরযোগ্য ফুটবলার ছিলেন। কিন্তু হামান তাঁকে বল পাস করার পর আমি তার ওপর চোখ রাখলাম। সে মাথা দিয়ে বলটি নিয়ন্ত্রণে নিল, পায়ে আনল, নাছোড়বান্দা ভোগটসের সামনে ছুটে গেল, এমনকি হোটজেসকেও পেছনে ফেলে মেয়ারকে ফাঁকি দিয়ে বলটি জালে জড়াল।

জার্মানি ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল! কিন্তু কোন জার্মানি? আমার, নাকি আমার? হ্যাঁ, আমি সম্ভবত আমার সেলে বসে চিৎকার করে উঠেছিলাম—‘গোল! গোল! গো-ও-ও-ল!’। একই সঙ্গে আফসোস হচ্ছিল অন্য জার্মানি পিছিয়ে পড়েছে দেখে। কিন্তু যখন আমি বেকেনবাওয়ারের দলকে আক্রমণে উঠতে দেখলাম, তখন আবার পশ্চিম জার্মান একাদশকে উৎসাহিত করছিলাম।

এবার আমার চ্যান্সেলরের কথা বলি (যাঁর পতন অবশ্যই আমার কোনো কাজের কারণে হয়নি—আমি এ জন্য নোলাউ এবং আরো বেশি করে ওহনার ও গেনশারকে দায়ী করব)। আমি চ্যান্সেলরকে একটি পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিলাম—ছুটির দিনগুলোত এবং তাঁর জন্মদিনে (১৮ ডিসেম্বর) কার্ড পাঠানো অব্যাহত ছিল। ম্যাচের ফলাফলের জন্য কার্ড পাঠিয়ে আমি দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম। তিনি এর উত্তর দেননি। তবে আমি নিশ্চিত, স্পারওয়াসারের গোলটি নিয়ে তাঁর মধ্যেও আত্মপরিচয়ের সংকট সম্পর্কে মিশ্র অনুভূতি হয়েছিল।

 

 

 

হুমায়ূন আহমেদের গল্পের শেষ নেই

ফরিদুর রেজা সাগর

হুমায়ূন আহমেদের গল্পের শেষ নেই

অসুস্থ হুমায়ূন আহমেদ যখন প্রথম দেশে এলেন, তখন আমরা তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। দখিন হাওয়ায় ঘর ভর্তি মানুষ। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন প্রিয়জনরা। দেখে মনে হচ্ছিল না যে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত কোনো একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। শরীরের এমন অবস্থা কাউকে বুঝতেই দিচ্ছেন না তিনি। হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেই এটা সম্ভব।

সুরের ধারা ও চ্যানেল আইয়ের উদ্যোগে প্রকাশিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ভিসিডি ‘শ্রুতি গীত বিতান’ নিয়ে আমরা সেদিন হাজির হুমায়ূন আহমেদের বাসায়। আমার সঙ্গে অন্যদিনের সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, প্রাবন্ধিক ড. ফজলুল আলম, আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানূর রহমান। রবীন্দ্রনাথের গানের সংকলন শ্রুতি গীত বিতান পেয়ে খুশি হলেন হুমায়ূন আহমেদ। উচ্ছ্বসিত হলেন, আনন্দ প্রকাশ করলেন। কারণ রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় কবি।

একই সময়ে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের পাক্ষিক বিনোদন আনন্দ আলোর বিশেষ সংখ্যাটিও তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হলো। সংখ্যাটির প্রচ্ছদ কাহিনি লেখা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। সঙ্গে ছিল হুমায়ূন আহমেদের ছবি দিয়ে সুদৃশ্য একটি মোড়ক। পত্রিকাটি হাতে পেয়ে হুমায়ূন আহমেদ নিজের ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন— বাহ! চমৎকার। রসিকতা করলেন তাঁকে নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লেখা নিয়ে।

এর আগের দিনের কথা। হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় ইমপ্রেস টেলিফিল্মের চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র বিশেষ প্রদর্শনীতে এলেন। এর আগে ঘেটুপুত্র কমলা দেখার জন্য আবেগঘন এক চিঠি লিখলেন  হুমায়ূন আহমেদ।

‘হে বন্ধু, হে প্রিয় ডাক্তারের কঠিন নিষেধ, বেশি মানুষের ভিড়ে যাওয়া যাবে না। তার পরও সবাইকে নিয়ে ঘেটুপুত্র কমলা দেখার লোভ সামলাতে পারছি না। ছবি দেখে সরাসরি আমাকে গালাগাল করার সুযোগ হেলায় হারাবেন না। আসুন, আমার সঙ্গে ঘেটুপুত্র কমলা দেখুন।’

ছবিটি দেখার পর অনেক দর্শকই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ব্যতিক্রম শুধু হুমায়ূন আহমেদ। বললেন, ‘ছেলেটির মৃত্যু হোক, এটা আমিও চাইনি। কিন্তু মৃত্যু তো আমার হাতে নেই।’

আমরাও জানি—মৃত্যু এমনই, যা মানুষের হাতে নেই। মৃত্যু সময়ে-অসময়ে নিজের করে নেয় সবাইকে।

সেদিন স্টার সিনেপ্লেক্সে নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রটি দেখার সময় ছিলেন অনেক অন্তরঙ্গ। নিজেই দর্শকদের সঙ্গে ছবির শিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। কথার জাদুতে নিজেও হাসলেন, অন্যদেরও হাসালেন।

হুমায়ূন আহমেদ এমনই। তাঁর গল্প বলে কি শেষ করা যাবে।

একবার একজন পাঠক তাঁকে বলেছিলেন—স্যার, আপনি তো বাংলা সাহিত্যকে পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। বাঙালিকে বইমুখো করেছেন। আপনার কারণেই এত পরিমাণ বই বিক্রি হয়।

এই কথা শুনে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন—আসলেই কি বই বিক্রি বেড়েছে? পাঠক বেড়েছে? পাঠক বেড়েছে হুমায়ূন আহমেদের। বইয়ের পাঠক আসলে বাড়েনি।

তাঁর এই কথা আমরা টের পেয়েছি হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার পর। বইমেলায় আসলেই বই বিক্রি আগের তুলনায় কমেছে বৈ বাড়েনি। মেলায় এখনো যেভাবে হুমায়ূন আহমেদের বই বিক্রি হয়, সেই তুলনায় অন্য লেখকদের বই বিক্রি হয় অনেক কম। হুুমায়ূন আহমেদই ঠিক বলেছিলেন।

একবার নিষাদ-নিনিত, মানে হুমায়ূনের দুই পুত্রের জন্মদিনে খুব সুন্দর করে কার্ড ছাপলেন। অসাধারণ এবং অন্য রকম সেই কার্ড। তিনি বলেছিলেন—আমি তো এদের বিয়ে দেখে যেতে পারব না, তাই এ রকম একটি কার্ড ছেপে দিলাম। হুুমায়ূন আহমেদ ভবিষ্যৎ ভাবনা ভাবতেন। তাঁর ভাবনায় ভবিষ্যৎ ছিল। তিনি অনেক কিছু সবার আগে ভাবতেন। ভাবতে পারতেন দার্শনিকের মতো।

আজ তিনি নেই। শূন্যতা চারদিকে। কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ হবে তখনই, যখন হুমায়ূন আহমেদকে আমরা ধারণ করব নিজেদের করে।