• ই-পেপার

খাদ্য সহায়তা নিয়ে দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে আলীকদমে

‘প্রয়োজন শুধু একটি সহানুভূতিশীল হৃদয়’

বসুন্ধরা শুভসংঘ ডেস্ক
‘প্রয়োজন শুধু একটি সহানুভূতিশীল হৃদয়’

বন্যার পানি নেমে গেলেও বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবনে দুর্যোগ শেষ হয়নি। সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে একাকী প্রবীণ মানুষ, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিক্রিছড়ামুখ তঞ্চঙ্গ্যা পাড়া, কোলক্ষ্য হেডম্যান পাড়া ও বিক্রিছড়া এলাকার বন্যাকবলিত অর্ধশত পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন বসুন্ধরা শুভসংঘের স্বেচ্ছাসেবকরা। সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহৃর্ত ছিল এক প্রবীণ মানুষের ছোট্ট ঘরটির সামনে। তাঁর নাম মংচাখয় মারমা। বয়স ৭৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি একা বসবাস করছেন। দেখাশোনা করার মতো নিকটাত্মীয় নেই, পাশে দাঁড়ানোর মতো আপনজনও নেই। সাম্প্রতিক বন্যা তাঁর ছোট্ট বসতঘরটিও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঘরে থাকা সামান্য খাদ্যও নষ্ট হয়ে গেছে। এক নীরব অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি। খবর পৌঁছে যায় বসুন্ধরা শুভসংঘের বন্ধুদের কাছে। কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোনো প্রচারের আয়োজন নয়, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা ছুটে যান প্রবীণ এই মানুষটির বাড়িতে। তাঁর হাতে তুলে দেন খাদ্যসামগ্রী এবং নগদ আর্থিক সহায়তা। দীর্ঘদিন একাকিত্বে থাকা মানুষটির পাশে দাঁড়ানো এবং খোঁজখবর নেওয়াটাই হয়ে ওঠে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

বিক্রিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বসন্ত কুমার চাকমা বলেন, ‘বন্যার কারণে দুর্গম এলাকার মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে অসহায় ও প্রবীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই মানবিক উদ্যোগ শুধু প্রশংসার দাবিদারই নয়, সমাজের অন্যদের জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রকৃতির নির্মম আঘাতে ভেঙে যেতে পারে একটি ঘর, হারিয়ে যেতে পারে জীবিকার সম্বল, কিন্তু মানবিকতা কখনো ভেঙে পড়ে না। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে বসুন্ধরা শুভসংঘ প্রমাণ করেছে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন শুধু একটি সহানুভূতিশীল হৃদয়। আর সেই হৃদয়ের স্পর্শই দুর্যোগের অন্ধকারে আশার আলো হয়ে বেঁচে থাকে।’ মংচাখয় মারমার মতো অসংখ্য মানুষের চোখের ভাষা একটিই কথা বলে, দুর্যোগে সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু খাদ্য নয়, বরং এমন কিছু মানুষ, যারা কোনো স্বার্থ ছাড়াই পাশে দাঁড়ায়।

 

লামায় বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ পেল খাদ্য সহায়তা

তানফিজুর রহমান
লামায় বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ পেল খাদ্য সহায়তা

বান্দরবানের লামায় টানা বর্ষণের পর পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তেই ফুলে-ফেঁপে ওঠে খাল-ছড়া, তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট, পানিতে ডুবে যায় বসতভিটা। ভয়াল পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে নিভে যায় পাঁচটি প্রাণ। কারো ঘর ভেঙে পড়ে, কারো জীবিকার শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে যায়। পানি নেমে যাওয়ার পরও শেষ হয়নি মানুষের দুর্ভোগ, বরং শুরু হয় খাদ্যসংকট, অনিশ্চয়তা আর নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। এমন কঠিন সময়ে লামায় মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। সম্প্রতি বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে লামা পৌরসভার নয়াবাজার, মধুঝিরি পূর্ব পাড়া, ফরেস্ট কলোনিসহ বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকার অতিদরিদ্র পরিবারের মাঝে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। দিনমজুর, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী ও প্রান্তিক পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে। কয়েক দিনের কর্মহীনতায় অনেক পরিবারের খাবার ফুরিয়ে যায়। অনেকে জানত না পরের বেলার খাবার কোথা থেকে আসবে।

এই বাস্তবতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের স্বেচ্ছাসেবকরা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। দুর্গত পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন, তাদের কষ্টের কথা শোনেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তাদের মানবিক উপস্থিতি বিপর্যস্ত মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করে।

খাদ্য সহায়তা পেয়ে এক উপকারভোগী বলেন, ‘বন্যার পর থেকে সংসারে খুব কষ্ট চলছিল। কাজ ছিল না, ঘরেও খাবার শেষ হয়ে গিয়েছিল। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। বসুন্ধরা শুভসংঘ আমাদের ঘরে এসে খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে। এই সহযোগিতা আমাদের জন্য অনেক বড় স্বস্তি। আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।’ বসুন্ধরা শুভসংঘ লামা উপজেলা শাখার সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ সারা দেশে গরিব অসহায় মানুষের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি আমরা। দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব। ভবিষ্যতেও যেকোনো দুর্যোগে দুর্গত মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করব।’ খাদ্য সহায়তা বিতরণকালে উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ লামা উপজেলা শাখার মো. ইরান, ইয়াছিন মামুন, তারিফুল ইসলাম, ইমদাদুল হক, ইলিয়াছ উদ্দিন, আমিনুল হক, আবিদুল হক, মো. মামুন, সিহাবসহ বসুন্ধরা শুভসংঘের স্বেচ্ছাসেবকরা।

 

 

লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার বন্যার্ত মানুষের পাশে বসুন্ধরা শুভসংঘ

নাহিয়ান চৌধুরী
লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার বন্যার্ত মানুষের পাশে বসুন্ধরা শুভসংঘ

আকস্মিক বন্যার পানি কিছুটা কমলেও কমেনি মানুষের দুর্ভোগ। প্রকৃতির নির্মম আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বহু মানুষের স্বপ্ন আর স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। কোথাও বসতঘর তলিয়ে গেছে পানির নিচে, কোথাও ভেসে গেছে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। অনেক পরিবার এখনো দিন কাটাচ্ছে অনিশ্চয়তা আর সংকটের মধ্যে। বন্যার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, কর্মহীনতা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এমন দুর্যোগময় সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ।

দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শতাধিক পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের কাছে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, লবণ, শুকনা খাবারসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।

ত্রাণ বিতরণকালে সাতকানিয়া বসুন্ধরা শুভসংঘের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার জাবেদ হোসাইন বলেন, ‘সাতকানিয়ার অনেক এলাকার মানুষ এখনো বন্যার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। অনেক পরিবার তাদের বসতঘর ও সহায়-সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এমন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমরা আনন্দিত। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।’

এই ত্রাণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন মোহাম্মদুল হক, ইঞ্জিনিয়ার জিল্লুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার লুত্ফুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার জাবেদ হোসাইন, ডা. সায়মন সাদেক, মো. সাহেদ ও মিনহাজুল ইসলাম। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বন্যাদুর্গত মানুষের হাতে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

 

 

 

মানবিক সহায়তা নিয়ে হাজির হয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ

বান্দরবানের বন্যার্তদের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার বিতরণ

মো. শাফায়াত হোসেন
বান্দরবানের বন্যার্তদের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার বিতরণ

প্রকৃতির নির্মম আঘাতে যখন মানুষের জীবন থমকে যায়, তখন সহানুভূতির হাত, আন্তরিক উপস্থিতি কিংবা সামান্য কিছু খাদ্যসামগ্রীও হয়ে ওঠে নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। বান্দরবানের বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘ প্রমাণ করেছে মানুষ মানুষের জন্য। চারদিকে থইথই পানি। ঘরের মেঝে ডুবে গেছে, উঠান বিলীন হয়েছে বন্যার স্রোতে। চুলায় আগুন জ্বলে না, হাঁড়িতে ভাত ওঠে না। ছোট শিশুর কান্না, বয়স্কদের অসহায় দৃষ্টি আর নিরাপদ পানির জন্য হাহাকার—এভাবেই কেটেছে বান্দরবান সদর উপজেলার অনেক মানুষের কয়েকটি দুঃসহ দিন। টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবান সদর উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। নিরাপদ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে তারা। এই সংকটময় মুহূর্তে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিক্রিছড়ামুখ, লেমু ঝিরি ও চরুইপাড়ার বন্যাকবলিত শতাধিক পরিবারে পৌঁছে দেওয়া হয় জরুরি খাদ্যসামগ্রী। দুর্গম পথ, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা আর প্রতিকূল পরিস্থিতি উ

ক্ষা করে বসুন্ধরা শুভসংঘের বন্ধুরা পৌঁছে যান মানুষের দোরগোড়ায়। শুধু খাদ্যসামগ্রী নয়, তাঁরা পৌঁছে দেন একটুখানি স্বস্তি, কিছুটা আশা এবং এই বার্তা—আমরা আছি, আপনারা একা নন।

খাদ্যসামগ্রী হাতে পেয়ে এক উপকারভোগী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘তিন দিন আমরা পানিবন্দি ছিলাম। খোঁজ নেওয়ার কেউ ছিল না। চারদিকে পানি আর পানি। খাবার ও পানির অনেক সংকট ছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা সবাইকে হারিয়ে ফেলেছি। তখনই আপনারা (বসুন্ধরা শুভসংঘ) আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই সহযোগিতা কোনো দিন ভুলতে পারব না।’ স্থানীয় লোকজন জানায়, দুর্গম এলাকায় অতি দ্রুত খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘ ক্ষুধার্ত মানুষের মাঝে ফিরিয়ে দিয়েছে বেঁচে থাকার সাহস। বিপর্যস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সময়োপযোগী এই উদ্যোগ হয়ে উঠেছে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বসুন্ধরা শুভসংঘের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমন্বয়ক ও বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা বলেন, ‘দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের মানবিক অঙ্গীকার। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করার লক্ষ্যেই আমরা তাদের কাছে এসেছি। কোনো মানুষ যেন দুর্যোগের সময় নিজেকে একা বা অসহায় মনে না করে—এই বিশ্বাস থেকেই বসুন্ধরা শুভসংঘ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’ খাদ্য সহায়তা বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন জেলা শাখার সদস্য ওয়াইমং মারমা, সুলতানুল আরেফিন, মহিউদ্দিন হোসেন, উবাসাইং মারমা, কোহই খুমীসহ অন্য সদস্যরা। সহায়তা বিতরণের পাশাপাশি তাঁরা বন্যাদুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন এবং তাদের বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করেন।