প্রশ্ন : বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে? এসব মোকাবেলায় কি প্রস্তুতি জরুরি?
উত্তর : আমার দৃষ্টিতে, বর্তমান সময়ে নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু একটি সাপোর্ট সার্ভিস নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব, ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং মানুষের আস্থার অন্যতম ভিত্তি। একটি প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা, ব্যাংক বা বাণিজ্যিক স্থাপনা যত বড়ই হোক, নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া তার কার্যক্রম দীর্ঘ মেয়াদে সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই আধুনিক ব্যাবসায়িক ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা খাতের গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চুরি, অনধিকার প্রবেশ, অগ্নিকাণ্ড, নাশকতা, অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি, তথ্যের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আমার মতে, নিরাপত্তা পেশাজীবীরা সমাজের নীরব রক্ষাকবচ। তাঁদের নিরলস শ্রমের কারণেই আমাদের প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নিরাপদ থাকে। তাই শুধু নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ নয়, দক্ষ জনবল, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
প্রশ্ন : করপোরেট অফিস, শিল্প-কারখানা, ব্যাংক ও শপিং মলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর : আমার বিশ্বাস, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর কোনো বিকল্প নয়; এটি একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিসিটিভি, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল, বায়োমেট্রিক সিস্টেম, ভিজিটর ম্যানেজমেন্ট এবং কেন্দ্রীয় মনিটরিং নিরাপত্তাকে আরো কার্যকর করেছে। তবে প্রযুক্তি কখনো মানুষের বিকল্প নয়। বরং এটি একজন দক্ষ নিরাপত্তাকর্মীর সক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করে। বর্তমান সময়ের নিরাপত্তাকর্মীকে শুধু বাহ্যিক নজরদারিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তাকে হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর, আচরণগত বিশ্লেষণে দক্ষ এবং সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুত একজন পেশাজীবী। প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয়ই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
প্রশ্ন : শুধু নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগই কি যথেষ্ট, নাকি কম্পানিকে সেফটি প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত মহড়াও সমান জরুরি?
উত্তর : আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শুধু নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করলেই একটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ নিরাপদ হয় না। নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়ার গুরুত্ব অপরিসীম। ফায়ার ড্রিল, জরুরি নির্গমন মহড়া, প্রাথমিক চিকিৎসা, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবেলার অনুশীলন একজন নিরাপত্তাকর্মীকে বাস্তব পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মীদের মধ্যেও নিরাপত্তা সচেতনতা গড়ে ওঠে। কভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা দেখেছি, নিরাপত্তাকর্মীরা জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় সেবা প্রদানকারী খাতের অংশ হিসেবে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ শুধু দক্ষতা বাড়ায় না, এই পেশাকে আরো পেশাদার ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়।
প্রশ্ন : নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বর্তমান অবস্থা আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
উত্তর : নিরাপত্তা খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো এর মানুষ। যাঁরা প্রতিদিন নিজেদের দায়িত্বের মাধ্যমে অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই খাতকে আরো শক্তিশালী করতে হলে সম্মানজনক বেতন, সময়মতো পারিশ্রমিক, স্বাস্থ্যসুবিধা, বীমা, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আমার বিশ্বাস, একজন নিরাপত্তাকর্মী যখন সম্মান ও নিশ্চয়তার সঙ্গে কাজ করেন, তখন তাঁর দায়িত্ব পালনের মানও বৃদ্ধি পায়। তাই নিরাপত্তা পেশাকে একটি দক্ষতাভিত্তিক, মর্যাদাপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
প্রশ্ন : নিরাপত্তাকর্মীদের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ক্লায়েন্ট ও সরকারের কী ভূমিকা থাকা উচিত?
উত্তর : বাংলাদেশে বেসরকারি নিরাপত্তা খাত গত কয়েক দশকে ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক, শিল্প-কারখানা, বন্দর, দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থা, এনজিও এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এই খাতের সেবা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তাই এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ক্লায়েন্ট এবং সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে মানসম্মত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অপারেটিং স্ট্যান্ডার্ড, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। ক্লায়েন্টদেরও নিরাপত্তাকে শুধু একটি সেবা হিসেবে না দেখে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণের মান নির্ধারণ, দক্ষতা উন্নয়ন, পেশাগত সনদায়ন, আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং কার্যকর তদারকি আরো জোরদার করা প্রয়োজন।




