• ই-পেপার

সাক্ষাৎকার

নিরাপত্তা পেশাজীবীরা সমাজের নীরব রক্ষাকবচ

  • বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চুরি, অনধিকার প্রবেশ, অগ্নিকাণ্ড, নাশকতা, অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি, তথ্যের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে বলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ইউরো ভিজিল (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যোহেব আমিন খান। তিনি এই খাতের বিস্তারিত তুলে ধরেন

সাক্ষাৎকার

নিরাপত্তারক্ষীরা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ

বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মীদের সাম্প্রতিক সময়ে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হলেও বর্তমান জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে তা একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন সিকিউরেক্স প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারহান কুদ্দুস

নিরাপত্তারক্ষীরা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ
ফারহান কুদ্দুস, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিকিউরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড

প্রশ্ন : বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে? এসব মোকাবেলায় কি প্রস্তুতি জরুরি?

উত্তর : বর্তমান ব্যাবসায়িক পরিবেশে নিরাপত্তা আর শুধু একটি পরিচালনাগত বিষয় নয়; এটি এখন একটি কৌশলগত ব্যাবসায়িক অগ্রাধিকার। আগে যেখানে চুরি, অননুমোদিত প্রবেশ, কর্মস্থলে সহিংসতা বা অগ্নিকাণ্ডই ছিল প্রধান উদ্বেগ, এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার হামলা, তথ্য পাচার, সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন, অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এসব ঝুঁকির যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে, গ্রাহকের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে এবং আর্থিক ও সুনামগত ক্ষতির কারণ হতে পারে। বর্তমান সময়ে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং পূর্বাভাসভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর হতে হবে।

প্রশ্ন : করপোরেট অফিস, শিল্প-কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর : বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ। করপোরেট অফিস, শিল্প-কারখানা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শপিং মলে শুধু প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; সমন্বিত প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিসিটিভি, বায়োমেট্রিক অ্যাক্সেস কন্ট্রোল, আধুনিক ভবন ব্যবস্থাপনা, ফায়ার অ্যান্ড লাইফ সেফটি সিস্টেম, ইনট্রুশন ডিটেকশন, সেন্সর এবং সেন্ট্রাল সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার ব্যবহার করে বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তাব্যবস্থার আধুনিকায়ন করছে। এসব প্রযুক্তির ব্যবহার তাৎক্ষণিক নজরদারি, সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্তকরণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সেবা গ্রহণকারীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

প্রশ্ন : নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগই কি যথেষ্ট, নাকি সেফটি প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত মহড়াও সমান জরুরি?

উত্তর : শুধু প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান নিরাপদ হয়ে যায় না। প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত নিরাপত্তা নির্ভর করে তার প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে মোকাবেলার সক্ষমতার ওপর। নিরাপত্তারক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মীকে নিরাপত্তা নীতিমালা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

প্রশ্ন : নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বর্তমান অবস্থা আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?

উত্তর : বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মীরা একটি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠান, সম্পদ এবং সুনাম রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হলেও বর্তমান জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে তা একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সাক্ষাৎকার

নিরাপত্তাঝুঁকির ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে

বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সাইবার আক্রমণ, অভ্যন্তরীণ জালিয়াতি, চুরি ও ডাকাতি, অননুমোদিত প্রবেশ, মব আক্রমণ এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব বলে জানিয়েছেন জেএসএস সার্ভিসেস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফেরদৌস উর রহমান

নিরাপত্তাঝুঁকির ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে
মো. ফেরদৌস উর রহমান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, জেএসএস সার্ভিসেস লিমিটেড

প্রশ্ন : বর্তমান সময়ে দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাঝুঁকি কী?

উত্তর : যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকির ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সাইবার আক্রমণ, অভ্যন্তরীণ জালিয়াতি, চুরি ও ডাকাতি, অননুমোদিত প্রবেশ, মব আক্রমণ এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব। এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় শুধু নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ নিরাপত্তাকর্মী, এআই ভিত্তিক সার্ভেইল্যান্স, স্মার্ট সিসিটিভি, অ্যাক্সেস সেন্ট্রাল, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং নিয়মিত সিকিউরিটি সার্ভে ও রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তাকে ব্যয় নয়, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, সুনাম এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখা।

প্রশ্ন : করপোরেট অফিস, শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর : জন্য আগে আমাদের বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তবতা বুঝতে হবে। দেশের  বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে এখনো পূর্ণাঙ্গ ইন্টিগ্রেটেড সিকিউরিটি সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। সিসিটিভি, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল, ফায়ার অ্যালার্ম এবং অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এআই এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারে। এআইভিত্তিক সার্ভেইল্যান্স রিয়েল টাইমে অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করতে পারে, ঝুঁকির পূর্বাভাস দিতে পারে এবং দ্রুত সতর্কবার্তা প্রদান করতে পারে। ফলে নিরাপত্তা রি-অ্যাক্টিভ থেকে প্রো-অ্যাক্টিভ পর্যায়ে চলে আসে।

প্রশ্ন : নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগই কি যথেষ্ট?

উত্তর : একেবারেই নয়। আমরা প্রায়ই বলি, নিরাপত্তাকর্মী হলেন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রথম দৃশ্যমান প্রতিরক্ষা এবং যেকোনো দুর্ঘটনা বা সংকটে প্রথম রেসপন্ডার। তাই শুধু নিয়োগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেফটি অ্যাওয়ারনেস, ইমার্জেন্সি ড্রিল, রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশ্ন : প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি কোন ধরনের ভুল বা অবহেলা দেখা যায়?

উত্তর : বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ভুল হলো নিরাপত্তাকে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান কস্ট হিসেবে দেখে, ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে নয়। ফলে সিকিউরিটি সার্ভে, রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা অডিট, ইমার্জেন্সি ড্রিল এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আমার মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সংস্কৃতি শুরু হয় টপ ম্যানেজমেন্টের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। যত দিন নিরাপত্তাকে ব্যবসার কৌশলগত অংশ হিসেবে দেখা না হবে, তত দিন টেকসই নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। নিরাপত্তার রিটার্ন সব সময় আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায় না, কিন্তু এটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম, ব্যবসার ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।

সাক্ষাৎকার

প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই

সিকিউরিটি ৩৬০ লিমিটেডের পরিচালক ক্যাপ্টেন (অব.) মো. আতাউল গনির মতে, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন

প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই
ক্যাপ্টেন (অব.) মো. আতাউল গনি, পরিচালক, সিকিউরিটি ৩৬০ লিমিটেড

প্রশ্ন : বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে? এসব মোকাবেলায় কি প্রস্তুতি জরুরি?

উত্তর : প্রত্যেকটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী খোঁজে। ব্যাংঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এলাকাভিত্তিক অসংখ্য নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহ প্রতিষ্ঠান সস্তায় অপ্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহ করে তাদের বিপদে ফেলছে। এ সমস্যা সমাধানে আশু সরকারি হস্তক্ষেপ জরুরি। বিপিএসএসপিএর সদস্য নয়, এমন কোনো কম্পানি থেকে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ না দেওয়ার বিধান করলে এই সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।

প্রশ্ন : করপোরেট অফিস, শিল্প-কারখানা, ব্যাংক ও শপিং মলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর : অবশ্যই প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সবার আগে মাইন্ড সেট পরিবর্তন করতে হবে। ইউজারের দিক থেকে বাজেট বাড়াতে হবে। সস্তায় প্রযুক্তি ব্যবহার হিতে বিপরীত হবেই। আমাদের মতো দেশে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রযুক্তির ওপর শতভাগ নির্ভর করার মতো প্রতিষ্ঠান খুব কমই আছে। সঠিক এবং প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ এবং উন্নত মানের প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার করে সুফল পাওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন : শুধু নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগই কি যথেষ্ট, নাকি কম্পানিকে সেফটি প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত মহড়াও সমান জরুরি?

উত্তর : প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। আর কেতাবি প্রশিক্ষণ তখনই কার্যকর হয় যখন নিয়মিত মহড়া নিশ্চিত করা যায়।

প্রশ্ন : নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বর্তমান অবস্থা আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?

উত্তর : আমার মনে হয় নিরাপত্তা সেবা ইন্ডাস্ট্রি এখন পর্যন্ত মোস্ট ইনফরমাল শেপে আছে। অথচ, ২০২৪-এর ৫-৮ আগস্ট যখন দেশে কার্যত কোনো পুলিশ ছিল না, তখন ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের অনেক হাউজিং সোসাইটি, ইপিজেডগুলো, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরের মতো শিল্প এলাকাকে আমরাই নিরাপত্তা দিয়েছি। করোনা মহামারির সময় সবাই যখন লক ডাউনে আমাদের কর্মীরা তখন জীবন বাজি রেখে অফিস, শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, এটিএম বুথ পাহারা দিয়েছেন। বিনিময়ে এই ইন্ডাস্ট্রি কিন্তু কিছুই উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি পায়নি। নিরাপত্তাকর্মীদের স্ট্যান্ডার্ড কোনো বেতন কাঠামো মানা হয় না। ১৫ এপ্রিল, ২০২৫-এ প্রণীত আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবাগ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫-এর প্রস্তাবিত পঞ্চম ক্যাটাগরিতে গার্ডদের প্রস্তাবিত মজুরি সেভাবে আলোর মুখ দেখেনি। হাতে গোনা কয়েকটি নিরাপত্তা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল পে স্কেল-২০১৫ (২০তম গ্রেড)-এর আলোকে সরকার নির্ধারিত বেতন কাঠামো (সেটাও অপ্রতুল) মানতে চাইলেও ভুঁইফোড় কিছু প্রতিষ্ঠান সস্তায় নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহ করে পুরো সিস্টেমকে অকার্যকর করে তুলছে। সংস্কার করতে গেলে প্রথমেই সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। নিরাপত্তাকর্মীদের সরকারকে একটি যুগপযোগী গ্রেডে এনে বেতন কাঠামো ঘোষণা করতে হবে এবং বিপিএসএসপিএর সব সদস্যকে ওই বেতন কাঠামো মেনে চলার বিধান করতে হবে।

প্রশ্ন : নিরাপত্তাকর্মীদের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ক্লায়েন্ট ও সরকারের কী ভূমিকা থাকা উচিত?

উত্তর : নিরাপত্তা ইন্ডাস্ট্রি এখন আর হেলাফেলা করার পর্যায়ে নেই। উন্নয়নের ব্যাটন এখন সরকারের হাতে। প্রথমেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিরাপত্তাকর্মীদের পুলিশ ভ্যারিফিকেশন, এনআইডির শুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য একটি সেল খুলতে হবে। বিপিএসএসপিএর সদস্য সব কম্পানির সঙ্গে এই সেলের নিবিড় অনলাইন যোগাযোগ থাকবে। দ্বিতীয়ত, শীর্ষস্থানীয় কিছু কম্পানি এবং বিপিএসএসপিএর মাধ্যমে গার্ডদের জন্য একটি অভিন্ন প্রশিক্ষণ কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে সার্টিফিকেশন থাকতে হবে। এই সার্টিফিকেট না থাকলে ক্লায়েন্ট ওই ব্যক্তিকে গার্ড হিসেবে গ্রহণ না করার বিধান থাকতে হবে। তৃতীয়ত : বিপিএসএসপিএকে এই সেক্টরের অভিভাবকত্ব নিতে হবে। এর সদস্য না হলে কেউ এই সেক্টরে ব্যবসা করতে না পারার বিধান চালু করতে হবে। চতুর্থত : ভুঁইফোড় কম্পানি রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কঠোর হতে হবে।

কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ নিরাপত্তাসেবা খাতে

শিহাবুল ইসলাম
কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ নিরাপত্তাসেবা খাতে

দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বেসরকারি নিরাপত্তা প্রহরীদের চাহিদা। অর্থনৈতিক আগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হচ্ছে বেসরকারি নিরাপত্তাসেবার চাহিদা। কিন্তু বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না থাকায় এই খাতে আসা তরুণরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিএনপি সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাসেবা দেওয়া খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমকি দুই-তিন মাসের ট্রেইনিং দিয়ে নিরাপত্তাকর্মী বা সিকিউরিটি গার্ডদের বিদেশেও পাঠানোর দারুণ সুযোগ রয়েছে। তবে প্রয়োজন সরকারের নীতি সহায়তা। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকর্মী দিবসেও এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। প্রতি বছর ২৪ জুলাই পালিত হয়।

সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর বাইরে বেসরকারিভাবে বিভিন্ন বাসা, বেসরকারি অফিস, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকায় অন্তত ৭০০-৮০০টি নিরাপত্তাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান বা সিকিউরিটি কম্পানি কাজ করছে। তবে এদের নিয়ন্ত্রণে নেই সরকারে শক্তিশালী আইন বা নীতিমালা। ফলে দেশে গড়ে উঠছে নতুন-নতুন বেসরকারি নিরাপত্তাসেবা কম্পানি। এ ছাড়া বেতন কম হওয়ায় চাহিদার বিপরীতে কর্মী পাওয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একজন নিরাপত্তাকর্মীর বেতন মাসে মাত্র ৯ হাজার ৮০০ টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে ২০০৬ সালে নিরাপত্তাসেবা নিয়ে আইন করা হয়, যা পরে সংশোধন করে ২০১৬ সালে চূড়ান্ত করা হয়। আর ২০১৯ সালে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করে ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হয়। সেই ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী একজন নিরাপত্তাকর্মীর এই বেতন ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণত সেবা নেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দেয়। কিন্তু এই বেতনে জীবন ধারণ সম্ভব হয় না। ফলে নিরাপত্তাকর্মীরা আট ঘণ্টা নয় বরং ১৬-১৭ ঘণ্টা ডিউটি করেন। এতে কম্পানিভেদে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা বেতন পাওয়া যায়। এই বেতনের বাইরে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহকারী কম্পানিগুলোর সার্ভিস চার্জ নেওয়ার নিয়ম, যা এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে। এই সার্ভিস চার্জের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মীর পোশাক, প্রশিক্ষণ, নজরদারি, মেডিক্যাল সেবা দেয় নিয়োগকারী কম্পানি। তবে নিরাপত্তাসেবা দেওয়া কম্পানিগুলো বলছে, ৯ হাজার ৮০০ টাকা বেতন যথেষ্ট নয়। এই বেতন অন্তত ১৫ হাজার ৯০০ টাকা করা উচিৎ যা সরকারকেই নির্ধারণ করে দিতে হবে।

দেশে প্রথম বেসরকারি নিরাপত্তাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান সিকিউরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড। যারা যাত্রা শুরু করে ১৯৮৮ সালে। ওই সময় সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এই কম্পানি চালু করেন। একই বছর রোরা নামে আরো একটি কম্পানি এই খাতে ব্যবসা শুরু করে। ১৯৯৪ সালে তৃতীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা করে জেএসএস সার্ভিস লিমিটেড। এই সেবা তখন কিছুটা ঢিমে তালে চললেও ২০০১ সালের পর থেকেই মূলত চাহিদা বাড়তে থাকে। এখন নিরাপত্তাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭০০-৮০০টি। তবে এর কোনো তালিকা কারো কাছেই নেই। এসব কম্পানির অধীনে কাজ করছেন প্রায় ১০-১১ লাখ।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আগে শুধু ব্যাংক ও এটিএম বুথে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নগদ টাকা আনা-নেওয়া, বড় ব্যবসায়ীর বডিগার্ড, বিদেশ থেকে আসা কোনো বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, সংস্থার উচ্চপদস্থ ব্যক্তির নিরাপত্তা দেওয়া, বাসা-বাড়ি, হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা, পণ্য সংরক্ষণাগার, শপিং মল, বিভিন্ন এমবাসি ও মিশনগুলোতে বেসকারি নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ করেন। কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেয়। তবে দেশে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাকর্মী কাজ করেন বিভিন্ন ব্যাংক ও এটিএম বুথে। যার সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। সেবা নেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা কম্পানিগুলোর সঙ্গে মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চুক্তি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সেবা এখন শুধু দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্ত হয়েছে আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর, স্ক্যানার, সিসিটিভি মনিটরিং, স্কট, ডগ স্কোয়াড সেবাও।

বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে কাজ করা কম্পানিদের একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসার কাজ করছে বাংলাদেশ প্রফেশনাল সিকিউরিটি সার্ভিস প্রভাইডার অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএসপিএ)। এই সংগঠনের সভাপতি লেফটেন্যান্ট কর্নেল খালিদ আজম, পিএসসি (অব.) এবং সাধারণ সম্পাদক ফারহান কুদ্দুস। ২০০৪ সালে গঠন করা হয়, যার সদস্য এখন ৪৮টি কম্পানি। এই সংগঠনটিই নিরাপত্তাসেবা দেওয়া কম্পানিগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে কাজ করছে। বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও আইনগত বিষয়গুলো নিয়ে আদালত ও সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। এখন নিরাপত্তাসেবা দেওয়া কম্পানিগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে সিকিউরেক্স, জেএসএস, ইউরো ভিজিল, সিকিউরিটি ৩৬০, আইএসএসএল, এলিট ফোর্স, ওরিয়ন সিকিউরিটি, এএসএফ, গার্ডা শেন্ড, জি৪এস, অরনেট, প্রোটেকশন ওয়ান, শিল্ড সিকিউরিটি ইত্যাদি। নিরাপত্তাসেবা দেওয়া কম্পানি সিকিউরেক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহান কুদ্দুস সিকিউরিটি গার্ডদের বেতনের বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ওয়েজ বোর্ডে যে বেতন ৯ হাজার ৮০০ টাকা, এই টাকা সেবাগ্রহীতারা দিতে চায় না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই এই নিয়ম মানে না। কিন্তু একজন গার্ডের মিনিমাম বেতন ১৫ হাজার ৯০০ টাকা হওয়া উচিত। এ ছাড়া কেউ এই কাজ করে বেঁচে থাকতে পারবে না।

নিরাপত্তাসেবা খাতের সম্ভাবনা থাকলেও সমস্যাও রয়েছে। মিলেনিয়াম সার্ভিস সিকিউরিটি বাংলাদেশ লিমিটেডের জিএম (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) মেজর (অব.) আশীষ মজুমদার বলেন, সরকার সহযোগিতা করলে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের বিদেশে পাঠাতে পারি। এতে দেশের বেকারত্ব দূর হবে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারত, নেপাল, আফ্রিকার মানুষ কাজ করছেন। তাঁরা অনেক ভালো বেতন পান। সরকারকে শুধু বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে।

নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে এটা খুবই ভালো চাকরি। অনেকে এটিএম মেশিনের পাশে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনেকে আট ঘণ্টার চেয়ে ১৬ ঘণ্টা ডিউটি করে। যাতে টাকাটা একটু বেশি পায়। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা নয়। আমাদের সরকার যদি নীতিমালা করে দেয়, যে এই বেতনের নিচে কেউ দিতে পারবে না তাহলে এরা যথাযথ বেতন পেতে পারবে। অনেক ক্ষেত্রে সিকিউরিটি গার্ডের ওপর হামলাও হয়। জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন।