দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বেসরকারি নিরাপত্তা প্রহরীদের চাহিদা। অর্থনৈতিক আগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হচ্ছে বেসরকারি নিরাপত্তাসেবার চাহিদা। কিন্তু বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না থাকায় এই খাতে আসা তরুণরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিএনপি সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাসেবা দেওয়া খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমকি দুই-তিন মাসের ট্রেইনিং দিয়ে নিরাপত্তাকর্মী বা সিকিউরিটি গার্ডদের বিদেশেও পাঠানোর দারুণ সুযোগ রয়েছে। তবে প্রয়োজন সরকারের নীতি সহায়তা। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকর্মী দিবসেও এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। প্রতি বছর ২৪ জুলাই পালিত হয়।
সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর বাইরে বেসরকারিভাবে বিভিন্ন বাসা, বেসরকারি অফিস, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকায় অন্তত ৭০০-৮০০টি নিরাপত্তাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান বা সিকিউরিটি কম্পানি কাজ করছে। তবে এদের নিয়ন্ত্রণে নেই সরকারে শক্তিশালী আইন বা নীতিমালা। ফলে দেশে গড়ে উঠছে নতুন-নতুন বেসরকারি নিরাপত্তাসেবা কম্পানি। এ ছাড়া বেতন কম হওয়ায় চাহিদার বিপরীতে কর্মী পাওয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একজন নিরাপত্তাকর্মীর বেতন মাসে মাত্র ৯ হাজার ৮০০ টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে ২০০৬ সালে নিরাপত্তাসেবা নিয়ে আইন করা হয়, যা পরে সংশোধন করে ২০১৬ সালে চূড়ান্ত করা হয়। আর ২০১৯ সালে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করে ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হয়। সেই ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী একজন নিরাপত্তাকর্মীর এই বেতন ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণত সেবা নেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দেয়। কিন্তু এই বেতনে জীবন ধারণ সম্ভব হয় না। ফলে নিরাপত্তাকর্মীরা আট ঘণ্টা নয় বরং ১৬-১৭ ঘণ্টা ডিউটি করেন। এতে কম্পানিভেদে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা বেতন পাওয়া যায়। এই বেতনের বাইরে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহকারী কম্পানিগুলোর সার্ভিস চার্জ নেওয়ার নিয়ম, যা এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে। এই সার্ভিস চার্জের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মীর পোশাক, প্রশিক্ষণ, নজরদারি, মেডিক্যাল সেবা দেয় নিয়োগকারী কম্পানি। তবে নিরাপত্তাসেবা দেওয়া কম্পানিগুলো বলছে, ৯ হাজার ৮০০ টাকা বেতন যথেষ্ট নয়। এই বেতন অন্তত ১৫ হাজার ৯০০ টাকা করা উচিৎ যা সরকারকেই নির্ধারণ করে দিতে হবে।
দেশে প্রথম বেসরকারি নিরাপত্তাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান সিকিউরেক্স প্রাইভেট লিমিটেড। যারা যাত্রা শুরু করে ১৯৮৮ সালে। ওই সময় সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এই কম্পানি চালু করেন। একই বছর রোরা নামে আরো একটি কম্পানি এই খাতে ব্যবসা শুরু করে। ১৯৯৪ সালে তৃতীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা করে জেএসএস সার্ভিস লিমিটেড। এই সেবা তখন কিছুটা ঢিমে তালে চললেও ২০০১ সালের পর থেকেই মূলত চাহিদা বাড়তে থাকে। এখন নিরাপত্তাসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭০০-৮০০টি। তবে এর কোনো তালিকা কারো কাছেই নেই। এসব কম্পানির অধীনে কাজ করছেন প্রায় ১০-১১ লাখ।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আগে শুধু ব্যাংক ও এটিএম বুথে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নগদ টাকা আনা-নেওয়া, বড় ব্যবসায়ীর বডিগার্ড, বিদেশ থেকে আসা কোনো বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, সংস্থার উচ্চপদস্থ ব্যক্তির নিরাপত্তা দেওয়া, বাসা-বাড়ি, হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা, পণ্য সংরক্ষণাগার, শপিং মল, বিভিন্ন এমবাসি ও মিশনগুলোতে বেসকারি নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ করেন। কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেয়। তবে দেশে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাকর্মী কাজ করেন বিভিন্ন ব্যাংক ও এটিএম বুথে। যার সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। সেবা নেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা কম্পানিগুলোর সঙ্গে মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চুক্তি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সেবা এখন শুধু দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্ত হয়েছে আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর, স্ক্যানার, সিসিটিভি মনিটরিং, স্কট, ডগ স্কোয়াড সেবাও।
বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে কাজ করা কম্পানিদের একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসার কাজ করছে বাংলাদেশ প্রফেশনাল সিকিউরিটি সার্ভিস প্রভাইডার অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএসপিএ)। এই সংগঠনের সভাপতি লেফটেন্যান্ট কর্নেল খালিদ আজম, পিএসসি (অব.) এবং সাধারণ সম্পাদক ফারহান কুদ্দুস। ২০০৪ সালে গঠন করা হয়, যার সদস্য এখন ৪৮টি কম্পানি। এই সংগঠনটিই নিরাপত্তাসেবা দেওয়া কম্পানিগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে কাজ করছে। বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও আইনগত বিষয়গুলো নিয়ে আদালত ও সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। এখন নিরাপত্তাসেবা দেওয়া কম্পানিগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে সিকিউরেক্স, জেএসএস, ইউরো ভিজিল, সিকিউরিটি ৩৬০, আইএসএসএল, এলিট ফোর্স, ওরিয়ন সিকিউরিটি, এএসএফ, গার্ডা শেন্ড, জি৪এস, অরনেট, প্রোটেকশন ওয়ান, শিল্ড সিকিউরিটি ইত্যাদি। নিরাপত্তাসেবা দেওয়া কম্পানি সিকিউরেক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহান কুদ্দুস সিকিউরিটি গার্ডদের বেতনের বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ওয়েজ বোর্ডে যে বেতন ৯ হাজার ৮০০ টাকা, এই টাকা সেবাগ্রহীতারা দিতে চায় না। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই এই নিয়ম মানে না। কিন্তু একজন গার্ডের মিনিমাম বেতন ১৫ হাজার ৯০০ টাকা হওয়া উচিত। এ ছাড়া কেউ এই কাজ করে বেঁচে থাকতে পারবে না।’
নিরাপত্তাসেবা খাতের সম্ভাবনা থাকলেও সমস্যাও রয়েছে। মিলেনিয়াম সার্ভিস সিকিউরিটি বাংলাদেশ লিমিটেডের জিএম (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) মেজর (অব.) আশীষ মজুমদার বলেন, ‘সরকার সহযোগিতা করলে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের বিদেশে পাঠাতে পারি। এতে দেশের বেকারত্ব দূর হবে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারত, নেপাল, আফ্রিকার মানুষ কাজ করছেন। তাঁরা অনেক ভালো বেতন পান। সরকারকে শুধু বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে।’
নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে এটা খুবই ভালো চাকরি। অনেকে এটিএম মেশিনের পাশে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনেকে আট ঘণ্টার চেয়ে ১৬ ঘণ্টা ডিউটি করে। যাতে টাকাটা একটু বেশি পায়। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা নয়। আমাদের সরকার যদি নীতিমালা করে দেয়, যে এই বেতনের নিচে কেউ দিতে পারবে না তাহলে এরা যথাযথ বেতন পেতে পারবে। অনেক ক্ষেত্রে সিকিউরিটি গার্ডের ওপর হামলাও হয়। জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন।’