কলকাতায় বছরের শেষ সকাল। ‘শহরের উষ্ণতম দিন’ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। বরং হালকা শীতের আমেজ চারদিকে। উবার কল করে রওনা হলাম লর্ডস মোড়ের দিকে। গন্তব্য দ্য স্টুডিও স্পেস। উদ্দেশ্য এক প্রিয় গানওয়ালার সঙ্গে সাক্ষাৎ, যিনি আমার কৈশোর রাঙিয়েছেন তাঁর সুরে-কণ্ঠে। ‘ধাঁধার থেকেও জটিল তুমি’, ‘শহরের উষ্ণতম দিনে’, ‘মানুষ চেনা দায়’, ‘যখন ধোঁয়া মেঘে’, ‘তোমায় দিলাম’—এমন সব দারুণ গানের সুরকার আর কণ্ঠশিল্পী তিনি
কেমন আছেন দাদা? কেমন চলছে গান?
ভালো আছি, জয়। নিজ শহর থেকে দূরে প্রবাসজীবনে চাইলেও মন ভরে বাংলা গান নিয়ে অনেক কিছু করতে পারি না৷ তবে চেষ্টা করি গানের মধ্যেই থাকতে, কারণ সেটাই আমার অক্সিজেন।
দাদা গানের সঙ্গে সখ্য কিভাবে? আপনার গান বানানোর গল্প জানার খুব ইচ্ছা আমার।
গাইছি তো ছোটবেলা থেকেই৷ বাসায় বোনেরা গান করতেন, তাঁদের সঙ্গেই শুরু। কিন্তু গান বানাব, সেটা ভেবেছি অনেক পরে। আমাদের কলেজের ফ্রেশার্স রিসেপশনে ইন্দ্রনীল সেন এলেন। তিনি দুটি গান গাইলেন, যার একটি জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাকে সুর করে বানানো, আরেকটি ছিল গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গান ‘কথা দিয়া বন্ধু’। তখনো গৌতমদার সঙ্গে পরিচয় হয়নি। গান দুটি শুনে খুব ইম্প্রেসড হলাম। মনে হলো, এমন তো আমরাও চেষ্টা করতে পারি৷ নিজেরা গান তৈরি করে গাইতে পারি। প্রথম দিকে ইংরেজি গানের ভাবানুবাদ করে বাংলায় গাইতাম। তারপর ধীরে ধীরে নিজেরাই বানানো শুরু করলাম।
প্রথম কোন গান সুর করলেন, মনে পড়ে?
হ্যাঁ, মনে আছে। হঠাৎ করেই করা। তখন কলেজে পড়ি। আমি, উপল আর জয়জিৎ। আমরা তিন বন্ধু মিলেই বানাই আমাদের সেই গান। উপল দার্জিলিং থেকে ফিরে এসে লিখল দুটি লাইন—‘ও আমার প্রিয় হিমালয়, হাতছানি দিয়ে ডাকছ আমায়, মন তাই হয়েছে উতলা, বলো আজ কে আর থামায়?’ পরে বাকিটুকু জয়জিৎ লেখে। প্রথমটুকু উপল সুর করে, মাঝের অন্তরা আমি, আর শেষেরটুকু জয়জিৎ। এভাবেই তিন বন্ধু মিলে বানালাম একটি গান, যেটা আমার জীবনে প্রথম মৌলিক গানের সুর করা।
এরপর নিয়মিত গান বানানো শুরু করলেন? কবে থেকে সেটা?
অনেকটা তা-ই। কলেজের কথা। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তাম। একদিন কলেজের মাঠে শুনলাম ছেলেরা গাইছে ‘হায় ভালোবাসি’। তারপর কারো কাছে প্রথম ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র ক্যাসেট পেলাম। শুনে দারুণ ইন্সপায়ার্ড হলাম। মনে হলো, ইংরেজি গানের ভাবানুবাদ আর কেন? নিজেরাই তো লিখে, সুর করে বানাতে পারি। ব্যাস, লেগে পড়লাম। জয়জিৎ লিখে ফেলল ‘ঘেন্না করো, কলেজ ক্যান্টিন, বাড়লে বয়েস’। আমি সুর করলাম। তৈরি হতে থাকল আমাদের নিজেদের গান।
গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের কাছে আপনাদের গান পৌঁছল কিভাবে?
আমরা তো গান বানাচ্ছি; কিন্তু সেগুলো কিভাবে কী করব তা বুঝতে পারছি না। আমার পাড়ার এক দাদা তখন বললেন, ‘চলো, তোমাদের নিয়ে যাই আমার এক দাদার কাছে। তিনি তোমাদের পথ দেখাতে পারবেন।’ সেই মানুষটি হলেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়। এভাবেই পরিচয় হলো দাদার সঙ্গে। আমরা অ্যালবাম বের করতে গিয়েছিলাম। গৌতমদা বললেন, ‘এখন অ্যালবাম করার চিন্তা ছাড়ো, গান বানাও, গান করো।’ সেটা ১৯৮৯ সালের কথা। আমরাও গৌতমদার সঙ্গে মিশে গেলাম। আমাদের সৃষ্টি, ভাবনা সব তাঁর সঙ্গে শেয়ার করতাম। সেভাবেই চলতে থাকল।
‘গড়ের মাঠ’ শুরু হলো কবে, কিভাবে? ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ সম্পাদিত গানের অ্যালবামে যুক্ত হওয়ার গল্পটাও শুনতে চাই।
এর সবকিছুই এক সুতোয় গাঁথা। ১৯৯৩ সালের দিকে গৌতমদা একটি সরকারি কাজ পেলেন, মৌলিক গানের ভিডিও নির্মাণের প্রজেক্ট। সেই কাজ করতে করতে তাঁর বাজেট গেল ফুরিয়ে। গৌতমদা যা-ই করতেন সব গ্র্যান্ড স্কেলে করতেন। তখন তাঁর হঠাৎ বুদ্ধি এলো যে ভিডিওর গানগুলো অডিও রেকর্ড করে ক্যাসেট বের করা যাক। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, বিক্রি হবে কোথায়? তিনি বললেন, বইমেলায়। তাহলে একটা বই লাগবে। যেই ভাবা সেই কাজ। গানগুলোর লিরিকসমেত বই হলো। ক্যাসেট হলো। বইমেলায় স্টলের সামনে আমরা সবাই জড়ো হয়ে গানগুলো গাইতাম। মানুষের আগ্রহ হলে স্টলে গিয়ে বই আর ক্যাসেট কিনত। প্রত্যাশার চেয়ে ভালো সাড়া পেলাম আমরা। ১০ দিনে সব বিক্রি হয়ে গেল। এভাবেই হলো ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ সম্পাদিত গানের প্রথম অ্যালবাম ‘আবার বছর কুড়ি পরে’। সেখানেই স্থান পেলো আমার আর জয়জিতের গান ‘ঘেন্না করো’ বা ‘ধাঁধার থেকেও জটিল তুমি’। সেই গান প্রকাশের সময় আমাদের দলের একটি নাম দরকার হলো। তখন ঠিক হলো ব্যান্ডের নাম—‘গড়ের মাঠ’। গৌতমদা ব্যান্ডের একটি নাম চাইলে জয়জিৎ তিনটি নাম দেয়। সেখান থেকে গৌতমদাই পছন্দ করেন ‘গড়ের মাঠ’। ব্যান্ডে আমার দুই ভাইও ছিল আমাদের সঙ্গে—সুখেন্দু আর সুমন্ত। সুখেন্দু সাউন্ড করত, সুমন্ত বাজাত বেইস। এ ছাড়া ছিল সুব্রত লোধ টিটো, সে বাজাত পারকাশান। আর জয়জিৎ লাহিড়ী লিখত লিরিক। এভাবেই তৈরি হলো ‘গড়ের মাঠ’।
‘তোমায় দিলাম’ আর ‘মানুষ চেনা দায়’—দাদা, আপনার কালজয়ী এই দুই গানের গল্প শুনতে চাই।
দুটি গানই জয়জিৎ লাহিড়ীর লেখা, আমার সুর ও কণ্ঠ। আমরা খুব বন্ধু, স্কুল থেকেই। জয়জিৎ একটি সরকারি চাকরি পেয়ে চলে গেল কলকাতার বাইরে। তখন কলকাতায় আসতে হলে একটাই ট্রেন লাইন ছিল পুরুলিয়া থেকে। তাই চাইলেই যেকোনো সময় সে আসতে পারত না কলকাতায়। সেই সময় সে দারুণ মিস করত এই শহর। শহরের ফুটপাত, বেলুনগাড়ি, দালানকোঠা—সব। সেই মিস করা থেকেই লেখা ‘তোমায় দিলাম’ গানটি। ১৯৯৫ সালে প্রথম অ্যালবামটা বের হওয়ার পরেই তৈরি হয় এই গান। ১৯৯৬ সালে আমরা প্রথম স্টেজে পারফরম করি। আর ‘মানুষ চেনা দায়’ গানটি অনেক আগে করা; কলেজে থাকতেই। এই গানের একটি মজার ঘটনা আছে। প্রথমে গানটি ছিল মেজর স্কেলে। পরে আমাদের এক আড্ডায় অনুপ ঘোষালের একটি গান শোনায় আমার বন্ধু উপল, নাম ‘আদালতের জবানবন্দি’। সেখানে মেজর থেকে মাইনরে চলে যায় গানটি একসময়। সেটা শুনে আমার এতই ভালো লাগে যে আমি এ গানটিকে পরে মাইনর কর্ডসে নিয়ে যাই। ভিন্ন সময়ে করা হলেও দুটি গানই ১৯৯৬ সালে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ সম্পাদিত গানের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘ঝরা সময়ের গান’-এ প্রকাশ পায়।
গান নিয়েই তো আছেন। বর্তমানে কী করছেন আর ভবিষ্যতের জন্য কী ভাবছেন?
নতুন গান করছি। আশা করি, প্রকাশ পাবে এ বছর। একটি ইন্টারনেট রেডিও করার পরিকল্পনা আছে৷ বর্তমান, ভবিষ্যৎ যা-ই হোক, গানেই থাকতে চাই।




