• ই-পেপার

দেশীয় প্রযুক্তিতে মানসম্মত যন্ত্রাংশ তৈরি

আমদানি বিকল্প গড়ছে পাবনার প্রকৌশল শিল্প

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদন

অর্থনৈতিক সাফল্যে উচ্চমধ্যম আয়ে পাঁচ দেশ

উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া পাঁচটি দেশ হচ্ছে শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, জর্দান ও মাইক্রোনেশিয়া নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে আফ্রিকার টোগো

বাণিজ্য ডেস্ক
অর্থনৈতিক সাফল্যে উচ্চমধ্যম আয়ে পাঁচ দেশ

অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সংকট কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি রপ্তানিতে সাফল্য দেখিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো। বিশ্বব্যাংকের দেশভিত্তিক আয় শ্রেণিবিন্যাসের এ বছরের হালনাগাদে দেখা গেছে, পাঁচটি দেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। প্রতিটি দেশের পেছনের গল্প আলাদা : কোনো দেশ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, কোনোটি রপ্তানিতে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়ে অন্যদের ছাড়িয়েছে, আবার কোনো দেশের অর্থনীতির আকার নতুন হিসাব অনুযায়ী আগের ধারণার তুলনায় ১০ শতাংশ বড় বলে প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো সেই ভিন্ন ভিন্ন গল্পের মাত্র তিনটি উদাহরণ।

নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া পাঁচটি দেশ হচ্ছেশ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, জর্দান ও মাইক্রোনেশিয়া। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে আফ্রিকার টোগো। যদিও বাংলাদেশ এখনো নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, বাংলাদেশের গড় মাথপিছু আয় এখন তিন হাজার ২০ মার্কিন ডলার।

বিশ্বব্যাংকের সদস্যভুক্ত ২১৮টি দেশ ও অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এ প্রতিবেদন তৈরি করে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক নিজেদের সদস্য দেশগুলোকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে চার শ্রেণিতে ভাগ করে। এগুলো হলোনিম্ন, নিম্নমধ্যম, উচ্চমধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশ। এর ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক ঋণের পরিমাণ, শর্তসহ অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ করে।

নতুন সীমা নির্ধারণ : মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে এ বছরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী এক বছরে বিশ্বব্যাংক কোন দেশ কোন শ্রেণিতে, তা নির্ধারণের জন্য নতুন সীমা নির্ধারণ করেছে। এখন থেকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে এক হাজার ১৭৫ ডলার হতে হবে। নিম্নমধ্যম থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে চার হাজার ৬৩৫ ডলার হতে হবে। আর উচ্চ আয়ের দেশে যেতে হলে ১৪ হাজার ৩৭৫ ডলার মাথাপিছু আয় হতে হবে। উন্নতি করা দেশগুলো কিভাবে সাফল্য পেল তা তুলে ধরা হলো।

ভিয়েতনাম : রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) গড়ে বছরে ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম উদাহরণ। ২০২৪ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই ছিল চার হাজার ৪৯০ ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৯৭০ ডলার। রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলের ওপর ভর করে ভিয়েতনাম শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ উভয় বছরেই দেশটির রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের বেশি। একই সময় মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যথাক্রমে ৭ ও ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ফিলিপিন্স : রপ্তানিতে বাংলাদেশের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিপিন্স। অর্থনীতির ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে দেশটি। গত পাঁচ বছরে দেশটির জিডিপি গড়ে বছরে ৫.৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি কোনো একক খাতের উল্লম্ফনের ফল নয়; বরং অর্থনীতির প্রায় সব প্রধান খাতেই উন্নতির প্রতিফলন। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৮৫০ ডলার।

শ্রীলঙ্কা : ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনীতি ৫ শতাংশ প্রসারিত হওয়ায় দেশটিকে নিম্নমধ্যম আয়ের তালিকা থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হয়েছে। মূলত শিল্প খাতের সামগ্রিক পুনরুদ্ধার এবং পর্যটন ও আর্থিক সেবা খাতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করেই দেশটির অর্থনীতিতে এই গতি এসেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৬৭০ ডলার। শ্রীলঙ্কার এই সাফল্যকে পুনরুদ্ধারের এক অনন্য গল্প হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২২ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের জেরে দেশটি যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তার ঠিক তিন বছরের মাথায় এসে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মাইক্রোনেশিয়া : দীর্ঘ কভিড-১৯-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার পর মাইক্রোনেশিয়া ধীর ছিল। কিন্তু স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। নির্মাণ ও কৃষি খাত ছিল এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। তবে নিট প্রাথমিক আয়ের উল্লেখযোগ্য পতন সামগ্রিক অগ্রগতিকে কিছুটা সীমিত করেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৭৬০ ডলার।

জর্দান : জর্দানের জাতীয় হিসাব পুনর্নির্ধারণ করার ফলে দেশটি নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগ নতুন জরিপ, অতিরিক্ত তথ্যসূত্র এবং উন্নত জাতীয় হিসাব প্রণয়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখতে পায়, দেশটির অর্থনীতির আকার আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বড়। এর সঙ্গে ২০২৫ সালে ২.৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যুক্ত হওয়ায় দেশটি স্পষ্টভাবে উচ্চতর আয়ের সীমা অতিক্রম করে। ২০২৫ সালে জর্দানের মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ২৬০ ডলার।

টোগো : টোগো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে।

বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদন

বিশ্বে দিনে মিলিয়নেয়ার হচ্ছে ২,৬৮০ জন

২০২৫ সালে বিশ্বে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ বেড়েছে ১০.৮ শতাংশ যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি

বাণিজ্য ডেস্ক
বিশ্বে দিনে মিলিয়নেয়ার হচ্ছে ২,৬৮০ জন

মন্দার মধ্যেও বিশ্বজুড়ে এক শ্রেণির মানুষের সম্পদ বাড়ছে, আর অন্য শ্রেণির কমছে। এতে আয়বৈষম্য আরো বিস্তৃত ও গভীর হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংক ইউবিএসের সর্বশেষ গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট বা বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ ১০.৮ শতাংশ বেড়েছে, যা অন্তত গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে প্রায় ১০ লাখ নতুন মিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে।

ইউবিএস বিশ্বের ৫৬টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এসব দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট সম্পদের আনুমানিক ৯২ শতাংশ বা তারও বেশি প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ১.৫ শতাংশ বেড়েছে। গড় হিসাবে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৬৮০ জন নতুন মার্কিন ডলার মিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে চার লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি নতুন মিলিয়নেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের, অর্থাৎ দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২০০ জনের বেশি নতুন মিলিয়নেয়ার হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন মিলিয়নেয়ার বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের।

ইউবিএস গ্লোবাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের সহ-প্রধান ইকবাল খান এই প্রবৃদ্ধির পেছনে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বিভিন্ন বাজারে তৈরি হওয়া নতুন সুযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।

অবশ্য বৈশ্বিক সম্পদের এই প্রবৃদ্ধির মধ্যেও বেশির ভাগ দেশে কমেছে মধ্যক সম্পদ বা মিডিয়ান ওয়েলথ-এর পরিমাণ। ইউবিএস জানিয়েছে, অতি ধনী বা উচ্চ আয়ের মানুষের আয়ের প্রভাব এই হিসাবে কম থাকে বলে একেই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে নির্ভুল চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গড় মধ্যক সম্পদের (মিডিয়ান ওয়েলথ) দিক থেকে বৈশ্বিক তালিকায় লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়ামের পরই তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটিতে জনপ্রতি মধ্যক সম্পদের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার।

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ সল এসলেক বলেন, মধ্যবিত্ত ও ধনীদের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। তবে অন্য দেশের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় সম্পদের বণ্টন কিছুটা বেশি সুষম বলে মনে করেন তিনি। সল এসলেক বলেন, উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা যায়। সেখানে গড় পারিবারিক সম্পদ মধ্যক (মিডিয়ান) পারিবারিক সম্পদের চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি। তাই এটা স্পষ্ট যে অস্ট্রেলিয়ায় সম্পদ বণ্টনে অসংগতি বা বৈষম্য রয়েছে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সমমানের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম।

এই প্রতিবেদনে কাউকে ধনকুবের বা মিলিয়নেয়ার হিসেবে চিহ্নিত করার মানে এই নয়, ব্যাংকে তাদের লাখ লাখ টাকা বা ডলার জমা রয়েছে। ইউবিএস তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে, এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত বেশির ভাগ সাধারণ ধনীর ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের বসবাসের জন্য কেনা বাড়ি বা সম্পত্তিই (ওনার-অকুপাইড প্রপার্টি) ছিল সবচেয়ে বড় সম্পদ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহজ কথায়, সম্পত্তির মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক মানুষই এ তালিকায় ঢুকে পড়েছে। তবে এর ফলে তাদের প্রকৃত ব্যয়যোগ্য আয় (ডিসপোজেবল ইনকাম) কিন্তু বিন্দুমাত্র বাড়েনি।

 

বিশেষ লেখা

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর অর্থনৈতিক অংশীদারির নতুন অধ্যায়

এম. মাহমুদুর রশিদ

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর অর্থনৈতিক অংশীদারির নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়, বরং এমন একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক উদ্যোগ, যা আগামী কয়েক দশকের জন্য বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে সরবরাহব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস হচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক অংশীদারির গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা আরো জোরদার করা সময়ের দাবি। এই বাস্তবতায় মালয়েশিয়া শুধু একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ নয়, বরং এমন একটি কৌশলগত অংশীদার, যা বাংলাদেশকে বহুমুখী, উদ্ভাবননির্ভর এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথকে আরো গতিশীল করতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক মূলত জনশক্তি রপ্তানিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মূল্যবান। তবে ভবিষ্যতের এই সম্পর্ককে শ্রমবাজারের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্প সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিতে রূপ দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সেই যৌথ অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।

বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি হওয়ার পাশাপাশি এটি ১০টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত আসিয়ানের অন্যতম প্রবেশদ্বার। প্রায় ৭০ কোটি মানুষের বাজার এবং প্রায় চার ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতির এই আঞ্চলিক জোট বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার অর্থনীতি একে অন্যের পরিপূরক। বাংলাদেশের রয়েছে ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের বৃহৎ বাজার, দ্রুত সম্প্রসারিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন সক্ষমতা এবং এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় ভোক্তা বাজার। অন্যদিকে মালয়েশিয়া উন্নত উৎপাদন শিল্প, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস পণ্য, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল শিল্প, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থায় বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করেছে।

২০২৫ সালে মালয়েশিয়ার মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন ট্রিলিয়ন রিঙ্গিত অতিক্রম করেছে। একই বছর দেশটির রপ্তানি ১.৬ ট্রিলিয়ন রিঙ্গিত ছাড়িয়ে যায় এবং টানা ২৮তম বছরের মতো বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বজায় রাখে। এই সাফল্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে, বিশেষ করে শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে উচ্চতর অবস্থানে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাতে নতুন সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

উন্নত উৎপাদনশিল্প ও শিল্পায়ন এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এরই মধ্যে একটি শক্তিশালী উৎপাদনভিত্তি গড়ে তুলেছে। এখন প্রয়োজন প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন এবং ভ্যালু অ্যাডেড শিল্পে প্রবেশ, যেখানে মালয়েশিয়ার রয়েছে ব্যাপক অভিজ্ঞতা। বর্তমানে বাংলাদেশও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশের লক্ষ্যে কাজ করছে। এ সম্বন্ধে সহযোগিতা এবং নিয়মিত বিভিন্ন রকমের ট্রেনিং প্রোগ্রাম আয়োজনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে এরই মধ্যে মালয়েশিয়ান সরকারের একটি জি২বি এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছে।

ডিজিটাল অর্থনীতি সহযোগিতার আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ডিজিটাল সেবাখাত ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এসব ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ দুই দেশের জন্যই নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে পারে।

হালাল অর্থনীতিও একটি বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। মালয়েশিয়া বিশ্বব্যাপী হালাল সার্টিফিকেশন ও হালাল শিল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে খাদ্য, ওষুধ এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। এই দুই দেশের সক্ষমতার সমন্বয় বৈশ্বিক হালাল বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে হালাল শিল্পের উন্নয়নে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএমসিসিআই) সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং অদূর ভবিষ্যতে একটি আন্তর্জাতিক হালাল সামিট আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি শিক্ষা এবং লজিস্টিকস অবকাঠামোতেও ফলপ্রসূ অংশীদারি গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত বিনিয়োগ সহযোগিতা।

বাংলাদেশ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নিট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির প্রতিফলন। রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে বাস্তব বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারিতে রূপান্তর করতে হবে। এখানেই বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুই দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে বিএমসিসিআই কাজ করে যাচ্ছে। ব্যবসা-টু-ব্যবসা সংযোগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নৈতিক শ্রমবাজার নিশ্চিতকরণ এবং বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের আসিয়ান বাজারে প্রবেশে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলোমালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা। তাঁদের অবদান শুধু রেমিট্যান্সেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁরা দুই দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দূত হিসেবে কাজ করছেন।

তাঁদের অভিজ্ঞতা, নেটওয়ার্ক এবং উদ্যোক্তা সক্ষমতা ভবিষ্যতের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে।

অতএব, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির এক নতুন কৌশলগত অধ্যায়ের সূচনা।

লেখক : যুগ্ম মহাসচিব

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএমসিসি)

ফ্রিজ-এসিতে ভ্যাট কমায় স্বস্তি দেশীয় ইলেকট্রনিক শিল্পে

বাজেটে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার (এসি) ও কম্প্রেসরের ওপর সংযোজন কর বা ভ্যাট আগের মতো ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে বেড়ে যাওয়া ভ্যাটের হার আবার অর্ধেকে নামিয়ে আনায় বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছে দেশীয় ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পে

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফ্রিজ-এসিতে ভ্যাট কমায় স্বস্তি দেশীয় ইলেকট্রনিক শিল্পে

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার (এসি) ও কম্প্রেসরের ওপর সংযোজন কর বা ভ্যাট আগের মতো ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বেড়ে যাওয়া ভ্যাটের হার আবার অর্ধেকে নামিয়ে আনায় বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছে দেশীয় ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থানীয় ব্র্যান্ডের পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি যেমন বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে ফ্রিজ ও এসি উৎপাদনে ভ্যাটের হার ছিল শূন্য শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশ করা হলেও সদ্যঃসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা একলাফে দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। হঠাৎ ভ্যাট দ্বিগুণ করায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে দেশীয় ফ্রিজ ও এসির দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে মধ্যবিত্ত ক্রেতারা পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যান এবং স্থানীয় উৎপাদকদের বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে যায়। অতিরিক্ত ভ্যাটের চাপ ও পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন বলে দাবি উৎপাদকদের।

উদ্যোক্তারা মনে করছেন, নতুন বাজেটে ভ্যাট আবার ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনায় ফ্রিজ ও এসির দাম ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে। বর্তমানে তীব্র গরম ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফ্রিজ বা এসি এখন আর বিলাসপণ্য নয়, বরং খাদ্য সংরক্ষণ ও পারিবারিক জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহিদুল ইসলাম বলেন, দেশীয় ইলেকট্রনিক শিল্পের সুরক্ষায় ফ্রিজ ও এসির ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। এ জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরকে ধন্যবাদ জানাই। ভ্যাট সহনীয় হওয়ায় দেশীয় পণ্যের চাহিদা বাড়বে, কারখানাগুলো উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির পলিসি অ্যাডভাইজার এবং অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের ফলে স্থানীয় শিল্পে ওয়ালটনসহ অন্যান্য দেশীয় ব্র্যান্ডের বিনিয়োগ আরো বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী হবে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে ভোক্তা, উৎপাদক ও সরকারের রাজস্ব বিভাগ তিন পক্ষই দীর্ঘ মেয়াদে উপকৃত হবে।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদন খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক মানের ফ্রিজ, এসি ও কম্প্রেসর উৎপাদন করে স্থানীয় বাজারের  বেশির ভাগ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করছে। এই খাতের টেকসই বিকাশের জন্য সরকারের এমন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।