অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সংকট কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি রপ্তানিতে সাফল্য দেখিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো। বিশ্বব্যাংকের দেশভিত্তিক আয় শ্রেণিবিন্যাসের এ বছরের হালনাগাদে দেখা গেছে, পাঁচটি দেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। প্রতিটি দেশের পেছনের গল্প আলাদা : কোনো দেশ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, কোনোটি রপ্তানিতে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়ে অন্যদের ছাড়িয়েছে, আবার কোনো দেশের অর্থনীতির আকার নতুন হিসাব অনুযায়ী আগের ধারণার তুলনায় ১০ শতাংশ বড় বলে প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো সেই ভিন্ন ভিন্ন গল্পের মাত্র তিনটি উদাহরণ।
নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া পাঁচটি দেশ হচ্ছে—শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, জর্দান ও মাইক্রোনেশিয়া। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে আফ্রিকার টোগো। যদিও বাংলাদেশ এখনো নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, বাংলাদেশের গড় মাথপিছু আয় এখন তিন হাজার ২০ মার্কিন ডলার।
বিশ্বব্যাংকের সদস্যভুক্ত ২১৮টি দেশ ও অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এ প্রতিবেদন তৈরি করে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক নিজেদের সদস্য দেশগুলোকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে চার শ্রেণিতে ভাগ করে। এগুলো হলো—নিম্ন, নিম্নমধ্যম, উচ্চমধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশ। এর ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক ঋণের পরিমাণ, শর্তসহ অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ করে।
নতুন সীমা নির্ধারণ : মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে এ বছরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী এক বছরে বিশ্বব্যাংক কোন দেশ কোন শ্রেণিতে, তা নির্ধারণের জন্য নতুন সীমা নির্ধারণ করেছে। এখন থেকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে এক হাজার ১৭৫ ডলার হতে হবে। নিম্নমধ্যম থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে চার হাজার ৬৩৫ ডলার হতে হবে। আর উচ্চ আয়ের দেশে যেতে হলে ১৪ হাজার ৩৭৫ ডলার মাথাপিছু আয় হতে হবে। উন্নতি করা দেশগুলো কিভাবে সাফল্য পেল তা তুলে ধরা হলো।
ভিয়েতনাম : রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) গড়ে বছরে ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম উদাহরণ। ২০২৪ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই ছিল চার হাজার ৪৯০ ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৯৭০ ডলার। রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলের ওপর ভর করে ভিয়েতনাম শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ উভয় বছরেই দেশটির রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের বেশি। একই সময় মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যথাক্রমে ৭ ও ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফিলিপিন্স : রপ্তানিতে বাংলাদেশের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিপিন্স। অর্থনীতির ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে দেশটি। গত পাঁচ বছরে দেশটির জিডিপি গড়ে বছরে ৫.৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি কোনো একক খাতের উল্লম্ফনের ফল নয়; বরং অর্থনীতির প্রায় সব প্রধান খাতেই উন্নতির প্রতিফলন। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৮৫০ ডলার।
শ্রীলঙ্কা : ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনীতি ৫ শতাংশ প্রসারিত হওয়ায় দেশটিকে নিম্নমধ্যম আয়ের তালিকা থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হয়েছে। মূলত শিল্প খাতের সামগ্রিক পুনরুদ্ধার এবং পর্যটন ও আর্থিক সেবা খাতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করেই দেশটির অর্থনীতিতে এই গতি এসেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৬৭০ ডলার। শ্রীলঙ্কার এই সাফল্যকে ‘পুনরুদ্ধারের এক অনন্য গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২২ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের জেরে দেশটি যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তার ঠিক তিন বছরের মাথায় এসে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মাইক্রোনেশিয়া : দীর্ঘ কভিড-১৯-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার পর মাইক্রোনেশিয়া ধীর ছিল। কিন্তু স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। নির্মাণ ও কৃষি খাত ছিল এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। তবে নিট প্রাথমিক আয়ের উল্লেখযোগ্য পতন সামগ্রিক অগ্রগতিকে কিছুটা সীমিত করেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৭৬০ ডলার।
জর্দান : জর্দানের জাতীয় হিসাব পুনর্নির্ধারণ করার ফলে দেশটি নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগ নতুন জরিপ, অতিরিক্ত তথ্যসূত্র এবং উন্নত জাতীয় হিসাব প্রণয়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখতে পায়, দেশটির অর্থনীতির আকার আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বড়। এর সঙ্গে ২০২৫ সালে ২.৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যুক্ত হওয়ায় দেশটি স্পষ্টভাবে উচ্চতর আয়ের সীমা অতিক্রম করে। ২০২৫ সালে জর্দানের মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ২৬০ ডলার।
টোগো : টোগো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে।




