• ই-পেপার

বিশেষ লেখা

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর অর্থনৈতিক অংশীদারির নতুন অধ্যায়

  • এম. মাহমুদুর রশিদ

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদন

অর্থনৈতিক সাফল্যে উচ্চমধ্যম আয়ে পাঁচ দেশ

উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া পাঁচটি দেশ হচ্ছে শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, জর্দান ও মাইক্রোনেশিয়া নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে আফ্রিকার টোগো

বাণিজ্য ডেস্ক
অর্থনৈতিক সাফল্যে উচ্চমধ্যম আয়ে পাঁচ দেশ

অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সংকট কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি রপ্তানিতে সাফল্য দেখিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো। বিশ্বব্যাংকের দেশভিত্তিক আয় শ্রেণিবিন্যাসের এ বছরের হালনাগাদে দেখা গেছে, পাঁচটি দেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। প্রতিটি দেশের পেছনের গল্প আলাদা : কোনো দেশ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, কোনোটি রপ্তানিতে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়ে অন্যদের ছাড়িয়েছে, আবার কোনো দেশের অর্থনীতির আকার নতুন হিসাব অনুযায়ী আগের ধারণার তুলনায় ১০ শতাংশ বড় বলে প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো সেই ভিন্ন ভিন্ন গল্পের মাত্র তিনটি উদাহরণ।

নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া পাঁচটি দেশ হচ্ছেশ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, জর্দান ও মাইক্রোনেশিয়া। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে আফ্রিকার টোগো। যদিও বাংলাদেশ এখনো নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, বাংলাদেশের গড় মাথপিছু আয় এখন তিন হাজার ২০ মার্কিন ডলার।

বিশ্বব্যাংকের সদস্যভুক্ত ২১৮টি দেশ ও অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এ প্রতিবেদন তৈরি করে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক নিজেদের সদস্য দেশগুলোকে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে চার শ্রেণিতে ভাগ করে। এগুলো হলোনিম্ন, নিম্নমধ্যম, উচ্চমধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশ। এর ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক ঋণের পরিমাণ, শর্তসহ অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ করে।

নতুন সীমা নির্ধারণ : মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে এ বছরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী এক বছরে বিশ্বব্যাংক কোন দেশ কোন শ্রেণিতে, তা নির্ধারণের জন্য নতুন সীমা নির্ধারণ করেছে। এখন থেকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে এক হাজার ১৭৫ ডলার হতে হবে। নিম্নমধ্যম থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে চার হাজার ৬৩৫ ডলার হতে হবে। আর উচ্চ আয়ের দেশে যেতে হলে ১৪ হাজার ৩৭৫ ডলার মাথাপিছু আয় হতে হবে। উন্নতি করা দেশগুলো কিভাবে সাফল্য পেল তা তুলে ধরা হলো।

ভিয়েতনাম : রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনাম। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) গড়ে বছরে ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম উদাহরণ। ২০২৪ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই ছিল চার হাজার ৪৯০ ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৯৭০ ডলার। রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলের ওপর ভর করে ভিয়েতনাম শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ উভয় বছরেই দেশটির রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের বেশি। একই সময় মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যথাক্রমে ৭ ও ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

ফিলিপিন্স : রপ্তানিতে বাংলাদেশের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিপিন্স। অর্থনীতির ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে দেশটি। গত পাঁচ বছরে দেশটির জিডিপি গড়ে বছরে ৫.৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি কোনো একক খাতের উল্লম্ফনের ফল নয়; বরং অর্থনীতির প্রায় সব প্রধান খাতেই উন্নতির প্রতিফলন। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৮৫০ ডলার।

শ্রীলঙ্কা : ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনীতি ৫ শতাংশ প্রসারিত হওয়ায় দেশটিকে নিম্নমধ্যম আয়ের তালিকা থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হয়েছে। মূলত শিল্প খাতের সামগ্রিক পুনরুদ্ধার এবং পর্যটন ও আর্থিক সেবা খাতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করেই দেশটির অর্থনীতিতে এই গতি এসেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৬৭০ ডলার। শ্রীলঙ্কার এই সাফল্যকে পুনরুদ্ধারের এক অনন্য গল্প হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২২ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের জেরে দেশটি যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তার ঠিক তিন বছরের মাথায় এসে দেশটির প্রকৃত জিডিপি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মাইক্রোনেশিয়া : দীর্ঘ কভিড-১৯-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার পর মাইক্রোনেশিয়া ধীর ছিল। কিন্তু স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। নির্মাণ ও কৃষি খাত ছিল এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। তবে নিট প্রাথমিক আয়ের উল্লেখযোগ্য পতন সামগ্রিক অগ্রগতিকে কিছুটা সীমিত করেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে চার হাজার ৭৬০ ডলার।

জর্দান : জর্দানের জাতীয় হিসাব পুনর্নির্ধারণ করার ফলে দেশটি নতুন আয়ের শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগ নতুন জরিপ, অতিরিক্ত তথ্যসূত্র এবং উন্নত জাতীয় হিসাব প্রণয়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখতে পায়, দেশটির অর্থনীতির আকার আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বড়। এর সঙ্গে ২০২৫ সালে ২.৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যুক্ত হওয়ায় দেশটি স্পষ্টভাবে উচ্চতর আয়ের সীমা অতিক্রম করে। ২০২৫ সালে জর্দানের মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার ২৬০ ডলার।

টোগো : টোগো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে।

বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদন

বিশ্বে দিনে মিলিয়নেয়ার হচ্ছে ২,৬৮০ জন

২০২৫ সালে বিশ্বে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ বেড়েছে ১০.৮ শতাংশ যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি

বাণিজ্য ডেস্ক
বিশ্বে দিনে মিলিয়নেয়ার হচ্ছে ২,৬৮০ জন

মন্দার মধ্যেও বিশ্বজুড়ে এক শ্রেণির মানুষের সম্পদ বাড়ছে, আর অন্য শ্রেণির কমছে। এতে আয়বৈষম্য আরো বিস্তৃত ও গভীর হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংক ইউবিএসের সর্বশেষ গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট বা বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ ১০.৮ শতাংশ বেড়েছে, যা অন্তত গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে প্রায় ১০ লাখ নতুন মিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে।

ইউবিএস বিশ্বের ৫৬টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এসব দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট সম্পদের আনুমানিক ৯২ শতাংশ বা তারও বেশি প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ১.৫ শতাংশ বেড়েছে। গড় হিসাবে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৬৮০ জন নতুন মার্কিন ডলার মিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে চার লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি নতুন মিলিয়নেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের, অর্থাৎ দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২০০ জনের বেশি নতুন মিলিয়নেয়ার হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন মিলিয়নেয়ার বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের।

ইউবিএস গ্লোবাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের সহ-প্রধান ইকবাল খান এই প্রবৃদ্ধির পেছনে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বিভিন্ন বাজারে তৈরি হওয়া নতুন সুযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।

অবশ্য বৈশ্বিক সম্পদের এই প্রবৃদ্ধির মধ্যেও বেশির ভাগ দেশে কমেছে মধ্যক সম্পদ বা মিডিয়ান ওয়েলথ-এর পরিমাণ। ইউবিএস জানিয়েছে, অতি ধনী বা উচ্চ আয়ের মানুষের আয়ের প্রভাব এই হিসাবে কম থাকে বলে একেই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে নির্ভুল চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গড় মধ্যক সম্পদের (মিডিয়ান ওয়েলথ) দিক থেকে বৈশ্বিক তালিকায় লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়ামের পরই তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটিতে জনপ্রতি মধ্যক সম্পদের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার।

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থনীতিবিদ সল এসলেক বলেন, মধ্যবিত্ত ও ধনীদের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। তবে অন্য দেশের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় সম্পদের বণ্টন কিছুটা বেশি সুষম বলে মনে করেন তিনি। সল এসলেক বলেন, উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা যায়। সেখানে গড় পারিবারিক সম্পদ মধ্যক (মিডিয়ান) পারিবারিক সম্পদের চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি। তাই এটা স্পষ্ট যে অস্ট্রেলিয়ায় সম্পদ বণ্টনে অসংগতি বা বৈষম্য রয়েছে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সমমানের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম।

এই প্রতিবেদনে কাউকে ধনকুবের বা মিলিয়নেয়ার হিসেবে চিহ্নিত করার মানে এই নয়, ব্যাংকে তাদের লাখ লাখ টাকা বা ডলার জমা রয়েছে। ইউবিএস তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে, এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত বেশির ভাগ সাধারণ ধনীর ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের বসবাসের জন্য কেনা বাড়ি বা সম্পত্তিই (ওনার-অকুপাইড প্রপার্টি) ছিল সবচেয়ে বড় সম্পদ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহজ কথায়, সম্পত্তির মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক মানুষই এ তালিকায় ঢুকে পড়েছে। তবে এর ফলে তাদের প্রকৃত ব্যয়যোগ্য আয় (ডিসপোজেবল ইনকাম) কিন্তু বিন্দুমাত্র বাড়েনি।

 

ফ্রিজ-এসিতে ভ্যাট কমায় স্বস্তি দেশীয় ইলেকট্রনিক শিল্পে

বাজেটে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার (এসি) ও কম্প্রেসরের ওপর সংযোজন কর বা ভ্যাট আগের মতো ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে বেড়ে যাওয়া ভ্যাটের হার আবার অর্ধেকে নামিয়ে আনায় বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছে দেশীয় ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পে

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফ্রিজ-এসিতে ভ্যাট কমায় স্বস্তি দেশীয় ইলেকট্রনিক শিল্পে

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার (এসি) ও কম্প্রেসরের ওপর সংযোজন কর বা ভ্যাট আগের মতো ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বেড়ে যাওয়া ভ্যাটের হার আবার অর্ধেকে নামিয়ে আনায় বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছে দেশীয় ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থানীয় ব্র্যান্ডের পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি যেমন বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে ফ্রিজ ও এসি উৎপাদনে ভ্যাটের হার ছিল শূন্য শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশ করা হলেও সদ্যঃসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা একলাফে দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। হঠাৎ ভ্যাট দ্বিগুণ করায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে দেশীয় ফ্রিজ ও এসির দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে মধ্যবিত্ত ক্রেতারা পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যান এবং স্থানীয় উৎপাদকদের বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে যায়। অতিরিক্ত ভ্যাটের চাপ ও পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন বলে দাবি উৎপাদকদের।

উদ্যোক্তারা মনে করছেন, নতুন বাজেটে ভ্যাট আবার ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনায় ফ্রিজ ও এসির দাম ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে। বর্তমানে তীব্র গরম ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফ্রিজ বা এসি এখন আর বিলাসপণ্য নয়, বরং খাদ্য সংরক্ষণ ও পারিবারিক জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ রেফ্রিজারেটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহিদুল ইসলাম বলেন, দেশীয় ইলেকট্রনিক শিল্পের সুরক্ষায় ফ্রিজ ও এসির ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। এ জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরকে ধন্যবাদ জানাই। ভ্যাট সহনীয় হওয়ায় দেশীয় পণ্যের চাহিদা বাড়বে, কারখানাগুলো উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির পলিসি অ্যাডভাইজার এবং অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রকৌশলী লিয়াকত আলী বলেন, এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের ফলে স্থানীয় শিল্পে ওয়ালটনসহ অন্যান্য দেশীয় ব্র্যান্ডের বিনিয়োগ আরো বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী হবে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে ভোক্তা, উৎপাদক ও সরকারের রাজস্ব বিভাগ তিন পক্ষই দীর্ঘ মেয়াদে উপকৃত হবে।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদন খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক মানের ফ্রিজ, এসি ও কম্প্রেসর উৎপাদন করে স্থানীয় বাজারের  বেশির ভাগ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করছে। এই খাতের টেকসই বিকাশের জন্য সরকারের এমন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

দেশীয় প্রযুক্তিতে মানসম্মত যন্ত্রাংশ তৈরি

আমদানি বিকল্প গড়ছে পাবনার প্রকৌশল শিল্প

মেহদী ইসলাম
আমদানি বিকল্প গড়ছে পাবনার প্রকৌশল শিল্প

একসময় কৃষি যন্ত্রপাতি ও শিল্প-কারখানার খুচরা যন্ত্রাংশের জন্য পুরোপুরি বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। সেই চিত্র এখন বদলাচ্ছে। পাবনার হালকা প্রকৌশল শিল্প দেশীয় প্রযুক্তিতে মানসম্মত যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। এতে আমদানি নির্ভরতা কমছে। একই সঙ্গে সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। তবে এই শিল্পের বড় বাধা এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পুঁজির সংকট।

পাবনা জেলা সদরে গড়ে উঠেছে হালকা প্রকৌশল শিল্পের একটি বড় ক্লাস্টার। এখানে প্রায় ৩০০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দুই হাজারের বেশি মানুষ কাজ করেন। শহরের বাবলাতলা, রাধানগর, অনন্ত সিনেমা হল এলাকা, বাস টার্মিনাল, বাইপাস গাছপাড়া ও পৈলানপুরসহ বিভিন্ন স্থানে কারখানাগুলো ছড়িয়ে রয়েছে। রাজধানী ঢাকা এবং আশপাশের জেলার সঙ্গে এই শিল্পাঞ্চলের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে কাঁচামাল আনা এবং পণ্য সরবরাহ তুলনামূলক সহজ।

পাবনা জেলা ইঞ্জিনিয়ারিং মালিক সমিতির সভাপতি নাসির উদ্দীন বলেন, শুধু পাবনা সদরেই প্রায় ১২০টি ওয়ার্কশপ রয়েছে। আর পুরো জেলায় এর সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০-এর বেশি। তাঁর ভাষ্য, এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ যুক্ত। দেশের বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরি করে এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমদানির বিকল্প হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিদেশের বদলে মেইড ইন পাবনা : পাবনার তৈরি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন বড় শিল্প-কারখানায় জায়গা করে নিচ্ছে। যেমনকৃষি যন্ত্রপাতির মধ্যে ধান মাড়াই কল, নিড়ানি যন্ত্র এবং সেচ পাম্পের খুচরা যন্ত্রাংশ। শিল্প পার্টস যন্ত্রপাতির মধ্যে আটা ও চালের মিলের ড্রাম, নাট-বোল্ট এবং ছোট ছোট মোটর পার্টস। পরিবহন খাতের যন্ত্রপাতির মধ্যে অটো ও রিকশার বডি এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। এ ছাড়া গ্রিল, আলমারি, শাটার ভাঁজ মেশিন, ওষুধ তৈরির মেশিন, মিক্সচার মেশিন, প্যাকেজিং মেশিন, অয়েল মিলের মেশিন, পাশাপাশি হেভি মেশিনারিজ, গাড়ির ইঞ্জিন, গিয়ার পিনিয়াম, সিমেন্ট মিলের জন্য হেভি ইক্যুইপমেন্টও তৈরি করে থাকে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, আগে যেসব পার্টস চীন বা ভারত থেকে আমদানি করতে হতো, এখন তা পাবনাতেই তৈরি হচ্ছে। এতে খরচ কমছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।

পাবনা জেলা ইঞ্জিনিয়ারিং মালিক সমিতির সভাপতি নাসির উদ্দীন বলেন, পাবনা জেলার ভেতরেই আমাদের পণ্যের চাহিদা বেশি। তবে ফার্মাসিউটিক্যালসের যে বিশেষ মেশিনারি আমরা তৈরি করি, তা ঢাকা ও পাবনা ছাড়া আর কোথাও তৈরি হয় না।

বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে থমকে যাচ্ছে উৎপাদন

এই শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিদ্যুৎ। কিন্তু লোডশেডিং এবং লো ভোল্টেজের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। ফলে হচ্ছে আর্থিক ক্ষতি। কফিলউদ্দিন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের পরিচালক গিয়াস উদ্দিন মাহবুব বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ চলাকালীন সময় বিদ্যুৎ অনেক ভুগিয়েছে। তবে এখনো সেই সংকট কাটেনি। দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। লোহার কাজ করার সময় হুট করে বিদ্যুৎ চলে গেলে কাঁচামাল নষ্ট হয়, আবার লেদ মেশিনের সূক্ষ্ম কাজগুলোও ব্যাহত হয়। ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানো এখন ব্যয়বহুল।

পুঁজি সংকট : বড় হওয়ার পথে প্রধান বাধা

পাবনার এই লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস্টারের বেশির ভাগ উদ্যোক্তাই প্রান্তিক। নতুন আধুনিক মেশিন কেনা বা ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার জোগান নেই তাঁদের কাছে। মো. রবিউল ইসলাম নামের এক উদ্যোক্তা বলেন, লোন নিতে গেলে উচ্চ সুদ দিতে হয়। একটা ব্যবসা দাঁড় করাতে তো সময় লাগে। বেসরকারি ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিতে গেলে চড়া সুদের ঘানি টানতে হয়। এভাবে লোন নিয়ে ব্যবসা করতে গেলে সুদের চাপে কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। এ জন্য ব্যবসা বড় করতে পারছি না।

নাসির উদ্দীন বলেন, ব্যাংকগুলো ঋণ দেয় ঠিকই, কিন্তু ঋণের সুদের হার অনেক বেশি। এই উচ্চ সুদের হারের কারণে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। সুদের হার যদি কমানো হয়, তবে বিনিয়োগ আরো বাড়বে।

বিদেশি পণ্যের সঙ্গে অসম লড়াই : আমদানি করা নিম্নমানের সস্তা পণ্যের সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে দেশি এই শিল্পকে। উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকার যদি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে দেয় এবং দেশীয় যন্ত্রাংশ ব্যবহারে বড় শিল্পগুলোকে উৎসাহিত করে, তবে পাবনার এই হালকা প্রকৌশল খাত দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে।

পাবনা জেলা ইঞ্জিনিয়ারিং মালিক সমিতির সভাপতি নাসির উদ্দীন বলেন, আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমনদক্ষ শ্রমিকের অভাব, কারিগরি শিক্ষার অভাব এবং আর্থিক সংকট। আমাদের কারখানাগুলোতে যে ধরনের মেশিনারি তৈরি হয়, তা বাংলাদেশের আর কোথাও হয় না। যেমন-স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমরা এখানেই তৈরি করি। সরকার যদি এই শিল্পকে আরো উন্নত প্রযুক্তি ও নতুন মেশিনারি আমদানিতে সহায়তা করে এবং কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করে, তবে পাবনার এই ওয়ার্কশপগুলো আরো বেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাজিম হাসান সাত্তার বলেন, ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং তাঁদের বিকাশে সুযোগ-সুবিধা কিছুটা সীমিত। এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করতেই এসএমই ফাউন্ডেশন সারা দেশে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৭৬টি আঞ্চলিক ক্লাস্টার বা শিল্পাঞ্চল চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে পাবনার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস্টার অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

তিনি আরো বলেন, আমরা এরই মধ্যে ১৬টি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছি, যার মাধ্যমে ৭ শতাংশ সিঙ্গেল ডিজিট সুদে এবং জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার সঙ্গে এসএমই খাতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া এমন ৫০টি খাত চিহ্নিত করেছি, যেখানে সরাসরি কাজ করা সম্ভব। আমাদের ১৮০ দিনের স্বল্পমেয়াদি এবং তিন বছরমেয়াদি একটি কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, এই ক্লাস্টারগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা মোটেও অসম্ভব নয়।