আমাদের সমাজে পেশা হিসেবে লেখালেখিকে এখনো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হয় না। অথচ আমি সেই কত বছর আগে স্নাতকোত্তর না করে, পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখনো সমাজের তোয়াক্কা না করে বাবা আমাকে সমর্থন দিয়েছিল। ছাত্রজীবন থেকেই স্বনির্ভর হওয়ার মাধ্যমে নিজেকে গড়ার যে সুযোগ পেয়েছি, তার মূল কারিগর আমার বাবা—খন্দকার খালিদ হোসেন।সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে টাঙ্গাইল জজকোর্টে কাজ করতেন। কিন্তু বাবার আসল পরিচয় তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্ব ও মননশীলতায়। উত্তরাধিকার সূত্রে স্থাবর সম্পত্তির চেয়ে অনেক বেশি দামি সম্পদ পেয়েছি—তা হলো বাবার সাহস, পাণ্ডিত্য ও বিচক্ষণতা। বাবা একজন উচ্চমানের পাঠক। ফলে শৈশবে অসংখ্য বইয়ের সান্নিধ্যে বড় হওয়াটাই আমার মধ্যে লেখক হওয়ার বীজ বপন করেছিল। আজ আমি শখকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেও গতানুগতিক পেশায় নিয়োজিত মানুষের তুলনায় বস্তুগত সফলতার কোনো মানদণ্ডে পিছিয়ে নেই। জীবনযাত্রার যে মান বজায় রেখে চলতে পারছি, এর পেছনে বাবার স্বরাট মানসিকতা এবং তাঁর স্বাধীনচেতা জীবনযাপন দেখে বড় হওয়ার প্রভাব অনেক। আমাদের দুজনের মতাদর্শে অনেক তফাত। কাজের ধরন আলাদা। কিন্তু উদ্দেশ্য নিখাদ। আমি ভীষণ আত্মমন্যতায় নিমজ্জিত মানুষ। বাবা অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ মানুষ হয়েও আমার স্বার্থপর সিদ্ধান্তগুলোতে বাধা না হয়ে ছায়ার মতো পাশে থাকেন। ছাত্রজীবনে বাবার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে আলোচনা করেছি। সেই আলোচনা আমার দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। তা আমার লেখায়ও কোনো না কোনোভাবে প্রতিফলিত হয়।বাবা প্রচারবিমুখ। জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটাতে আজীবন জ্ঞান আহরণ করেছেন। এখনো করছেন। তাঁর প্রজ্ঞা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে গভীর দর্শন। জ্ঞানার্জনের জন্য বহু রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। তিনি চলে গেলেও যেন আমার লেখার মাধ্যমে মানুষের মনে সেই দর্শন জীবিত থাকে—এটিই আমার লেখালেখির লক্ষ্য। বাবার মতো এমন অভিভাবক পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কোনো না কোনো প্রতিভা সবার মধ্যেই থাকে। তবে সেটি বিকশিত করার সুযোগ সবাই পায় না। বাবার কল্যাণে আমি পেয়েছি। বাবা, আপনাকে ধন্যবাদ।
আসিফ খন্দকার
দক্ষিণ বেতডোবা, কালিহাতী, টাঙ্গাইল




