• ই-পেপার

[ দিনগুলি মোর ]

আপনাকে ধন্যবাদ বাবা!

মৃত্তিকার সন্ধানে ওঁরা সাতজন

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকায় আজ শেষ হচ্ছে ‘সার্চ সোল, সয়েল’ শীর্ষক গবেষণাধর্মী শিল্প প্রদর্শনী। কিউরেটর কুন্তল বাড়ৈ। এতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্থানীয় বাস্তবতা এবং গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে নির্মিত শিল্পকর্মের মাধ্যমে পরিবেশগত সংকট, পরিবর্তন এবং অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন সামনে এনেছেন সাত তরুণ। তাঁরা সেই গল্পই বলছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

মৃত্তিকার সন্ধানে ওঁরা সাতজন
শিল্পকর্ম : ফুড অ্যান্ড এক্সিটেন্স, শিল্পী : বনানী সিমলাই, ছবি : মঞ্জুরুল করিম

খাইদেম সিথি সিনহা, বনানী সিমলাই, দীপ্র বণিক, রূপশ্রী হাজং, মো. ফাইজুল ইসলাম, লুৎফা মাহমুদা ও মো. হাশেম

খাইদেম সিথি সিনহা, বনানী সিমলাই, দীপ্র বণিক, রূপশ্রী হাজং, মো. ফাইজুল ইসলাম, লুৎফা মাহমুদা ও মো. হাশেম

ওষুধও এখন খাদ্যতালিকার অংশ

বনানী সিমলাই

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—বহুল প্রচলিত এই বাংলা প্রবাদটিতে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূগোল, স্মৃতি এবং পরিচয়ের প্রতিফলন মেলে। বাঙালির কাছে যেমন ভাত ছাড়া খাবার অসম্পূর্ণ, তেমনি পৃথিবীর বহু সংস্কৃতিতেই খাদ্য শুধু শরীরের পুষ্টি নয়, এটি মানুষের অস্তিত্ব, সামাজিক সম্পর্ক এবং সভ্যতার ভিত্তি। ‘ফুড অ্যান্ড এক্সিটেন্স’ শিল্পকর্মে খাবারের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের সম্পর্কই দেখিয়েছি। সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হরেক রকম খাবার। বসার ব্যবস্থাও আছে, কিন্তু আপনি খেতে পারছেন না। জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। মাটি দূষিত হলে তার থেকে উৎপন্ন খাদ্যও দূষিত হয়। আমরা প্রতিনিয়ত খাবারের সঙ্গে পরোক্ষভাবে কীটনাশক গ্রহণ করছি, যা আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে দেখা দেয় অস্তিত্বের সংকট। কালো ও লাল মাটির সমন্বয়ে তৈরি শিল্পকর্মে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় বাঙালি খাবার এবং সঙ্গে কিছু ওষুধের প্যাকেট দিয়েছি। দুঃখজনকভাবে এটিও এখন আমাদের খাদ্যতালিকার অংশ হয়ে গেছে!

 

মৃত্তিকার সন্ধানে ওঁরা সাতজন

শিল্পী: রূপশ্রী হাজং

হাজংদের কাছে প্রকৃতিই জীবন

রূপশ্রী হাজং

হাজং জনগোষ্ঠীর বহু উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান প্রকৃতি থেকে উৎসারিত গল্প, বিশ্বাস ও প্রতীকের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। হাজংদের রয়েছে বন ও বনজ পরিবেশ সম্পর্কে নিজস্ব প্রথাগত জ্ঞান। তারা দীর্ঘকাল ধরে পবিত্র বৃক্ষ, জীববৈচিত্র্য, বন এবং জলাভূমি সংরক্ষণের চর্চা করে আসছে। খাদ্য, ওষুধ, আচার, উৎসব, গৃহস্থালি জীবন এবং দৈনন্দিন জীবিকা—সবই গভীরভাবে বন ও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। হাজংদের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসব চৈত্রসংক্রান্তি, যা হাজং ভাষায় হং অ রাণী নামে পরিচিত। হাজংদের কাছে গাছ, লতা, এমনকি পরজীবী উদ্ভিদও শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এগুলো বিশ্বাস, লোককথা এবং আচারগত প্রতীকবাদের গুরুত্বপূর্ণ বাহক। হং অ রাণী উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন উদ্ভিদ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে বহু কাহিনি ও প্রতীকী অর্থ। যেমন—গৌরপাংখা উদ্ভিদকে প্রবল বৃষ্টি ও ঝড় থেকে রক্ষাকারী হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। অন্যদিকে তিক্ত স্বাদের ঔষধি উদ্ভিদ ডুংনিটিতা রোগ-ব্যাধি থেকে সুরক্ষা প্রদান করে বলে ধারণা করা হয়। পারিবারিক শান্তি, মঙ্গল এবং অশুভ শক্তি থেকে সুরক্ষার আশায় এই উদ্ভিদগুলো ঐতিহ্যগতভাবে বাড়ির প্রবেশদ্বারে স্থাপন করা হয়। এই প্রথাগুলো হাজং জনগোষ্ঠীর সেই দৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে, যেখানে প্রকৃতি শুধু জীবনধারণের উপায় নয়, বরং আধ্যাত্মিকতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামষ্টিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুই ও সুতার বুননে সেটিই তুলে ধরেছি।

 

মৃত্তিকার সন্ধানে ওঁরা সাতজন

শিল্পী: খাইদেম সিথি সিনহা

মণিপুরি শিকড়ের গল্প

খাইদেম সিথি সিনহা

আমার শিল্পকর্মের মূল ভিত্তি ও মাধ্যম মণিপুরি তাঁত। একটি জাতির পোশাক তার আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী দর্পণ। আমাদের বুননশৈলীতে আদিকাল থেকেই প্রকৃতি সরাসরি বা রূপক অর্থে ঠাঁই করে নিয়েছে। বিশেষ করে মণিপুরি নারীদের ‘থামি’র পাঁচটি বিশেষ মোটিফ আমাদের জীবনদর্শনকে অর্থবহ করে তোলে। এর মধ্যে শসার বীজ মাতৃত্ব ও সৃষ্টির প্রতীক, আর টিয়াপাখির ঠোঁট মিষ্টভাষী নারীকে বোঝায়। ছোট মাছের চোখ দিয়ে আমরা আমাদের ভেতরের সুপ্ত প্রতিবাদী রূপকে প্রকাশ করি। নারী স্বভাবজাতভাবে কোমল হলেও সংকটে তিনি তেমনই দৃঢ়। একইভাবে মৌমাছি ও চাঁদের মোটিফ যথাক্রমে নারীর জীবনচক্র এবং চারপাশকে আলোকিত করার প্রেরণা জোগায়। তবে যান্ত্রিক তাঁতের দাপটে আমাদের এই হস্তচালিত ঐতিহ্য আজ অস্তিত্বের সংকটে। প্রকৃতি থেকে আহরিত সুতা ও রঙের সেই অকৃত্রিমতা আজ কৃত্রিমতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই শিল্প আজ প্রায় অচেনা। আমার এই সৃজনের মূল উদ্দেশ্য বিলীয়মান এই ঐতিহ্যের প্রতি সচেতনতা তৈরি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে শিকড়ের গল্প পৌঁছে দেওয়া।

 

মৃত্তিকার সন্ধানে ওঁরা সাতজন

শিল্পী: দীপ্র বণিক

পায়ের ছাপে বিলুপ্তির চিহ্ন

দীপ্র বণিক

একসময় দক্ষিণ এশিয়ার জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধতম অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আজকের বাংলাদেশ। বন উজাড়, আবাসের খণ্ডবিখণ্ডতা, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, বন্য প্রাণীর অবৈধ শিকার এবং ক্রমবর্ধমান মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে মারাত্মক বাস্তুসংস্থানিক অবনতি ঘটেছে, যার ফলে অগণিত প্রজাতি বিলুপ্ত ও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ‘এনডেনজার্ড জিওগ্রাফি’ একটি সমসাময়িক ভাস্কর্যভিত্তিক ইনস্টলেশন। প্রতিটি ভাস্কর্য নির্দিষ্ট প্রাণী তো বটেই, তার হারিয়ে যাওয়া আবাসের স্মৃতিকেও উপস্থাপন করে। দর্শনার্থীরা মেঝেতে বিছানো বিপন্ন প্রাণীদের মাটির পায়ের ছাপ অনুসরণ করে গ্যালারিতে প্রবেশ করে। এই পদচিহ্নগুলো এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির দিকে নিয়ে যায়, যা বাংলাদেশের বন, নদী, জলাভূমি ও তৃণভূমি থেকে বিলুপ্ত হতে থাকা বন্য প্রাণীর স্মৃতির প্রতীক। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এই শিল্পকর্ম।

 

মৃত্তিকার সন্ধানে ওঁরা সাতজন

শিল্পী: মো. ফয়জুল ইসলাম

বৃষ্টির ফোঁটা

মো. ফাইজুল ইসলাম

ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে আমি কাজ করেছি রেইন পলিউশন নিয়ে। আমরা যারা গ্রাম বা মফস্বল শহরে বড় হয়েছি, তারা বৃষ্টিটিকে উদযাপন করতাম। বৃষ্টিতে ভিজেছি, ফুটবলও খেলেছি ভিজে ভিজে। কিন্তু এখন বৃষ্টিতে ভেজার প্রসঙ্গ এলে শহুরে তরুণ-তরুণীদের ভাবতে হয়—অসুস্থ হয়ে যাব না তো! বৃষ্টি তো আগের মতোই আছে। তাহলে মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন এলো কিভাবে? আসলে এর পেছনে দূষণ একটি বড় কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানি, কলকারখানার দূষণ, প্লাস্টিক পোড়ানোতে কার্বনের পরিমাণ বাড়ছে। যেভাবে দূষণ বাড়ছে, তাতে হয়তো আগামী ১০০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশেও এসিড বৃষ্টির কবলে পড়তে পারে। বৃষ্টিও দূষণের কবলে পড়ছে। সেই ভাবনা থেকেই ঠিক করলাম, বৃষ্টির কিছু ফোঁটা বানাব—যেগুলো একেকটি একেক ধরনের কার্বন বোঝাবে। সেই জায়গা থেকে মাটি, প্লাস্টার অব প্যারিস, কাপড়, ফানেল, রেজিন ইত্যাদির সমন্বয়ে বৃষ্টির ফোঁটা বানিয়েছি।

 

মৃত্তিকার সন্ধানে ওঁরা সাতজন

শিল্পী: মো. হাশেম

মানুষ নতুন করে ভাবুক

মো. হাশেম

আমার কাজের শিরোনাম ‘টপসয়েলের শেষ স্তর’। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি ভূদৃশ্য, ঝিরি, ঝরনা এবং সাঙ্গু নদীকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি গবেষণাভিত্তিক শিল্প প্রকল্প। ছোটবেলা থেকেই পাহাড়, ঝিরি ও নদীর সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক। অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, পাহাড়ে আগুন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে পাহাড় ও নদী দ্রুত পরিবর্তিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই এই কাজের মূল অনুপ্রেরণা। এই প্রকল্পের কেন্দ্রে রয়েছে টপসয়েল। পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর স্তর, যেখানে অণুজীব, খনিজ, বীজ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনা সংরক্ষিত থাকে। মাত্র এক সেন্টিমিটার টপসয়েল তৈরি হতে শত থেকে হাজার বছর সময় লাগে। অথচ মানুষের কয়েক বছরের কর্মকাণ্ডেই এটি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই আমার কাছে টপসয়েল পৃথিবীর স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি। এই কাজের জন্য দীর্ঘ সময় পাহাড়ি অঞ্চল, ঝিরি ও নদী ঘুরেছি, পরিবর্তিত ভূদৃশ্য পর্যবেক্ষণ করেছি এবং আলোকচিত্রের মাধ্যমে সেই পরিবর্তন নথিবদ্ধ করেছি। সেই গবেষণা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাটি, পোড়ামাটি, বিভিন্ন টেক্সচার এবং মিশ্র মাধ্যম ব্যবহার করে এই ক্যানভাসে ভিজ্যুয়াল ভাষা নির্মাণ করেছি। টপসয়েলের ক্ষয় মানে একটি ভূখণ্ডের ইতিহাস ও সম্ভাবনার ক্ষয়। আমি চাই দর্শক প্রকৃতি, মাটি এবং মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবুক।

 

মৃত্তিকার সন্ধানে ওঁরা সাতজন

শিল্পী: লুৎফা মাহমুদা

স্মৃতি রয়ে যায়

লুৎফা মাহমুদা

‘অন্তর্ভুক্তির খণ্ডচিত্র বা Fragments of Belonging’ শিল্পকর্মটি আসলে স্মৃতি, পরিচয়, স্থান এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের গল্প বলে। এটি মনে করিয়ে দেয়, ‘অন্তর্ভুক্তি’ বা ‘আপন হওয়া’ কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, আবার স্থায়ী কোনো অবস্থাও নয়। বরং জীবনের অভিজ্ঞতা, অভিবাসন, সংস্কৃতির বিনিময়, বিচ্ছেদ ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে এটি প্রতিনিয়ত নতুনভাবে গড়ে ওঠে। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের ফেলে আসা স্থানের ভাষা, সংস্কৃতি, সম্পর্ক, অনুভূতি ও প্রকৃতির স্মৃতি নিজের ভেতরে বহন করে চলি। স্থান বদলালেও সেই স্মৃতিগুলো থাকে। পাখির বাসার মতো দেখতে এই ইনস্টলেশনটি একাধিক পরস্পর সংযুক্ত মডিউল নিয়ে তৈরি। এটি একই সঙ্গে আজকের বিশ্বের বাস্তবতাকেও তুলে ধরে। অভিবাসন, বিশ্বায়ন, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে। তারা নিজের সঙ্গে পুরনো বাড়ির স্মৃতি বহন করে, আবার নতুন জায়গাকেও নিজের পরিচয়ের অংশ করে নেয়। ফলে ‘বাড়ি’ আর শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি হয়ে ওঠে সম্পর্ক, স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার এক চলমান মানচিত্র।

 

 

 

রাশেদ এখন উদাহরণ

একসময় তিন বেলা পেট ভরে খেতে পেতেন না। জীবিকার তাগিদে কখনো দিনমজুর, কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে কাজ করেছেন। সেই রাশেদ এখন মাসে খাবার বিক্রি করেন প্রায় ২০ লাখ টাকার। লিখেছেন মো. মুজিবুর রহমান দুলাল

রাশেদ এখন উদাহরণ

সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। ছোটবেলায় ঠিকমতো তিন বেলা খাবার জোটেনি। তবে লেখাপড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল রাশেদের। লেখাপড়ার পাশাপাশি অন্যের জমিতে গতর খাটতেন। যা পেতেন, তা দিয়েই খাতা-কলম কিনতেন। সকালে পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে পড়ানোর সুবাদে ওই সব বাড়িতে নাশতা সেরে নিতেন। অনেক সময় না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। রাশেদের জীবনে এমন গল্প কম নয়। টিফিনের সময় সহপাঠীরা চলে যেত দোকানে নাশতা খেতে। রাশেদ যেতেন বাড়ির পাশে একটি মসজিদে। মুয়াজ্জিনের অনুপস্থিতিতে আজান দিতেন। দুপুরে মুয়াজ্জিনের জন্য গ্রামবাসী যে খাবার পাঠাত, ওই খাবারের একটা অংশ খেয়েই আবার স্কুলে যেতেন।

লাকসাম উপজেলার উত্তরদা ইউনিয়নের চন্দনা গ্রামের বদিউল আলম পাটোয়ারীর ছেলে রাশেদ। পুরো নাম রাশেদুল আলম পাটোয়ারী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাবার দ্বিতীয় সংসারের সন্তান তাঁরা। প্রথম সংসারেও রয়েছে তাঁর দুই ভাই ও এক বোন। তাঁরা চট্টগ্রামে থাকেন। নিজেদের কোনো জায়গাজমি নেই। এখন লাকসাম পৌর শহরের নশরতপুরে একটি ভাড়া বাড়িতে মা, ভাই-বোনসহ থাকেন রাশেদ। বড় ভাই মাসুদুল আলম পাটোয়ারী একসময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। এখন নিজেদের দোকানে বাবুর্চির কাজ করেন।

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে রাশেদ এখন চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ইংরেজি বিষয়ে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন।

তাঁর বাবা দৈনিক হাজিরাভিত্তিক চট্টগ্রামে টিঅ্যান্ডটিতে চাকরি করতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার চাকরি চলে যায়। সংসারে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। ঠিকমতো খাবারই জুটত না। ফলে অন্যের জমিতে কাজ করে তাঁকে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে হয়েছে।

উত্তরদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উমা ঘোষ ও সহকারী শিক্ষক উজ্জ্বলা রাণী দাসের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় পঞ্চম শ্রেণিতে জিপিএ ৫ পেয়েছেন রাশেদ। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন উত্তরদা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সন্ধ্যায় টিউশনি করতেন। দিনমজুরের কাজ করতেন স্কুলের ফাঁকে ফাঁকে। তবে পড়াশোনায় ফাঁকি দেননি।

জেএসসিতে জিপিএ ৫ এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ করেন রাশেদ। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের লেখাপড়ার ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি সংসারেও জোগান দেন।

ছোটবেলা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন রাশেদের। নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির কয়েক দিন পরই চলে যান চট্টগ্রামে। সেখানে দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে টাইলস মিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ নেন। সারা দিনের কঠোর পরিশ্রম শেষে সন্ধ্যায় পড়তে বসতেন। কিছুদিন পর পরিচিত কয়েকজনের সহযোগিতায় কাজ নেন কর্ণফুলী স্টিল মিলে। সেখানেও কঠোর পরিশ্রম। তবু ভালো—আট ঘণ্টা কাজ, বেতনও বেশি। দৈনিক ৪০০ টাকা।

ওই কারখানার কিছু কর্মকর্তা বিদেশি। কাজ বুঝে নিতে তাদের সঙ্গে রাশেদ মাঝেমধ্যে ইংরেজিতে কথা বলতেন। তাঁর কথোপকথন দেখে সহকর্মীদের অনুরোধে কাজের শেষে তাঁদের ইংরেজি শেখান রাশেদ। সেখান থেকেও তাঁর কিছু আয় হয়।

এভাবে কিছু অর্থ জমিয়ে সেখানেই শুরু করেন ফুচকা বিক্রি। বিকেলে কারখানা ছুটি শেষে ফুচকা বিক্রি করতেন। অল্পদিনেই তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নেন। মা আর বোনকে নিয়ে আসেন। তাঁরাও ব্যবসার কাজে সহযোগিতা করেন। কিন্তু বিধিবাম! হঠাৎ করোনা শুরু হলে চাকরি, ব্যবসা—সব গুটিয়ে বাড়ি চলে আসতে বাধ্য হন। কাজ নেন একটি রড-সিমেন্টের দোকানে।

করোনার পর সঞ্চিত টাকায় আরেকটি ফুচকা দোকান শুরু করেন। ঋণ নিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছেন। ফুচকা দোকানটি তো রয়েছেই। লাকসাম পৌর শহরের রেলওয়ে জংশন এলাকায় লেকের পারে ‘লেক ভিউ’ নামে বড় পরিসরে আরেকটি খাবারের দোকানও চালু করেছেন। দুটি দোকানে প্রচুর বেচাকেনা হয়।

রাশেদ জানান, এখন তাঁর ব্যবসার পুঁজি প্রায় ২৭ লাখ টাকা। বর্তমানে তাঁর তত্ত্বাধবানে দুটি প্রতিষ্ঠানে ১২ জন কর্মী আছেন। সেখান থেকে প্রতি মাসে গড়ে ২০ লাখ টাকার খাবার বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে কমপক্ষে দুই লাখ টাকা লাভ হয়।

রাশেদ এখন জায়গা কিনে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন। যেখানে এক ছাদের নিচে মা, ভাই-বোনসহ সবাই মিলে বসবাস করবেন। রাশেদ বলেন, সততা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর ভালো মানের খাবার সরবরাহের ফলে সাফল্য ধরা দিয়েছে। কোনো কাজকে ছোট করে দেখতে নেই। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং সঞ্চয়ী মনোভাব থাকলে যেকোনো স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

 

 

 

জল ও মশকের হারিয়ে যাওয়া সুর

মনোয়ার হোসেন রনি
জল ও মশকের হারিয়ে যাওয়া সুর
অলংকরণ : তানভীর মালেক

শৈশবের স্মৃতি বড় অদ্ভুত। চারপাশের চেনা জগৎ তখন রূপকথার মতো মনে হতো। মনে পড়ে, ছোটবেলায় পুরান ঢাকার বনগ্রামে খালার বাসায় বেড়াতে যেতাম। সেই সরু গলি, পুরনো দালানের বারান্দা, আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো পাশের বাসার কিছু বিহারি মানুষের উর্দু ভাষার এক মায়াবী সুর—সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জীবন।

একদিন খালার বাসা থেকে বের হয়ে ঠাটারীবাজারের দিকে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমাদের পাশ কাটিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে গেলেন এক প্রবীণ মানুষ। মাথায় কিস্তি টুপি, মিশমিশে কালো চাপদাড়ি, কোমরে ভেজা গামছা আর কাঁধে ঝুলছে এক রহস্যময় কালো চামড়ার ব্যাগ। কৌতূহল সামলাতে না পেরে খালাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভাইয়া, ওই ব্যাগে কী?’ উত্তর পেয়েছিলাম, ‘খাওয়ার পানি।’

সেদিন হয়তো কৌতূহল মিটেছিল, কিন্তু আজ এই পরিণত বয়সে এসে বুঝি—সেদিন শুধু একজন মানুষকে দেখিনি, দেখেছিলাম ঢাকা শহরের এক জীবন্ত ইতিহাসকে। আজ সেই মানুষগুলো হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে তাদের পেশা। কিন্তু মনের মণিকোঠায় আজও তা অমলিন।

সালটা ১৮৬০। বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে তখনো ভোরের কুয়াশা ভাসছে। বাকরখানির সুবাস আর ভেজা মাটির গন্ধ নিয়ে মাত্র জেগে উঠছে ঢাকা শহর। লালবাগ আর চকবাজারের সরু, আঁকাবাঁকা গলিগুলোর মধ্য দিয়ে একটা চেনা, ছন্দোময় শব্দ ইটের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—ছলাতছলাত, ছলাতছলাত। ভারী পশুর চামড়ার ব্যাগের ভেতরে পানির দুলুনির শব্দ এটি, যার সঙ্গে মিশে আছে একজন মানুষের ক্লান্তিহীন পদশব্দ। তিনি হলেন ভিস্তিওয়ালা—পুরান ঢাকার এক অঘোষিত জীবনদাতা, যাঁকে ছাড়া সে যুগের নগরজীবন একমুহূর্তের জন্যও কল্পনা করা যেত না।

 

‘বেহেশত’ থেকে ‘ভিস্তি’ : স্বর্গের সুধা বিলানো মানুষ

ভিস্তি বা ভিসতি শব্দের উৎস অত্যন্ত চমৎকার। এটি এসেছে ফারসি শব্দ বেহেশত থেকে, যার অর্থ স্বর্গ। ইসলামি বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতিতে তৃষ্ণার্তকে জলপান করানো এক পরম পুণ্যের কাজ। সেই স্বর্গীয় বারতা ও স্বস্তি যিনি বয়ে নিয়ে আসতেন, তিনিই ‘বেহেশতি’ বা অপভ্রংশে ‘ভিস্তিওয়ালা’। ঢাকার মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই স্বর্গের সুধা নিয়ে আসা ত্রাণকর্তা।

 

চামড়ার ‘মশক’ ও বুড়িগঙ্গার জল

আধুনিক প্লাস্টিক বা লোহার পাইপলাইনের যুগে পৌঁছানোর বহু আগে, ঢাকায় পানি ছিল এক পরম বিলাসের বস্তু। বিহার ও উত্তর ভারত থেকে আসা এই সংগ্রামী মানুষগুলো ছাগল বা ভেড়ার আস্ত চামড়া দিয়ে তৈরি মশক নামক জলরোধী ব্যাগে পানি বহন করতেন। চামড়াটিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হতো, যাতে তীব্র গরমেও ভেতরের পানি চমৎকার ঠাণ্ডা থাকত। ভোরের আজানের আগেই বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ বুক কিংবা শহরের বড় বড় দিঘি থেকে প্রায় ৩৫ কেজি পানি দিয়ে মশক পূর্ণ করে তাঁরা শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়তেন। নবাবদের আলিশান প্রাসাদ থেকে শুরু করে সাধারণের রান্নাঘর—সবখানেই ছিল তাঁদের অবাধ যাতায়াত।

 

দিল্লি থেকে ঢাকা : রাজকীয় ইতিহাসের সাক্ষী

ভিস্তিওয়ালাদের ইতিহাস শুধু ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ নয়, তা দিল্লি আর কলকাতার ইতিহাসেও অনন্য মর্যাদায় ভাস্বর। দিল্লির নবাব মোগল সম্রাট হুমায়ুন যখন শেরশাহর কাছে পরাজিত হয়ে গঙ্গায় ডুবে যাচ্ছিলেন, তখন ‘নিজাম’ নামের এক সাধারণ ভিস্তি নিজের মশক দিয়ে সম্রাটকে টেনে তুলে জীবন বাঁচান। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সম্রাট হুমায়ুন তাঁকে এক দিনের জন্য দিল্লির সিংহাসনে বসিয়েছিলেন।

 

কলকাতার বাবু কালচার

লর্ড ক্লাইভের আমল থেকে শুরু করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, কলকাতার রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা ও বাবুদের ঘরে পানি সরবরাহে ভিস্তিওয়ালারা ছিলেন অপরিহার্য। ঢাকার নবাব আব্দুল গনি ১৮৭৮ সালে যখন প্রথম ফিল্টার পানির ব্যবস্থা (ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস) করেন, তখনো ভিস্তিরা প্রাসঙ্গিক ছিলেন। তাঁরাই উঁচু তলার বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিতেন। পুরান ঢাকার ‘ভিস্তিখানা’ এলাকাটি আজও তাঁদের স্মৃতি বহন করছে।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক প্লাম্বিং ও টিউবওয়েলের আবির্ভাবে ঢাকা থেকে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকে মশকের সেই ছলাতছলাত সুর। আজ বুড়িগঙ্গার জলও আর আগের মতো স্বচ্ছ নেই, আর ব্যস্ত ঢাকার রাজপথেও দেখা মেলে না সেই কাঁধে মশক নেওয়া মানুষগুলোর।

নতুন প্রজন্মের কাছে এই সমৃদ্ধ ইতিহাস এখন রূপকথা। আমাদের শিকড় ও ঐতিহ্যের স্বার্থেই এই হারিয়ে যাওয়া ভিস্তিওয়ালা বা সাক্কাদের কথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে কিভাবে এক টুকরা চামড়ার ব্যাগে চড়ে একসময় বয়ে চলত গোটা ঢাকা শহরের প্রাণশক্তি।

 

 

 

মাঠে বসে মেসির হ্যাটট্রিক দেখা ভাগ্যের ব্যাপার

লিওনেল মেসির পাঁড় ভক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দ্য বোয়িং কম্পানির সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার শুভেচ্ছা চক্রবর্তী। এবারের বিশ্বকাপে মাঠে বসে দেখেছেন প্রিয় তারকার হ্যাটট্টিক। সেই গল্প শুনিয়েছেন তিনি

মাঠে বসে মেসির হ্যাটট্রিক দেখা ভাগ্যের ব্যাপার
স্টেডিয়ামে পরিবারসহ লেখক

১৩ জুলাই ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল। জার্মানির কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। ওই রাতেই আমার ফ্লাইট। সবকিছু পেছনে ফেলে আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছি। কিন্তু মনে তখন একটিই কষ্ট—আর্জেন্টিনার পরাজয়। সেই আমি আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনাল দেখলাম সরাসরি মাঠে বসে। ১৯৯৮, ২০০২-এর হতাশা দেখেছি, ২০০৬-এর আক্ষেপ দেখেছি, ২০১০-এর ব্যর্থতা দেখেছি, ২০১৪-এর ফাইনালে হৃদয়ভাঙা দেখেছি, ২০১৮-এর কষ্ট দেখেছি। তার পরও দল ছাড়িনি। অনেকেই ঠাট্টা করে আর্জেন্টিনাকে বলত, আরজেতেনা। বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে, বিশ্বাস ধরে, ভালোবাসা ধরে একই দলের পাশে থেকেছি। সময় অনেক গড়িয়েছে। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতল। আমেরিকা ২০২৬ ওয়ার্ল্ড কাপের আয়োজক এবং আমাদের খুব কাছের শহর কানসাস সিটিও একটি ওয়ার্ল্ড কাপ ভেন্যু। বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় এক মাস আগেই কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছিলাম। অনেক হিসাব-নিকাশ করে সম্ভাব্য সব ব্র্যাকেট আর ম্যাচআপ বিশ্লেষণ করেছিলাম। কানসাস সিটির কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল আর্জেন্টিনার। মেসি বনাম রোনালদোকে একসঙ্গে মাঠে দেখার সুযোগ তো স্বপ্নের মতো! কিন্তু পর্তুগাল হতাশ করল। এরপর আশা করছিলাম আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে কলম্বিয়া। কলম্বিয়াও বিদায় নিল। আর্জেন্টিনাও মিসরের বিপক্ষে প্রায় বিদায়ের মুখে চলে গিয়েছিল। সেই ম্যাচ চলাকালে মনে হচ্ছিল, যদি আর্জেন্টিনা হেরে যায়, তাহলে আমার টিকিট বিক্রিও হবে না, পুরো টাকাটাই জলে যাবে। কিন্তু ঈশ্বর আর আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা ছিল অন্য রকম। দুর্দান্তভাবে মিসরকে হারিয়ে দিল। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। এই ওয়ার্ল্ড কাপে আর্জেন্টিনার তিনটি খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে মাঠে বসে। প্রথম খেলা আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া, কানসাস সিটিতে। দেখে এলাম সংগীতা, সায়েশা, সাত্ত্বিকসহ। মাঠে বসে মেসির হ্যাটট্রিক দেখা—এ এক অন্য অনুভূতি। দ্বিতীয় খেলা আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া, ডালাসে। ওই খেলায়ও মেসির দুই গোল, দেখে এলাম বন্ধু অরুপের সঙ্গে। তৃতীয় খেলা আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড, নিজেদের শহর কানসাস সিটিতে।

ম্যাচের দিন খুব ভোরেই যাত্রা শুরু করলাম। আমার শহর উইচিটা থেকে স্টেডিয়ামের দূরত্ব প্রায় তিন ঘণ্টার ড্রাইভ। টানা গাড়ি চালিয়ে প্রথমে পৌঁছে গেলাম কানসাস সিটির ফিফা ফ্যান ফেস্টিভালে। সেখানে উৎসবের অসাধারণ আমেজ। চারদিকে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী, নানা ধরনের ফ্যান অ্যাক্টিভিটি। সেখানে অল আমেরিকান ব্যান্ডের লাইভ কনসার্ট উপভোগ করলাম। বিশাল স্ক্রিনে ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে ম্যাচের প্রথমার্ধ দেখলাম। পরে রওনা দিলাম স্টেডিয়ামের দিকে। যাত্রাপথে দেখা হলো আর্জেন্টিনা থেকে আগত সাপোর্টারদের সঙ্গে। ওরা বাংলাদেশের পতাকা দেখে সহজেই চিনে ফেলল—আমি বাংলাদেশি। বলল, আমরা বাংলাদেশিরা নাকি অলমোস্ট আর্জেন্টাইন। আমাকে অনুরোধ করল আর্জেন্টিনা ভ্রমণের জন্য। স্টেডিয়ামের ভেতরেই উইচিটা থেকে আসা বাংলাদেশের কয়েকজন আর্জেন্টিনা সমর্থকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। পরিচয় হলো প্রশান্ত, শৈবাল, সুদীপ, অনীক, সারজিল, রেজা নেহাল, সুমিতসহ আরো অনেকের সঙ্গে। মনে হচ্ছিল, যেন কানসাস সিটিতেই ছোট্ট একটি বাংলাদেশ। পুরো স্টেডিয়ামটাই যেন নীল-সাদা সমুদ্র। তারা আমাকে একদম নিজেদের একজন করে নিয়েছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল, ছবি তুলেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটা ছিল রোমাঞ্চে ভরা। খেলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আর্জেন্টিনা গোল করে বসে। সঙ্গে সঙ্গে পুরো স্টেডিয়াম যেন বিস্ফোরিত হলো আনন্দে। সবাই নাচছে, গাইছে, হাততালি দিচ্ছে। সে মুহূর্তটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পাশের আর্জেন্টাইন সমর্থকরা আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর সুইজারল্যান্ডও গোল শোধ করে দিল। মুহূর্তেই পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এরপর রেফারি প্রথমে আর্জেন্টিনার এক খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখালেন। ঠিক তখনই বড় স্ক্রিনে দেখানো হলো, ভিএআরে ভুল ধরা পড়েছে। রেফারি লাল কার্ড বের করলেন। সুইজারল্যান্ডের একজন খেলোয়াড়কে দেখানো হয়েছে। তখন যেন সবাই আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে জয় পেল। পুরো স্টেডিয়াম আবার উৎসবে মেতে উঠল। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, এ আনন্দের কোনো শেষ নেই।

আমার নিজের রাজ্যেই চোখের সামনে সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনাকে খেলতে দেখা—এটি সত্যি জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদগুলোর একটি। এই স্মৃতি সারা জীবন হৃদয়ে আগলে রাখব।