.jpg)
খাইদেম সিথি সিনহা, বনানী সিমলাই, দীপ্র বণিক, রূপশ্রী হাজং, মো. ফাইজুল ইসলাম, লুৎফা মাহমুদা ও মো. হাশেম
ওষুধও এখন খাদ্যতালিকার অংশ
বনানী সিমলাই
‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—বহুল প্রচলিত এই বাংলা প্রবাদটিতে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূগোল, স্মৃতি এবং পরিচয়ের প্রতিফলন মেলে। বাঙালির কাছে যেমন ভাত ছাড়া খাবার অসম্পূর্ণ, তেমনি পৃথিবীর বহু সংস্কৃতিতেই খাদ্য শুধু শরীরের পুষ্টি নয়, এটি মানুষের অস্তিত্ব, সামাজিক সম্পর্ক এবং সভ্যতার ভিত্তি। ‘ফুড অ্যান্ড এক্সিটেন্স’ শিল্পকর্মে খাবারের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের সম্পর্কই দেখিয়েছি। সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হরেক রকম খাবার। বসার ব্যবস্থাও আছে, কিন্তু আপনি খেতে পারছেন না। জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। মাটি দূষিত হলে তার থেকে উৎপন্ন খাদ্যও দূষিত হয়। আমরা প্রতিনিয়ত খাবারের সঙ্গে পরোক্ষভাবে কীটনাশক গ্রহণ করছি, যা আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে দেখা দেয় অস্তিত্বের সংকট। কালো ও লাল মাটির সমন্বয়ে তৈরি শিল্পকর্মে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় বাঙালি খাবার এবং সঙ্গে কিছু ওষুধের প্যাকেট দিয়েছি। দুঃখজনকভাবে এটিও এখন আমাদের খাদ্যতালিকার অংশ হয়ে গেছে!

শিল্পী: রূপশ্রী হাজং
হাজংদের কাছে প্রকৃতিই জীবন
রূপশ্রী হাজং
হাজং জনগোষ্ঠীর বহু উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান প্রকৃতি থেকে উৎসারিত গল্প, বিশ্বাস ও প্রতীকের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। হাজংদের রয়েছে বন ও বনজ পরিবেশ সম্পর্কে নিজস্ব প্রথাগত জ্ঞান। তারা দীর্ঘকাল ধরে পবিত্র বৃক্ষ, জীববৈচিত্র্য, বন এবং জলাভূমি সংরক্ষণের চর্চা করে আসছে। খাদ্য, ওষুধ, আচার, উৎসব, গৃহস্থালি জীবন এবং দৈনন্দিন জীবিকা—সবই গভীরভাবে বন ও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। হাজংদের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসব চৈত্রসংক্রান্তি, যা হাজং ভাষায় হং অ রাণী নামে পরিচিত। হাজংদের কাছে গাছ, লতা, এমনকি পরজীবী উদ্ভিদও শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এগুলো বিশ্বাস, লোককথা এবং আচারগত প্রতীকবাদের গুরুত্বপূর্ণ বাহক। হং অ রাণী উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন উদ্ভিদ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে বহু কাহিনি ও প্রতীকী অর্থ। যেমন—গৌরপাংখা উদ্ভিদকে প্রবল বৃষ্টি ও ঝড় থেকে রক্ষাকারী হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। অন্যদিকে তিক্ত স্বাদের ঔষধি উদ্ভিদ ডুংনিটিতা রোগ-ব্যাধি থেকে সুরক্ষা প্রদান করে বলে ধারণা করা হয়। পারিবারিক শান্তি, মঙ্গল এবং অশুভ শক্তি থেকে সুরক্ষার আশায় এই উদ্ভিদগুলো ঐতিহ্যগতভাবে বাড়ির প্রবেশদ্বারে স্থাপন করা হয়। এই প্রথাগুলো হাজং জনগোষ্ঠীর সেই দৃষ্টিকে প্রতিফলিত করে, যেখানে প্রকৃতি শুধু জীবনধারণের উপায় নয়, বরং আধ্যাত্মিকতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামষ্টিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুই ও সুতার বুননে সেটিই তুলে ধরেছি।

শিল্পী: খাইদেম সিথি সিনহা
মণিপুরি শিকড়ের গল্প
খাইদেম সিথি সিনহা
আমার শিল্পকর্মের মূল ভিত্তি ও মাধ্যম মণিপুরি তাঁত। একটি জাতির পোশাক তার আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী দর্পণ। আমাদের বুননশৈলীতে আদিকাল থেকেই প্রকৃতি সরাসরি বা রূপক অর্থে ঠাঁই করে নিয়েছে। বিশেষ করে মণিপুরি নারীদের ‘থামি’র পাঁচটি বিশেষ মোটিফ আমাদের জীবনদর্শনকে অর্থবহ করে তোলে। এর মধ্যে শসার বীজ মাতৃত্ব ও সৃষ্টির প্রতীক, আর টিয়াপাখির ঠোঁট মিষ্টভাষী নারীকে বোঝায়। ছোট মাছের চোখ দিয়ে আমরা আমাদের ভেতরের সুপ্ত প্রতিবাদী রূপকে প্রকাশ করি। নারী স্বভাবজাতভাবে কোমল হলেও সংকটে তিনি তেমনই দৃঢ়। একইভাবে মৌমাছি ও চাঁদের মোটিফ যথাক্রমে নারীর জীবনচক্র এবং চারপাশকে আলোকিত করার প্রেরণা জোগায়। তবে যান্ত্রিক তাঁতের দাপটে আমাদের এই হস্তচালিত ঐতিহ্য আজ অস্তিত্বের সংকটে। প্রকৃতি থেকে আহরিত সুতা ও রঙের সেই অকৃত্রিমতা আজ কৃত্রিমতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই শিল্প আজ প্রায় অচেনা। আমার এই সৃজনের মূল উদ্দেশ্য বিলীয়মান এই ঐতিহ্যের প্রতি সচেতনতা তৈরি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে শিকড়ের গল্প পৌঁছে দেওয়া।

শিল্পী: দীপ্র বণিক
পায়ের ছাপে বিলুপ্তির চিহ্ন
দীপ্র বণিক
একসময় দক্ষিণ এশিয়ার জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধতম অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আজকের বাংলাদেশ। বন উজাড়, আবাসের খণ্ডবিখণ্ডতা, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, বন্য প্রাণীর অবৈধ শিকার এবং ক্রমবর্ধমান মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে মারাত্মক বাস্তুসংস্থানিক অবনতি ঘটেছে, যার ফলে অগণিত প্রজাতি বিলুপ্ত ও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ‘এনডেনজার্ড জিওগ্রাফি’ একটি সমসাময়িক ভাস্কর্যভিত্তিক ইনস্টলেশন। প্রতিটি ভাস্কর্য নির্দিষ্ট প্রাণী তো বটেই, তার হারিয়ে যাওয়া আবাসের স্মৃতিকেও উপস্থাপন করে। দর্শনার্থীরা মেঝেতে বিছানো বিপন্ন প্রাণীদের মাটির পায়ের ছাপ অনুসরণ করে গ্যালারিতে প্রবেশ করে। এই পদচিহ্নগুলো এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির দিকে নিয়ে যায়, যা বাংলাদেশের বন, নদী, জলাভূমি ও তৃণভূমি থেকে বিলুপ্ত হতে থাকা বন্য প্রাণীর স্মৃতির প্রতীক। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এই শিল্পকর্ম।

শিল্পী: মো. ফয়জুল ইসলাম
বৃষ্টির ফোঁটা
মো. ফাইজুল ইসলাম
ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে আমি কাজ করেছি রেইন পলিউশন নিয়ে। আমরা যারা গ্রাম বা মফস্বল শহরে বড় হয়েছি, তারা বৃষ্টিটিকে উদযাপন করতাম। বৃষ্টিতে ভিজেছি, ফুটবলও খেলেছি ভিজে ভিজে। কিন্তু এখন বৃষ্টিতে ভেজার প্রসঙ্গ এলে শহুরে তরুণ-তরুণীদের ভাবতে হয়—অসুস্থ হয়ে যাব না তো! বৃষ্টি তো আগের মতোই আছে। তাহলে মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন এলো কিভাবে? আসলে এর পেছনে দূষণ একটি বড় কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানি, কলকারখানার দূষণ, প্লাস্টিক পোড়ানোতে কার্বনের পরিমাণ বাড়ছে। যেভাবে দূষণ বাড়ছে, তাতে হয়তো আগামী ১০০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশেও এসিড বৃষ্টির কবলে পড়তে পারে। বৃষ্টিও দূষণের কবলে পড়ছে। সেই ভাবনা থেকেই ঠিক করলাম, বৃষ্টির কিছু ফোঁটা বানাব—যেগুলো একেকটি একেক ধরনের কার্বন বোঝাবে। সেই জায়গা থেকে মাটি, প্লাস্টার অব প্যারিস, কাপড়, ফানেল, রেজিন ইত্যাদির সমন্বয়ে বৃষ্টির ফোঁটা বানিয়েছি।

শিল্পী: মো. হাশেম
মানুষ নতুন করে ভাবুক
মো. হাশেম
আমার কাজের শিরোনাম ‘টপসয়েলের শেষ স্তর’। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি ভূদৃশ্য, ঝিরি, ঝরনা এবং সাঙ্গু নদীকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি গবেষণাভিত্তিক শিল্প প্রকল্প। ছোটবেলা থেকেই পাহাড়, ঝিরি ও নদীর সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক। অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, পাহাড়ে আগুন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে পাহাড় ও নদী দ্রুত পরিবর্তিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই এই কাজের মূল অনুপ্রেরণা। এই প্রকল্পের কেন্দ্রে রয়েছে টপসয়েল। পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর স্তর, যেখানে অণুজীব, খনিজ, বীজ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনা সংরক্ষিত থাকে। মাত্র এক সেন্টিমিটার টপসয়েল তৈরি হতে শত থেকে হাজার বছর সময় লাগে। অথচ মানুষের কয়েক বছরের কর্মকাণ্ডেই এটি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই আমার কাছে টপসয়েল পৃথিবীর স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি। এই কাজের জন্য দীর্ঘ সময় পাহাড়ি অঞ্চল, ঝিরি ও নদী ঘুরেছি, পরিবর্তিত ভূদৃশ্য পর্যবেক্ষণ করেছি এবং আলোকচিত্রের মাধ্যমে সেই পরিবর্তন নথিবদ্ধ করেছি। সেই গবেষণা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাটি, পোড়ামাটি, বিভিন্ন টেক্সচার এবং মিশ্র মাধ্যম ব্যবহার করে এই ক্যানভাসে ভিজ্যুয়াল ভাষা নির্মাণ করেছি। টপসয়েলের ক্ষয় মানে একটি ভূখণ্ডের ইতিহাস ও সম্ভাবনার ক্ষয়। আমি চাই দর্শক প্রকৃতি, মাটি এবং মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবুক।

শিল্পী: লুৎফা মাহমুদা
স্মৃতি রয়ে যায়
লুৎফা মাহমুদা
‘অন্তর্ভুক্তির খণ্ডচিত্র বা Fragments of Belonging’ শিল্পকর্মটি আসলে স্মৃতি, পরিচয়, স্থান এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের গল্প বলে। এটি মনে করিয়ে দেয়, ‘অন্তর্ভুক্তি’ বা ‘আপন হওয়া’ কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, আবার স্থায়ী কোনো অবস্থাও নয়। বরং জীবনের অভিজ্ঞতা, অভিবাসন, সংস্কৃতির বিনিময়, বিচ্ছেদ ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে এটি প্রতিনিয়ত নতুনভাবে গড়ে ওঠে। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের ফেলে আসা স্থানের ভাষা, সংস্কৃতি, সম্পর্ক, অনুভূতি ও প্রকৃতির স্মৃতি নিজের ভেতরে বহন করে চলি। স্থান বদলালেও সেই স্মৃতিগুলো থাকে। পাখির বাসার মতো দেখতে এই ইনস্টলেশনটি একাধিক পরস্পর সংযুক্ত মডিউল নিয়ে তৈরি। এটি একই সঙ্গে আজকের বিশ্বের বাস্তবতাকেও তুলে ধরে। অভিবাসন, বিশ্বায়ন, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে। তারা নিজের সঙ্গে পুরনো বাড়ির স্মৃতি বহন করে, আবার নতুন জায়গাকেও নিজের পরিচয়ের অংশ করে নেয়। ফলে ‘বাড়ি’ আর শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি হয়ে ওঠে সম্পর্ক, স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার এক চলমান মানচিত্র।




