মা ছিলেন ডাক্তারের মেয়ে। গায়ের রং ফরসা, গোলাকার মুখ। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি কিংবা শ্যামাসংগীতে মায়ের তুলনা ছিল না। প্রতিবছর মনসাপূজার এক মাস আগে থেকে ‘মনসামঙ্গল’ পাঠ শুরু করতেন। গ্রামের নারীরা এসে মায়ের সঙ্গে সুর মেলাতেন। মায়ের হাতের রান্না যে একবার খেয়েছে, সে বারবার আমাদের বাড়ি এসেছে। বাবা সেটলমেন্টের চাকরি করতেন। কী এক অজ্ঞাত কারণে বাবাসহ তাঁদের অফিসের সবার চাকরি চলে যায়। বাবা তখন ম্যাট্রিক পাস। বাড়িতে এসে দাদুর পরামর্শে একটি মুদি দোকান দেন। বিষয়টি ভালো চোখে দেখলেন না মা। তিনি বাবাকে বললেন, ‘আমি ডাক্তারের মেয়ে। আমার স্বামী একজন মুদি দোকানদার—এটি সবাইকে কিভাবে বলব? তোমাকে সরকারি চাকরি করতে হবে।’
বাবা রাজি হননি। বাড়ির কাছেই উপজেলা সদরে ছিল তাঁর দোকান। মা বললেন, ‘এক কাজ করো। তুমি প্রাইমারি স্কুলের চাকরির পরীক্ষা দাও। এর আগে পিটিআই শেষ করো।’ বাবা বললেন, ‘পিটিআই পড়তে তো টাকা লাগবে। টাকা কোথায়? তা ছাড়া আমাকে খুলনায় গিয়ে পড়তে হবে। এদিকে সংসার কিভাবে চলবে?’ মা হেসে বললেন, ‘টাকা আমি দেব। আমার সোনার অলংকার বিক্রি করে তুমি টাকা নিয়ে এসো।’ বাবা প্রথমে রাজি হননি। মা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন। পরে রাগ করে মা তাঁর বাবার বাড়ি বরিশালে চলে গেলেন। দিন দশেক পর মাকে আনতে মামার বাড়ি গেলেন দাদু। মা বললেন, ‘আপনার ছেলে যদি পিটিআই পড়তে যায়, তাহলেই আপনাদের বাড়ি যাব।’
মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন দাদু। আমাদের জায়গাজমি বলতে শুধু বসতবাড়ি আর বিঘা দুই জমি। দাদুকে জমি বিক্রি করতে না দিয়ে মা বললেন, ‘আমার সোনার দরকার নেই। শিক্ষিত স্বামীই আমার সোনা। আমি তাকে সরকারি চাকরিতে দেখতে চাই।’
অবশেষে মায়ের সোনা বিক্রির টাকায় বাবার পড়াশোনা চলতে লাগল। পিটিআই পাস করে বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পেলেন।
মা গর্ব করে বলতেন, ‘আমার স্বামী চাকরি করে। সে ছাত্রদের শিক্ষা দেয়।’ শিক্ষকতা পেশার প্রতি মায়ের অগাধ ভক্তি ছিল। তাই আমিও শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছি। মা আমাকে একদিন বললেন, ‘দীপ, তোমার বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তোমাকে সর্বনিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা কলেজের প্রফেসর হতে হবে। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হলে তো কথাই নেই।’ পড়ার সময় মা আমার পাশে বসে থাকতেন। বিদ্যুৎ ছিল না। মা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন।
একবার আমার ছোট বোনের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। দিদি ব্যস্ত সাজতে। মা ও বড় বোন রান্নাঘরে ব্যস্ত। ‘লক্ষ্মীর পাঁচালী’ পড়ার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। মা যে ছন্দে শিখিয়েছেন, সেই ছন্দে পড়া শুরু করলাম। সম্বন্ধ করতে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা পাশের রুম থেকে আমার পাঁচালী পড়া শুনলেন। যাওয়ার সময় মাকে বললেন, যে মায়ের ছেলে এত সুন্দর করে ‘লক্ষ্মীর পাঁচালী’ পড়তে পারে, সেই সংসারের মেয়ে আমরা নেব। আমাদের এই সুখ বেশিদিন সইল না। আমার ছোট বোন মারা যাওয়ার খবর শুনে মা পাগলের মতো হয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে মনে হতো, মা আমাকে চেনেন না। আমি তখন ঢাকায় থাকি। যে মায়ের টানে বাড়ি ফিরে যাই, সেই মা আমাকে চেনেন না। স্নান করার সময় মা আর লুঙ্গি ও গামছা নিয়ে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে থাকেন না। ভীষণ ভেঙে পড়ি। কয়েক বছর পর একটি কলেজে চাকরি হয় আমার। আমি খুলনা, বরিশাল, ঢাকা—কোথাও ডাক্তার দেখাতে বাদ রাখিনি। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে বাড়ি গিয়েছিলাম। পাশের বাড়ির পুকুরে স্নান করতে নামি। স্নান শেষে ওপরে উঠতে যাব, দেখি মা লুঙ্গি ও গামছা নিয়ে ঘাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। সেটিই ছিল শেষ আলিঙ্গন। এর সপ্তাহখানেক পর আমাদের ছেড়ে চলে যান মা।
দিলীপ দাস
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ভাঙ্গা মহিলা কলেজ, ফরিদপুর





