১৯৮৬ সালের জুনের এক তপ্ত দুপুর। মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন এক লাখ ১৪ হাজার দর্শকের চিৎকার। মাঝমাঠ থেকে বলটি পেয়েই এক অবিশ্বাস্য দৌড় শুরু করলেন কোঁকড়া চুলের এক জাদুকর। একের পর এক ইংলিশ ডিফেন্ডারদের ছিটকে দিয়ে বলটি যখন জালে জড়াল, ধারাভাষ্যকার চিৎকার করে উঠলেন ‘ডিয়েগো ওওও ম্যারাডোনা!’ ফুটবল ইতিহাসের সেই ‘শতাব্দীর সেরা গোল’-এর সাক্ষী এই মাঠ। তারও ১৬ বছর আগে, ১৯৭০ সালে এই মাঠেরই ঘাসে শেষবারের মতো বিশ্বজয়ের নাচ নেচেছিলেন কালো মানিক পেলে। ফুটবল ইতিহাসের বড় দুই ঈশ্বরের বিশ্বজয়ের ট্রফি ছোঁয়ার স্মৃতি যেখানে জড়িয়ে, সেই মাঠে আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের পর্দা উঠেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই মাঠেই রেফারি বাজিয়েছেন উদ্বোধনী বাঁশি।

ইতিহাসের কোনো স্টেডিয়াম আজ পর্যন্ত যা করতে পারেনি, আজতেকা এবার সেটিই করে দেখাচ্ছে। ১৯৭০ আর ১৯৮৬ সালের পর ২০২৬ সালে এসে পৃথিবীর প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের অনন্য এক ‘হ্যাটট্রিক’ করল এই ঐতিহাসিক মাঠ। আজতেকা স্টেডিয়ামের প্রতিটি ধূলিকণায় যেন ১৯৭০ সালের সেই কিংবদন্তি ব্রাজিল দলের স্মৃতি মিশে আছে। মেক্সিকোর সেই বিশ্বকাপে পেলে এসেছিলেন একরাশ চাপ আর চোটের শঙ্কা মাথায় নিয়ে। কিন্তু আজতেকার চেনা সবুজ ঘাসে পা রাখতেই যেন খোলস বদলে গেল কালো মানিকের। টুর্নামেন্টজুড়ে তো বটেই, বিশেষ করে ইতালির বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটিতে আজতেকা দেখেছিল পেলের ফুটবলীয় শিল্পের চূড়ান্ত রূপ। ম্যাচের মাত্র ১৮ মিনিটে পেলের সেই শূন্যে ভেসে নেওয়া জাদুকরী হেডের গোলটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ছবি। শুধু গোল করাই নয়, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানো আর মাঠে তাঁর একেকটি ড্রিবলিং গ্যালারির হাজার হাজার মানুষকে সম্মোহিত করে রেখেছিল। ম্যাচ শেষে ব্রাজিল যখন ৪-১ ব্যবধানে ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো জুলে রিমে ট্রফি নিজেদের করে নিল, তখন আজতেকা স্টেডিয়াম রূপ নিয়েছিল এক মহাসমুদ্রে। উন্মত্ত মেক্সিকান সমর্থকরা মাঠে নেমে পেলেকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল, তাঁর মাথায় পরিয়ে দিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান ‘সোমব্রেরো’ টুপি। পেলে কাঁদছিলেন আর তাঁর সেই অশ্রুসিক্ত আনন্দের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল আজতেকার আকাশ। ওটিই ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে ফুটবলসম্রাটের শেষ রাজকীয় নাচ, যা এই মাঠকে রাতারাতি অমর করে দেয়।
পেলের বিদায়ের ঠিক ১৬ বছর পর এই আজতেকা স্টেডিয়ামেই ফুটবলবিশ্ব দেখেছিল আরেক ঈশ্বরের অবতার। ১৯৮৬ সালের সেই বিশ্বকাপটি ছিল একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জেতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেই বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ঈশ্বরের হাতের গোল নিয়ে আজও ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তর্ক চলে। তবে সেই তর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই তার ঠিক চার মিনিট পরেই ম্যারাডোনা যা করেছিলেন, তা শুধু এই আজতেকা মাঠেই সম্ভব ছিল। নিজের অর্ধে বল পেয়ে জাদুকরের মতো ঘুরলেন তিনি। এরপর একে একে পিটার বেয়ার্ডসলে, পিটার রিড, টেরি ফেনউইক ও টেরি বুচারের মতো ইংলিশ ডিফেন্ডারদের ছিটকে ফেলে বোকা বানালেন গোলরক্ষক পিটার শিল্পটনকেও। ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেস তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলছিলেন, ‘তুমি কোন গ্রহ থেকে এসেছ?’ ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে ম্যারাডোনা যখন ট্রফিটি দুই হাতে উঁচিয়ে ধরেছিলেন, তখন এই মাঠটিই হয়ে উঠেছিল আলবিসেলেস্তেদের রূপকথার মঞ্চ।
ফুটবলারদের জন্য আজতেকা স্টেডিয়ামে খেলা কিন্তু মোটেও সহজ নয়। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ২০০ ফুট উঁচুতে। একটু সহজ করে বললে প্রায় পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি। এত উঁচুতে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমতলের চেয়ে অনেক কম থাকে। এর ফলে ফুটবলারদের স্ট্যামিনা বা দম খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। একটু দৌড়ালেই বুক ভরে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, বাতাসের ঘনত্ব কম থাকার কারণে এখানে বলের গতিও সাধারণ মাঠের চেয়ে অনেক দ্রুত হয়। মাঠের এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ জয় করাটা এবার নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য হবে এক অগ্নিপরীক্ষা।




