• ই-পেপার

লিখুন বাবাকে নিয়ে

কৃষক মানেই পুরুষ?

আছেন হালিমারাও

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নীরবে খাটেন হালিমা। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের কাউকান্দি গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তবে তাঁর শ্রমের নেই রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক স্বীকৃতি। লিখেছেন জাকির হোসেন চৌধুরী

আছেন হালিমারাও
ছবি : লেখক

হালিমার দিন শুরু হয় কাকডাকা ভোরে, ফজরের আজানের আগে আগে। কাউকান্দি গ্রামের প্রায় সবাই যখন ঘুমে বিভোর, হালিমা তখন জ্বলন্ত চুলার পাশে বসে তরকারি কুটেন। সকাল-দুপুর—দুই বেলার রান্না একত্রে করতে হয়। এখন ফসল তোলার মৌসুম। দিনে আর রান্নার সময় কই? আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কাজের গতি বাড়ে তাঁর। ঘরদোর পরিষ্কার, স্বামী-সন্তানের খাবার তৈরি, ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠানো—সবই করতে হয়। ঘরকন্না সামলানোর পর হালিমার গন্তব্য বাড়ির পাশের খলা (ধান শুকানোর চাতাল)। সেখানে ভেজা ধান বিছানো, পা দিয়ে নাড়া, বাতাসে উড়িয়ে চিটা পরিষ্কার—কাজের কি আর শেষ আছে? সময় গড়ায়। দুপুরের কড়া রোদে পিঠ পোড়ে, কিন্তু জিরানোর জো নেই। দেওয়ার ডাক শুনলেই বুকে কাঁপন ধরে। সাঁঝের বেলা হালিমার ক্লান্ত শরীর বিছানা খোঁজে। কিন্তু গরু পালেন তিনি। বেলা ডুবলেই গরু দুটিকে গোয়ালে বাঁধতে হয়। তারপর ছেলেমেয়েদের ঘরে ফেরার হাঁক। সবার রাতে খাবার শেষ হলে তবেই মেলে একটু ফুরসত। এত খাটুনির পরও রাষ্ট্রীয় নথিতে হালিমার পরিচয় শুধুই ‘গৃহিণী’।

জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে কৃষিশ্রমের যে বাড়তি ধকল, তার প্রায় পুরো চাপ পড়ে হালিমার মতো হাওরের প্রান্তিক নারীদের ওপর। মাঠে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কাজের পর পুরুষদের বিশ্রাম মিললেও নারীদের টানা খাটতে হয় ভোর থেকে রাত পর্যন্ত। ‘রাতে ঘুমাইতে ১০টা-১১টা বেজে যায়, আবার সেই ভোরবেলা ওঠা, কয় ঘণ্টা আর ঘুমানো যায়, বলেন?’ হালিমার কণ্ঠে অভিযোগের সুর। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হালিমার মতো নারীরা। হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর কোনো দূরবর্তী তত্ত্ব নয়, বরং হালিমাদের নিত্যদিনের নির্মম বাস্তবতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অকালের বন্যা হাওরের কৃষিব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় পুরুষরা যখন তড়িঘড়ি করে মাঠের কাঁচা-পাকা ধান কেটে বাড়ি ফেরেন, হালিমাদের আসল যুদ্ধ শুরু হয় তখন থেকে। আকাশে ঘন মেঘ দেখলেই ছুটে যান খলায়। ধান জড়ো করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া, রোদ উঠলে তা মেলে ধরা—পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁদের শাড়ি কখনো ভেজে বৃষ্টিতে, কখনো ঘামে। হালিমা বলেন, ‘আগে ধান শুকানোর জন্য কয়েক দিন সময় পেতাম। কিন্তু এখন পাহাড়ি ঢলের ভয়ে কখনো কখনো রাতের বেলায়ও কাঁচা ধান নাড়তে হয় শুকানোর জন্য। আগাম বন্যা হলে ভেজা ধান ঘরে কিংবা উঠানে পচে নষ্ট হয়। আমাদের কাজ আরো বাড়ে, গরু-বাছুরের দেখাশোনা, চাল-ডাল উঁচু জায়গায় রাখাসহ বাচ্চাদের দিকে খেয়ালা রাখতে হয়।’

সম্প্রতি কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কার্ড যে তিনিও পেতে পারেন, সে সম্পর্কে ধারণা নেই হালিমার। ‘কৃষি কার্ড দিয়া আমি কী করমু?’ প্রশ্নটি শুধু একজন হালিমার নয়, বরং হাওরের হাজারো নারী কৃষকের মনের কথা। তাঁরা জানেন না যে ক্ষেতে চারা লাগানো থেকে শুরু করে খলায় ধান শুকানো পর্যন্ত তাঁদের প্রতি বিন্দু ঘাম ‘কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতির যোগ্য। পুরুষতান্ত্রিক প্রথায় তাঁদের মনে গেঁথে গেছে—কৃষি মানেই পুরুষের কাজ। ফলে কার্ডও তাঁদের। হালিমার মতো হাওরাঞ্চলের ৯০ শতাংশেরও বেশি নারীর নামে জমি নেই। শ্বশুর, স্বামী কিংবা ভাইয়ের নামে জমি। বিধবা অনেক নারী স্বামীর মৃত্যুর পরও শ্বশুরের বা ভাশুরের ভিটা থেকে উচ্ছেদের ভয়ে মুখ খোলেন না। এই সীমাবদ্ধতার সত্যতা মেলে তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলামের কথায়। তিনি বলেন, “নারীরা ধান প্রক্রিয়াকরণের মূল কাজগুলো করেন। কিন্তু জমির খতিয়ান বা লিজের প্রমাণপত্র ছাড়া আমরা কাউকে স্বতন্ত্র ‘কৃষক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারি না। এমনকি আমাদের স্থানীয় কৃষি সম্পর্কিত বা দুর্যোগ কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্ল্যাটফর্মেও নারীদের অন্তর্ভুক্তি নেই বললেই চলে।”

হালিমার সঙ্গে দিনমজুর হিসেবে কাজ করছিলেন মাসুমা আক্তার। ধান শুকানো ও ঝাড়াইয়ের কাজ করে দিনে ৫০০ টাকা পান তিনি। একই ধরনের কাজের জন্য পুরুষদের মজুরি ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন, ‘নারীদের শ্রম পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও কৃষক বা শ্রমিক হিসেবে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। এর থেকে বের হতে হলে সবার আগে নারী কৃষকদের সরকারিভাবে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।’ এত প্রতিকূলতার মধ্যে নারীদের আলোর পথ দেখাচ্ছে কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন (সিআরইএ) কর্মসূচি। সুইডেনের আর্থিক সহায়তায় এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কারিগরি তত্ত্বাবধানে তাদের স্থানীয় সহযোগী এনজিও এফোর্টস ফর রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট (ইরা) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো নারী কৃষককে স্বল্পমেয়াদি ও বন্যাসহনশীল ধানের জাত চাষ, জলবায়ুসহনশীল সমন্বিত বাড়ির আঙিনায় সবজিবাগান, সম্মিলিত দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘নারীরা উৎপাদনশীল কৃষির মূলশক্তি, কিন্তু তাঁরা অদৃশ্য। তাঁদের পরিচর্যার বোঝা কমাতে পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র এবং প্রযুক্তিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’

নতুন পোশাকে রঙিন বুনো ফুল

বান্দরবানের লামার গজালিয়ার দুর্গম চংকক পাড়ায় গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক বিদ্যালয়—পাওমুম থারক্লা। ২০১৬ ফ্রিল্যান্সার শাহারিয়ার পারভেজ, উথোয়াইয়ই মারমাসহ কয়েকজনের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে স্কুলটি। ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল এ নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল কালের কণ্ঠের অবসরে পাতায়। শিরোনাম ‘ম্রো পাহাড়ে আলোর মশাল’। এবার সেখানকার শিশুরা পেল রঙিন পোশাক। উথোয়াইয়ই মারমা সেই গল্প শুনিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

নতুন পোশাকে রঙিন বুনো ফুল

পাওমুম থারক্লায় যতবার গিয়েছি, ততবার দেখেছি স্কুলে শিক্ষার্থীরা একেকজন একেক ধরনের পোশাক পরে ক্লাসে আসছে। তিন বছরের অধিক সময় ধরে কেউ টি-শার্ট গায়ে, আবার কেউ শার্ট পরে স্কুলে আসত। এই শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই জুমিয়া পরিবারের সন্তান, যাদের পাহাড়ে এক দিন না গেলেই খোরাক জোটানো দুষ্কর। ফলে প্রতিবছর সন্তানের জন্য স্কুলড্রেস কিনে দেওয়ার সাধ্য তাদের নেই, যে কারণে পুরনো পোশাক পরেই শিশুরা স্কুলে আসে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পাওমুম পার্বণের আগে পরিচয় হয় রাফেজ উদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি জানতে চাইলেন—আপনাদের স্কুলের জন্য কি প্রয়োজন? বলেছিলাম, পাওমুমে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলড্রেস দেওয়া গেলে খুবই ভালো হবে। কিছুদিন পর তিনি শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্মের মাপ পাঠাতে বলেন। পরিচিত এক দরজিকে পাওমুমে পাঠিয়ে ৫৩ জনের ড্রেসের মাপ নিলাম। ড্রেসের মাপ নেওয়ার পর লাল আর নেভি ব্লু সমন্বয়ে ড্রেসের কালার নির্ধারণ করে রাফেজ উদ্দিনকে পাঠালাম। তিনি সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা। সেখানেই শুরু হয় শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন ইউনিফর্ম সেলাই। পরে রাফেজ ভাই কুরিয়ারে ড্রেসগুলো পাঠিয়ে দেন লামায়। কয়েক দিন আগে সেগুলো দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। স্কুলে এখন মোট শিক্ষার্থী ৭৮ জন। এর মধ্যে ৫৩ জন নতুন রঙিন পোশাক পেয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে। বাকিদের মুখে ছিল কালো মেঘের ছায়া। তবে এখন সেই মেঘও কেটে গেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ২৫ জনের গায়েও উঠবে রঙিন পোশাক।

গেল ১৩ মার্চ স্কুল ও ছাত্রাবাসে সৌরবিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এবার স্কুলড্রেস পেল ওরা। আগামী মাসেই আরেক শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতায় দুর্গম পাহাড়ের এই স্কুলে দেওয়া হবে স্টারলিংকের সংযোগ। তখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষকরা পড়াতে পারবেন আমাদের বুনো ফুলদের। এভাবেই একদিন দুর্গম এই অন্ধকারে মশাল হয়ে আলো ছড়াবে পাওমুম থারক্লার শিশুরা।

 

 

 

আসছে তাঁতি স্টুডিও

প্রতিবছর ‘বব ফিশ এন্টারপ্রেনিওরিয়াল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে থাকে বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ও বিজনেস স্কুল ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এফআইটি)। বিশ্বের ১১টি টিমকে পেছনে ফেলে এবার ২৫ হাজার ডলার অর্থমূল্যের পুরস্কারটি জিতেছে সমদত্তা, আসিফ ও ইয়াসিনের হোম টেক্সটাইল স্টার্টআপ ‘তাঁতি স্টুডিও’। সেই গল্প টেক্সটাইল প্রকৌশলী ইয়াসিন শুনিয়েছেন আল সানিকে

আসছে তাঁতি স্টুডিও
পুরস্কারের চেক হাতে ‘তাঁতি স্টুডিও’র তিন সদস্য সমদত্তা, আসিফ ও ইয়াসিন। ছবি : সংগৃহীত

আমি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ১০ বছর কাজ করেছি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, শুধু কারিগরি জ্ঞান নিয়ে এই সেক্টরে বিশ্ববাজারে বড় ভূমিকা রাখা অসম্ভব। গ্লোবাল ফ্যাশন ব্যবসা কিভাবে চলে, ব্র্যান্ড কিভাবে দাঁড় করাতে হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য নিয়ে সিদ্ধান্তগুলো কিভাবে নেওয়া হয়—এসব না জানলে বেশিদূর এগোনো কঠিন। এরপর থেকেই বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্যবসা সংক্রান্ত ভালো কোর্স খুঁজছিলাম।

ফ্যাশন দুনিয়ায় এফআইটিকে অনেকেই ফ্যাশনের এমআইটি বলে ডাকেন। বিশ্বজুড়ে এই স্কুলের সুনাম। আমাদের তিনজনের পরিচয় এফআইটির গ্লোবাল ফ্যাশন ম্যানেজমেন্ট কোর্সে। আমাদের দলে আছেন ভারতের সমদত্তা দাস আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মোহাম্মদ আশিকুর রহমান আসিফ।

‘তাঁতি স্টুডিও’ আমাদের দুই বছরের একটি লম্বা আর কঠিন পরিশ্রমের ফল। আমাদের কোর্সে বিজনেস আইডিয়া চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া ভীষণ প্রতিযোগিতামূলক। ২৪ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকে প্রথমে তিনটি করে মোট ৭২টি আইডিয়া জমা দেন। শিক্ষকরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত প্রকল্পের জন্য ১২টি আইডিয়া বেছে নেন। মজার ব্যাপাার হলো, পুরস্কার জেতা তাঁতি স্টুডিও কিন্তু শুরুতে ৭২টি আইডিয়ার মধ্যে ছিল না!

প্রথম সেমিস্টারে আমরা ‘সোর্সক্ল্যাফট’ নামে অন্য একটি আইডিয়া নিয়ে কাজ করছিলাম। এটি ছিল একটি সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম। কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম, আমাদের ইউনিক ভ্যালু প্রপোজিশন দুর্বল। ফলে একটি বড় প্রেজেন্টেশনের পর একরকম আটকে গেলাম। দ্বিতীয় সেমিস্টারে নতুন করে কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নিলাম। তখনই মাথায় এলো বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, অথচ বিশ্ববাজারে আমাদের নিজেদের কোনো ব্র্যান্ড নেই! আমরা কেবল অন্যের ব্র্যান্ডের কাপড় সেলাই করে দিই, পণ্যের গায়ে লেখা থাকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেবেল। অথচ আমাদের দেশে ইউনেসকো স্বীকৃত জামদানি বা নকশিকাঁথার মতো শত বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প আছে। কিন্তু সঠিক সুযোগ আর মূল্যায়নের অভাবে এই শিল্পের কারিগররা হারিয়ে যাচ্ছেন। মনে হলো, এখানেই কিছু করা দরকার। সেই ভাবনার ফসল তাঁতি স্টুডিও। পোশাক নয়, আমরা মূলত একটি হোম টেক্সটাইল ব্র্যান্ড। আমাদের প্রাথমিক পণ্যের তালিকায় থাকছে বেড কাভার, কুশন কাভার এবং টেবিল রানার। এগুলো তৈরি হবে বাংলাদেশের স্থানীয় তাঁতিদের হাতে, ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা ও জামদানির নকশায়। আমাদের দুটি মূল কালেকশন লাইন থাকবে— রেগুলার লাইন সাধারণ বা মধ্যম আয়ের ভোক্তাদের জন্য, ‘অ্যাটেলিয়ার লাইন’ হবে আমাদের প্রিমিয়াম বা লাক্সারি কালেকশন। এটি মূলত ‘মেড টু অর্ডার’ অর্থাৎ ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজ করে সম্পূর্ণ হাতে বুনে সীমিত সংখ্যায় তৈরি করা হবে।

আমেরিকা বা ইউরোপের ক্রেতারা আমাদের দেশীয় হস্তশিল্প কেন কিনবেন? প্রশ্নটি আমাদের মনেও ছিল। তাই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ৬১ জন ভোক্তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎকার এবং বাজার জরিপ চালাই। জরিপে দেখা গেছে ৯৭ শতাংশ আমেরিকান ক্রেতা Ethically sourced এবং হস্তশিল্পজাত পণ্যের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। ৯০ শতাংশ ক্রেতা পণ্যের কারুকাজ ও উচ্চমানের ফিনিশিংকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। ৬৫ শতাংশ ক্রেতা পণ্য কেনার সময় দেখেন এর পেছনে কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে কি না। আর ৬০ শতাংশ ক্রেতা পণ্যের গুণগত মান ও মৌলিকত্বের জন্য যেকোনো প্রিমিয়াম বা বাড়তি মূল্য দিতে সানন্দে প্রস্তুত। একজন ক্রেতা বলেছিলেন, ‘যদি পণ্যটি একজন প্রকৃত কারিগরের হাতে তৈরি হয়, তবে এক হাজার ডলার দিতেও দ্বিধা করব না।’

আমেরিকার হোম বেডিং মার্কেট প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২৩ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। এর মধ্যে আমাদের লক্ষ্য যে বাজার—অর্থাৎ প্রিমিয়াম, আর্টিজানাল (কারুশিল্পজাত) এবং এথিক্যালি সোর্সড পণ্য, সেই সেগমেন্টটাই প্রায় ১.৪৪ বিলিয়ন ডলারের। পশ্চিমারা এখন ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব পণ্য খোঁজেন। বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের শক্তি ঠিক এই জায়গায়ই।

আমাদের তিনজনের কাজের অভিজ্ঞতা আলাদা। এই প্রকল্পে সমদত্তা দাস সামলান প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন ডিরেকশন, ম্যাটেরিয়াল সিলেকশন এবং পোশাকের কারিগরি দিকগুলো। মোহাম্মদ আশিকুর রহমান আসিফ বুঁদ হয়ে আছেন ফিন্যান্সে—বাজেটিং, কস্টিং, ফিন্যানশিয়াল মডেলিং, পুরো বিজনেসের আর্থিক কাঠামো তৈরি করা  তাঁর কাজ। আমি মার্কেট রিসার্চ ও মার্কেটিংয়ে—আমেরিকান হোম টেক্সটাইল বাজার বিশ্লেষণ, কাস্টমার সেগমেন্টেশন পজিশনিং স্ট্র্যাটেজি এবং ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনের দায়িত্বে। দিনশেষে আমরা একটি টিম হিসেবেই কাজ করেছি।

বব ফিশ অ্যাওয়ার্ডের বিচারকদের মূল্যায়ন আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সম্পূর্ণ ডেটাচালিত এবং বিস্তারিত মার্কেটিং প্ল্যানের বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন তাঁরা। একই সঙ্গে আসিফের তৈরি করা ফিন্যানশিয়াল মডেলটির স্পষ্টতা তাঁদের মুগ্ধ করেছে। পুরস্কার প্রদানের সময় গ্লোবাল ফ্যাশন ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের চেয়ারপারসন অ্যারন ডানকান বলেছিলেন, ‘একটি স্টার্টআপ কম্পানির জন্য এত গভীর ও নিখুঁত মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি এবং ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিস আগে দেখিনি।’ ২০২৭ সালের প্রথম দিকে তাঁতি স্টুডিওর পপ-আপ ইভেন্টের (অস্থায়ী প্রদর্শনী) মাধ্যমে নিউইয়র্কের বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা আছে আমাদের।

 

 

[ মাকে মনে পড়ে ]

কষ্টের মোক্ষম ওষুধ মা

কষ্টের মোক্ষম ওষুধ মা

আমাদের শৈশব কেটেছে একান্নবর্তী আবহে, সবাইকে নিয়ে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো পার করেছি তখন। ভাগাভাগি করে জীবন কাটানোর যে মহত্ত্ব, তা শুধু প্রাচুর্য দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। সংসারে অভাব ছিল, দৈন্য ছিল, কিন্তু সেই কষ্টের মোক্ষম ওষুধ ছিলেন মা। জীবনের বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মা আমাদের সেই অভাব-অনটন থেকে সযত্নে বের করে এনেছেন। স্কুল শিক্ষক বাবা মো. মিল্লাত হোসেন ভূঁইয়া একরকম ক্লিশে জীবনের মধ্য দিয়ে সংসার টেনে নিয়ে গেছেন। তারপর একসময় বাবার চলে যাওয়া আমাদের জীবন আরো কঠিন করে তোলে। সংসারের সেই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে হাল ধরলেন আমার মা আইরীন পারভিন নাঈমা। ব্র্যাক ও প্রশিকার মতো বিভিন্ন এনজিওতে চাকরি করে তিনি সংসার চালিয়েছেন। এমনকি জমিজমা বিক্রি করে আমাদের ভাই-বোনদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করেছেন। অনেকটা কণ্টকাকীর্ণ পথ তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে। নিজের হাড়ভাঙা খাটুনি আর অসীম ত্যাগের বিনিময়ে তিনি আজ আমাকে প্রকৌশলী করেছেন; ছোট বোনকে শিক্ষক করেছেন। মা আমাদের জীবনের সেই ক্লান্ত রণতরি, যিনি ঝড়ের মুখেও আমাদের আগলে রেখেছেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো।

সিয়ামুল হায়াত সৈকত

সহকারী প্রকৌশলী, চায়না নর্থ ইস্ট ইলেকট্রিক পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, মৌলভীবাজার