হালিমার দিন শুরু হয় কাকডাকা ভোরে, ফজরের আজানের আগে আগে। কাউকান্দি গ্রামের প্রায় সবাই যখন ঘুমে বিভোর, হালিমা তখন জ্বলন্ত চুলার পাশে বসে তরকারি কুটেন। সকাল-দুপুর—দুই বেলার রান্না একত্রে করতে হয়। এখন ফসল তোলার মৌসুম। দিনে আর রান্নার সময় কই? আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কাজের গতি বাড়ে তাঁর। ঘরদোর পরিষ্কার, স্বামী-সন্তানের খাবার তৈরি, ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠানো—সবই করতে হয়। ঘরকন্না সামলানোর পর হালিমার গন্তব্য বাড়ির পাশের খলা (ধান শুকানোর চাতাল)। সেখানে ভেজা ধান বিছানো, পা দিয়ে নাড়া, বাতাসে উড়িয়ে চিটা পরিষ্কার—কাজের কি আর শেষ আছে? সময় গড়ায়। দুপুরের কড়া রোদে পিঠ পোড়ে, কিন্তু জিরানোর জো নেই। দেওয়ার ডাক শুনলেই বুকে কাঁপন ধরে। সাঁঝের বেলা হালিমার ক্লান্ত শরীর বিছানা খোঁজে। কিন্তু গরু পালেন তিনি। বেলা ডুবলেই গরু দুটিকে গোয়ালে বাঁধতে হয়। তারপর ছেলেমেয়েদের ঘরে ফেরার হাঁক। সবার রাতে খাবার শেষ হলে তবেই মেলে একটু ফুরসত। এত খাটুনির পরও রাষ্ট্রীয় নথিতে হালিমার পরিচয় শুধুই ‘গৃহিণী’।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে কৃষিশ্রমের যে বাড়তি ধকল, তার প্রায় পুরো চাপ পড়ে হালিমার মতো হাওরের প্রান্তিক নারীদের ওপর। মাঠে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কাজের পর পুরুষদের বিশ্রাম মিললেও নারীদের টানা খাটতে হয় ভোর থেকে রাত পর্যন্ত। ‘রাতে ঘুমাইতে ১০টা-১১টা বেজে যায়, আবার সেই ভোরবেলা ওঠা, কয় ঘণ্টা আর ঘুমানো যায়, বলেন?’ হালিমার কণ্ঠে অভিযোগের সুর। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হালিমার মতো নারীরা। হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর কোনো দূরবর্তী তত্ত্ব নয়, বরং হালিমাদের নিত্যদিনের নির্মম বাস্তবতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অকালের বন্যা হাওরের কৃষিব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় পুরুষরা যখন তড়িঘড়ি করে মাঠের কাঁচা-পাকা ধান কেটে বাড়ি ফেরেন, হালিমাদের আসল যুদ্ধ শুরু হয় তখন থেকে। আকাশে ঘন মেঘ দেখলেই ছুটে যান খলায়। ধান জড়ো করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া, রোদ উঠলে তা মেলে ধরা—পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁদের শাড়ি কখনো ভেজে বৃষ্টিতে, কখনো ঘামে। হালিমা বলেন, ‘আগে ধান শুকানোর জন্য কয়েক দিন সময় পেতাম। কিন্তু এখন পাহাড়ি ঢলের ভয়ে কখনো কখনো রাতের বেলায়ও কাঁচা ধান নাড়তে হয় শুকানোর জন্য। আগাম বন্যা হলে ভেজা ধান ঘরে কিংবা উঠানে পচে নষ্ট হয়। আমাদের কাজ আরো বাড়ে, গরু-বাছুরের দেখাশোনা, চাল-ডাল উঁচু জায়গায় রাখাসহ বাচ্চাদের দিকে খেয়ালা রাখতে হয়।’
সম্প্রতি কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কার্ড যে তিনিও পেতে পারেন, সে সম্পর্কে ধারণা নেই হালিমার। ‘কৃষি কার্ড দিয়া আমি কী করমু?’ প্রশ্নটি শুধু একজন হালিমার নয়, বরং হাওরের হাজারো নারী কৃষকের মনের কথা। তাঁরা জানেন না যে ক্ষেতে চারা লাগানো থেকে শুরু করে খলায় ধান শুকানো পর্যন্ত তাঁদের প্রতি বিন্দু ঘাম ‘কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতির যোগ্য। পুরুষতান্ত্রিক প্রথায় তাঁদের মনে গেঁথে গেছে—কৃষি মানেই পুরুষের কাজ। ফলে কার্ডও তাঁদের। হালিমার মতো হাওরাঞ্চলের ৯০ শতাংশেরও বেশি নারীর নামে জমি নেই। শ্বশুর, স্বামী কিংবা ভাইয়ের নামে জমি। বিধবা অনেক নারী স্বামীর মৃত্যুর পরও শ্বশুরের বা ভাশুরের ভিটা থেকে উচ্ছেদের ভয়ে মুখ খোলেন না। এই সীমাবদ্ধতার সত্যতা মেলে তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলামের কথায়। তিনি বলেন, “নারীরা ধান প্রক্রিয়াকরণের মূল কাজগুলো করেন। কিন্তু জমির খতিয়ান বা লিজের প্রমাণপত্র ছাড়া আমরা কাউকে স্বতন্ত্র ‘কৃষক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারি না। এমনকি আমাদের স্থানীয় কৃষি সম্পর্কিত বা দুর্যোগ কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্ল্যাটফর্মেও নারীদের অন্তর্ভুক্তি নেই বললেই চলে।”
হালিমার সঙ্গে দিনমজুর হিসেবে কাজ করছিলেন মাসুমা আক্তার। ধান শুকানো ও ঝাড়াইয়ের কাজ করে দিনে ৫০০ টাকা পান তিনি। একই ধরনের কাজের জন্য পুরুষদের মজুরি ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন, ‘নারীদের শ্রম পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও কৃষক বা শ্রমিক হিসেবে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। এর থেকে বের হতে হলে সবার আগে নারী কৃষকদের সরকারিভাবে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।’ এত প্রতিকূলতার মধ্যে নারীদের আলোর পথ দেখাচ্ছে কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন (সিআরইএ) কর্মসূচি। সুইডেনের আর্থিক সহায়তায় এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কারিগরি তত্ত্বাবধানে তাদের স্থানীয় সহযোগী এনজিও এফোর্টস ফর রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট (ইরা) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো নারী কৃষককে স্বল্পমেয়াদি ও বন্যাসহনশীল ধানের জাত চাষ, জলবায়ুসহনশীল সমন্বিত বাড়ির আঙিনায় সবজিবাগান, সম্মিলিত দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘নারীরা উৎপাদনশীল কৃষির মূলশক্তি, কিন্তু তাঁরা অদৃশ্য। তাঁদের পরিচর্যার বোঝা কমাতে পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র এবং প্রযুক্তিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’




