• ই-পেপার

[ প্রাণ প্রকৃতি ]

অবশেষে মায়ের কোলে

  • সরওয়ার পাঠান

[ মাকে মনে পড়ে ]

কষ্টের মোক্ষম ওষুধ মা

কষ্টের মোক্ষম ওষুধ মা

আমাদের শৈশব কেটেছে একান্নবর্তী আবহে, সবাইকে নিয়ে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো পার করেছি তখন। ভাগাভাগি করে জীবন কাটানোর যে মহত্ত্ব, তা শুধু প্রাচুর্য দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। সংসারে অভাব ছিল, দৈন্য ছিল, কিন্তু সেই কষ্টের মোক্ষম ওষুধ ছিলেন মা। জীবনের বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মা আমাদের সেই অভাব-অনটন থেকে সযত্নে বের করে এনেছেন। স্কুল শিক্ষক বাবা মো. মিল্লাত হোসেন ভূঁইয়া একরকম ক্লিশে জীবনের মধ্য দিয়ে সংসার টেনে নিয়ে গেছেন। তারপর একসময় বাবার চলে যাওয়া আমাদের জীবন আরো কঠিন করে তোলে। সংসারের সেই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে হাল ধরলেন আমার মা আইরীন পারভিন নাঈমা। ব্র্যাক ও প্রশিকার মতো বিভিন্ন এনজিওতে চাকরি করে তিনি সংসার চালিয়েছেন। এমনকি জমিজমা বিক্রি করে আমাদের ভাই-বোনদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করেছেন। অনেকটা কণ্টকাকীর্ণ পথ তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে। নিজের হাড়ভাঙা খাটুনি আর অসীম ত্যাগের বিনিময়ে তিনি আজ আমাকে প্রকৌশলী করেছেন; ছোট বোনকে শিক্ষক করেছেন। মা আমাদের জীবনের সেই ক্লান্ত রণতরি, যিনি ঝড়ের মুখেও আমাদের আগলে রেখেছেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো।

সিয়ামুল হায়াত সৈকত

সহকারী প্রকৌশলী, চায়না নর্থ ইস্ট ইলেকট্রিক পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড, মৌলভীবাজার

 

 

 

[ মাকে মনে পড়ে ]

তপ্ত রোদে শীতল ছায়া

তপ্ত রোদে শীতল ছায়া

বাবা সকালে উঠেই তড়িঘড়ি করে ছুটে যেতেন অফিসে। ফিরতেন রাত ১০টার দিকে। তাই বাবার সঙ্গে কথাবার্তা তুলনামূলক কম হতো। আমাদের খাওয়াদাওয়া, স্কুলে যাওয়া-আসা, খেলাধুলা—বেশির ভাগই হতো মায়ের তত্ত্বাবধানে। মা কখনো পড়তে বসাতেন, রান্না করে খাওয়াদাওয়া করিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিতেন, বিকেলে খেলার মাঠে পাঠাতেন, আবার ফুটবল খেলে পায়ের আঙুলে ব্যথা পেলে মালিশ করে দিতেন। মা সব কাজের কাজি। ছোটবেলায় একবার ভয়ানক এক অসুখে পড়লাম। এক দিন, দুই দিন—এভাবে সাত দিন পেরিয়ে গেল, কিছুতেই সুস্থ হচ্ছিলাম না। ডাক্তার কিছু ওষুধ দিলেন। বললেন, সেবা-যত্ন ভালো করে করতে হবে। মা তো কেঁদেকেটে অস্থির, ‘আমি ভালোমতো দেখাশোনা করব।’ এরপর শুরু হলো যমে-মানুষে টানাটানি। সহজ কথায়, যম আর মায়ের লড়াই। তখন রোজ আটটি করে ট্যাবলেট খেতে হতো আমাকে। প্রায় ১৪ দিন পর যমরাজ হার মানলেন। সুস্থ হয়ে উঠলাম।  আমাদের বাড়ির পাশেই ধানক্ষেত। ধান কাটার পর সেই জমিতে আমরা কয়েকজন দাঁড়িয়াবান্ধা খেলছি। হঠাৎ কেউ একজন গালি দিল। জবাবে আমিও গালি দিলাম। জানতাম না যে মা পাশেই কাজ করছিলেন। তিনি শুনে ফেলেন। একটি মোটা লাঠি নিয়ে সেই যে আমাকে পেটাতে শুরু করলেন, কোনোমতে দৌড়ে পালালাম। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরেছিলাম। যে শিক্ষা সেদিন পেয়েছিলাম, তা আজও ভুলিনি। এইচএসসি পরীক্ষা দেব। হঠাৎ করে ফরম পূরণের নোটিশ পাওয়ায় বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর হাতে টাকা ছিল না। মা বললেন, ‘আমি দিচ্ছি।’ পরে জানলাম, মা বিয়ের সময় পাওয়া সোনার আংটি বিক্রি করে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন। চাকরি হওয়ার পর মাকে আংটি কিনে দিয়েছিলাম। আমরা তিন ভাই। মা কখনোই আমাদের বুঝতে দেননি কাকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আমরা প্রত্যেকেই জানি, মা আমাকেই বেশি ভালোবাসেন।

কমল কুজুর, কবি ও শিক্ষক, দিনাজপুর

 

 

[ মাকে মনে পড়ে ]

অনুপ্রেরণার নাম

অনুপ্রেরণার নাম

মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই। এই পৃথিবীতে মা কত মমতাময়, তা শুধু মা না থাকলেই টের পাওয়া যায়।

আমাদের ছোট পরিবার। মা ছিলেন খুবই সাধারণ এক গৃহিণী। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা খুব না থাকলেও সন্তানদের পড়ালেখার প্রশ্নে কখনো ছাড় দিতেন না। আমরা দুই ভাই-বোন। আমাদের পড়ালেখার হাতেখড়ি মায়ের হাত ধরে। মা নিজে অল্প পড়ালেখা করে যেটুকু শিখেছেন, সেটুকু দিয়েই আমাদের গড়ে তুলেছেন।

অজপাড়াগাঁয়ে বসবাস করলেও সন্তানদের পড়ালেখা করানোর অদম্য ইচ্ছা ছিল আমার মায়ের। তাই মধ্যবিত্ত সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও পড়ালেখার ক্ষেত্রে টাকা-পয়সাকে কখনো বাধা হতে দেননি। নিজে অনেক কষ্ট করেছেন, কিন্তু আমাদের কখনো অভাব টের পেতে দেননি। সন্তানের সাফল্যই যেন তাঁর সাফল্য! মা সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন আমরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলে। যে গ্রামে আমরা বসবাস করতাম, সেখানে পড়ালেখাকে অতটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। যেখানে ছেলেসন্তান বড় হয়ে উঠলে পড়ালেখার চেয়ে কাজে নিযুক্ত করার তাগিদ বেশি, মেয়ে একটু ডাঙর হলেই বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা প্রবল; সেখানে আমার মা একদম আলাদা। পড়ালেখা শেষ না করে কাজ বা বিয়ে কোনোটির পক্ষেই ছিলেন না মা।

তাঁর অনুপ্রেরণা ও তত্ত্বাবধানে আমি আমার গ্রামের প্রথম ও একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছি। আমার বোন একটি সরকারি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর করেছে।

গ্রামে যখন সাধারণ ছেলেমেয়ে ঠিকমতো হাত ধুয়েও খাবার খেত না, সেখানে সাবান দিয়ে হাত না ধুলে মা আমাদের খেতে দিতেন না। অন্যের ধন-সম্পত্তির দিকে কখনো যেন লোভ না করি, সেই শিক্ষা মা সব সময় দিয়েছেন। কষ্ট করে বড় হওয়ার অনুপ্রেরণা তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া। চাকরির সুবাদে আমার বাবা বাইরে থাকতেন। কিন্তু আমার মা কখনো বাড়িতে বাবার অনুপস্থিতি টের পেতে দিতেন না। মা-ই ছিলেন আমাদের বাবা। স্কুলে গিয়ে পড়ালেখার খোঁজখবর নেওয়া, নিজে কম খেয়ে সন্তানদের ভালো খাবার খাওয়ানো, সন্ধ্যা হলে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসানো, খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মিশতে না দেওয়া—এগুলো ছিল তাঁর অন্যতম গুণ। গ্রামের অনেক মাকে দেখেছি আমার মাকে অনুসরণ করতে। যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে এখনো মায়ের দেওয়া জ্ঞান কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। এখনো কোনো কাজে সফলতা অর্জন করলে সবার আগে মাকেই জানাতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু পারি না।

খাইরুল ইসলাম পলাশ

সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

 

[ দিনগুলি মোর ]

হারানো ঈদ

হারানো ঈদ
অলংকরণ : তানভীর মালেক

আমাদের ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যেত আগের দিন বিকেল থেকেই। ভোর হতেই চালের গুঁড়ার রুটি বানানোর ধুম পড়ে যেত। এই কাজটি করতেন বাড়ির মহিলারা, প্রতিবেশীরা এসে সানন্দে শামিল হতেন। আত্মীয়-অনাত্মীয়র কোনো বালাই ছিল না। কাই তৈরি করা, কাই মসৃণ করা, রুটি তৈরি করা, রুটি ছেঁকে সাজিতে সংরক্ষণ করা—চার পরিবারের সদস্যদের কাজ চলত সমান তালে। শিশুদের হৈ-হল্লা আর আনন্দে গমগম করত সারা বাড়ি।

ঈদের দিন দুপুরে সবার রান্না করা মাংসের পাতিল জমা হতো উঠানের মাঝখানে; পাশেই সকাল থেকে বানানো রুটির স্তূপ। প্রতিবেশীদের মধ্যে যাঁরা কোরবানি করেননি, বাবা আর জ্যাঠা তাঁদের হাত ধরে নিয়ে আসতেন। লম্বা সারিতে সবাইকে বসিয়ে দিতেন বাড়ির লোকদের সঙ্গে। চালের গুঁড়ার নরম রুটি আর সদ্যোরান্না করা গরম মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। পরিবেশন করতেন বাবা আর মেজো জ্যাঠা, জোগান দিতেন বেলাল ভাই। কোনো ছোট্ট শিশু যখন আর খেতে চাইত না কিংবা কোনো মুরব্বি যখন পরিতৃপ্ত হয়ে বলতেন, ‘আর লাগবে না, আর লাগবে না’, বাবা কিংবা মেজো জ্যাঠা তখন জোর করে আরো দুটি রুটি হাতে গুঁজে দিতেন, প্লেটে তুলে দিতেন আরেক চামচ মাংস।

পুরুষদের পর মহিলাদের পালা। আম্মা আর বড়মা আন্তরিকতায় তাঁদের আপ্যায়ন করতেন। জরির মা, যিনি আমাদের ঢেঁকির কাজ করতেন কিংবা আম্মার হেঁশেলের ‘ডান হাত’ রুমালি খালা—সবাই আজ এই বাড়ির আপনজন, সম্মানিত মেহমান। আম্মা চিলমচি এগিয়ে ধরে তাঁদের হাতে পানি ঢেলে দিতেন; বড়মা স্নেহভরা কণ্ঠে বলতেন, ‘তোমরা তৃপ্তি করে খাও। বাড়ির জন্যও তুলে রেখেছি, যাওয়ার সময় নিয়ে যেয়ো।’

ঈদের দিনেই প্রায় সব মাংস শেষ হয়ে যেত। দু-তিন দিন পর প্লেটে ঠকঠক শব্দ করে আমরা গরুর নেহারির মজ্জা বের করে মজা করে খেতাম। আমাদের কখনোই মনে হতো না আমাদের কোরবানি, আর অমুকের নয়, বরং মনে হতো এই ঈদ সবার, এই আনন্দে সবাই সমান অংশীদার।

প্রতিবেশীরাও বছরজুড়ে আমাদের হরেক রকম উপহার পাঠাতেন—কামরাঙা, জাম, মেটে আলু, চিনাবাদাম কিংবা ডেউয়ার মতো কত আন্তরিক ঐশ্বর্য! তাঁদের ছাগল ভুল করে আমাদের শিমগাছ খেয়ে ফেললে কিংবা আমাদের হাঁস তাঁদের জালাক্ষেত বেখেয়ালে মাড়িয়ে ফেললেও কোনো বকাঝকা করতেন না কেউ। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে রামছাগলটা ফিরিয়ে দিতেন বড়মা; প্রতিদানে তাঁরাও শুধু ‘হুস’ করে তাড়িয়ে দিতেন আমাদের হাঁসগুলো। 

কোরবানির ঈদ এলেই শৈশবের আনন্দঘেরা রঙিন ঈদগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। বড় বড় ডিপ ফ্রিজের হিম শীতলতায় আহা কোথায় হারিয়ে গেছে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর আমাদের সেই যৌথ ঈদগুলো!

কাইছুন নেছা কুহেলী, সুবর্ণচর, নোয়াখালী