বাবা সকালে উঠেই তড়িঘড়ি করে ছুটে যেতেন অফিসে। ফিরতেন রাত ১০টার দিকে। তাই বাবার সঙ্গে কথাবার্তা তুলনামূলক কম হতো। আমাদের খাওয়াদাওয়া, স্কুলে যাওয়া-আসা, খেলাধুলা—বেশির ভাগই হতো মায়ের তত্ত্বাবধানে। মা কখনো পড়তে বসাতেন, রান্না করে খাওয়াদাওয়া করিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিতেন, বিকেলে খেলার মাঠে পাঠাতেন, আবার ফুটবল খেলে পায়ের আঙুলে ব্যথা পেলে মালিশ করে দিতেন। মা সব কাজের কাজি। ছোটবেলায় একবার ভয়ানক এক অসুখে পড়লাম। এক দিন, দুই দিন—এভাবে সাত দিন পেরিয়ে গেল, কিছুতেই সুস্থ হচ্ছিলাম না। ডাক্তার কিছু ওষুধ দিলেন। বললেন, সেবা-যত্ন ভালো করে করতে হবে। মা তো কেঁদেকেটে অস্থির, ‘আমি ভালোমতো দেখাশোনা করব।’ এরপর শুরু হলো যমে-মানুষে টানাটানি। সহজ কথায়, যম আর মায়ের লড়াই। তখন রোজ আটটি করে ট্যাবলেট খেতে হতো আমাকে। প্রায় ১৪ দিন পর যমরাজ হার মানলেন। সুস্থ হয়ে উঠলাম। আমাদের বাড়ির পাশেই ধানক্ষেত। ধান কাটার পর সেই জমিতে আমরা কয়েকজন দাঁড়িয়াবান্ধা খেলছি। হঠাৎ কেউ একজন গালি দিল। জবাবে আমিও গালি দিলাম। জানতাম না যে মা পাশেই কাজ করছিলেন। তিনি শুনে ফেলেন। একটি মোটা লাঠি নিয়ে সেই যে আমাকে পেটাতে শুরু করলেন, কোনোমতে দৌড়ে পালালাম। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরেছিলাম। যে শিক্ষা সেদিন পেয়েছিলাম, তা আজও ভুলিনি। এইচএসসি পরীক্ষা দেব। হঠাৎ করে ফরম পূরণের নোটিশ পাওয়ায় বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাঁর হাতে টাকা ছিল না। মা বললেন, ‘আমি দিচ্ছি।’ পরে জানলাম, মা বিয়ের সময় পাওয়া সোনার আংটি বিক্রি করে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন। চাকরি হওয়ার পর মাকে আংটি কিনে দিয়েছিলাম। আমরা তিন ভাই। মা কখনোই আমাদের বুঝতে দেননি কাকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আমরা প্রত্যেকেই জানি, মা আমাকেই বেশি ভালোবাসেন।
কমল কুজুর, কবি ও শিক্ষক, দিনাজপুর





