আমাদের ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যেত আগের দিন বিকেল থেকেই। ভোর হতেই চালের গুঁড়ার রুটি বানানোর ধুম পড়ে যেত। এই কাজটি করতেন বাড়ির মহিলারা, প্রতিবেশীরা এসে সানন্দে শামিল হতেন। আত্মীয়-অনাত্মীয়র কোনো বালাই ছিল না। কাই তৈরি করা, কাই মসৃণ করা, রুটি তৈরি করা, রুটি ছেঁকে সাজিতে সংরক্ষণ করা—চার পরিবারের সদস্যদের কাজ চলত সমান তালে। শিশুদের হৈ-হল্লা আর আনন্দে গমগম করত সারা বাড়ি।
ঈদের দিন দুপুরে সবার রান্না করা মাংসের পাতিল জমা হতো উঠানের মাঝখানে; পাশেই সকাল থেকে বানানো রুটির স্তূপ। প্রতিবেশীদের মধ্যে যাঁরা কোরবানি করেননি, বাবা আর জ্যাঠা তাঁদের হাত ধরে নিয়ে আসতেন। লম্বা সারিতে সবাইকে বসিয়ে দিতেন বাড়ির লোকদের সঙ্গে। চালের গুঁড়ার নরম রুটি আর সদ্যোরান্না করা গরম মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। পরিবেশন করতেন বাবা আর মেজো জ্যাঠা, জোগান দিতেন বেলাল ভাই। কোনো ছোট্ট শিশু যখন আর খেতে চাইত না কিংবা কোনো মুরব্বি যখন পরিতৃপ্ত হয়ে বলতেন, ‘আর লাগবে না, আর লাগবে না’, বাবা কিংবা মেজো জ্যাঠা তখন জোর করে আরো দুটি রুটি হাতে গুঁজে দিতেন, প্লেটে তুলে দিতেন আরেক চামচ মাংস।
পুরুষদের পর মহিলাদের পালা। আম্মা আর বড়মা আন্তরিকতায় তাঁদের আপ্যায়ন করতেন। জরির মা, যিনি আমাদের ঢেঁকির কাজ করতেন কিংবা আম্মার হেঁশেলের ‘ডান হাত’ রুমালি খালা—সবাই আজ এই বাড়ির আপনজন, সম্মানিত মেহমান। আম্মা চিলমচি এগিয়ে ধরে তাঁদের হাতে পানি ঢেলে দিতেন; বড়মা স্নেহভরা কণ্ঠে বলতেন, ‘তোমরা তৃপ্তি করে খাও। বাড়ির জন্যও তুলে রেখেছি, যাওয়ার সময় নিয়ে যেয়ো।’
ঈদের দিনেই প্রায় সব মাংস শেষ হয়ে যেত। দু-তিন দিন পর প্লেটে ঠকঠক শব্দ করে আমরা গরুর নেহারির মজ্জা বের করে মজা করে খেতাম। আমাদের কখনোই মনে হতো না আমাদের কোরবানি, আর অমুকের নয়, বরং মনে হতো এই ঈদ সবার, এই আনন্দে সবাই সমান অংশীদার।
প্রতিবেশীরাও বছরজুড়ে আমাদের হরেক রকম উপহার পাঠাতেন—কামরাঙা, জাম, মেটে আলু, চিনাবাদাম কিংবা ডেউয়ার মতো কত আন্তরিক ঐশ্বর্য! তাঁদের ছাগল ভুল করে আমাদের শিমগাছ খেয়ে ফেললে কিংবা আমাদের হাঁস তাঁদের জালাক্ষেত বেখেয়ালে মাড়িয়ে ফেললেও কোনো বকাঝকা করতেন না কেউ। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে রামছাগলটা ফিরিয়ে দিতেন বড়মা; প্রতিদানে তাঁরাও শুধু ‘হুস’ করে তাড়িয়ে দিতেন আমাদের হাঁসগুলো।
কোরবানির ঈদ এলেই শৈশবের আনন্দঘেরা রঙিন ঈদগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। বড় বড় ডিপ ফ্রিজের হিম শীতলতায় আহা কোথায় হারিয়ে গেছে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর আমাদের সেই যৌথ ঈদগুলো!
কাইছুন নেছা কুহেলী, সুবর্ণচর, নোয়াখালী