আপনার শৈশব-কৈশোরের কথা জানতে চাই। আমার জন্ম ঢাকায়, ৩ এপ্রিল ১৯৫০। ঢাকায়ই বড় হয়েছি। মূলত তেজগাঁওয়ে। ছোটবেলায় খেলাধুলা, আড্ডা আর লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। কৈশোরটা বেশ ভালো ছিল। হৈ-হুল্লোড়, গানবাজনা—এগুলো করতাম। মূলত গানের প্রতি খুব টান ছিল। কোনো গান ভালো লাগলে সেই গায়কের কণ্ঠ অনুকরণ করতাম। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, আব্দুল আলীম, আব্বাসউদ্দীন আহমদসহ অনেকের গানই শুনতাম। তবে গায়ক হওয়ার কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। অভিনয়ে এলেন কখন? ১৯৭২ সালে অভিনয়ে এসেছি। একবার ফার্মগেটের একটি স্টুডিওতে আলমগীর কুমকুম আমার ছবি দেখে অফার করলেন ফিল্মে কাজ করার। আমি তখন তাঁর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেলাম। কিছুদিন পর আমাদের তেজগাঁওয়ের বাড়িটি তিনি ভাড়া নিতে এলেন। জানতে পারলাম, এই বাড়িটি ফিল্মের অফিস হবে। আমরা তাঁকে বাড়ি ভাড়া দিইনি। তারপর তিনি যাওয়ার সময় আমি ছবি করব কি না আবার জিজ্ঞেস করেছিলেন। বলে গেলেন, যদি ছবিতে কাজ করি তাহলে যেন এক সপ্তাহের মধ্যে যোগাযোগ করি। তাঁর এ কথা শুনে বড় বোন আর দুলাভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করলাম। তাঁরা উত্সাহ দিলেন, ‘ওকে, কাজ করো। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের ছবি, ইতিহাস হয়ে থাকবে! তবে এই একটা ছবিতেই কাজ করো।’ তারপর আলমগীর কুমকুমের সঙ্গে যোগাযোগ করা। তাঁর সঙ্গে দেখা হলো। সঙ্গে আরো দু-চারজন ছিলেন। তাঁরা জানিয়েছিলেন, আমার কথায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক টান আছে। শুদ্ধ করে কথা বলা শিখতে হবে। আমাকে বলেছিলেন, যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিদায় অভিশাপ’ পড়ে আসি। আমি পুরোটা না পড়লেও অল্প কিছুদিনে তিন-চার পাতা মুখস্থ করে আবার তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। এবার তিনি হেসে বললেন, ‘তোমাকে দিয়েই হবে!’ আমি কাজ করলাম তাঁর ‘আমার জন্মভূমি’ ছবিতে। আলমগীর কুমকুম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো ফিল্মে আসা হতো না। কতগুলো ছবি করেছেন? সঠিক হিসাব বলতে পারব না, তবে আনুমানিক ২৩০টা ছবি আমি করেছি। ‘আমার জন্মভূমি’র পর দ্বিতীয় ছবি ‘দস্যুরানী’। এরপর ‘চাষীর মেয়ে’, ‘জয় পরাজয়’, ‘লাভ ইন সিমলা’, ‘হাসি কান্না’, ‘জাল থেকে জ্বালা’, ‘শাপমুক্তি’, ‘গুণ্ডা’, ‘মাটির মায়া’, ‘মণিহার’, ‘লুকোচুরি’, ‘হীরা’, ‘মমতা’, ‘রাতের কলি’, ‘মধুমিতা’, ‘হারানো মানিক’, ‘মেহেরবানু’, ‘কন্যাবদল’, ‘কাপুরুষ’, ‘শ্রীমতী ৪২০’, ‘জিঞ্জির’, ‘বদলা’, ‘সাম্পানওয়ালা’, ‘কসাই’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘লুটেরা’, ‘চম্পা চামেলী’, ‘গাঁয়ের ছেলে’, ‘ওস্তাদ সাগরেদ’, ‘দেনা পাওনা’, ‘মধুমালতী’, ‘আশার আলো’, ‘বড় বাড়ির মেয়ে’, ‘আল হেলাল’, ‘সবুজ সাথী’, ‘রজনীগন্ধা’, ‘ভালোবাসা’, ‘লাইলী মজনু’, ‘বাসরঘর’, ‘মান সম্মান’, ‘ধনদৌলত’, ‘নতুন পৃথিবী’, ‘মরণের পরে’, ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘মহল’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘ভাত দে’, ‘হিসাব নিকাশ’, ‘দুই নয়ন’, ‘ঘরের লক্ষ্মী’...আরো কত যে নাম! অনেক চলচ্চিত্রকারের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের সম্পর্কে যদি বলতেন। তাঁদের গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, নারায়ণ ঘোষ মিতা, সুভাষ দত্ত, আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল ইসলাম, এ জে মিন্টু...কার কথা বলব। একেকজনকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যাবে। তাঁরা একেকটা ইনস্টিটিউশন ছিলেন। তাঁরা খুব ভালো ডিরেক্টর ছিলেন। আমরা খুব সৌভাগ্যবান যে এসব ডিরেক্টর পেয়েছি। আমরা কেউ অভিনয় জানতাম না। আমরা স্টাইলিশ ছিলাম না। এই ডিরেক্টররা আমাদের আস্তে আস্তে শিখিয়েছেন। আমাদের ক্লাস নিতেন তাঁরা। আমার তো মনে হয়, এখন যাঁরা নতুন ছেলে-মেয়ে, তাঁদের ক্লাস নেওয়ার ক্ষমতা অনেক ডিরেক্টরের নেই। এ কথা বলার জন্য আমি খুবই দুঃখিত। আশা করি কেউ ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না। আমি সামগ্রিক অর্থে বলছি। আলমগীর-শাবানা জুটি খুব দর্শকপ্রিয় ছিল। জুটির বিষয়টি কেমন ছিল? শাবানার সঙ্গে জুটি বেঁধে করেছি শতাধিক ছবি। তখনকার যুগে একসঙ্গে কাজ করার বিশেষ কোনো অনুভূতি ছিল বলে মনে পড়ে না। ক্যামেরা ওপেন হতো সকাল ৭টায়। ফলে আমাদের মেকআপ নিতে হতো ৬টায়। তারপর নিরবচ্ছিন্ন কাজ করতাম। শুধু আলমগীর-শাবানা না, রাজ্জাক-কবরী, ফারুক-ববিতা—এ রকম আরো জুটি ছিল। তবে আমাদের কাছে জুটিটা কোনো বড় বিষয় ছিল না। বড় ছিল ডিরেক্টর। তিনি যা বলছেন, তার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের কারো ছিল না। আমি একটা কথা বলি, শুধু জুটি দেখে দর্শক হলে যেত—এমন ধারণা ভুল। দর্শক হলে যেত আসলে ডিরেক্টরের নাম শুনে। আমরা দেখেছি, ‘আলগীর-শাবানা’ নেম প্লেটটা যখন স্ক্রিনে এলো, দর্শক তখন চুপচাপ। কিন্তু যখনই ডিরেক্টর ইবনে মিজানের নাম এলো, তখন দর্শকের হাততালি থামছেই না। তার মানে, ডিরেক্টরই ছিলেন চলচ্চিত্র নামক জাহাজটির ক্যাপ্টেন। ফলে আমরা যারা তখনকার আর্টিস্ট, জুটি বিষয়টি আমাদের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। জুটি দর্শককে হয়তো প্রথম দিন হলে নিয়ে যেতে পারে—আচ্ছা, ঠিক আছে, রাজ্জাক-কবরীর ছবি বা আলমগীর-শাবানার ছবি রিলিজ হয়েছে। যাই। কিন্তু গল্পে যদি জাদু না থাকে, তাহলে তো হবে না। আসলে সব ডিরেক্টরদের খেলা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আমাদের তেমন ডিরেক্টর নেই। এখন সবাই প্রডিউসারদের হাতের পুতুল। আমি এখনো বলছি, অভিনয়শিল্পীকে প্রডিউসার নয়, ডিরেক্টরের হাতের পুতুল হতে হবে। ডিরেক্টররা সেই পুতুলগুলো গড়বেন। চাবি দিয়ে ছেড়ে দেবেন। তাঁর ইচ্ছামতো সেই পুতুল নাচবে। তখন সহশিল্পীদের মধ্যে হূদ্যতা কেমন ছিল? আমরা ছিলাম পরিবারের মতো। আমাদের কোনো অসুবিধা হলে রাজ্জাক ভাই, ফারুক, ওয়াসিম—সবাই এগিয়ে আসতেন। তাঁদের কোনো সমস্যা হলে আমরা আছি। নায়িকাদের সঙ্গেও একই রকম হূদ্যতা ছিল। আমি শাবানার বাড়িতে যেতাম, তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। কবরী আসতেন, আমি তাঁর বাড়িতে যেতাম। কারো বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে একটা বাটি দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া। কাউকে দিয়ে পাঠাতে না পারলে একটা বাটি নিয়ে শুটিংয়ে চলে যাওয়া—আপনার জন্য কালকে বাড়িতে রান্না করেছিলাম। এই যে একটা হূদ্যতা, এই যে একটা পারিবারিক বন্ধনের মতো সম্পর্ক—এটা কেন যেন এখন আর নেই। আমরা আডটডোর শুটিংয়ে গেলে সকালের নাশতাটা যে যার রুমে করে নিতাম। রাতে যখন ফিরে আসতাম, তখন কিন্তু খাবারটা ইউনিটের সবাই মিলে একসঙ্গে খেতাম। এখন আউটডোরে গেলে দেখি, রাতে প্রতি ঘরে একটা টিফিন বাটি নিয়ে যাচ্ছে। আমি বলি, কী ব্যাপার? বলে, এখন তো সব আর্টিস্ট যার যার ঘরে বসে খায়। কোথায় চলে গেল সেই হূদ্যতা? যে যার মতো চলছে! আপনি ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এত সিনেমা করেছেন, এর মধ্যে কোনো একটি কি আপনার মনে বিশেষ তাত্পর্য তৈরি করে? এই যে এতগুলো সিনেমা করেছি, সবই একই একাগ্রতা, একই নিষ্ঠার সঙ্গে করেছি—এ কথা যদি বলি, তাহলে আমি মিথ্যাবাদী। না, এটা হতে পারে না। চলচ্চিত্র এমনই একটি মাধ্যম, যার মধ্যে শিল্পও থাকতে হবে, বাণিজ্যও থাকতে হবে। শিল্পবোধের মাঝে কিছু ছবি বাণিজ্য, মানে পেটের দায়ে বেছে নিয়েছি। আবার কিছু ছবি বেছে করতাম, যেটা আমার মনের খোরাক দেবে। তখনকার যুগে একটা ছবি করলে যে টাকা পাওয়া যেত, তা একেবারেই অকল্পনীয় রকমের কম। তার পরও আমরা কাজ করেছি। তখনকার যুগের পরিচালক, শিল্পী—সবাই একরকম কাজপাগল ছিল। আমাদের পয়সা নেই, আউটডোরে গেলে খেতে পারছি না; চলো, মুড়ি খেয়ে পার করে দিই—এভাবে কাজ করতাম। কিছু কিছু শিল্পীর কিছু বিশেষ গুণ থাকে। এটা তৈরি করা নয়, বরং জন্মগতভাবে পাওয়া। সেটা হয়তো বা আমার ছিল। আমি সোশ্যাল ছবি করেছি, গ্রামের অ্যাংরিম্যান, গ্রামীণ প্রেম, ফোক-ফ্যান্টাসি—সবই করেছি। এ ক্ষেত্রে আমি ভাগ্যবান। কিন্তু আমাদের তৈরি করেছেন ডিরেক্টররা। কখনো আদর করে, কখনো শাসন করে। আমরা আসলে কিছুই ছিলাম না! চলচ্চিত্রের কলাকুশলীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল? আমাদের সময় সবাই বন্ধু ছিলাম। আতিক, মিন্টু ভাই, তালেব সাহেব, ফজলে হক—যাঁরা এডিটর ছিলেন, খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন আমাদের। হয়তো আমি কোনো দিন এফডিসিতে শুটিং করছি, এক ঘণ্টার ব্রেক পড়েছে খাওয়ার জন্য, খেতে তো এক ঘণ্টা লাগে না, আমরা পাঁচ মিনিটে খেয়ে খোঁজ নিতাম নিজের কোনো ছবির এডিট চলছে কি না। তারপর দৌড়ে চলে যেতাম সেখানে। এডিটরের কাছে বসতাম। জিজ্ঞেস করতাম, তালেব ভাই, কী কী সমস্যা আছে? এই যে জানার ইচ্ছা, এই পরিবেশ আর পাই না। এখন আমার নিজেরই চলছে না, অন্যের কী বলব! এখন অভিনয় করতে আর ভালো লাগে না। আর বোধ হয় করবও না। বাংলা চলচ্চিত্রের তুমুল জনপ্রিয়তা দেখেছেন, জনপ্রিয়তায় ধসও দেখেছেন। এই ধসের কারণ কী? শরীরে যখন কোনো পোকা ধরে, যখন ক্যান্সার বাসা বাঁধে, তত্ক্ষণাৎ বোঝা যায় না। বুঝতে পারা যায় শেষ স্টেজে। তখন আর ফিরে আসার সময় থাকে না। আমাদেরও তা-ই হয়েছে। শুরুতে আমরা বুঝতে পারিনি আমাদেরকে অশ্লীলতা গ্রাস করেছে, নকল ছবি গ্রাস করতে শুরু করেছে। সব কিছু খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিল। ধরুন একজন ফিল্ম ডিরেক্টর, আমার হিসাবে ১০ বছরের প্রিপারেশন ছাড়া ছবি পরিচালনা শেখা সম্ভব না। কিন্তু আমি দেখলাম, কেউ কেউ এক বছরেই সেটা করে ফেলছেন। ধরুন একটা ছেলে এলো, নায়ক হলো, আস্তে আস্তে তৈরি হবে। অথচ আসার আগেই সে বলে দিচ্ছে—আমি হিরো। আমাদের চলচ্চিত্রের সব জায়গাতেই আসলে দোষ ছিল। আমরা যখন কাজ করতে করতে টায়ার্ড হয়ে যেতাম, তখন বলতাম, নতুনরা আসুক। কিন্তু নতুনরা এসে শিক্ষাটা কার কাছে পাবে? ডিরেক্টরদের কাছে। ডিরেক্টরই যেহেতু তৈরি হয়ে আসেনি, যার কারণে হয়তো সঠিক পথটা দেখাতে পারেনি। অন্যদিকে দ্বিতীয় সমস্যা দেখা দিল, যেনতেন গল্প নিয়ে ছবি বানানোর চর্চা। উত্তরণের পথ কী? সিনেমায় নিশ্চয় বাণিজ্য থাকবে। কিন্তু এটি অবশ্যই শিল্পমাধ্যম। বাণিজ্যের সঙ্গে শিল্পমাধ্যমের সংমিশ্রণ ঘটাতে পারলেই সিনেমার অবস্থার উন্নতি ঘটবে। চিন্তাভাবনা করে প্রডিউস করতে আসবেন—এমন প্রডিউসার দরকার। তারপর দরকার ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটার। একটা মৌলিক গল্প লিখে দেওয়ার মতো কতজন রাইটার আছে? নেই। মিউজিকের কথা বলি। আগে দেখতাম একটা গান করবেন—এ জন্য আলম খান, আলাউদ্দীন আলী...এমন সব প্রখ্যাত মিউজিক ডিরেক্টর সাত-আট দিন একসঙ্গে বসছেন। গীতিকারও বসা। আমরা যারা লিপসিং করব, তারাও গিয়ে বসতাম। সাত-আট দিন চেষ্টা করার পর একটা গান বেরিয়ে আসত। সেই গানগুলো এখনো, চল্লিশ বছর পরও হিট। কিন্তু এখন কী হচ্ছে? একজন পরিচালক ফোন করে মিউজিক ডিরেক্টরকে বলছে—আমার একটি রোমান্টিক গান লাগবে। সে গান লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কী হচ্ছে জানি না! কিন্তু এটা ভুল। এখান থেকে হয়তো একটি-দুটি গান হিট করছে। কিন্তু সিস্টেমটা ভুল। আমাদের সময়ে একজন ডিরেক্টর, একজন ক্যামেরাম্যান—সবাই মিলে বহু রকম চিন্তাভাবনার পর একটা কাস্টিং ঠিক করতেন। আমরা দেখেছি, অনেক ডিরেক্টর ছয় মাস, এক বছর আমাদের জন্য অপেক্ষা করেছেন। বলেছেন—আলমগীর, আমি ক্যারেক্টারটা তোমার জন্য রেখেছি। আমাদের একজন এডিটর ছিলেন বশির সাহেব। অনেক সিনিয়র। দুইটা-তিনটা-চারটা ফিল্ম কেটে কেটে দেখতেন এক শট থেকে আরেক শটে যেতে স্মুথনেসটা কিভাবে আসবে। আমার কাছে তখন বিরক্ত লাগত। ভাবতাম, এত কাটাকাটির কী দরকার? সেই দিনগুলো এখন কই? এখন এমন এডিটর কই? এখন সবই কম্পিটারাইজড। আচ্ছা, ফাইন! পৃথিবী এগিয়ে চলছে। সব জায়গায় কম্পিউটারাইজড। এটা হ্যান্ডেল করার যে মেধা, তা হয়তো অনেকের আছে। কিন্তু এই মেধাকে পরিপোক্ত করে দেখে নেওয়ার কাজটা হচ্ছে না! তবে আমি আশাবাদী মানুষ। এফডিসির বাইরের কিছু ছেলে-মেয়ে এগিয়ে আসছে। ওরা একটা লিবারেশন ঘটাবে বলে আমার মনে হয়। গত পাঁচ-ছয় বছরে তাদের কিছু ছবি আমি দেখেছি। তারা যেভাবে আসছে, চলচ্চিত্রের সুদিন আসবেই। ওটাই হয়তো মেইনস্ট্রিম হয়ে উঠবে। আমার কাছে মেইনস্ট্রিম কোনটা? যে ছবিটা চলছে, সেটাই মেইনস্ট্রিম। আপনি নির্দেশনায় এলেন ১৯৮৫ সালে। কোন ঘটনা থেকে নির্দেশনায় আসা? আমি যত ছবি করেছি, তার বেশির ভাগই, অন্তত ১৮০টিই করেছি ১৯৮০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত, ১৫ বছরে। তখন খুবই ব্যস্ত দিনরাত কেটেছে আমার। তার পরও সৃষ্টির আগ্রহ জাগল। অভিনয়ের এক জিনিস, কিন্তু সৃষ্টির তো আলাদা আনন্দ আছে। সেটা আমার ভেতর হয়তো বা ছিল। ১৯৮৫ সালে নির্দেশনায় এলাম। পরের বছর মুক্তি পেল পরিচালক হিসেবে আমার প্রথম ছবি ‘নিষ্পাপ’। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার সময় আমার মনে আলাদা কোনো অনুভূতি কাজ করেনি। আসলে আমি খুব চাপা স্বভাবের মানুষ। কোনো কিছু সহজে প্রকাশ করি না। ফলে পরিচালক ও প্রযোজক হওয়া সত্ত্বেও ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর কোনো খোঁজ নিইনি। তখন অন্যের ডিরেকশনে শুটিং করছিলাম। রবি-সোমবারের দিকে খবর পেলাম, ছবি হিট। সর্বশেষ পরিচালনা করেছি ‘একটি সিনেমার গল্প’ (২০১৮)। তথাকথিত মেইনস্ট্রিম বলে যেটা বোঝায়, পরিচালক হিসেবে সে ধরনের সিনেমা আমি কখনো বানাইনি। একটু অফট্র্যাকের কাজ করি। এবার সিনেমার ভেতর সিনেমা (ফিল্ম উইদিন ফিল্ম) বানিয়েছি। এখন একটি মৌলিক গল্প খুঁজছি পরের ছবির জন্য। পুরনো কোনো গল্প বা গরিবের ছেলের সঙ্গে ধনীর মেয়ের বিয়ে—ওগুলোতে আমি যাব না। আপনার ব্যক্তিগত জীবনের কথা জানতে চাই। আমার মেয়ে আঁখি আলমগীর গায়িকা। ছোটবেলায় নিজেরই গান শেখার ইচ্ছা ছিল, কোনো কারণে শেখা হয়নি। মেয়েকে গান শিখিয়েছি। ‘ভাত দে’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে সে অভিনয়ও করেছিল। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিল। কিন্তু আর অভিনয় করার ইচ্ছা ছিল না ওর। আমার মা-বাবা বেঁচে নেই। বাবা কলিম উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রযোজক। আমার মা খুব ধার্মিক মানুষ ছিলেন। আমরা ছিলাম তিন ভাই, দুই বোন। বোনেরা আর আমি বেঁচে আছি। আমাদের পরিবারটি বেশ সচ্ছল ছিল। ভাই-বোনদের সঙ্গে খুনসুটি করে শৈশব কাটত। আমার প্রথম স্কুল ছিল হলিক্রস। তখন হলিক্রসে কো-এডুকেশন সিস্টেম ছিল। ওখান থেকে আমি চলে যাই আদমজী ক্যান্টনমেন্টে। ওটা তখন ছিল শুধুই ইংলিশ মিডিয়াম। এরপর নটর ডেম কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। তারপর ভর্তি হই করাচি ইউনিভার্সিটিতে। আমার নার্সারি ক্লাসের কিছু বন্ধুর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে। এখনো আড্ডাবাজি করি। আগে গান শোনার ভীষণ শখ ছিল। এখন তেমন একটা নেই। এখন অফিস আর বাড়ি—এই তো জীবন। শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক (বারিধারা ডিওএইচএস, ঢাকা; ৮ জানুয়ারি ২০১৯)