অন্তরে আল্লাহর অবিভাজ্য ভালোবাসা অর্জনে সুদৃঢ় থাকো।
ইবনু আতা (রহ.)

কোনো অর্জনে খুশি হয়ে উৎসব করা
প্রশ্ন : পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, চাকরি পাওয়া কিংবা সন্তান হওয়ার আনন্দে উৎসব করার বিধান কী? এ ব্যাপারে ইসলাম কি অনুৎসাহী করেছে?
রায়হান, তেজগাঁও
উত্তর : ইসলাম ধর্মে উৎসবের অর্থই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার শোকর বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। তাই পরীক্ষায় পাস, চাকরি হওয়া, সন্তান হলে ইত্যাদি খুশির সংবাদে আল্লাহ তাআলার শোকর বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা প্রয়োজন। এসব আনন্দের সময় শরিয়ত পরিপন্থী কোনো কাজ না হলে খানাপিনার আয়োজন করে আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুবান্ধবকে দাওয়াত করাও জায়েজ আছে। (সুরা : ইব্রাহিম : ৭, আবু দাউদ : ২/৮৩, ফাতাওয়ায়ে মুফতি মাহমুদ : ১০/৪৩৭)

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার একটি উদ্বেগজনক অনৈতিক দিক হলো, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাব কিংবা ওষুধ কম্পানির পক্ষ থেকে ডাক্তারদের কমিশন, উপঢৌকন ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা প্রদান করা। শরিয়তের দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ এখানে রোগীর আস্থা, চিকিৎসকের পেশাগত আমানতদারিতা এবং মানুষের সম্পদের হক জড়িত, যা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার পথকে সুগম করে। অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’
(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৮)
শরিয়তের পরিভাষায় ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্ককে আকদুল ইজারা তথা সেবাভিত্তিক চুক্তি বলে। রোগী নির্ধারিত ফি প্রদান করে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে। এ অবস্থায় রোগী হলো সেবাগ্রহীতা। আর ডাক্তার হলেন সেবাদাতা। রোগীর দায়িত্ব হলো, নিজের শারীরিক অবস্থা সঠিকভাবে জানানো এবং নির্ধারিত ফি প্রদান করা। পক্ষান্তরে ডাক্তারের দায়িত্ব হলো, রোগ নির্ণয় করে যথাযথ চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়োজনভেদে বিভিন্ন টেস্ট, স্ক্যান বা ল্যাব পরীক্ষার সাহায্য নেওয়া এ দায়িত্বেরই অংশ।
অতএব রোগীর কল্যাণ বিবেচনা করে কোন টেস্ট দিতে হবে, কোথায় করালে নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়া যাবে—এসব নির্ধারণ করা ডাক্তারের পেশাগত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এ কাজের বিনিময় রোগী আগেই ভিজিট ফি প্রদান করেছে, তাই এই দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ বৈধ হতে পারে না। কারণ এ ক্ষেত্রে কমিশন গ্রহণের অর্থ হলো, ডাক্তার নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাজের জন্যই অন্যদের থেকে অর্থ গ্রহণ করছেন। আর এটা শরিয়ত নিষিদ্ধঘোষিত উেকাচের অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ থাকব। তারা হলো : ১. যে ব্যক্তি আমার নামে অঙ্গীকার করার পর গাদ্দারি করে (অঙ্গীকার ভেঙে ফেলে)। ২. যেকোনো স্বাধীন মানুষকে (দাস বানিয়ে) বিক্রি করে তার অর্থ ভক্ষণ করে। ৩. আরেকজন হলো, সে ব্যক্তি যে কাউকে কর্মচারী বা শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করার পর তার থেকে যথাযথভাবে কাজ বুঝে নিয়েছে অথচ তাকে তার পারিশ্রমিক দেয়নি। (বুখারি, হাদিস : ২২২৭)
অন্য হাদিসে এসেছে , রাসুল (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপর লানত করেছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫৮০)
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কী হয়েছে! আমরা যাকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে পাঠাই, সে বলে, এটা সরকারি সম্পদ, আর এটা আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে! সে যদি তার পিতার ঘরে বা মাতার ঘরে বসে থাকত, তাহলে কি তাকে কেউ উপহার দিত? যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তার কসম! যে কেউ এমন অবৈধ উপহার গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন সে তা নিজের ঘাড়ে বহন করে আসবে।
(বুখারি, হাদিস : ৭১৭৪)
আজকাল বহু ওষুধ কম্পানি তাদের ব্র্যান্ডের ওষুধ প্রেসক্রাইব করানোর জন্য ডাক্তারদের নগদ অর্থ, বিদেশভ্রমণ, দামি উপহার, মোবাইল রিচার্জ কার্ড, ইলেকট্রনিক ডিভাইস কিংবা অন্যান্য সুবিধা দেয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে এসবও জায়েজ নয়। এটিও শরিয়তের দৃষ্টিতে বিনিময়হীন উেকাচের শামিল। কেননা চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো, রোগীর জন্য যে ওষুধ সবচেয়ে কার্যকর ও উপযোগী সেটিই নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা। কোনো কম্পানির আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করলে এ নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফিন্যানশিয়াল ইনস্টিটিউশনস (এ-এ-ও-আই-এফ-আই)-এর সিদ্ধান্ত মতে, কলম, প্যাড, খাতা, স্টাপলার, প্রেসক্রিপশন স্লিপ বক্সের মতো স্বল্পমূল্যের স্টেশনারি সামগ্রী গ্রহণের সুযোগ আছে। এগুলোতে ওষুধ কম্পানির ট্রেডমার্ক, উৎপাদিত পণ্যের ট্রেডনেম ছাপানো থাকে। মূলত এগুলো কম্পানির বিজ্ঞাপন হিসেবে দেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলো বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা বৈধ নয়।
এই কমিশন সংস্কৃতি শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নষ্ট হয়, নিম্নমানের ডায়াগনস্টিক সেন্টার টিকে থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় টেস্টের কারণে চিকিৎসা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে চিকিৎসকের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত ব্যাহত হয়, রোগী-ডাক্তারের আস্থা ভেঙে পড়ে এবং চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে ব্যাবসায়িক মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়। এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা।
হাদিসে এসেছে, কারো ক্ষতি করা বা একে অন্যকে ক্ষতির মুখোমুখি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। (ইবনে মাজাহ : ২৩৪০)
আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল পদ্ধতিতে ইনকাম করার তাওফিক দান করেন।

সৌদি আরবের জাজান অঞ্চলে মসজিদ ও মুসল্লিদের সেবার মানোন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামী দাওয়াহ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত জুন মাসজুড়ে অঞ্চলটির বিভিন্ন গভর্নরেট ও কেন্দ্রজুড়ে অবস্থিত মসজিদ পরিদর্শনে মোট ৪৭ হাজার ১০টি সরেজমিন পরিদর্শন সফর পরিচালনা করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের জাজান শাখা জানায়, এসব পরিদর্শন কার্যক্রমে এক হাজার ১৬২ জন পুরুষ ও কিছুসংখ্যক নারী পরিদর্শক অংশ নেন। মসজিদগুলোর সার্বিক সেবার মানোন্নয়ন, নিয়মিত তদারকি জোরদার এবং মুসল্লিদের জন্য আরো সুন্দর ও নিরাপদ ইবাদতের পরিবেশ নিশ্চিত করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
পরিদর্শনের সময় মসজিদগুলোর সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, পরিচালন ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি মুসল্লিদের স্বাচ্ছন্দ্যে ইবাদত পালনের জন্য স্থাপনাগুলোর প্রস্তুতি যাচাই, আশপাশের দৃশ্যমান ত্রুটি ও সৌন্দর্য হানিকর বিষয়গুলো অপসারণ এবং জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের প্রয়োজন এমন সমস্যাগুলোও চিহ্নিত করা হয়।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের ধারাবাহিক পরিদর্শন কার্যক্রমের মাধ্যমে মসজিদগুলোকে আরো পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সাধারণ মুসল্লিরা একটি শান্ত, আরামদায়ক ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে ইবাদত পালন করার সুযোগ পাচ্ছেন।