মুসলমানের জন্য ধর্মীয় জীবনে দোয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। দোয়া একই সঙ্গে ইবাদত, প্রার্থনা ও মানবিক প্রশান্তি লাভের মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়াকে ইবাদত ও ইবাদতের মগজ বলেছেন। তিনি দোয়ার প্রতি উৎসাহিত করে বলেছেন, ‘যে আল্লাহর কাছে চায় না, আল্লাহ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হন।’
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৭৩)
তবে দোয়ার ক্ষেত্রেও শরিয়তের কিছু বিধি-বিধান ও নির্দেশনা রয়েছে।
বিষয়বস্তু হিসেবে দোয়া বা প্রার্থনা দুই প্রকার : পার্থিব ও অপার্থিব। পার্থিব বা লৌকিক প্রার্থনা মানুষ স্বাভাবিকভাবে পরস্পরের কাছে করতে পারে। এসব বিষয় স্বভাবজাতভাবে একজন অপরজনের কাছে চেয়ে থাকে। মানুষ বাহ্যত তা প্রদান করতে পারে। যেমন কারো কাছে টাকা-পয়সা চাওয়া, সাহায্য চাওয়া, পানিতে পড়ে গেলে ওঠানোর জন্য ডাকা, মাথার বোঝা পড়ে গেলে ওঠাতে সাহায্য চাওয়া ইত্যাদি।
দ্বিতীয় প্রকার দোয়া হলো অপার্থিব। জাগতিক উপকরণ ছাড়া অলৌকিক সাহায্য ও মুক্তি প্রার্থনা করা। এজাতীয় প্রার্থনা শুধু কোনো ‘ধর্মের অনুসারী’ বা ‘বিশ্বাসী’ করেন। যারা মুমিন বা ‘বিশ্বাসী’ শুধু আল্লাহ বা তার ধারণা মতে, স্রষ্টার কাছে দোয়া করে থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের দোয়া ইবাদতের সর্বজনীন প্রকাশ। মনোবাসনা পূরণে স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য যা কিছু করা হয় তাও পরোক্ষ দোয়ার অন্তর্ভুক্ত। নোমান বিন বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘দোয়াই ইবাদত’ এ কথা বলে তিলাওয়াত করেন—‘তোমাদের প্রভু বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। যারা আমার ইবাদত থেকে অহংকার করে (আমার কাছে প্রার্থনা না করে) তারা শিগগিরই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬০)
দ্বিতীয় প্রকারের প্রার্থনা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে করা বৈধ নয়। দ্বিতীয় প্রকারের প্রার্থনা গাইরুল্লাহর কাছে করা শিরক। সমাজের অনেকেই আল্লাহর ওলি, পীর ও ফকিরের কাছে অপার্থিব বিষয়গুলোও প্রার্থনা করে থাকে, যা কোনোভাবে বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের সময়কার মুশরিকরা অপার্থিব বিষয়গুলো গাইরুল্লাহর কাছে প্রার্থনা করত। তারা প্রার্থনা করত ফেরেশতা ও নবী-রাসুলদের কাছে, যাদের মর্যাদা পীর-ফকির ও দরবেশদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। তবু আল্লাহ তাদের কৃতকর্মকে শিরক আখ্যা দিয়ে তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘বোলো তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করো, তাদেরকে আহবান করো, করলে দেখবে তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূর করার অথবা পরিবর্তন করার শক্তি তাদের নেই। তারা যাদেরকে আহবান করে তারাই তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হতে পারে। তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালকের শাস্তি ভয়াবহ।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৫৬-৫৭)
যেহেতু দোয়া ইবাদতের মূল প্রকাশ এবং এতেই বেশি শিরকে লিপ্ত হয় মানুষ, তাই কোরআনে এই ইবাদতের কথা সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও একমাত্র আল্লাহকে ডাকতে বা একমাত্র তাঁরই কাছে দোয়া করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোথাও আল্লাহ ছাড়া আর অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করার অসারতা বর্ণনা করা হয়েছে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কোরআনে দুই শতাধিক স্থানে এ বিষয়ে মানবজাতিকে সতর্ক করা হয়েছে।
দোয়ার শিরকের বিষয়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) বলেন, ‘মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের কাছে প্রয়োজন পূরণের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করত। অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা, দরিদ্র ব্যক্তির সচ্ছলতা ইত্যাদি প্রয়োজনে তারা তাদের কাছে প্রার্থনা করত। এসব উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার জন্য তারা তাদের নামে মানত করত। তারা আশা করত যে এসব মানতের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং বিপদ-আপদ কেটে যাবে। তারা বরকত লাভের উদ্দেশ্যে এসব উপাস্যের নাম পাঠ করত। এ কারণে আল্লাহ তাদের নির্দেশ দিলেন যে তারা সালাতের মধ্যে বলবে, ‘আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি, শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা : ১/১২৯)
বাংলার প্রসিদ্ধ পীর ও সংস্কারক ফুরফুরার পীর শায়খ আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর নির্দেশে আল্লামা রুহুল আমিন (রহ.) দোয়া, ডাকা বা প্রার্থনাবিষয়ক শিরকগুলো ব্যাখ্যা করেন। তিনি লেখেন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে গায়েবি ইলম বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, মনোবাঞ্ছা পূরণকারী বা কল্যাণ-অকল্যাণে সক্ষম বলে ধারণা করা শিরক। বিপদে-আপদে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিপদ মোচনের জন্য ডাকা বা কারো দিকে মনোনিবেশ করা শিরক। যেমন—হে শায়খ আবদুল কাদের জিলানী! আল্লাহর জন্য আমাকে কিছু দিন অথবা হে খাজা শামসুদ্দিন পানিপতি, আল্লাহর জন্য আমাকে কিছু দিন... ইত্যাদি বলা শিরক।
আল্লাহ সবাইকে শিরকমুক্ত প্রার্থনা করার তাওফিক দিন। আমিন।