kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

মোটা-মুটি গল্প

প্রবুদ্ধ

৯ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মোটা-মুটি গল্প

এক ছিল মোটা—বেজায় মোটা লোক। তার বউও ছিল মোটা। সবাই বলত ‘মোটা-মুটি’। ধনীর ছেলে কিনা, তাই আলসেমির মধ্যে দিন কাটিয়েছে সারা জীবন। ফলে মেদ বৃদ্ধি পেয়েছে দিনের পর দিন।

আসলে কর্তার নাম হরিধন, গিন্নির নাম ক্ষেমঙ্করী। কিন্তু ‘মোটা-মুটি’ নামের আড়ালে তাদের আসল নাম কবে হারিয়ে গেছে।

টাকার দিক থেকে হরিধন ছিল এক্কেবারে ‘সলিড’—মোটা টাকার মালিক। শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাথাটাও তৈরি, যাকে বলে মোটা মাথার মালিক।

বুড়ো-বুড়ি ইয়া লাস নিয়ে যখন অঘোরে নাক ডাকাত, মনে হতো যেন ডাকাত পড়েছে বাড়িতে কিংবা ভূমিকম্প হচ্ছে।

এত টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের মনে সুখ ছিল না—ছেলেপুলে নেই। সম্পত্তি ভোগ করবে কে? তাই তারা ঠিক করল, যা কিছু আছে, খেয়েদেয়ে বেবাক ফাঁক করে যাবে—যা থাকে কপালে!

ঘি-দুধ-রাবড়ি থেকে শুরু করে পোলাও-কালিয়া খেয়ে খেয়ে তারা দিনের পর দিন আরো মোটা, মোটাতর, মোটাতম হয়ে উঠল। শেষে এমন অবস্থা হলো যে কারোর সাহায্য ছাড়া তারা চলাফেরা তো দূরের কথা, নড়াচড়াও করতে পারত না। এর জন্য কর্তার চারজন চাকর, গিন্নির পাঁচজন চাকরানি সব সময় হিমশিম খেয়ে যেত।

ঘরের বাইরে বেড়াতে ইচ্ছে হলেও যাওয়ার উপায় ছিল না। কেননা, তাদের দেহের পরিধির চেয়ে দরজাখানা ছিল কিছু ছোট। তারই ভেতর স্নান, খাওয়াদাওয়া, ঘুমানো—সব কিছুরই ব্যবস্থা।

সকাল ৮টায় ঘুম ভাঙার পর একরাশ ঘি চুবচুবে পরোটা চিবিয়ে খাঁটি দুধের ক্ষীর এক গ্লাস খেয়ে কর্তা আটটি বালিশ হেলান দিয়ে বসতেন। দুই পায়ের নিচে দুটি বালিশ, দুই হাতে দুটি, আর পিঠের কাছে চারটি—মোট আটটি বালিশ। গিন্নিরও তা-ই।

এভাবে একঘেয়ে জীবন কাটাতে কাটাতে জীবনে তাদের ঘেন্না ধরে গিয়েছিল। কত ডাক্তার-কবিরাজ এলো-গেল, কোনো ওষুধে কিছু হয় না। রোগা তো দূরের কথা, দিনের পর দিন যেন আরো মেদ বৃদ্ধি ঘটতে লাগল।

শেষে এলেন একজন ব্যায়ামবিদ। তিনি বুড়ো-বুড়িকে যোগাসন করাতে লাগলেন। কিন্তু মুশকিল বাধল প্রথম দিনই। যেই না বুড়োর হাতের একধারে বালিশ সরিয়ে নিয়েছেন, অমনি বুড়ো কাত হয়ে সেই ব্যায়ামবিদের ওপরেই হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। অত বড় একটা পেল্লায় লাসের ভারে ব্যায়ামবিদের প্রাণ যায় আর কি!

বুড়িকে স্কিপিং করাতে গিয়েও বিপদ। উঠতেই পারে না, দড়ি ধরে লাফাবে কী! হতাশ হয়ে ব্যায়ামবিদ কেটে পড়লেন।

বুড়োর গায়ে ছিল একটা ফতুয়া। তাতে চার ইঞ্চি অন্তর এক-দুই-তিন-চার করে নম্বর দেওয়া থাকত। গরমের দিনে গা চুলকালে বুড়ো ইঙ্গিত করত, আর সেই-সেই নম্বর চুলকে দিত চাকররা। এ ছাড়া উপায় ছিল না।

একদিন বিকেলে বুড়ো বলল বুড়িকে—কিসের যেন পচা গন্ধ পাচ্ছি।

চাকর-চাকরানি বিছানা আতিপাতি খুঁজল। কিন্তু না, কোথাও কিছু নেই—মরা জন্তুজানোয়ার তো দূরের কথা!

পরদিন অবস্থা আরো খারাপ। আরো পচা গন্ধে ঘর ভরে গেছে। টেকা দুঃসাধ্য।

শেষে বুড়োর ফতুয়া খুলে দেখা গেল ইয়া বড় একটা বিছা মরেছে ভুঁড়ির ভাঁজে—সেটাই পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

এমনিভাবে দিন যায়। ওদের বড় কষ্ট গরমের দিন এলে। রাত-দিন পাখা চালিয়েও ঘাম বন্ধ হয় না।

শেষে ওরা ভেবেচিন্তে ঠিক করল—কোনো উঁচু পাহাড়ি জায়গায় চলে যাবে।

টাকার তো অভাব নেই। যেই ভাবা, সেই কাজ। ওদের জন্য পাহাড়ের এক জায়গায় ঘর নেওয়া হলো।

কিন্তু ফ্যাসাদ বাধল যাওয়ার দিন। প্রথমে দরজা ভাঙা হলো গাঁইতি দিয়ে, ধরাধরি করে বের করার পর বুড়োকে আনা হলো এক রিকশার ওপরে। কিন্তু দেখা গেল, রিকশায় উনি আঁটছেন না। যদিও বা চেপেচুপে রিকশায় ধরানো হলো বুড়োকে; কিন্তু ততক্ষণে রিকশাওয়ালা বে-পাত্তা। রিকশার মায়া ছেড়ে প্রাণের মায়ায় কোথায় অন্তর্ধান করেছে।

আবার ধরাধরি করে নামানোর পর ঠিক হলো, পালকি করে স্টেশনে যাওয়া হবে। কিন্তু পালকি কোথায়? কোনো বেহারার দলই ওদের নিয়ে যেতে রাজি নয়। ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ানও নয়, এমনকি ট্যাক্সিওয়ালাও নয়।

এ তো ভারি ফ্যাচাং।

এসব ব্যাপার-স্যাপার যখন চলেছে, তখন এক চাকর কিন্তু বসে বসে ভাবছে গালে হাত দিয়ে। ওদের সবচেয়ে পুরনো চাকর। ভাবতে ভাবতে তার মাথায় এক বুদ্ধি খেলে গেল। সে অন্য চাকর আর চাকরানিদের ডেকে নিয়ে গেল বাড়ির সামনের গাছতলায়। ফিসফিস করে কী সব পরামর্শ হলো।

তাহলে তোমরা সবাই রাজি তো?—চাকরটি জিজ্ঞেস করে।

হ্যাঁ, রাজি। তবে দেখো, আমরা যেন শেষে চাকরিটা না হারাই।

সে ভার আমার ওপর ছেড়ে দাও।

 

গাছতলা থেকে ফিরে ওরা দাঁড়াল সবাই বুড়ো-বুড়িকে ঘিরে।

এত বড় একটা হুজ্জুত গেছে দেহের ওপর দিয়ে, তাই বুড়ো-বুড়ির খিদে পেয়েছে। বলল—ওরে তোরা খেতে দিচ্ছিস না কেন?

সঙ্গে সঙ্গে সেই চাকরটা বলল—তোরা আবার খাবি কী? কচুপোড়া খা!

কী!—বুড়ো-বুড়ি যেন আকাশ থেকে পড়ল, আমাদের চাকর হয়ে আমাদেরই এত বড় কথা বললি? বিষম রেগে বুড়ো-বুড়ি উঠতে যায়, কিন্তু পারে না, পড়ে যায় কাত হয়ে। কাত হয়ে কাতরাতে থাকে।

কেউই যায় না তাদের তুলে সোজা করতে।

ক্রমে বেলা বাড়ে, বুড়ো-বুড়ির খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। তবু শত অনুরোধেও কেউ তাদের খেতে দিল না। অধিক কি, বুড়ো-বুড়িকে দেখিয়ে দেখিয়ে তাদের দুজনের খাবার ওরা আয়েশ করে সবাই খেয়ে চলল।

বুড়ো যত শাসায়, ‘তোদের চাকরি খতম’—ওরা ততই দুজনকে বক দেখায়। বলে, ‘উঠতেই পারো না, তার আবার খতম! কচু করবে আমাদের।’

এভাবে দুদিন কেটে গেল। খিদের চোটে ওরা জাগে, খিদে নিয়েই ওরা ঘুমায়।

এরই মধ্যে চাকর-চাকরানিরা একটা ছড়া তৈরি করেছে, মাঝে মাঝে শোনাচ্ছে বুড়ো-বুড়িকে—

 

‘ওরে মোটা, ওরে মুটি—

কবে হবি কলাইশুঁটি?

চালকুমড়োর খোলস ছেড়ে,

আয় না তেড়ে, আয় না তেড়ে!

 

অসহ্য! অসহ্য! বুড়ো-বুড়ি গড়িয়ে গড়িয়ে ওদের তেড়ে যায়—ওরাই দূরে সরে যায় একটু একটু করে।

দিন চারেক পরের ঘটনা।

চাকর-চাকরানিরা তখন একটু দূরে মজা করে খাচ্ছে, বুড়ো চিঁ চিঁ করে উঠল—ওরে আমাদের কিছু খেতে দে।

সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো—কচুপোড়া খাও—

গিন্নি!—দুরন্ত রাগে ও দুঃখে বুড়ো এবার চ্যাঁ চ্যাঁ করে উঠল, আর যে সহ্য হয় না। এরা আমাদেরই খেয়ে-পরে মানুষ, আর আমাদেরই কিনা অপমান করছে! এর চেয়ে মৃত্যু ভালো।

না গো, মরার আগে শেষ চেষ্টা করে দেখি। ওই ভাঙা চৌকাঠখানা হাত বাড়িয়ে দাও দেখি।

বুড়ো বহু কষ্টে ভাঙা চৌকাঠের একখণ্ড এগিয়ে দেয় বুড়িকে।

আর তুমি নাও এই বালিশটা, ব্যাটাদের মোক্ষম শিক্ষা দিয়ে যেতে হবে। বুড়ি বলল বুড়োকে।

বুড়ো-বুড়িকে ওই চৌকাঠ-ভাঙা আর বালিশ হাতে উঠতে দেখে তারা আরো জোরে জোরে ছড়া কাটতে থাকে—

‘চালকুমড়োর খোলস ছেড়ে,

আয় না তেড়ে, আয় না তেড়ে!’

তবে রে!—রাগে বুড়ো-বুড়ি যেন বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলল, ধাওয়া করে গেল চাকর-চাকরানিদের। সঙ্গে সঙ্গে ওরাও সরে গেল দল বেঁধে।

কিছুক্ষণ পরে হঠাত্ বুড়ো-বুড়ির হুঁশ হয়। তারা অবাক নিজেদের সেই ফাঁকা মাঠে দেখে : একি, আমরা তাহলে চলতে-ফিরতে পারছি!

গিন্নি বলে—তাইতো! এতক্ষণ ছুটে ফেললাম কী করে?

এমন সময় দূরের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো সেই পুরনো চাকর। তাকে দেখেই বুড়ো-বুড়ি গাল পাড়তে শুরু করল।

তারা থামলে দূর থেকে চাকরটা বলল—মা, আপনারা রাগ করবেন না। আপনাদের অবস্থা দেখে আমরা খুব দুঃখ পেতাম। সবাই তাই যুক্তি করে এসব করেছি। দেখলেন তো, এখন আপনারা আমাদের মতোই চলতে-ফিরতে পারছেন।

অ্যাঁ! তাইতো! বুড়ি হেসে ফেলল।

বুড়ো বলল—ব্যাটা পাক্কা বদমাশ। ঘটে ওর বুদ্ধি ঠাসা। যাক, তোদের সব্বাইকে বকশিশ দেব আজ।

মন্তব্য