বাজেটে ঘোষিত ব্যবসাবান্ধব বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে চলতি অর্থবছরে রপ্তানি খাত গতি ফিরে পাবে।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, বাণিজ্যমন্ত্রী

বাজেটে ঘোষিত ব্যবসাবান্ধব বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে চলতি অর্থবছরে রপ্তানি খাত গতি ফিরে পাবে।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, বাণিজ্যমন্ত্রী

পদত্যাগের দুই দিন পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সরকারি বাসভবন ‘বঙ্গভবন’ ছেড়েছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গতকাল রবিবার দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে তিনি ‘বঙ্গভবন’ ছেড়ে রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবন গ্রিন ভিলার উদ্দেশে রওনা হন। পরে বিকেল ৩টার কিছুক্ষণ আগে তিনি গুলশানের ১২৩ নম্বর সড়কের নিজ বাড়ি ‘গ্রিন ভিলা’য় পৌঁছান।
গতকাল বঙ্গভবনের আশপাশেও কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। দুপুরের দিকে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সরকারি গাড়িবহর নিয়ে বেরিয়ে যান দুই দিন আগে পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। দুই বছরের বেশি সময় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে অন্তত ছয় মাস দায়িত্ব পালন করে পদত্যাগ বা মেয়াদ শেষে পদ ছাড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আজীবন অবসর ভাতা পাওয়ার অধিকারী হন। মো. সাহাবুদ্দিন যেহেতু ছয় মাসের অনেক বেশি সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই তিনি ২০১৬ সালের ‘রাষ্ট্রপতির অবসর ভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন’ অনুযায়ী আজীবন অবসর ভাতা পাওয়ার অধিকারী। এ ছাড়া আইনে নির্ধারিত অন্যান্য সুবিধাও তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিরোধী দল যেসব অভিযোগ তুলেছে তাতে আমলে নেওয়ার মতো কোনো বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর যেকোনো নাগরিক বা রাজনৈতিক দলের মতামত ও প্রতিবাদ প্রকাশের অধিকার রয়েছে। সেটা আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এনসিপি এবং অন্যরা তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করছেন। সেটা করতে পারেন। কিন্তু আমলে নেওয়ার মতো কোনো বক্তব্য ওখানে নেই।’ গতকাল রবিবার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে পুলিশের সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা সনদ ও আর্থিক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এবং সমসাময়িক ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পদাধিকার বলে দায়িত্ব পালনকালীন সাবেক রাষ্ট্রপতি যে সাংবিধানিক সুরক্ষা (ইমিউনিটি) পেয়ে থাকেন, তা বলবৎ থাকবে। তা ছাড়া আইন অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপতিকে এসএসএফ, পিজিআর ও পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে।’
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে এবং তা গৃহীত হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি পত্রিকায় দেখেছি। কী তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো পত্রিকা এমন একটি সংবাদ দিল, সেটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন। তবে সরকারের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।’
মতিঝিল মেট্রো রেল স্টেশনের নিচে পাওয়া ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস উদ্ধার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘উল্টো রথযাত্রা বা কোনো বিশেষ ধর্মীয় উৎসবকে লক্ষ্য করে এটি করা হয়েছে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই; বরং এটি কাকতালীয়। তিনি বলেন, ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের তৎপরতায় তা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে এবং ঘটনাটির বিষয়ে তদন্ত চলছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা সততা, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের কর্মের যথাযথ স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কৃত করা হবে। অন্যদিকে যাঁরা আইন-বিধি লঙ্ঘন করে জনসেবায় ব্যাঘাত ঘটাবেন বা অপকর্মে লিপ্ত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি তিরস্কারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনপ্রত্যাশা ও জন-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি জনবান্ধব ও সেবামুখী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ নীতি অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
এ বছর পুলিশ সপ্তাহে পদক প্রদান অনুষ্ঠান না হওয়া সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, তাড়াহুড়া করে তৈরি করা প্রাথমিক তালিকায় কিছু কারিগরি ত্রুটি ও অনিয়ম ধরা পড়ায় তা পুনরায় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যোগ্যদের মাঝে বিশুদ্ধ তালিকা অনুযায়ী পুলিশ পদক প্রদান করা হবে।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও বহিরাগমন) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। অন্যান্যের মধ্যে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থাপনা করেন পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (কনফিডেনশিয়াল) মো. কামরুল আহসান। অনুষ্ঠানে দুটি ভিন্ন সাহসিকতা, প্রশংসনীয় ও কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ৯ জন পুলিশ সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়।

সদ্যোবিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ আজাদি পার্টি ও রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম নামের দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে দুটি অভিযোগ করা হয়। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ দায়েরের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আজাদি পার্টির আহ্বায়ক সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. হাসিনুর রহমান। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট পর্যন্ত এত লোককে হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে; কোনো দিন প্রতিবাদ করেননি সাবেক এই দুই রাষ্ট্রপতি। এসব অপরাধে তাঁদের মৌন সম্মতি ছিল।’
সংগঠনটির প্রধান সংগঠক মুন্সি বোরহান মাহমুদ বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা গণহত্যা, জুডিশিয়াল কিলিং, গুম, খুন, আয়নাঘরসহ বাংলাদেশে যতগুলো গণহত্যা হয়েছে, যতগুলো নারকীয় ঘটনা ঘটেছে, সব ঘটনার সময় এই দুজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতিরা ফ্যাসিস্ট সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন, সব ধরনের নিরাপত্তা দিয়েছেন। এই অন্যায়গুলোর প্রতিবাদ করেননি এবং ওই ক্ষমতার অংশ হয়ে সুবিধা ভোগ করেছেন। এই দুই সাবেক রাষ্ট্রপতি এই অন্যায়ের দায় এড়াতে পারেন না।’
রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে শুধু সদ্যোবিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাই তুলে ধরেছেন অভিযোগে। এতে বলা হয়েছে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে শাহবাগে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে গত বছরের ১৮ জানুয়ারি রাতে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে তাঁকে গুম করা হয়। পরদিন ১৯ জানুয়ারি বাংলামোটর এলাকায় তাঁকে ফেলে রেখে যায়। অভিযোগে সদ্যঃসাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘একান্ত সহযোগী’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করা, অমানবিক নির্যাতন, খুন, গুমের হুকুমদাতা হিসেবে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্ত করে বিচারের দাবি জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং চব্বিশের গণ-আন্দোলনে সাহাবুদ্দিনের কোনো আইনগত দায় বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
তারকাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ : রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের পক্ষ থেকে চিত্রনায়ক রিয়াজ আহমেদ, ফেরদৌস আহমেদ, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ ওঠা অন্যদের মধ্যে আছেন—অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস, শমী কায়সার, রোকেয়া প্রাচী, মাহিয়া মাহি, নিপুণ আক্তার, তানভীন সুইটি, হৃদি হক, জ্যোতিকা জ্যোতি, অভিনেতা সাজু খাদেম, সোহানা সাবা, পিয়া জান্নাতুল, শামীমা তুষ্টি, হিরো আলম, আশনা হাবীব ভাবনা, সাইমন সাদিক, সুজাতা আজিম, জায়েদ খান, আজিজুল হাকিম, চন্দন রেজা, আসাদুজ্জামান নূর, মারিয়া কিসপট্টা, শান্তা ফারজানা, মোমিন মেহেদী, সোমা ইসলাম ও সাংবাদিক আনিস আলমগীর।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যায় প্ররোচনা, সহযোগিতা, উসকানি বা সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত ছিলেন এসব তারকা। এই অভিযোগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আইনানুগ তদন্ত প্রত্যাশা করছি।