পাল্টাপাল্টি প্রাণঘাতী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছে। যদিও একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কারিগরি আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এটা ঠিক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দিনের প্রাণঘাতী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে বন্দুকের শব্দ থেমেছে এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো কূটনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনা কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ঠিকই রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থা এখন ‘পেনরোজ স্টেয়ার্স’-এর মতো। এটি এক ধরনের অপটিক্যাল ইলিউশন বা দৃষ্টিভ্রম। প্রথম দেখায় মনে হয়, একটি সিঁড়ি চারদিকে ঘুরে আবার একই জায়গায় ফিরে আসছে। কিন্তু আপনি যেন সব সময় ওপরের দিকে উঠছেন বা নিচের দিকে নামছেন। বাস্তবে এমন সিঁড়ি তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থা এখন এই পেনরোজ স্টেয়ার্সের মতো! বিশ্লেষকরা দাবি করেছেন, এই পরিস্থিতির অনেকটাই ট্রাম্পের নিজের সিদ্ধান্তের ফল। তিনি এমন একটি সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন, যার কোনো সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত প্রস্থান কৌশল ছিল না। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করেছিলেন, তা সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করতে পারেনি। গত বুধবার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এরপর তিনি আবারও সেই পুরনো দ্বিধার মুখে পড়েছেন। তাঁর সামনে এখন দুটি কঠিন পথ। প্রথমত, যুদ্ধ আরো বিস্তৃত করা; যার মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য হতে পারে চড়া। দ্বিতীয়ত, এমন একটি ভঙ্গুর সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা, যা সমালোচকদের মতে ইরানকে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে ব্যর্থ হবে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে সমঝোতাকে নিজের ‘অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ট্রাম্প। তাই সাম্প্রতিক সংঘাত সেটির কার্যকারিতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলেছে। বাস্তবে নতুন করে হামলার নির্দেশ দিয়ে তিনি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যেখানে ইরানের হাতে থাকা কৌশলগত সুবিধা ভাঙতে গিয়ে আরেকটি সংঘাতের ঝুঁকি নিচ্ছেন।
পাকিস্তান-কাতারের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে পাকিস্তান ও কাতার। তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ও কাতারের কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তাঁরা উভয় পক্ষকে সামরিক অভিযান বন্ধ করে আবার আলোচনায় ফেরার আহবান জানিয়েছেন। পাকিস্তান সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দোহার সঙ্গে সমন্বয় করে ইসলামাবাদ উত্তেজনা কমাতে এবং পরবর্তী দফার আলোচনা আয়োজনের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। পাকিস্তানি সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা অপ্রত্যাশিত হলেও উভয় পক্ষই বুঝতে পারছে, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ কোনো পক্ষের অনুকূলে যাবে না। সর্বশেষ উত্তেজনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষকেই আবার কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার আহবান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বিদ্যমান সমঝোতা বাস্তবায়ন করা গেলে এখনো দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির লাইসেন্স বাতিল করায় আলোচনা এগোবে কি না, তা বেশ অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের শত্রুতা সম্পূর্ণ যৌক্তিক : লেবাননভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিরাজ শিয়ার্স বলেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু মূল সমস্যাটি হলো চরম অবিশ্বাস। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, এই আলোচনা থেকে খুব সামান্যই ফল পাওয়া যাবে। অনেক দিক থেকেই এসব আলোচনা প্রায় প্রতীকী এবং আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রকৃত গতি না আসা পর্যন্ত বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা সম্ভবত কোনো দিকেই এগোবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানি শাসকগোষ্ঠীর যে শত্রুতা, তা অত্যন্ত গভীর এবং অনেকাংশেই সম্পূর্ণ যৌক্তিক।’
সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ইসরায়েল : যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের চলমান উত্তেজনায় যুক্ত হয়ে ইরানে আবারও হামলা চালাতে ইসরায়েলের একটি অংশ আগ্রহী। তবে এ জন্য তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান। নাম প্রকাশ না করে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেরুজালেমের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, আগামী কয়েক দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকবে। একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট। পত্রিকাটি জেরুজালেমের একটি সূত্রের বরাতে জানায়, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হামলায় যুক্ত হতে এবং পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে আগ্রহী ইসরায়েল।
হরমুজে ফের অচলাবস্থা : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টাহামলা শুরু হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কমে গেছে। ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকটে থাকা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নতুন করে বড় ধাক্কা খেল। জাহাজ চলাচলের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার থেকে কোনো বড় বাণিজ্যিক জাহাজ নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে এই প্রণালি পার হয়নি। জলপথটি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সূত্র : সামা টিভি, টাইমস অব ইসরায়েল, নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা



