• ই-পেপার

জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চাইলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী

উক্তি

উক্তি

অপরাধী আমাদের কাছে একজন অপরাধীই। সে দলের যত বড় নেতাই হোক না কেন, আমাদের কাছে তার পরিচয়—একজন অপরাধী।

মো. আসাদুজ্জামান, আইনমন্ত্রী

 

ইরান ইস্যুতে থমথমে মধ্যপ্রাচ্য

পাকিস্তান-কাতারের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার ট্রাম্পের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ইসরায়েল

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
ইরান ইস্যুতে থমথমে মধ্যপ্রাচ্য

পাল্টাপাল্টি প্রাণঘাতী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছে। যদিও একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কারিগরি আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এটা ঠিক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দিনের প্রাণঘাতী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে বন্দুকের শব্দ থেমেছে এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো কূটনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনা কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ঠিকই রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থা এখন ‘পেনরোজ স্টেয়ার্স’-এর মতো। এটি এক ধরনের অপটিক্যাল ইলিউশন বা দৃষ্টিভ্রম। প্রথম দেখায় মনে হয়, একটি সিঁড়ি চারদিকে ঘুরে আবার একই জায়গায় ফিরে আসছে। কিন্তু আপনি যেন সব সময় ওপরের দিকে উঠছেন বা নিচের দিকে নামছেন। বাস্তবে এমন সিঁড়ি তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থা এখন এই পেনরোজ স্টেয়ার্সের মতো! বিশ্লেষকরা দাবি করেছেন, এই পরিস্থিতির অনেকটাই ট্রাম্পের নিজের সিদ্ধান্তের ফল। তিনি এমন একটি সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন, যার কোনো সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত প্রস্থান কৌশল ছিল না। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করেছিলেন, তা সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করতে পারেনি। গত বুধবার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এরপর তিনি আবারও সেই পুরনো দ্বিধার মুখে পড়েছেন। তাঁর সামনে এখন দুটি কঠিন পথ। প্রথমত, যুদ্ধ আরো বিস্তৃত করা; যার মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য হতে পারে চড়া। দ্বিতীয়ত, এমন একটি ভঙ্গুর সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা, যা সমালোচকদের মতে ইরানকে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে ব্যর্থ হবে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে সমঝোতাকে নিজের ‘অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ট্রাম্প। তাই সাম্প্রতিক সংঘাত সেটির কার্যকারিতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলেছে। বাস্তবে নতুন করে হামলার নির্দেশ দিয়ে তিনি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যেখানে ইরানের হাতে থাকা কৌশলগত সুবিধা ভাঙতে গিয়ে আরেকটি সংঘাতের ঝুঁকি নিচ্ছেন।

পাকিস্তান-কাতারের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে পাকিস্তান ও কাতার। তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ও কাতারের কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তাঁরা উভয় পক্ষকে সামরিক অভিযান বন্ধ করে আবার আলোচনায় ফেরার আহবান জানিয়েছেন। পাকিস্তান সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দোহার সঙ্গে সমন্বয় করে ইসলামাবাদ উত্তেজনা কমাতে এবং পরবর্তী দফার আলোচনা আয়োজনের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। পাকিস্তানি সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা অপ্রত্যাশিত হলেও উভয় পক্ষই বুঝতে পারছে, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ কোনো পক্ষের অনুকূলে যাবে না। সর্বশেষ উত্তেজনার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষকেই আবার কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার আহবান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বিদ্যমান সমঝোতা বাস্তবায়ন করা গেলে এখনো দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির লাইসেন্স বাতিল করায় আলোচনা এগোবে কি না, তা বেশ অনিশ্চিত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের শত্রুতা সম্পূর্ণ যৌক্তিক :  লেবাননভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিরাজ শিয়ার্স বলেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু মূল সমস্যাটি হলো চরম অবিশ্বাস। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, এই আলোচনা থেকে খুব সামান্যই ফল পাওয়া যাবে। অনেক দিক থেকেই এসব আলোচনা প্রায় প্রতীকী এবং আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রকৃত গতি না আসা পর্যন্ত বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা সম্ভবত কোনো দিকেই এগোবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানি শাসকগোষ্ঠীর যে শত্রুতা, তা অত্যন্ত গভীর এবং অনেকাংশেই সম্পূর্ণ যৌক্তিক।’

সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ইসরায়েল : যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের চলমান উত্তেজনায় যুক্ত হয়ে ইরানে আবারও হামলা চালাতে ইসরায়েলের একটি অংশ আগ্রহী। তবে এ জন্য তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান। নাম প্রকাশ না করে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেরুজালেমের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, আগামী কয়েক দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকবে। একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট। পত্রিকাটি জেরুজালেমের একটি সূত্রের বরাতে জানায়, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হামলায় যুক্ত হতে এবং পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে আগ্রহী ইসরায়েল।

হরমুজে ফের অচলাবস্থা : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টাহামলা শুরু হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কমে গেছে। ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকটে থাকা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নতুন করে বড় ধাক্কা খেল। জাহাজ চলাচলের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার থেকে কোনো বড় বাণিজ্যিক জাহাজ নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে এই প্রণালি পার হয়নি। জলপথটি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সূত্র : সামা টিভি, টাইমস অব ইসরায়েল, নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা

 

নাহিদ ইসলাম

শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য
নাহিদ ইসলাম

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্যই দেশে ফিরবেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার রায় অলরেডি হয়ে গেছে। এখন এই সরকারের উচিত যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় গণহত্যাকারীকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এসএমই ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল রয়টার্সে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা জানান।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘আজকে একটা ইন্টারভিউয়ে আমরা দেখেছি যে ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশ তো অলরেডি ১৬ বছরের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এখন আমরাও চাই দেশে ফিরবেন, ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য।’

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটা তো শেখ হাসিনা ঠিক করবেন না, তিনি কিভাবে আসবেন। তিনি কাদের নিয়ে আসবেন, সারেন্ডার করবেন কী করবেন না—এটা ঠিক করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। বাংলাদেশ সরকার এটা নিয়ে কথা বলবে দিল্লির সঙ্গে, এখানে আর কোনো পক্ষ নেই। ফলে এটা সরকার ঠিক করবে—তাঁকে কখন আনবে, কিভাবে আনবে এবং কিভাবে বিচারের রায় কার্যকর করবে। সব প্রস্তুতি নিয়েই তাঁকে আনতে হবে।’

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, এটাও দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় একটা উদ্যোগ হবে। এ সরকারের দ্রুত রায়টি কার্যকর করা উচিত। এ ছাড়া অন্য কোনো পরিকল্পনা যদি কেউ ভাবে, তাহলে সেটা কারো জন্যই ভালো হবে না।’

এ সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা অংশগ্রহণ করেছে, রাজনৈতিকভাবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তারা প্রস্তুত আছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্য আমরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছি।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী আশিকিন আলম। এতে সারা দেশ থেকে আসা বিভিন্ন উদ্যোক্তারা অংশ নেন।

 

‘আওয়ামী লীগের বিচার সঠিক রাস্তা’

অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার যদি কোনো ধরনের পাঁয়তারা হয় আর সরকার যদি সেটাকে প্রশ্রয় দেয়, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন সরকারই হবে।

এনসিপির আহ্বায়ক আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে দলগতভাবে বিচারের মুখোমুখি করার কথা সরকারও ভাবছে। আমরা মনে করি, এটাই সঠিক রাস্তা। শেখ হাসিনার রায় অলরেডি হয়ে গেছে। এখন এটা কার্যকর করতে হবে। শেখ হাসিনা যদি দেশে ফিরে, কেবল ফিরবে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য।’

শেখ হাসিনা নিজের দলের নেতাকর্মীদের ত্যাগ করে দিল্লিতে পালিয়ে গেছেন বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটা দিল্লির নিয়ন্ত্রিত একটা দল। ফলে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত নয়। দিল্লি থেকে তাঁকে যতটুক পারমিট করা হয়, পারমিশন দেওয়া হয়, সে অনুযায়ী তিনি কথা বলেন।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘ফলে শেখ হাসিনা আসবেন কি আসবেন না, কিভাবে আসবেন, বিচার হবে কি না—এটা মূলত দিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে।’

মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সাজা (১০ বছরের কারাদণ্ড) নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘হাসানুল হক ইনুর রায় বিচারব্যবস্থা এবং ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়াও আমরা পাইনি। সরকার তো একটা রাজনৈতিক দলও; সেই দলের জায়গা থেকেও কিন্তু আমরা কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি।’

 

বিশেষ লেখা

মশার কামড়েই কি মারা যাব

ইমদাদুল হক মিলন

মশার কামড়েই কি মারা যাব

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশাকে বলা হতো বনেদি মশা। এরা শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে জন্মায়, সেই এলাকার মানুষদেরই কামড়ায়, সেই এলাকার মানুষেরাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। শুনেছি, তা-ও নাকি পুরুষ এডিসে কামড়ালে ডেঙ্গু হয় না, স্ত্রী এডিসে কামড়ালে হয়। এই মশা রাত জাগতে পারে না, কামড়ায় দিনের বেলায়। জন্মের স্থানগুলো হলো—যেখানে চার-পাঁচ দিন ধরে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, ও রকম জায়গা। যেমন—ফ্রিজের তলার ট্রেতে, এসির তলায় জমে থাকা পানিতে, পাঁচ-সাত দিন ধরে বদলানো হয় না এমন ফুলের টবে, মানিপ্লান্টের বোতলে, গরিব এলাকার ডাবের খোসায় কিংবা গাড়ির পুরনো পরিত্যক্ত টায়ারে। অর্থাৎ যেখানে চার-পাঁচ দিন পরিষ্কার পানি জমে থাকে, সেই জায়গায় এই মশা জন্মায়। ভবন নির্মাণের চৌবাচ্চাও এডিস মশার একটি প্রিয়তম জায়গা। এই মশার একটি সংক্রমিত হয়ে কোনো একজনকে কামড়ালেই তিনি ডেঙ্গু আক্রান্ত হবেন।

২০০০ সালে ঢাকায় প্রথম ব্যাপক আকারে ডেঙ্গুর আবির্ভাব ঘটেছিল। বেশ কয়েক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। বহু মানুষের জীবনহানি হয়েছে। ২০১৯ সালেও ডেঙ্গু বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লাখখানেক মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল ২০২৩ সালে। প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বছরটি ছিল ডেঙ্গু মহামারির বছর। ১৯৬৪ সালে এই দেশে প্রথম ডেঙ্গু ধরা পড়ে। রোগটিকে তখন চিহ্নিত করা হয়েছিল ‘ঢাকা ফিভার’ নামে। আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে, ১৮২৪ সালে উপমহাদেশের মধ্যে কলকাতায় প্রথম ডেঙ্গুর আবির্ভাব ঘটেছিল। ১৮৩৬, ১৮৭২ ও ১৯০৬ সালে কলকাতায় মহামারির আকার ধারণ করেছিল ডেঙ্গু। রোগটি এই উপমহাদেশে এসেছে আফ্রিকা থেকে। কলকাতায় ১৮৭২ সালে ডেঙ্গুর সময় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ১১ বছর। ডেঙ্গুর ভয়ে কলকাতা থেকে পানিহাটির এক বাগানবাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ঠাকুর পরিবার। রবীন্দ্রনাথের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘জীবনস্মৃতি’তে এই ঘটনার উল্লেখ আছে।

ঢাকায় ২০০০ সালে বড় আকারে ডেঙ্গুর দেখা দেওয়ার পর সিটি করপোরেশন শুধুই ঢাকার ধানমণ্ডি, বনানী, গুলশান—এই সব এলাকা এডিসমুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা কঠোরভাবে মশা নিয়ন্ত্রিত। বসুন্ধরায় আজ পর্যন্ত কখনো একজনও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়নি। অন্য অভিজাত এলাকাগুলো আগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হতো, পত্রপত্রিকা আর টেলিভিশনে সেই সব সংবাদ আমরা দেখেছি। দিনে দিনে এডিস মশা তার চরিত্র বদলে ফেলল। ঢাকার অভিজাত এলাকা ছেড়ে প্রথমে ছড়িয়ে গেল শহরের অন্যান্য এলাকার অলিতে-গলিতে, ছড়িয়ে গেল দেশের অন্যান্য জেলা শহরে। এমনকি উপজেলা ও গ্রামেও থাবা বসাল এডিস মশা। এখন আর তারা শুধু দিনেই কামড়ায় না, রাতেও কামড়ায়। এখন আর সংক্রমিত স্ত্রী এডিসই শুধু ডেঙ্গুর বাহক না, পুরুষ এডিসরাও ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে। প্রকৃতিতে এডিস মশার অনুপাত মোট মশার ১ শতাংশেরও কম। তার পরও এই মশা সংক্রমিত হয়ে কাউকে একটি কামড় বসালেই সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবে।

প্রথম প্রথম ডেঙ্গু ছিল শুধুই বর্ষাকালের রোগ। এখন এই রোগ বছরব্যাপীই হচ্ছে। তবে বর্ষায় ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। এ বছর এরই মধ্যে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে প্রায় সাত হাজার মানুষ। ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞরা এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, সামনের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাঁরা জানিয়েছেন, ফগিংয়ে এডিস মশা নির্মূূল হয় না, ৭০ শতাংশ মশা বেঁচে থাকে।

 

এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

এক গোলটেবিল বৈঠকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আটটি ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।  প্রথম ও প্রধান প্রতিরোধের উপায়টি বলেছেন শুধু ফগিং নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। দুই. সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সমন্বয় ও বছরজুড়ে নজরদারি জোরদার করা। তিন. উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো। চার. জনসচেতনাকে আচরণগত পরিবর্তনে রূপ দিয়ে নিয়মিত পানি জমার স্থান পরিষ্কার করা। পাঁচ. আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত র‌্যাপিড রেসপন্স টিম মোতায়েন ও সহজলভ্য এনএস-১ পরীক্ষা নিশ্চিত করা। ছয়. হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে রাখা। সাত. সরকার, স্থানীয় সরকার ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা। আট. ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করে জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

এই আট পরামর্শের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং জনসচেতনতা আচরণগত পরিবর্তনে রূপ দেওয়া। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ সচেতন হলে ও সেই মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এখন এই সচেতনতার কাজগুলো কিভাবে হতে পারে? জনসচেতনতায় প্রচারমাধ্যমগুলো যদি এগিয়ে আসে, যদি টিভি চ্যানেলগুলো ডেঙ্গু প্রতিরোধে কী কী করণীয় সে বিষয়ে প্রচারণা শুরু করে, পত্রপত্রিকা তাদের প্রিন্ট ও অনলাইন ভার্সনে জনসচেতনতা শুরু করে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও যদি মানুষ যুক্ত হয় ডেঙ্গু বিষয়ে দেশের মানুষকে সচেতন এবং কিভাবে তা প্রতিরোধ করা যায় তা জানাতে, তাহলে অবশ্যই ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব। খুব সহজ কতগুলো কাজ করলেই হয়, যেমন—মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, ফুলহাতা শার্ট পরা, কোথাও স্বচ্ছ পানি জমতে না দেওয়া আর মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা ইত্যাদি। শুধু সরকারের মুখ চেয়ে থাকলে হয় না, নাগরিক দায়িত্বও পালন করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা পথ দেখিয়ে দেবেন, কাজগুলো করতে হবে আমাদেরই।

এই শতাব্দীর শুরুর দিকে ঢাকা ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ‘বিশ্বসাহিত্য প্রতিরোধ কমিটি’ নামে একটি সংগঠন করেছিলেন। সংগঠনের কাজ ছিল ছাত্রসমাজকে উদ্বুদ্ধ করা। পাঁচ-সাতজনের একটি করে দল করা হয়েছিল। তারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিশ্বসাহিত্য ভয়াবহতা সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতন করেছিল। প্রচুর লিফলেট ছাপানো হয়েছিল, সেগুলো বিলি করা হয়েছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে। মাইকে বলা হচ্ছিল, ‘আমাদের শহর বিশ্বসাহিত্য আক্রান্ত। আসুন, সবাই মিলে প্রতিরোধ করি’। এই প্রচারণার ব্যাপক শুভফল পাওয়া গিয়েছিল।

বাংলাদেশে হাজার হাজার সামাজিক সংগঠন আছে। সেই সব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। প্রতিটি সংগঠনকে আমি অনুরোধ করছি, ডেঙ্গু বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলুন, যে যার জায়গা থেকে এডিস মশার প্রজননস্থলগুলো ধ্বংস করুন, বাড়ি-ঘর, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথাও কোনো পাত্রে স্বচ্ছ পানি জমতে দেবেন না, নিজে বাঁচুন ও অন্যকে বাঁচার পথ দেখিয়ে দিন।

আমাদের ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ’ কয়েক মাস আগে থেকেই ডেঙ্গু সচেতনতায় কাজ শুরু করেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এই সংগঠনের কর্মীরা নানা রকমের সভা-সমাবেশ করে, মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে ডেঙ্গু  প্রতিরোধে কী কী করণীয় সেসব প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছে। নিজ এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছে, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করছে। তাতে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, সচেতনতাই বড় শক্তি। মানুষ সচেতন হলে সবকিছুই জয় করা সম্ভব। আমরা মশার হাতে মরতে চাই না। আমরা মশক প্রতিরোধে রুখে দাঁড়াব। নিজেরা বাঁচব, অন্যদের বাঁচাব—এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা। মনে রাখতে হবে, মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচে।