দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগের খরা চলছিল। দেশীয় বিনিয়োগ যেমন কম, তেমনি কম বিদেশি বিনিয়োগও। আশা করা হচ্ছে, বিনিয়োগের সেই খরা এবার কাটতে শুরু করবে। গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নসংক্রান্ত নানা বাধা পেরিয়ে অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন)। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর এই শিল্পাঞ্চলের গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠান গতকাল অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই গ্রাউন্ডব্রেকিং শুধু একটি শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ শুরুর আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার হওয়ার পর এই প্রকল্প ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই প্রকল্প ঘিরে অন্তত ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসবে এবং সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ ও চীনের সরকার টু সরকার (জি টু জি) উদ্যোগের মাধ্যমে। ২০১৪ সালে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন প্রকল্পটি অগ্রসর হয়নি। শুরুতে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানির সঙ্গে আলোচনা হলেও পরে ২০২২ সালে চীনা সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেজা ও সিআরবিসির মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। বেজার তথ্য মতে, আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য সরকার চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট থেকে আসবে।
চীনা বিনিয়োগের প্রবণতাও এখন বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভূমি ইজারা চুক্তি করেছে, যার সম্ভাব্য বিনিয়োগ ৭১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানই চীনা মালিকানাধীন বা চীনা যৌথ উদ্যোগের, যাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রায় ৪৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। বিডা জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৯২১ কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। পাশাপাশি গত রবিবার চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) ২০০ কোটি টাকার দেশি বিনিয়োগে এমইপি হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেডের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন শিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। অন্যদিকে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ ও অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান ইকুইলাইন ফাইন্যান্স।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এই দেশে দ্রুত বাড়ছে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থানের চাহিদা। এই চাহিদা মেটাতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সেই পরিপ্রেক্ষিতে চীনা বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা আশা করি, নিকট ভবিষ্যতে চীনের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের বিনিয়োগও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে দেশীয় বিনিয়োগও।

