২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন বিএনপি জোট সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার বাজেট ঘোষণার পরপরই শুরু হয়ে যায় পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘গণবিরোধী ও লুটপাটের’ বাজেট অভিহিত করে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ই মিছিল ও সমাবেশ করেছে। অর্থনীতিবিদরা বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রশংসা করে বাজেট বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কেউ কেউ বাজেটের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
দেশে বিনিয়োগে গতি নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। নানা প্রতিকূলতায় শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতির গতি ফেরাতে বড় বাজেটের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আর বড় ব্যয় নির্বাহের জন্য বড় রাজস্ব আয় করাও জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমস্যাটা মূলত সেখানেই। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যাকে রীতিমতো অবিশ্বাস্য মনে করা হচ্ছে। কারণ চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য এর তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ কম হওয়া সত্ত্বেও তা অর্জনে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তাই রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য অর্জনে বড় ঘাটতি থাকবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা সত্ত্বেও বাজেটে ঘাটতি রয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশ এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে ব্যাংকিং খাত থেকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরো চাপে পড়বে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, তাতে আরো বেশি চাপ সৃষ্টি হলে তা বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান সংকটসহ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দেশের অর্থনীতি। এমন বাস্তবতায় বাজেটে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ মোটের ওপর সঠিক হয়েছে, তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর। তাঁদের মতে, তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এই বাজেট তৈরি হয়েছে। প্রথমত, বৈদেশিক খাতের কয়েকটি সূচক ছাড়া প্রায় সব সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকই ছিল চাপে। দ্বিতীয়ত, নতুন সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে বাজেট প্রণয়নে চাপের মুখে ছিল। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও সরকারকে নিতে হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদের মতে, বাজেটের সাফল্য কখনোই তার আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাই একটি বাজেটের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না।
আমরাও মনে করি, বাজেটের অনেক ভালো দিক রয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি যৌক্তিক সমালোচনা ও সুপারিশগুলোকে বিবেচনায়
নিতে হবে।

