

বিব্রতকর এক সমস্যা ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা (Snoring)। ঘুমন্ত অবস্থায় নাক, মুখ ও গলার বায়ুপথ আংশিক সংকুচিত হয়ে বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। এতে শ্বাসনালির আশপাশের টিস্যুগুলো কাঁপতে থাকে এবং তৈরি হয় নাক ডাকার শব্দ। বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে এটি কোনো বড় সমস্যা নয়। তবে কারো ক্ষেত্রে এটি গুরুতর রোগের লক্ষণও হতে পারে।
নাক কেন ডাকে
স্থূলতা (Obesity) : অতিরিক্ত ওজনের কারণে গলার চারপাশে চর্বি জমে বায়ুপথ সংকুচিত হয়ে যায়; ফলে নাক ডাকার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
নাক বন্ধ থাকা : সর্দিকাশি, অ্যালার্জি, সাইনুসাইটিস, নাকের মাংস বৃদ্ধি (Nasal Polyp), নাকের হাড় বাঁকা (DNS) ও অন্যান্য কারণে নাকে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। এতে নাক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়, দেখা দেয় নাক ডাকার মতো উপসর্গ।
টনসিল ও এডিনয়েড বড় হওয়া : বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে বড় টনসিল বা এডিনয়েড শ্বাসনালি সংকুচিত করে নাক ডাকার কারণ হতে পারে।
বার্ধক্য : বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলার পেশি শিথিল হয়ে যায়; ফলে নাক ডাকার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ঘুমানোর ভঙ্গি : চিত হয়ে ঘুমালে জিহ্বা ও নরম তালু পেছনের দিকে সরে গিয়ে বায়ুপথ সংকুচিত করতে পারে।
ধূমপান ও মদ্যপান : ধূমপান ও অ্যালকোহল গলার টিস্যু ফুলিয়ে বা শিথিল করে নাক ডাকা বাড়িয়ে দিতে পারে।
ঘুমের ওষুধ বা সেডেটিভ গ্রহণ : কিছু ওষুধ গলার পেশি অতিরিক্ত শিথিল করে নাক ডাকার ঝুঁকি বাড়ায়।
গুরুতর রোগের লক্ষণ
ওপরের কারণগুলোর বাইরে আরো একটি কারণে নাক ডাকতে পারে, এর নাম অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (OSA)। এটি একটি গুরুতর ঘুমজনিত রোগ, যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। নাক ডাকা এর অন্যতম প্রধান লক্ষণ। এর লক্ষণের মধ্যে রয়েছে—
► ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া
► ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া
► সকালে মাথা ব্যথা
► দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব
► মনোযোগ কমে যাওয়া
► উচ্চ রক্তচাপ
► রাতে হাঁপিয়ে ওঠা বা দম বন্ধ লাগা।
এসব লক্ষণ থাকলে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
করণীয়
ওজন নিয়ন্ত্রণ : অতিরিক্ত ওজন কমালে অনেক ক্ষেত্রেই নাক ডাকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কাত হয়ে ঘুমান : চিত হয়ে না ঘুমিয়ে পাশ ফিরে ঘুমানোর অভ্যাস করুন।
নাকের সমস্যার চিকিৎসা করুন : অ্যালার্জি, সাইনুসাইটিস, নাকের হাড় বাঁকা বা পলিপ থাকলে সঠিক চিকিৎসা নিন।
ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করুন : এগুলো নাক ডাকা বাড়িয়ে দেয়।
নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলুন : পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম গলার পেশির কার্যকারিতা ভালো রাখতে সাহায্য করে।
মাথা সামান্য উঁচু করে ঘুমানো : এতে বায়ুপথ খোলা রাখতে সহায়তা হতে পারে।
অ্যাপনিয়ার চিকিৎসা
যদি Obstructive Sleep Apnea (OSA) ধরা পড়ে, তাহলে Sleep Studz, CPAP থেরাপি বা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার লাগতে পারে।
কখন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন
► দীর্ঘদিন ধরে নাক ডাকার সমস্যা থাকলে
► ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে
► শিশুদের নাক ডাকার সঙ্গে মুখ খুলে ঘুমানো বা শ্বাসকষ্ট থাকলে
► দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকলে
► উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের সঙ্গে নাক ডাকা থাকলে।
নাক ডাকা সব সময় সাধারণ সমস্যা নয়। অনেক সময় এটি Obstructive Sleep Apnea-র মতো গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে। তাই দীর্ঘদিনের নাক ডাকা, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ঘুমের মান খারাপ হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লেখক : নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন
সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা রোগ বিভাগ
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

অনেকে মনে করেন, বৃষ্টিতে ভিজলেই গলা ব্যথা হয়। আসলে আর্দ্র বাতাসে প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া স্পোর ও ভাইরাস উড়ে বেড়ায়, যা গলার অভ্যন্তরের শ্লেষ্মা ঝিল্লিতে প্রবেশ করে সৃষ্টি করে প্রদাহ। এ থেকে তৈরি হয় ব্যথার অনুভূতি, যা প্রচলিত ভাষায় ঠাণ্ডাজনিত গলা ব্যথা নামে পরিচিত। ঘরোয়া পরিচর্যায় কিছুদিনের মধ্যেই সেরে যায় এটি; অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গলা ব্যথা হতে পারে জটিল রোগের উপসর্গ। তাই গলা ব্যথার ধরন অনুযায়ী উপসর্গ জেনে নেওয়া জরুরি।
ধরন
গলা ব্যথার সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করতে ব্যথার ধরন জানা গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রেপ থ্রোট বা টনসিলাইটিস দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
♦ ফ্যারিঞ্জাইটিস : গলার পেছনের অংশ বা ফ্যারিংসের প্রদাহ থেকে দেখা দেয় ফ্যারিঞ্জাইটিস। এতে গলার পেছনের অংশে অস্বস্তি ও ব্যথা অনুভূত হয়। বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে গলা ব্যথার কারণ এটাই।
♦ টনসিলাইটিস : ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে টনসিলে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। এতে টনসিল ফুলে যায়, গলা ব্যথার পাশাপাশি খাবার গিলতে সমস্যা এবং গলা ব্যথা হয়। অনেক সময় জ্বরও দেখা দিতে পারে। শিশুদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি হলেও যেকোনো বয়সেই হতে পারে এই রোগ। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
♦ ল্যারিঞ্জাইটিস : স্বরযন্ত্রের প্রদাহের কারণে কণ্ঠস্বর ভেঙে যায় বা বসে যায়। ভাইরাসের সংক্রমণ বা দীর্ঘ সময় উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার কারণে এটি হতে পারে।
♦ স্ট্রেপ থ্রোট : গলায় ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে এটি হয়ে থাকে। উপসর্গের মধ্যে আছে তীব্র গলা ব্যথা, জ্বর এবং টনসিলে সাদা দাগ দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যান্য কারণ
সংক্রমণ ছাড়াও অন্যান্য রোগের উপসর্গ হিসেবেও গলা ব্যথা হতে পারে। এর মধ্যে আছে—
♦ এসিড রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) : পাকস্থলীর এসিড গলায় উঠে এসে গলায় জ্বালাপোড়া ও ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
♦ দাঁতের সংক্রমণ : মাড়ির প্রদাহ, দাঁতের ফোড়া বা আক্কেল দাঁতের জটিলতা থেকেও গলায় ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
♦ কানের সংক্রমণ : মধ্যকর্ণের সংক্রমণে অনেকেই গলা ব্যথা অনুভব করেন।
♦ টনসিলোলিথ (Tonsillolith) : টনসিলে খাদ্যকণা জমে ছোট পাথরের মতো বস্তু তৈরি হলে গলা ব্যথা, মুখে দুর্গন্ধ এবং গিলতে অস্বস্তি হতে পারে।
♦ থাইরয়েড বা লালাগ্রন্থির প্রদাহ : গয়টার, থাইরয়ডাইটিস বা লালাগ্রন্থির সংক্রমণেও গলায় ব্যথা দেখা দিতে পারে।
♦ ক্যান্ডিডিয়াসিস (Candidiasis) : রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে বা দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা স্টেরয়েড ইনহেলার ব্যবহারের ফলে ফাঙ্গাল সংক্রমণ হয়ে গলা ব্যথা হতে পারে।
ঝুঁকিতে যারা
♦ শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়
♦ ধূমপায়ীরাও সহজে আক্রান্ত হন
♦ অ্যালার্জিতে আক্রান্ত ব্যক্তি
♦ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল
♦ ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
ঘরোয়া পরিচর্যা
ভাইরাসজনিত গলা ব্যথা উপশমে ঘরোয়া পরিচর্যা করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
♦ কুসুম গরম লবণ পানি দিয়ে গার্গল করা
♦ পর্যাপ্ত পানি পান
♦ গরম স্যুপ বা অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ
♦ গলাকে বিশ্রাম এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলা কমানো
♦ প্রয়োজনে গরম পানির ভাপ নেওয়া
♦ জ্বর বা ব্যথা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে।
প্রতিরোধ
♦ অণুজীবী সংক্রমণ এড়াতে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে
♦ কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে হবে
♦ অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে
♦ ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে
♦ বৃষ্টিতে ভিজে গেলে দ্রুত শুকনো পোশাক পরতে হবে। ঘুমানোর সময় এসি বা ফ্যান ব্যবহার কমাতে হবে
♦ পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য ও নিয়মিত পানি পান নিশ্চিত করতে হবে
♦ দীর্ঘ সময় উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা বা চিৎকার করা এড়িয়ে চলতে হবে
♦ অ্যালার্জির কারণ থেকে দূরে থাকতে হবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
♦ গলা ব্যথা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে
♦ শ্বাস নিতে কষ্ট হলে
♦ খাবার বা পানি গিলতে সমস্যা হলে
♦ উচ্চ জ্বর দীর্ঘ সময় থাকলে
♦ টনসিল বা ঘাড় অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেলে
♦ মুখ পুরোপুরি খুলতে না পারলে
♦ কণ্ঠস্বর তিন সপ্তাহের বেশি ভাঙা থাকলে
♦ বারবার গলা ব্যথা ফিরে এলে
♦ মুখ দিয়ে রক্ত এলে।
গলা ব্যথার চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করবেন চিকিৎসক। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন নয়।
লেখক : মেডিক্যাল অফিসার
ডেলটা হেলথ কেয়ার