বাংলাদেশে এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (২০১৭-১৮) অনুযায়ী, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন, যাঁদের অনেকে জানেনই না যে তাঁদের শরীরে অজান্তেই বাসা বেঁধেছে উচ্চ রক্তচাপ। যেহেতু তাঁদের শরীরে বাড়তি ওজন নেই, কোলেস্টেরলের সমস্যা নেই, তাই তাঁরা ধারণাও করতে পারেন না তাঁদেরও হতে পারে হাইপারটেনশন। দৈনন্দিন জীবনের আর্থিক সমস্যা, কাজের চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং শহুরে জীবনযাত্রার মানসিক চাপে সমস্যাটি হতে পারে বা বাড়তে পারে এর মাত্রা। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সরাসরি উচ্চ রক্তচাপের কারণ।
মানসিক চাপ কিভাবে রক্তচাপ বাড়ায়
দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকলে শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম অতি সক্রিয় হয়ে পড়ে এবং অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয় (ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন) এবং হৃত্স্পন্দন বেড়ে যায়। এই দুটি সমন্বিতভাবে সাময়িকভাবে দেহের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, শরীরকে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ রেসপন্সের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রতিটি মানুষ ক্রমাগত অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপে থাকে। মানসিক চাপ কমার তেমন সুযোগ হয়ে ওঠে না। তখন সাময়িক অবস্থাটি স্থায়ী রূপ নেয় এবং রক্তনালির সংকোচন ও উচ্চ হৃত্স্পন্দন আর কমে না। এর ফলে রক্তনালির প্রাচীরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ধমনি শক্ত হয়ে যায় এবং প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা সবই উচ্চ রক্তচাপের মূল কারণগুলোর মধ্যে পড়ে। এর পাশাপাশি মানসিক চাপ থেকে নিস্তার পেতে অনেকে বেছে নেন অস্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস। এর মধ্যে আছে খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ যোগ করা, ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম না করা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমানো। এসব অভ্যাস কিছু সময়ের জন্য মানসিক চাপ কমায় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময়ের পর উচ্চ রক্তচাপ আরো বাড়িয়ে তোলে। ঢাকার পরিচালিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অফিসকর্মী উচ্চ চাপের মধ্যে কাজ করেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রায় আড়াই গুণ বেশি।
প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ
জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে সম্ভব রোগটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভ্যাসগুলো ধরে রাখা জরুরি। উপসর্গ কমলেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
♦ খাদ্যাভ্যাস : লবণ কম খাওয়া, কলা, পালংশাকের মতো পটাসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো।
♦ ব্যায়াম : দিনে মাত্র ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা রক্তচাপ ৫-৮ mmHg কমাতে পারে।
♦ মানসিক চাপ কমানো : মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং যোগব্যায়াম কর্টিসল হরমোন কমাতে সাহায্য করে।
যাঁদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন, তাঁদের ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসকরা স্বল্প বা মাঝারি মাত্রার কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আছে এসিই ইনহিবিটর, বিটা-ব্লকার বা ডাইউরেটিক ঘরানার বেশ কিছু ওষুধ। প্রতিটি রোগীর প্রয়োজন আলাদা, সে অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করেন কেমন ওষুধ প্রয়োজন।
প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশে নিয়মিত ব্লাড প্রেসার স্ক্রিনিংয়ের প্রচার বাড়ানো দরকার, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা খুবই কম। উচ্চ রক্তচাপ শুধু একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য (২০২২) অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৫ শতাংশ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে হয়। তাই মানসিক চাপ কমিয়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ালে বাংলাদেশ এই নীরব ঘাতককে পরাজিত করতে পারে।
লেখক : হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক
কার্ডিওলজি বিভাগ, বিএমইউ




