
ক্যাটার্যাক্ট
ছানি—বার্ধক্যজনিত চোখের রোগ
- বার্ধক্যজনিত ক্রনিক রোগের মধ্যে চোখে ছানি পড়া বা ক্যাটার্যাক্ট অন্যতম। ছানির যথাযথ চিকিৎসার অভাবে অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারায়। ছানি হওয়ার কারণ, এর প্রতিকার ও চিকিৎসায় করণীয় জানাচ্ছেন ডা. মো. আরমান হোসেন রনি
মাইগ্রেনের জানা-অজানা

হাইপারটেনশন
মানসিক চাপে উচ্চ রক্তচাপ
অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ। বেশ কয়েকটি কারণে হয় এ রোগ, অন্যতম কারণ উচ্চমাত্রার মানসিক চাপ। লিখেছেন ডা. এস এম ইয়ার ই মাহাবুব

বাংলাদেশে এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (২০১৭-১৮) অনুযায়ী, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন, যাঁদের অনেকে জানেনই না যে তাঁদের শরীরে অজান্তেই বাসা বেঁধেছে উচ্চ রক্তচাপ। যেহেতু তাঁদের শরীরে বাড়তি ওজন নেই, কোলেস্টেরলের সমস্যা নেই, তাই তাঁরা ধারণাও করতে পারেন না তাঁদেরও হতে পারে হাইপারটেনশন। দৈনন্দিন জীবনের আর্থিক সমস্যা, কাজের চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং শহুরে জীবনযাত্রার মানসিক চাপে সমস্যাটি হতে পারে বা বাড়তে পারে এর মাত্রা। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সরাসরি উচ্চ রক্তচাপের কারণ।
মানসিক চাপ কিভাবে রক্তচাপ বাড়ায়
দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকলে শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম অতি সক্রিয় হয়ে পড়ে এবং অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয় (ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন) এবং হৃত্স্পন্দন বেড়ে যায়। এই দুটি সমন্বিতভাবে সাময়িকভাবে দেহের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, শরীরকে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ রেসপন্সের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রতিটি মানুষ ক্রমাগত অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপে থাকে। মানসিক চাপ কমার তেমন সুযোগ হয়ে ওঠে না। তখন সাময়িক অবস্থাটি স্থায়ী রূপ নেয় এবং রক্তনালির সংকোচন ও উচ্চ হৃত্স্পন্দন আর কমে না। এর ফলে রক্তনালির প্রাচীরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ধমনি শক্ত হয়ে যায় এবং প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা সবই উচ্চ রক্তচাপের মূল কারণগুলোর মধ্যে পড়ে। এর পাশাপাশি মানসিক চাপ থেকে নিস্তার পেতে অনেকে বেছে নেন অস্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস। এর মধ্যে আছে খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ যোগ করা, ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম না করা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমানো। এসব অভ্যাস কিছু সময়ের জন্য মানসিক চাপ কমায় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময়ের পর উচ্চ রক্তচাপ আরো বাড়িয়ে তোলে। ঢাকার পরিচালিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অফিসকর্মী উচ্চ চাপের মধ্যে কাজ করেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রায় আড়াই গুণ বেশি।
প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ
জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে সম্ভব রোগটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভ্যাসগুলো ধরে রাখা জরুরি। উপসর্গ কমলেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
♦ খাদ্যাভ্যাস : লবণ কম খাওয়া, কলা, পালংশাকের মতো পটাসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো।
♦ ব্যায়াম : দিনে মাত্র ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা রক্তচাপ ৫-৮ mmHg কমাতে পারে।
♦ মানসিক চাপ কমানো : মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং যোগব্যায়াম কর্টিসল হরমোন কমাতে সাহায্য করে।
যাঁদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন, তাঁদের ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসকরা স্বল্প বা মাঝারি মাত্রার কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আছে এসিই ইনহিবিটর, বিটা-ব্লকার বা ডাইউরেটিক ঘরানার বেশ কিছু ওষুধ। প্রতিটি রোগীর প্রয়োজন আলাদা, সে অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করেন কেমন ওষুধ প্রয়োজন।
প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশে নিয়মিত ব্লাড প্রেসার স্ক্রিনিংয়ের প্রচার বাড়ানো দরকার, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা খুবই কম। উচ্চ রক্তচাপ শুধু একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য (২০২২) অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৫ শতাংশ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে হয়। তাই মানসিক চাপ কমিয়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ালে বাংলাদেশ এই নীরব ঘাতককে পরাজিত করতে পারে।
লেখক : হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক
কার্ডিওলজি বিভাগ, বিএমইউ
ইনফার্টিলিটি
বন্ধ্যত্ব অভিশাপ নয়

বন্ধ্যত্ব নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো প্রচুর ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে বন্ধ্যত্বের জটিল সমস্যাও সমাধান করা যায়। প্রতিটি দম্পতির উচিত বিয়ের আগেই বন্ধ্যত্বের সম্ভাব্য কারণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নেওয়া। এতে ভুল-বোঝাবুঝির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।
বন্ধ্যত্ব কাকে বলে
চিকিৎসার ভাষায়, যেসব দম্পতির অন্তত এক বছর অরক্ষিত সহবাসের পরও স্ত্রী গর্ভধারণ করতে না পারেন, তাঁদের বলা হয় ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যত্ব। আমাদের সমাজের একটি প্রচলিত ধারণা, বন্ধ্যত্ব শুধু নারীদের হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বন্ধ্যত্বের জন্য প্রায় ৪০ শতাংশ দম্পতির ক্ষেত্রে স্বামী দায়ী, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী দায়ী এবং বাদবাকি ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্যান্য কারণ দায়ী।
বন্ধ্যত্ব ঝুঁকিতে যাঁরা
গর্ভধারণের ক্ষেত্রে বয়স অনেক বড় বিষয়। নারীদের জন্য গর্ভধারণের উপযুক্ত বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর। পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়স ৪৫ বছর পার হলে ফার্টিলিটি কমতে শুরু করে। স্ত্রীর বয়স যদি ৩৫ এবং স্বামীর বয়স যদি ৪৫ বছরের বেশি হয়, আর অন্তত এক বছর চেষ্টার পরও যদি স্ত্রী গর্ভধারণ করতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে ইনফার্টিলিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।
পরীক্ষার ধরন
বহু কারণেই হতে পারে বন্ধ্যত্ব। অনেকে বন্ধ্যত্ব নিয়েই জন্মগ্রহণ করেন, কেউ কেউ অল্প বয়সেও বন্ধ্য হয়ে যেতে পারেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রেই করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্ট্রাল ফলিকল কাউন্ট (এএফসি)। এটি করার নিয়ম মাসিকের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দিনে। এ জন্য ব্যবহৃত হয় টিভিএস আলট্রাসাউন্ড পদ্ধতি। এ ছাড়া যেসব পরীক্ষা করা হয়—
♦ অ্যান্টিমুলেরিয়ান হরমোনের (এএমএইচ) মাত্রা। এ জন্য রোগীর রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
♦ টিভিএস আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ফলিকুলোমেট্রি পরীক্ষা।
দুটি পরীক্ষাই করা হয় মাসিকের ১২তম দিনে। তাই আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা জরুরি, নইলে পরীক্ষার জন্য আবার এক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে মূল ইনফার্টিলিটি পরীক্ষা হচ্ছে বীর্য বা সিমেন অ্যানালিসিস। শুক্রাণুর উপস্থিতি, পরিমাণ, নড়াচড়া, আকৃতি এবং স্বাস্থ্যের মাধ্যমে জানা যায়। এ ছাড়া রয়েছে রক্ত পরীক্ষা করে পুরুষ হরমোনের মাত্রা বের করা। কিছু ক্ষেত্রে আলট্রাসাউন্ডেরও প্রয়োজন হতে পারে। কী পরীক্ষা প্রয়োজন, সেটি রোগীর ইতিহাস অনুযায়ী চিকিৎসক ঠিক করে দেবেন।
চিকিৎসা
বন্ধ্যত্বের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে হরমোন চিকিৎসা যথেষ্ট। জটিল ক্ষেত্রে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের (আইভিএফ) প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিটি চিকিৎসাই এখন দেশে রয়েছে, এমনকি আইভিএফও। অভিজ্ঞ ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিলে সমাধান পাওয়া যাবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ,
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
কনসালট্যান্ট, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
দাঁত
স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে লেজার চিকিৎসা
ডা. অনুপম পোদ্দার

অযাচিত ব্যথা, রক্তপাত এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে দাঁত ও মাড়ির চিকিৎসায় এখন ব্যবহৃত হচ্ছে লেজার। এতে ড্রিল বা স্ক্যালপেলের মতো মাড়িতে কাটাকাটির প্রয়োজন হয় না। তাই চিকিৎসা শেষে রোগী দ্রুত সেরে ওঠে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সেলাই বা অ্যানেসথেসিয়ারও প্রয়োজন হয় না। যেসব রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণ, রক্তপাত বা ক্ষত থেকে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা বেশি, তাদের জন্য লেজারভিত্তিক দন্ত চিকিৎসা হতে পারে চমৎকার সমাধান।
কিডনি প্রতিস্থাপন ও
ইমিউনোসাপ্রেসড রোগী
কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। প্রথাগত দন্ত চিকিৎসায় এই রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। লেজার চিকিৎসায় দাঁত ও মাড়ি জীবাণুমুক্ত থাকে, রক্তপাতও কম হয়। ফলে সংক্রমণের আশঙ্কাও কম। তবে কিডনি রোগীদের অবশ্যই আগে নেফ্রোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।
ডায়াবেটিক রোগী
ডায়াবেটিক রোগীদের যেমন মাড়ির রোগের ঝুঁকি বেশি, তেমনি দেহের যেকোনো ক্ষত সহজে সারে না। লেজার ব্যবহারে অপ্রয়োজনীয় ক্ষত তৈরি না করেই দাঁত ও মাড়ির ব্যাকটেরিয়া দমন করে প্রদাহ কমানো যায়। ফলে মুখে সংক্রমণ বা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই পরিহার করা সম্ভব।
রক্ত পাতলা করার
ওষুধ গ্রহীতা
হৃদরোগ অথবা স্ট্রোকের রোগীদের নিয়মিত রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে যেকোনো প্রকার অস্ত্রোপচারে অতিরিক্ত রক্তপাতের ঝুঁকি থাকে। লেজার ব্যবহৃত হলে রক্তপাতের ঝুঁকি কমে। কেননা লেজারের উত্তাপে ক্ষতস্থানের রক্তনালিগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে যায়, রক্ত ঝরার উপায় থাকে না।
গর্ভবতী নারী
গর্ভাবস্থায় হরমোনজনিত কারণে মাড়ির সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে, ফলে সৃষ্টি হয় প্রদাহ। লেজার চিকিৎসার মাধ্যমে প্রায় ব্যথাহীনভাবে মাড়ির চিকিৎসা করা সম্ভব। তবে চিকিৎসার আগে দন্ত চিকিৎসক ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সতর্কতা
লেজার প্রযুক্তি অনেক সুবিধা দিলেও এটি সব ধরনের দাঁতের সমস্যার জন্য উপযোগী নয়। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, ব্যবহৃত ওষুধ এবং চিকিৎসার ধরন বিবেচনা করে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন দন্ত চিকিৎসক। তাই যেকোনো বিশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থার ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লেখক : চিফ কনসালট্যান্ট
পাল্প ডেন্টাল হাসপাতাল
