আমাদের গলার নিচের অংশে, শ্বাসনালির ঠিক সামনে রয়েছে থাইরয়েড। দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো। ছোট্ট এই গ্রন্থি দেহের বিভিন্ন কার্যক্রম সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। এই গ্রন্থি থেকে দুটি হরমোন নিঃসৃত হয়—থাইরক্সিন (FT4) ও ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (FT3)। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া (Metabolism),
হৃত্স্পন্দন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ন্ত্রণেও এই হরমোনগুলো অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। থাইরয়েডের কর্মক্ষমতা ধরে রাখা তাই অত্যন্ত জরুরি। যখন এই গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করে, তখন সেই অবস্থাকে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিজম। আর যখন বেশি হরমোন তৈরি করে, তখন তাকে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিজম। দুই ক্ষেত্রেই দেহে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়, দীর্ঘ মেয়াদে স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়ে যায়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই এ সমস্যাগুলোর নেপথ্য কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অথবা অপুষ্টি।
যেসব পুষ্টি প্রয়োজন
থাইরয়েড গ্রন্থিকে বলা যেতে পারে হরমোন তৈরির কারখানা। কাঁচামাল ছাড়া কোনো কারখানা চলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে থাইরয়েডের জ্বালানি হলো নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টিকর উপাদান। কিছু খনিজ ও ভিটামিন ছাড়া থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন অসম্ভব।
প্রধান কাঁচামাল আয়োডিন : থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন অপরিহার্য। শরীরে আয়োডিন উৎপাদিত হয় না, তাই এটি খাবার থেকে গ্রহণ করতে হয়। আয়োডিনের অভাবে দেখা দেয় গলগণ্ড (Goiter) ও হাইপোথাইরয়েডিজমের মতো জটিল ব্যাধি। তবে অতিরিক্ত আয়োডিন আবার হাইপারথাইরয়েডিজমের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই পরিমিত মাত্রায় আয়োডিন গ্রহণ করা জরুরি। আয়োডিনের উত্কৃষ্ট উৎস আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য ও ডিম।
হরমোনের সক্রিয়কারী সেলেনিয়াম :
FT4 হরমোনকে সক্রিয় FT3-তে রূপান্তর করতে সাহায্য করে সেলেনিয়াম। এটি থাইরয়েড গ্রন্থিকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে। এর মূল উৎস ব্রাজিল নাট
(Brazil nuts), টুনা মাছ, মুরগির মাংস ও সূর্যমুখীর বীজ।
জিংক (Zinc) : থাইরয়েড হরমোন সংশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জিংক। জিংকের অভাবে থাইরয়েডের কার্যক্রমের গতি মন্থর হয়ে যেতে পারে। গরুর মাংস, কুমড়ার বীজ, ছোলা ও ডাল জিংকের ভালো উৎস।
আয়রন ও ভিটামিন ‘ডি’ : অনেকেরই অজানা, থাইরয়েডের সুস্থতায় আয়রন ও ভিটামিন ‘ডি’র ভূমিকা আছে। এ দুটির অভাব হলে থাইরয়েড এনজাইমের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়।
থাইরয়েড রোগীদের দেহে ভিটামিন ‘ডি’র ঘাটতি দেখা যায় অহরহ। তাই বেশি করে ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ করতে হবে। এর উত্কৃষ্ট উেসর মধ্যে আছে লাল মাংস, কলিজা, দুধ, ডিম, সূর্যালোক, গাঢ় সবুজ শাক-সবজি ও বাদাম।
কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন
থাইরয়েড রোগীদের জন্য পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করা বেশ বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকের ভ্রান্ত ধারণা, থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিলে নির্দিষ্ট কিছু সবজি একদমই খাওয়া যাবে না। বাস্তবতা হলো, গয়ট্রোজেনিক খাবার পরিমিত মাত্রায় গ্রহণ করলে থাইরয়েডের ক্ষতি হয় না। বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকোলি এবং সয়াবিনজাতীয় খাবারে গয়ট্রোজেন (Goitrogens) থাকে, যা আয়োডিন শোষণে বাধা দিতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে এগুলো পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। রান্নার ফলে এসব খাবারের গয়ট্রোজেনিক প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। তাই থাইরয়েড রোগীরা পরিমিত পরিমাণে রান্না করা ফুলকপি বা বাঁধাকপি খেতে পারেন। কাঁচা অবস্থায় সালাদের মধ্যে এসব খাবার না খাওয়াই ভালো। সয়া সস এড়িয়ে চলা উত্তম।
আঁশযুক্ত খাবার ও পানি গ্রহণ করতে হবে বেশি বেশি। হাইপোথাইরয়েড রোগীদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা খুব সাধারণ। তাই প্রচুর শাক-সবজি, ফলমূল এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। এটি বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যজনিত জটিলতা (ফিস্টুলা, হেমোরয়েড, ফিশার) প্রতিরোধে সহায়ক।
চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন করা প্রয়োজন। রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলে থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা। তাই থাইরয়েড রোগীরা অতিরিক্ত চিনি এবং রিফাইন করা কার্বোহাইড্রেট (যেমন—সাদা ময়দা) গ্রহণ করলে দেহে ক্লান্তি বাড়বে এবং ওজন বেড়ে যাবে দ্রুত। এর প্রভাবে উল্টো থাইরয়েডের সমস্যা আরো প্রকট হতে পারে।
পুষ্টির সঙ্গে জীবনযাত্রার সমন্বয় করাও জরুরি। শুধু ভালো খাবার খেলেই হবে না, শরীর যাতে সেই পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে, তারও ব্যবস্থা করতে হবে।
♦ মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ : অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা থাইরয়েডের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়।
♦ পর্যাপ্ত ঘুম : হরমোনের ভারসাম্য রাখতে দৈনিক সাত-আট ঘণ্টা গভীর ঘুম প্রয়োজন।
♦ নিয়মিত ব্যায়াম : হাইপোথাইরয়েডিজমের রোগীদের অলসতা ও মেদ কমাতে হাঁটা বা ইয়োগা কার্যকর।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়





