
১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস
কর্মক্ষেত্রে চাই মানসিক স্বাস্থ্য সহায়ক পরিবেশ
মাইগ্রেনের জানা-অজানা

হাইপারটেনশন
মানসিক চাপে উচ্চ রক্তচাপ
অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ। বেশ কয়েকটি কারণে হয় এ রোগ, অন্যতম কারণ উচ্চমাত্রার মানসিক চাপ। লিখেছেন ডা. এস এম ইয়ার ই মাহাবুব

বাংলাদেশে এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (২০১৭-১৮) অনুযায়ী, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন, যাঁদের অনেকে জানেনই না যে তাঁদের শরীরে অজান্তেই বাসা বেঁধেছে উচ্চ রক্তচাপ। যেহেতু তাঁদের শরীরে বাড়তি ওজন নেই, কোলেস্টেরলের সমস্যা নেই, তাই তাঁরা ধারণাও করতে পারেন না তাঁদেরও হতে পারে হাইপারটেনশন। দৈনন্দিন জীবনের আর্থিক সমস্যা, কাজের চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং শহুরে জীবনযাত্রার মানসিক চাপে সমস্যাটি হতে পারে বা বাড়তে পারে এর মাত্রা। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সরাসরি উচ্চ রক্তচাপের কারণ।
মানসিক চাপ কিভাবে রক্তচাপ বাড়ায়
দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকলে শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম অতি সক্রিয় হয়ে পড়ে এবং অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয় (ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন) এবং হৃত্স্পন্দন বেড়ে যায়। এই দুটি সমন্বিতভাবে সাময়িকভাবে দেহের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, শরীরকে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ রেসপন্সের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রতিটি মানুষ ক্রমাগত অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপে থাকে। মানসিক চাপ কমার তেমন সুযোগ হয়ে ওঠে না। তখন সাময়িক অবস্থাটি স্থায়ী রূপ নেয় এবং রক্তনালির সংকোচন ও উচ্চ হৃত্স্পন্দন আর কমে না। এর ফলে রক্তনালির প্রাচীরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ধমনি শক্ত হয়ে যায় এবং প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা সবই উচ্চ রক্তচাপের মূল কারণগুলোর মধ্যে পড়ে। এর পাশাপাশি মানসিক চাপ থেকে নিস্তার পেতে অনেকে বেছে নেন অস্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস। এর মধ্যে আছে খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ যোগ করা, ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম না করা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমানো। এসব অভ্যাস কিছু সময়ের জন্য মানসিক চাপ কমায় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময়ের পর উচ্চ রক্তচাপ আরো বাড়িয়ে তোলে। ঢাকার পরিচালিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অফিসকর্মী উচ্চ চাপের মধ্যে কাজ করেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কা প্রায় আড়াই গুণ বেশি।
প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ
জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে সম্ভব রোগটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাখা। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভ্যাসগুলো ধরে রাখা জরুরি। উপসর্গ কমলেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
♦ খাদ্যাভ্যাস : লবণ কম খাওয়া, কলা, পালংশাকের মতো পটাসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ানো।
♦ ব্যায়াম : দিনে মাত্র ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা রক্তচাপ ৫-৮ mmHg কমাতে পারে।
♦ মানসিক চাপ কমানো : মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং যোগব্যায়াম কর্টিসল হরমোন কমাতে সাহায্য করে।
যাঁদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন, তাঁদের ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসকরা স্বল্প বা মাঝারি মাত্রার কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আছে এসিই ইনহিবিটর, বিটা-ব্লকার বা ডাইউরেটিক ঘরানার বেশ কিছু ওষুধ। প্রতিটি রোগীর প্রয়োজন আলাদা, সে অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করেন কেমন ওষুধ প্রয়োজন।
প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশে নিয়মিত ব্লাড প্রেসার স্ক্রিনিংয়ের প্রচার বাড়ানো দরকার, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা খুবই কম। উচ্চ রক্তচাপ শুধু একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য (২০২২) অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৫ শতাংশ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে হয়। তাই মানসিক চাপ কমিয়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ালে বাংলাদেশ এই নীরব ঘাতককে পরাজিত করতে পারে।
লেখক : হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক
কার্ডিওলজি বিভাগ, বিএমইউ
ইনফার্টিলিটি
বন্ধ্যত্ব অভিশাপ নয়

বন্ধ্যত্ব নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো প্রচুর ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে বন্ধ্যত্বের জটিল সমস্যাও সমাধান করা যায়। প্রতিটি দম্পতির উচিত বিয়ের আগেই বন্ধ্যত্বের সম্ভাব্য কারণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নেওয়া। এতে ভুল-বোঝাবুঝির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।
বন্ধ্যত্ব কাকে বলে
চিকিৎসার ভাষায়, যেসব দম্পতির অন্তত এক বছর অরক্ষিত সহবাসের পরও স্ত্রী গর্ভধারণ করতে না পারেন, তাঁদের বলা হয় ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যত্ব। আমাদের সমাজের একটি প্রচলিত ধারণা, বন্ধ্যত্ব শুধু নারীদের হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বন্ধ্যত্বের জন্য প্রায় ৪০ শতাংশ দম্পতির ক্ষেত্রে স্বামী দায়ী, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী দায়ী এবং বাদবাকি ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্যান্য কারণ দায়ী।
বন্ধ্যত্ব ঝুঁকিতে যাঁরা
গর্ভধারণের ক্ষেত্রে বয়স অনেক বড় বিষয়। নারীদের জন্য গর্ভধারণের উপযুক্ত বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর। পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়স ৪৫ বছর পার হলে ফার্টিলিটি কমতে শুরু করে। স্ত্রীর বয়স যদি ৩৫ এবং স্বামীর বয়স যদি ৪৫ বছরের বেশি হয়, আর অন্তত এক বছর চেষ্টার পরও যদি স্ত্রী গর্ভধারণ করতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে ইনফার্টিলিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।
পরীক্ষার ধরন
বহু কারণেই হতে পারে বন্ধ্যত্ব। অনেকে বন্ধ্যত্ব নিয়েই জন্মগ্রহণ করেন, কেউ কেউ অল্প বয়সেও বন্ধ্য হয়ে যেতে পারেন। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রেই করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্ট্রাল ফলিকল কাউন্ট (এএফসি)। এটি করার নিয়ম মাসিকের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দিনে। এ জন্য ব্যবহৃত হয় টিভিএস আলট্রাসাউন্ড পদ্ধতি। এ ছাড়া যেসব পরীক্ষা করা হয়—
♦ অ্যান্টিমুলেরিয়ান হরমোনের (এএমএইচ) মাত্রা। এ জন্য রোগীর রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
♦ টিভিএস আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ফলিকুলোমেট্রি পরীক্ষা।
দুটি পরীক্ষাই করা হয় মাসিকের ১২তম দিনে। তাই আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা জরুরি, নইলে পরীক্ষার জন্য আবার এক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে মূল ইনফার্টিলিটি পরীক্ষা হচ্ছে বীর্য বা সিমেন অ্যানালিসিস। শুক্রাণুর উপস্থিতি, পরিমাণ, নড়াচড়া, আকৃতি এবং স্বাস্থ্যের মাধ্যমে জানা যায়। এ ছাড়া রয়েছে রক্ত পরীক্ষা করে পুরুষ হরমোনের মাত্রা বের করা। কিছু ক্ষেত্রে আলট্রাসাউন্ডেরও প্রয়োজন হতে পারে। কী পরীক্ষা প্রয়োজন, সেটি রোগীর ইতিহাস অনুযায়ী চিকিৎসক ঠিক করে দেবেন।
চিকিৎসা
বন্ধ্যত্বের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে হরমোন চিকিৎসা যথেষ্ট। জটিল ক্ষেত্রে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের (আইভিএফ) প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিটি চিকিৎসাই এখন দেশে রয়েছে, এমনকি আইভিএফও। অভিজ্ঞ ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিলে সমাধান পাওয়া যাবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ,
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
কনসালট্যান্ট, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ক্যাটার্যাক্ট
ছানি—বার্ধক্যজনিত চোখের রোগ
বার্ধক্যজনিত ক্রনিক রোগের মধ্যে চোখে ছানি পড়া বা ক্যাটার্যাক্ট অন্যতম। ছানির যথাযথ চিকিৎসার অভাবে অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারায়। ছানি হওয়ার কারণ, এর প্রতিকার ও চিকিৎসায় করণীয় জানাচ্ছেন ডা. মো. আরমান হোসেন রনি

চোখ আমাদের দেহের অন্যতম মূল্যবান অঙ্গ। এর মাধ্যমে আমরা পৃথিবীকে দেখি, চিনি, অনুভব করি। এই চোখেই যখন ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসে, চারপাশ ঝাপসা হয়ে যায়—সেটা হতে পারে ছানি নামক রোগের লক্ষণ। এটি এমন এক সমস্যা, যা ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস করে এবং ঠেলে দিতে পারে অন্ধত্বের দিকে।
কিভাবে হয়
প্রচলিত ভাষায় একে বলা হয় ‘ছানি পড়া’। এই রোগের প্রভাবে চোখে বাড়তি কোনো কিছু প্রবেশ করে না। চোখের মধ্যে থাকা স্বচ্ছ কাচের মতো লেন্সটি ধীরে ধীরে অস্বচ্ছ বা ঘোলাটে হয়ে যাওয়ার অবস্থাটিকেই বলা হয় ছানি বা মেডিক্যাল ভাষায় ক্যাটার্যাক্ট। লেন্স হঠাৎ করেই অস্বচ্ছ হয়ে যায় না। সময়ের সঙ্গে সেটি ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে যায়, রোগের শেষ পর্যায়ে লেন্সটি পুরোপুরি ঘোলাটে হয়ে যায়। ছানির দরুন চোখের লেন্স ঘোলাটে হয়ে যাওয়ায় রেটিনায় ঠিকভাবে আলো পৌঁছতে পারে না, ফলে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হতে থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পূর্ণবয়স্কদের অন্ধত্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে ছানিই দায়ী। বিশ্বজুড়ে অন্ধত্বের সবচেয়ে নিরাময়যোগ্য কারণ হিসেবে ছানিকে বিবেচনা করা হয়।
ছানি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো বয়সজনিত ছানি, যা ৫০ বছরের পর বেশির ভাগ মানুষের মধ্যেই দেখা দেয়। আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কারণের মধ্যে আছে—
♦ চোখে আঘাতজনিত ছানি
♦ চোখের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বা ইনফেকশন
♦ শক্তিশালী তেজস্ক্রিয়াজনিত কারণে লেন্সের স্বচ্ছতা নষ্ট হওয়া
♦ চোখের জটিল সমস্যা থেকে ছানি
♦ ডায়াবেটিস ও অন্যান্য মেটাবলিক ডিস-অর্ডারের প্রভাবে লেন্স ঘোলাটে হয়ে যাওয়া
♦ চোখের জন্মগত ত্রুটি হিসেবেও শিশুদের মধ্যে চোখের ছানি দেখা যায়।
ওপরের প্রতিটি কারণেই চোখের লেন্স ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে যেতে পারে।
প্রকারভেদ
চোখের লেন্স কতটা ঘোলাটে হয়েছে, সেটিকে বলা হয় ছানির পরিপক্বতা। এর বিচারে ছানিকে তিনটি ধাপে ভাগ করা যায়—
♦ হালকা ছানি (ইম্যাচিউর) : চোখের লেন্স ধূসর বর্ণ ধারণ করে। এই পর্যায়ে রোগী ঝাপসা দেখতে পায়। রেটিনায় বেশ অনেকটা আলো পৌঁছে, তবে কিছুই পরিষ্কার দেখে না রোগী।
♦ পাকা ছানি (ম্যাচিউর) : এই পর্যায়ে মুক্তার মতো সাদা হয়ে যায় চোখের লেন্স। চোখে আলো প্রবেশ প্রবলভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং দৃষ্টিশক্তি অনেকাংশেই হারিয়ে যায়।
♦ অতিপাকা ছানি (হাইপার-ম্যাচিউর) : লেন্সটি দুধের মতো সাদা হয়ে যায়, কোনো আলোই প্রবেশ করতে পারে না। দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে রোগী।
চিকিৎসা
যে কারণেই ছানি হোক না কেন, অস্ত্রোপচার করাই এর একমাত্র চিকিৎসা। কবিরাজ বা ডাক্তারের ভুয়া পরিচয়ে অনেকেই চটকদার প্রচারণায় বলে থাকেন ছানি রোগের ওষুধের কথা। বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো ধরনের ওষুধ, চোখের ড্রপ বা চশমার মাধ্যমে ছানি সারানো সম্ভব নয়। অপারেশনের মাধ্যমে আই সার্জন চোখের অস্বচ্ছ লেন্সটি সরিয়ে নেন। সেই স্থানে উচ্চমানের কৃত্রিম লেন্স স্থাপন করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এখন ছানি অপারেশন সম্পূর্ণ ব্যথাহীন, নিরাপদ এবং মাত্র ১৫-২০ মিনিটে করা সম্ভব। অতএব, ছানির চিকিৎসায় আতঙ্কিত না হয়ে যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করিয়ে ফেলা উচিত।
জটিলতা
দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ছানির চিকিৎসা করা না হলে ছানির একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে, মেডিক্যাল ভাষায় যাকে বলা হয়ে থাকে ‘আর্জেন্টিনার পতাকা চিহ্ন’ জটিলতা। সমস্যাটি সাধারণত অতিপাকা ছানিযুক্ত রোগীদের অপারেশনের সময় ধরা পড়ে। এই সমস্যা হলে চোখের লেন্সের মধ্যে আর্জেন্টিনার পতাকার মতো স্ট্রাইপ দেখা যায়, সে অনুযায়ী নাম দেওয়া হয়েছে। স্ফীতিশীল ছানির কারণে এই সমস্যা হয়ে থাকে। বেশ কিছু কারণে ছানিযুক্ত লেন্সের অভ্যন্তরে চাপ বেড়ে সৃষ্টি হতে পারে স্ফীতিশীল ছানি। এর মধ্যে রয়েছে—
♦ ডায়াবেটিস
♦ অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন
♦ তামাক গ্রহণ
♦ চোখে অতিবেগুনি রশ্মির অতিরিক্ত সংস্পর্শ
♦ দীর্ঘ সময় ধরে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহার
♦ ক্যান্সারের জন্য কেমোথেরাপি ও বিকিরণ চিকিৎসা
♦ থ্যালাসেমিয়া রোগ।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জন ছানি রোগীর মধ্যে তিন থেকে ২৮ জন পর্যন্ত এই জটিলতায় আক্রান্ত হয়। এ ধরনের ছানির অপারেশনে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। সাধারণত অপারেশনের আগে ত্রাইপেন ব্লু নামক একটি রঞ্জক পদার্থ ব্যবহার করে লেন্সের ক্যাপসুল নীল রঙে রঞ্জিত করা হয়, যাতে কাটার সময় ক্যাপসুলটি স্পষ্ট দেখা যায়। তবে পাকা ছানি থাকলে এই ক্যাপসুল কাটার সময় মাঝেমধ্যে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছিঁড়ে যায় এবং তখন লেন্সটি দেখতে আর্জেন্টিনার পতাকার মতো লাগে। সেখান থেকেই এসেছে ‘আর্জেন্টিনার পতাকা চিহ্ন’ নামটি।
করণীয় ও পরামর্শ
মনে রাখা জরুরি, ছানি যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে, তত সহজে ও নিরাপদে সেটির চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই পাকা ছানি কিংবা স্ফীতিশীল ছানি হওয়ার আগেই অভিজ্ঞ চক্ষু সার্জনের মাধ্যমে অপারেশন করানো উচিত। অপারেশনে দেরি করলে ঝুঁকি ও জটিলতা বেড়ে যায়। তাই দৃষ্টিশক্তিতে যেকোনো পরিবর্তন, যেমন—ঝাপসা দেখা, আলোতে চোখে ব্যথা লাগা, রাতের বেলা কম দেখা—এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চোখের ডাক্তার দেখানো উচিত। পাশাপাশি চোখের সুরক্ষায় সানগ্লাস পরাও জরুরি।
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত মদ্যপান ও ধূমপান থেকেও চোখে ছানি দেখা দিতে পারে। বয়স ৬০ পার হলে এক-দুই বছর পর পর অবশ্যই চোখ পরীক্ষা করাতে হবে।
ছানি একটি নীরব রোগ, তবে এটি প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য। সময়মতো পদক্ষেপ নিলে অন্ধত্বের মতো ভয়াবহ পরিণতি এড়ানো সম্ভব। তাই সচেতন থাকুন, নিয়মিত চোখের পরীক্ষা করান এবং দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় ছানি প্রতিহত করুন।
লেখক : কনসালট্যান্ট (চক্ষু)
দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল
