বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) নিয়োগ পরীক্ষা একটি সুদীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া। ভাইভা বোর্ডে প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, বিচারকসুলভ প্রজ্ঞা ও মানসিক দৃঢ়তা যাচাই করা হয়। জুডিশিয়ারি পরীক্ষার ভাইভা একটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া। অন্যান্য প্রথম শ্রেণির চাকরির ভাইভার সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য আছে। এখানে ফলাফলের ক্ষেত্রে কোনো ওয়েটিং লিস্ট কিংবা আলাদা ক্যাডার, নন-ক্যাডার তালিকা থাকে না। যতজন নিয়োগ পাবেন, ঠিক ততজনেরই ফল প্রকাশ করা হয়।
প্রাথমিক প্রস্তুতি
ভাইভা বোর্ডে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন। সনদপত্র, নাগরিকত্ব সনদ, মার্কশিট, প্রশংসাপত্র ইত্যাদি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত ক্রমানুসারে সাজিয়ে একটি ফোল্ডারে রাখুন। মৌখিক পরীক্ষার জন্য শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতিও জরুরি। ভাইভার আগের রাতে পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। অহেতুক দুশ্চিন্তা বা ভীতি আপনার মূল প্রস্তুতিকে ম্লান করে দিতে পারে। মনে রাখবেন, লিখিত পরীক্ষায় পাস করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই আপনি ভাইভায় অংশ নিচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি আইন বিষয়ে ভালো জানেন, বাংলা-ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি সমসাময়িক ইস্যুতেও আপনার দখল আছে। এখন ভাইভা বোর্ডের সামনে শুধু তা উপস্থাপন করতে হবে। একটা প্রবাদে আছে, ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী’। ভাইভার দিনে পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা জরুরি, যা আপনাকে স্বাভাবিক আচরণ করতে সাহায্য করবে।
পোশাক ও ভাইভা রুমের শিষ্টাচার
সাজপোশাক : পুরুষ প্রার্থীদের জন্য সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো কোট ও কালো জুতা আদর্শ পোশাক। নারী প্রার্থীদের জন্য সাদা বা হালকা রঙের শাড়ি অথবা সালোয়ার-কামিজই উপযুক্ত।
প্রবেশ : ভাইভাকক্ষে প্রবেশই আপনার প্রথম পরীক্ষা। বোর্ডের অনুমতি নিয়ে ধীরস্থির ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে কক্ষে প্রবেশ করুন। সবার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে সালাম জানান।
আসন গ্রহণ ও আচরণ : বসতে বলার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকুন, কখনোই বোর্ড সদস্যদের আগে বসতে যাবেন না। বসার সময় সোজা হয়ে বসুন, পুরো পিঠ চেয়ারে ঠেকাবেন না। দুই হাত টেবিলের ওপর বা কোলে স্বাভাবিকভাবে রাখুন। পুরো ভাইভা পর্বে বিনীত ও মার্জিত আচরণ বজায় রাখুন।
প্রশ্নোত্তর : ভাইভায় নির্ধারিত কোনো সিলেবাস নেই। প্রশ্নকর্তারা যেকোনো বিষয়েই প্রশ্ন করতে পারেন। তাই প্রস্তুতি হতে হবে বহুমুখী। তবে অধিকাংশ প্রশ্নই হবে আইনকেন্দ্রিক। এ ছাড়া সমসাময়িক দেশীয় এবং বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা থাকতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার উত্তর শুনেই ভাইভা বোর্ড আপনার প্রায়োগিক প্রজ্ঞা, বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ধারণা পাবে। তাই ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দিন।
♦ আইনের গভীরে : প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার সিলেবাসে থাকা সব কটি আইনের ওপর সম্যক দক্ষতা থাকা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে, বিভিন্ন আইন কিংবা ধারার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, ধারাগুলোর বাস্তবিক জীবনে ব্যবহার, ভিন্ন ভিন্ন আইন অনুসারে মামলার ধাপগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন হতে পারে। যেমন—দেওয়ানি-ফৌজদারি মামলার আর্জি বা অভিযোগ থেকে শুরু করে রায় ঘোষণা পর্যন্ত ধাপগুলো এবং রায় বাস্তবায়ন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। তামাদি আইন, সাক্ষ্য আইন ও দণ্ডবিধির সূক্ষ বিষয়গুলোতে পুনরায় চোখ বুলিয়ে নিন। বিভিন্ন আইনের গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, সাজার মেয়াদ, বিচার প্রক্রিয়া ইত্যাদির ওপর স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।
♦ সংবিধান ও সাম্প্রতিক আইন : সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ, সংশোধনী এবং উল্লেখযোগ্য মামলা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিন। বিভিন্ন ইস্যুতে সাম্প্রতিক সাড়া জাগানো উচ্চ আদালতের (হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ) রায় সম্পর্কে নিয়মিত পড়াশোনা করুন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রণীত নতুন আইন কিংবা বিদ্যমান আইনের সংশোধনীগুলোর ওপর ভালো দখল থাকলে অন্যদের চেয়ে আপনি এগিয়ে থাকবেন।
♦ বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি : জুডিশিয়ারি ভাইভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি। ভাইভা বোর্ড বিভিন্ন ছোট ঘটনা বা ‘কেস স্টাডি’ বর্ণনা করে আপনার কাছ থেকে আইনি সমস্যার সমাধান চাইতে পারে। যেমন—‘একটি জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ, একজন দাবি করছেন তিনি ২০ বছর ধরে ভোগদখল করছেন, অন্যজন তার মালিকানার স্বপক্ষে দলিল দেখাচ্ছেন। আপনি বিচারক হিসেবে কী করবেন?’ অথবা ‘এক ব্যক্তি আদালতে অভিযোগ করলেন, পুলিশ তাঁকে অযথা হয়রানি করছে। আপনার করণীয় কী?’ এই ধরনের প্রশ্নের উত্তরে আইনের ভাষা ও পদ্ধতির পাশাপাশি আপনার সমাজবাস্তবতা, মানবিক বোধ ও বিচারিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত উত্তর না দিয়ে কিছু সময় নিয়ে গুছিয়ে কোন আইনের কোন ধারার অধীনে আপনি সমস্যাটির সমাধান করতে চান তা উল্লেখ করে আপনার সমাধানটি বলবেন।