kalerkantho

সোমবার । ২২ আষাঢ় ১৪২৭। ৬ জুলাই ২০২০। ১৪ জিলকদ  ১৪৪১

উজ্জ্বল অ্যাথলেট

৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উজ্জ্বল অ্যাথলেট

বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকা তুলে ধরতে ভালো লাগে উজ্জ্বলের

উজ্জ্বল চন্দ্র সূত্রধর। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। খেলাধুলায় রয়েছে তাঁর অনেক পুরস্কার। দেশের হয়ে ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। হয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্প ২০১৯’-এর দেশসেরা খেলোয়াড়। তাঁর গল্প শোনাচ্ছেন মোহাম্মদ রনি খাঁ

উজ্জ্বলের জন্ম কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা গ্রামের রেলস্টেশন এলাকায়। বাবা কৃষ্ণচন্দ্র সূত্রধর, মা মমতা রানী। কাঠমিস্ত্রি বাবার টানাটানির সংসারে তিন সন্তানের মধ্যে বড় তিনি। বাবার ওপর চাপ কমাতে খেলাধুলাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। নাম লেখিয়েছেন ক্লাবে। উজ্জ্বল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার টাকা ছিল না। একপর্যায়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ক্রীড়া কোটায় পড়াশোনা করার সুযোগ করে দেন। সেখানে ভর্তিও হয়েছিলাম। তবে সবকিছু বিবেচনা করে আরেক শিক্ষকের সহযোগিতায় যশোরে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছি। ক্লাবে যোগ দেওয়ায় কিছু টাকা-পয়সা পাই ঠিকই, তবে মা-বাবাকে এখনো আর্থিক সহায়তা দিতে পারি না। অবশ্য এ কারণে তাঁদের মনে কষ্ট নেই। বরং আমার সাফল্যে তাঁরা বেশ খুশি।’

উজ্জ্বল চন্দ্র সূত্রধর

খেলার প্রতি টান তাঁর ছোটবেলা থেকেই। ২০০৫ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নাম লেখান। ১০০ মিটার দৌড়ে অংশ নিয়ে জিতেন প্রথম পুরস্কার। এরপর পড়াশোনার চাপ ও পারিবারিক কারণে তেমন খেলাধুলা করতে পারেননি। নবম শ্রেণিতে উঠে আবারও নাম লেখালেন ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড় এবং লং জাম্পে। তিনটিতেই হলেন সেরা। এ ছাড়া রিলে দৌড়েও প্রথম হলো তাঁর দল। এখানেই শেষ নয়। গচিহাটা পল্লী একাডেমির হয়ে আন্ত বিদ্যালয়, আন্ত উপজেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও বিদ্যালয়ের জন্য নিয়ে আসেন সেরা খেলোয়াড়ের খেতাবসহ ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড় এবং লং জাম্পে প্রথম পুরস্কার। ২০১১-১২ সালে আন্ত কলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও এই তিনটি ইভেন্টে বিজয়ী তিনি। এ ছাড়া ১০০ মিটার রিলেতেও তাঁর দলেরই জোটে স্বর্ণপদক। কলেজ পর্যায়ে ঢাকা বিভাগের সেরা খেলোয়াড় খেতাব জিতেছেন তিনি দুইবার।

এদিকে ২০১৩ সালে জাতীয় বয়সভিত্তিক জুনিয়র অ্যাথলেটিক অনূর্ধ্ব-১৯ প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার দৌড় ও লং জাম্পে স্বর্ণপদক জিতে ভারতে খেলতে যাওয়ার সুযোগ পান উজ্জ্বল। কিন্তু টাকার অভাবে যেতে পারেননি সেবার। ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে লং জাম্পে ৭.০৯ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে তিনি রেকর্ড গড়েন। এ পর্যন্ত পাঁচবার জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটে অংশ নিয়ে পাঁচবারই ব্যক্তিগতভাবে সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন উজ্জ্বল।

বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হন ২০১৪ সালে। সে বছর বিজেএমসি ক্লাবের হয়ে জাতীয় অ্যাথলেটে ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড় এবং লং জাম্পে সেরা হয়েছেন। এ ছাড়া দ্রুততম মানবের খেতাবও পান। অন্যদিকে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের জাতীয় জুনিয়র অ্যাথলেটিকসে ১০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক এবং লং জাম্পে যথাক্রমে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক তাঁরই অর্জন।

২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিবছর আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাথলেটিকসে ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়, লং জাম্প এবং ৪ গুণিতক ৪০০ মিটার রিলে দৌড়ে টানা স্বর্ণপদক জিতে আসছেন উজ্জ্বল। এ বছরের ‘বঙ্গবন্ধু আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্প ২০১৯’-এরও সেরা পুরুষ ক্রীড়াবিদ তিনি। দৌড়ে ২০০ মিটার পাড়ি দিয়েছেন ২২.৯০ সেকেন্ডে; লং জাম্পে অতিক্রম করেছেন ৬.৬৮ মিটার। এ ছাড়া ১০০ মিটার দৌড়ে সেরা হয়ে ৬৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগীদের মধ্যে তিনিই দ্রুততম মানব। উজ্জ্বল বললেন, ‘এই প্রতিযোগিতায় প্রাইভেট, পাবলিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড়রা অংশ নেওয়ায় নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। অনেকেই আমার কাছ থেকে শিডিউল নিয়ে অনুশীলন করত। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নেওয়ার মুহূর্তটি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না! তবে প্রতিযোগিতাটি আমার জন্য কষ্টকর ছিল। অসুস্থ ছিলাম। খেলার আগের রাতেও আটবার বমি করেছি। পরে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ৩টা পর্যন্ত খাওয়াদাওয়া না করেই ১০০ মিটার দৌড়ে সেরা হয়েছি।’

এরই মধ্যে বাংলাদেশের হয়ে ভারত, নেপাল ও ইতালিতে গেছেন উজ্জ্বল। এ বছরের জুলাই মাসে ইতালির নেপোলি শহরে শুরু হওয়া ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি গেমসের ১০০ ও ৪০০ মিটার দৌড় এবং লং জাম্পে অংশ নিয়েছিলেন। তাতে সাফল্য না পেলেও অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাকে বড় করে দেখছেন তিনি। কেননা দুই বছর পর পর অনুষ্ঠিত হওয়া এই প্রতিযোগিতায় ১৯৩টি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ১৩ হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন ইভেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাংলাদেশ থেকে সাধারণত যাঁরা পর পর তিনবার এসব ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতেন, তাঁরাই অংশ নিতে পারেন। উজ্জ্বল বলেন, ‘প্রতিযোগিতাটিতে অংশ নিতে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো খরচ লাগেনি। বিমানভাড়া, থাকা-খাওয়া, মাঠে আসা-যাওয়া, ইতালির দর্শনীয় বিভিন্ন স্থানে ঘুরাফেরাসহ সব খরচ আয়োজক কমিটিই বহন করেছে।’

উজ্জ্বল এখন জাতীয় দলের অ্যাথলেট। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ উপস্থিতির শর্ত থাকায় জাতীয় দলে নিয়মিত খেলতে পারছেন না। পড়াশোনার মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষায় তিনি বছরে তিন মাস খেলাধুলা করেন। জাতীয় পর্যায়ের খেলা শেষ করে বাকি সময় ক্লাস আর পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় তাঁকে। ভবিষ্যতে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রশিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

উজ্জ্বল বলেন, ‘খেলোয়াড় হিসেবে সাফল্য পেলেও অর্থ সংকট ও যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাবে দক্ষতা অনুযায়ী তেমন কিছুই করতে পারিনি। তাই এখানে যাঁরা ভর্তি হবেন, পড়াশোনা করবেন, তাঁদের শিক্ষক হয়ে সেই অভাবগুলো পূরণ করতে চাই।’

মন্তব্য