বিশ্বজুড়ে এআই বিপ্লব উচ্চশিক্ষায় কী ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসছে বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। রিসার্চের একটি মেজর এরিয়া হচ্ছে অ্যাডভান্স এআই মেশিন লার্নিং বা ডিপ লার্নিং। এই জিনিসগুলো বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষা বিপ্লবে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বিষয়টা একটা উক্তি দিয়ে বলা যেতে পারে। মার্ক কিউবান বলেছেন, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ডিপ লার্নিং, মেশিন লার্নিং—হোয়াটএভার ইউ আর ডুইং ইফ ইউ ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড ইট, লার্ন ইট; বিকজ আদারওয়াইজ, ইউ আর গোইং টু বি আ ডাইনোসোর উইদিন থ্রি ইয়ার্স।’ অর্থাৎ ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপ লার্নিং কিংবা মেশিন লার্নিং—আপনি যে ক্ষেত্রেই কাজ করুন, যদি এসব প্রযুক্তি সম্পর্কে না জানেন, তবে এখনই শেখা শুরু করুন। নইলে আগামী তিন বছরের মধ্যেই আপনি ডাইনোসরে পরিণত হবেন।’ এখনকার বিশ্বে এআই যদি না জানেন, মেশিন লার্নিং ডেটা যদি না জানেন, তাহলে আপনি খাপ খাওয়াতে পারবেন না। বিশ্বজুড়ে একটা ভীষণ পরিবর্তন আসছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এআই যুগের জন্য কতটুকু প্রস্তুত?
আমরা পিছিয়ে নেই। এআইয়ের সঙ্গে আমরা (ইউআইইউ) তাল মিলিয়ে চলছি। দেশের অনেক বেসরকারি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণামূলক প্রবন্ধ যেমন জার্নাল বুক চ্যাপ্টার কনফারেন্স—এগুলো করছে। আমাদের ইউআইইউয়ের শিক্ষার্থীরা এখন উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছে। এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা মেশিন লার্নিং বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার জন্য আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলো ডেভেলপড করেছে। একসময় আমরা সবাই কম্পিউটার ব্যবহার করতাম টাইপিংয়ের জন্য। আপনি যদি সময়ের সঙ্গে টেকনোলজিকে অ্যাডাপ্ট না করতে পারেন তাহলে অবশ্যই আপনি পিছিয়ে যাবেন। যারা এআই শিখবে বা ধারণ করতে পারবে, তারাই টিকে থাকবে। আর যারা পারবে না, তাদের জন্য এআই চ্যালেঞ্জ। যারা প্রযুক্তিকে ভালোবাসে বা ধারণ করে নিতে পারবে তাদের জন্য এটা একটা বিশাল সুযোগ। এই মুহূর্তে আপনি যদি উন্নত বিশ্বে দেখেন, সেখানে এআই ইঞ্জিনিয়ার বা ডেটা সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারের অনেক চাহিদা। এটা আমাদের জন্য একটা সুযোগ। আমি একজন ‘প্রফেসর অব মেশিন লার্নিং’ হিসেবে অবশ্যই চিন্তা করি, এআই হচ্ছে আমাদের একটা
বিশাল সুযোগ।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এটা ব্যবহারের প্রবণতা কেমন?
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন এআই ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপক। এখন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) মতো বড় মডেল আছে। আপনি কোনো অ্যাসাইনমেন্ট বা কোনো একটা প্রশ্ন ছবি তুলে আপলোড করে দিলে এই লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ সঙ্গে সঙ্গে এর উত্তর বা সমাধান দিয়ে দিচ্ছে। আমার পরামর্শ হচ্ছে, এআই ব্যবহার করা ভালো; কিন্তু এর ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হলে আপনার নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক বা বিশ্লেষণমূলক সামর্থ্য কমে যাবে। ধরুন আপনার নিজের সমাধান করার সক্ষমতা আছে, কিন্তু সেটা না করে যদি আপনি এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হন, তাহলে আপনার বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি পাবে না। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমি বলব, ইতিবাচকভাবে এআই ব্যবহার করতে হবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এআই প্রশিক্ষণের জন্য কি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
অবশ্যই, এখন আমাদের কোর্স আছে। আমরা আমাদের কারিকুলামের মধ্যে এআইবিষয়ক অনেক কোর্স যুক্ত করেছি। এখন এআই মেজর করা যাচ্ছে, মেশিন লার্নিং মেজর করা যাচ্ছে, ডেটা সায়েন্স মেজর করা যাচ্ছে। তাই এগুলোর সঙ্গে নিয়মিত কিছু ওয়ার্কশপ বা সেমিনার যদি করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের বেশ
কাজে দেবে।
ভবিষ্যতে কর্মবাজার মাথায় রেখে কারিকুলামে কী ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার?
আমি কিন্তু এখানে বসে অনলাইনে এমআইটিতে কী হচ্ছে, জানতে পারছি। সেখানে কোন কোর্সগুলো পড়ানো হচ্ছে, সেগুলোও জানতে পারছি। আমি চাইলেই জানতে পারছি, এমআইটিতে ডিপ লার্নিং, বিগ ডেটা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিংয়ের কোর্স কারিকুলাম কেমন। সুতরাং আমরা চাইলে সহজেই তাদের কারিকুলামগুলো অনুসরণ করতে পারি এবং কর্মবাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে কারিকুলামে কোর্সগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।
ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে কোন ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন?
গুগলসহ শতাধিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান হিউম্যান রোবট বা মানুষের মতো রোবট বানাচ্ছে। এই রোবটগুলোকে তারা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করবে। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে মানুষের পরিবর্তে মোতায়েন করবে। অর্থাৎ মানুষের পরিবর্তে যুদ্ধ করবে রোবট। হয়তো কিছুদিন পরে দেখা যাবে, বাসায় কাজের বুয়ার দরকার নেই। বাসা বা ফ্লোর পরিষ্কারের জন্য এরই মধ্যে কিছু রোবট আছে বাজারে। বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠানও এরই মধ্যে এমন কিছু রোবট ব্যবহার করছে, যাদের প্রক্রিয়া বা কার্যক্রম রোবট দিয়ে করা হয়। ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশনে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ থেকেও রোবট ভালোভাবে কাজ করতে সক্ষম। তাই বলা যায়, ভবিষ্যতে অনেক কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটবে। তাই ভবিষ্যতে আপনি যদি অ্যাডভান্সড এআই বা রোবটিকস মেশিনকে আয়ত্ত করতে না পারেন, তাহলে আপনি ডাইনোসরের মতো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন।
এআইয়ের যুগে মানুষের সফট স্কিল বা সৃজনশীলতা কি গুরুত্ব পাবে?
এআই মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। আপনি দুটি কমপ্লেক্স নাম্বার দিয়ে যদি বলেন যে এটার উত্তর কত হবে; তখন মুহূর্তের মধ্যেই আপনাকে বলে দেবে সঠিক উত্তর। কিন্তু একই জিনিজ মানুষকে দিলে পাঁচ থেকে ১০ মিনিট হয়তো সময় নেবে। এর পরও মানুষ তো মানুষই। এই প্রযুক্তি মানুষই তৈরি করেছে, মানুষকে প্রযুক্তি তৈরি করেনি। এই টেকনোলজি যতই দক্ষ হোক না কেন আসলে এখানে আমাদের বা মানুষের দরকার হবেই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাবিব তারেক




প্রযুক্তি তো আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা এগুলো একজন মানুষকে তার স্থায়ী পরিচয় তৈরি করে দেয়। তাই আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু প্রযুক্তিতে দক্ষ পেশাজীবী হবে এমনটা নয়; বরং সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা থাকবে, সে নৈতিকতার সঙ্গে জীবন যাপন করবে, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। এআই আমাদের কাজকে সহজ করবে, হয়তো ক্ষেত্র বিশেষে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে; কিন্তু আমাদের সৃজনশীলতা কিংবা এক মানুষের প্রতি অন্য মানুষের সহমর্মিতা, সহানুভূতি এসব মানবিক বিষয় একান্তই মানুষের কাছে থেকে যাবে। তাই আমি মনে করি প্রযুক্তি এবং মানবিকতার এই সমন্বয়ই আগামী দিনের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সুযোগ।