বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হারানোর পর আর্জেন্টিনার উদীয়মান মিডফিল্ডার নিকো পাস ভক্তদের উদ্দেশে একটি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বার্তা দিয়েছেন। ফাইনাল ম্যাচে বেঞ্চে থাকলেও ম্যাচ শেষে স্যোশাল প্ল্যাটফর্মে পরবর্তী বিশ্বকাপে শিরোপা পুনরুদ্ধারের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলে জয় পায় স্পেন। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা যখন হতাশায় মাঠ ছাড়ছিলেন। তখন ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর ২১ বছর বয়সী তরুণ তারকা সতীর্থ ও সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা করতে এগিয়ে আসেন।
ফেসবুকে দলের একটি ছবি শেয়ার করে স্পেনে জন্মগ্রহণকারী এই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার লেখেন, ‘আজকের দিনে এই দেশ ও এই জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে এবং এমন একদল অসাধারণ মানুষের অংশ হতে পেরে আমি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গর্বিত।’
‘যারা এই জার্সির জন্য জীবন দিতে পারে এবং প্রতি মুহূর্তে তাদের হৃদয় ও আত্মা উজাড় করে দেয়। আমি শুধু তাদের ধন্যবাদ জানাতে পারি। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, এই বিশ্বকাপ ট্রফি আর্জেন্টিনায় ফিরিয়ে আনতে আমি আমার সবকিছু বিলিয়ে দেব।’
অভিনন্দন স্পেন এবং সব স্প্যানিশদের। আর্জেন্টিনা, সব সময় ভালো এবং খারাপ উভয় সময়েই পাশে আছে বলে যোগ করেন তিনি।
বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। বিশ্বকাপে জয়ের পর আনন্দে এক প্রতিক্রিয়ায় স্পেনের ১৯ বছর বয়সী সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পাউ কিউবারসি বলেছেন, মেসির সঙ্গে মাঠ ভাগ করে নেওয়াটা ছিল এক বিশাল সৌভাগ্য।
ফুটবলে নিজের আইডল মানা লিওনেল মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই আবেগঘন মন্তব্যটি করেন তিনি।
কিউবারসি বলেন, ‘আমার খারাপ লাগছিল, কারণ তিনি আমার আদর্শ এবং তাকে এভাবে হারতে দেখা আমার পছন্দ নয়।’
সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থেকে কেঁদে বের হয়ে গেলেন স্কালোনি
ক্রীড়া ডেস্ক
টানা দ্বিতীয়বারের মতো সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরা হলো না স্কালোনিদের। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ইতিহাস গড়ার এত কাছে এসেও খালি হাতে ফেরার যন্ত্রণা পুরো দলকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন লিওনেল স্কালোনি। এ সময় নিজের ভবিষ্যৎ, ম্যাচ এবং দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে বেশ কিছু আবেগঘন মন্তব্য করেছেন।
৩৯ বছর বয়সেও মেসির ফুটবল খেলা এবং তার অবিশ্বাস্য নেতৃত্বের প্রশংসা করতে গিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘৩৯ বছর বয়স, ভাইরা…এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমার পক্ষ থেকে আমি খুব ভালো করেই জানতাম এবং আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম যে ও যত দিন নিজে থেকে থামার সিদ্ধান্ত না নেবে, তত দিন খেলা চালিয়ে যাবে।’
জাতীয় দলে ওর সতীর্থরা এবং ওর চারপাশের প্রত্যেকে ওর জন্য নিজের সব কিছু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। আমি আশা করি, ও ওর সতীর্থদের নিয়ে গর্বিত এবং আমার মনে হয়, ও সত্যিই গর্বিত। আমি এটাও আশা করি যে দেশের মানুষ তাদের জাতীয় দল, ওকে এবং ও যা কিছু দিয়েছে, তা নিয়ে গর্ব বোধ করবে বলে যোগ করেন তিনি।
ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষে আর্জেন্টিনার কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট আভাস দিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘আমি চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাব। এরপর সম্ভবত আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিন্ন হতে যাচ্ছে। দেখা যাক কী হয়। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রধান কোচের পদটি অত্যন্ত চমৎকার এবং একটি স্বপ্নের মতো জায়গা।’
‘আশা করি, অন্য আরো অনেকের এখানে আসার সুযোগ হবে। আমি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলব। আমার মনে হয়, এত বড় কিছু অর্জনের পর (টানা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা) একই স্তরের সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে আমাদের ভাবার ও আলোচনার প্রয়োজন আছে।’
ম্যাচে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। স্কালোনি খেলোয়াড়দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের মনে কষ্ট আছে, কিন্তু একই সঙ্গে গর্বও হচ্ছে যে আমরা মাঠের ভেতর আমাদের সর্বস্ব দিয়েছি। মানুষ যেভাবে জেতার পর আনন্দ করে, সেভাবে আমাদের হারটাও মেনে নিতে শিখতে হবে। আজ আমরা সেটিই দেখিয়েছি।’
‘আমি এই খেলোয়াড়দের কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব আমাদের আরো একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল উপহার দেওয়ার জন্য এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার জন্য। আজকের ম্যাচে স্পেন আমাদের চেয়ে ভালো দল ছিল, এটাই সত্যি এবং আমাদের তা মেনে নিতে হবে।’
টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি ধরে রাখতে না পারলেও এই অর্জনকে ছোট করে দেখছেন না স্কালোনি। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপের মতো একটি বড় মঞ্চে দ্বিতীয় হওয়াটাও অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এই পর্যায় পর্যন্ত আসা কতটা কঠিন, তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে এবং এর মূল্য দিতে হবে।’
এক পর্যায়ে তিনি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন যে সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থেকে কেঁদে বের হয়ে যান।
তিন বছর ধরে রদ্রিগো হার্নান্দেজ ক্যাসকান্তের (রদ্রি) জীবনটা যেন কেটেছে রোলার কোস্টারের মতো। ২০২৩ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে জয়সূচক গোল। ২০২৪ স্পেনের হয়ে ইউরো জেতা এবং একই বছর বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে ‘ব্যালন ডি’অর’ জয়ের মতো ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ চূড়া দেখেছেন তিনি।
আবার একই সঙ্গে ক্যারিয়ার ধ্বংসকারী হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরি এবং তা থেকে সেরে ওঠার লড়াইয়ে বারবার ছিটকে যাওয়ার মতো যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ও তাকে পার করতে হয়েছে। এত কম সময়ে একজন ফুটবলার সাধারণত যা দেখেন না, রদ্রি তার চেয়েও বেশি কিছু দেখে ফেলেছেন।
তবে এই গ্রীষ্মে পুরোপুরি ফিট হয়ে ফিরে পায় চেনা ফর্ম। এরপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দুর্দান্ত খেলে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনকে এনে দিয়েছেন দ্বিতীয় শিরোপা। জিতেছেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ পুরস্কার গোল্ডেন বল।
প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা থেকে তরুণ প্রজন্ম শিক্ষা নিতে পারবে বলে জানিয়েছেন স্পেনের মাঝমাঠের স্তম্ভ রদ্রি।
৩০ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, গের্ড মুলার ও জিনেদিন জিদানের মতো কিংবদন্তিদের কাতারে যোগ দেন। এই তালিকায় তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বকাপ ও ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, নিজের ক্লাবের হয়ে ইউরোপীয় কাপ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং ব্যালন ডি’অর জিতেছেন।
তার কৃতিত্ব আরো বেশি অসাধারণ ছিল এই কারণে যে তিনি টুর্নামেন্টে খেলতে এসেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন তিনি নিজের সেই চিরচেনা বিধ্বংসী ফর্মটি খুঁজছিলেন—যা ২০২৪ সালে তাকে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার (ব্যালন ডি’অর) এনে দিয়েছিল। ওই একই বছরে তিনি স্পেনকে ইউরো জেতাতে সাহায্য করেছিলেন। তার ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিকে টানা রেকর্ড ৭৪টি ম্যাচে অপরাজিত থাকার গৌরব এনে দিয়েছিলেন।
ফিফার টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গ্রহণের পর তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে যেন এটা একদম নিখুঁত একটি চিত্রনাট্য। আমি সত্যিই এমন কিছু আশা করিনি।’
‘আমি চাই তরুণ প্রজন্ম দেখুক, একজন খেলোয়াড় যে একসময় স্বর্গ স্পর্শ করার পর নরকে পতিত হয়েছিল। সেও আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে’ বলে যোগ করেন তিনি।
স্পেনের দলীয় প্রচেষ্টা
স্পেনের মাঝমাঠের স্তম্ভ ছিলেন রদ্রি। পুরো মাঠ জুড়ে ছিল তার বিচরণ। তবে ‘লা রোজা’রাদের সব সময় দলগত পারফরম্যান্স ও একতাবদ্ধতাকে প্রাধান্য দেয়। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় ভাগে ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলে লড়াকু আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা নিজেদের করে নেন ইউরোসেরারা। ফাইনালে জয়েরে পর সতীর্থদের প্রশংসা করেতে ভোলেননি রদ্রি।
প্রতিপক্ষ হিসেবে আর্জেন্টিনা অনেক শক্তশালী দল ছিল। বিশেষ করে গোল করার সুযোগ খুব একটা না দিলেও তাদের ডিফেন্স ভাঙা ছিল স্পেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ—জানান রদ্রি।
পুরো ম্যাচ বিবেচনা করে ১-০ ব্যবধানের জয়ই সঠিক ও যৌক্তিক পরিণতি ছিল মনে করেন স্পেনের এই মিডফিল্ডার।