বাঙালি ভাষা আন্দোলনের অন্তর্ব্যঞ্জনা জাতির জন্য এতটাই মৌলিক এবং গভীর যে বিশেষত সে বিষয়ের গদ্য, নতুন হোক বা পুরনো হোক তার আকরগুলো সব সময় পুনঃপুনঃ পাঠযোগ্য আর নতুন নতুন আধুনিকতায় দ্যুতিময়। মানে মননশীল রচনা হওয়া সত্ত্বেও তা যেন চিরায়ত সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম। ঠিক সেই সত্যতা বা সাহিত্য বাস্তবতাই পাওয়া যায় আহমদ রফিকের 'ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস' গ্রন্থে। বলতে কী, এই সত্যকেও বইটি অনেকাংশে অতিক্রম করেছে। কারণ তুলনারহিত এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি নতুন মাত্রার রচনা এই বইয়ে সংকলিত হয়েছে। এবং খুব স্বচ্ছতার সঙ্গে সমসাময়িক বীক্ষায় বিষয়গুলোর যথার্থ সাধু বিশ্লেষণ এতে ভুক্তি পেয়েছে। যেমন ১৯৫২ সালের মার্চের ঘটনাবলি, ঢাকার বাইরে অন্যান্য জেলা-মহকুমায় ভাষা আন্দোলন, একুশে প্রসঙ্গে নানা ব্যক্তিত্বের নানা মতামত এবং ওই আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে অমীমাংসিত বিতর্ক ইত্যাদি। এবং সব শেষে একুশে ফেব্রুয়ারির 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হয়ে ওঠার বৈশ্বিক স্যোসিয়পলিটিক্যাল বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা বর্ণনা। আহমদ রফিক খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট হওয়ার ওপর প্রথিতযশা কবি। এই কবির গদ্য যে অন্য উচ্চতায় রচিত হতে বাধ্য, প্রতিভা, যোগ্যতার সেই স্ফুরণ লক্ষ্য করা যাবে এই ইতিহাসগ্রন্থে। এর আরো প্রায়োগিক কারণ আছে। সেটা হলো, তিনি একাধারে রাজনৈতিক চেতনায় শাণিত এবং সর্বোপরি মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। অতএব তিনি যে কেবল গবেষণার অনুঘটক তা-ই নয়, সরাসরি ঘটনার কুশীলবও বটে। সুতরাং তাঁর কাছ থেকে এমন মূল্যবান কিছু শ্রমঘন অর্জন পাওয়া যাবে, সেটাই যথার্থ। সেটাই স্বাভাবিক। আহমদ রফিক বিষয়ে নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, অনুবাদ, বিজ্ঞান লেখা, সম্পাদনার যে কর্মযজ্ঞ, সেখানে ভাষা আন্দোলন বিষয়ে আরো কাজ যে আছে, তা পাঠকমাত্রই জানেন। বিশেষ করে তাঁর 'একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস', 'ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য', ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা, ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তর প্রভাবের কথা এখানে নিশ্চয়ই প্রাসঙ্গিক। শেষের দিকে তাঁর আরেকটি বই বেরিয়েছে 'ভাষা আন্দোলন ও নেতাকর্মীদের ভূমিকা'। তো বলাই বাহুল্য, আহমদ রফিক এই বইয়ে বিষয়ের জাবরকাটা বা পুনরাবৃত্তির চর্বিতচর্বণের নামান্তর হয় এমন কাজ করেননি। এমনকি দ্বিরুক্তি এড়িয়ে যেতে তাঁকে তাঁর ওই সব বইয়ের বলা বক্তব্যের দিকে টানটান খেয়াল রাখতে হয়েছে। সে তো অবশ্যই সত্য। এ জন্যই ভাষা আন্দোলন বিষয়ে তাঁর প্রতিটি গ্রন্থের মননমূল্য অন্য অনেকের চেয়ে বেশি। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৪২ আর রচনা বা গদ্যসংখ্যা ২৪। অতএব, একটা গড়পড়তা বোঝাই যাচ্ছে যে নিবন্ধগুলো অহেতুক দীর্ঘ নয়। শুরুতে লেখকের দুই পৃষ্ঠার একটা সমৃদ্ধ 'মুখবন্ধ' আছে, যা পুরো বইটির মেজাজ ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুমান করাও বিশেষ সহায়ক। এর প্রচ্ছদ জ্যাকেটের প্রথম ব্লার্বেও বইটির আঁটসাঁট একটি মূল্যবান সারমর্ম রয়েছে, যা ক্রেতা-পাঠককে সামান্য সময়ের মধ্যে প্রকাশনাটি হৃদয়ঙ্গম করতে বিশেষভাবে সাহায্য করবে। এ বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটির শিরোনাম 'মাতৃভাষার বহুমাত্রিক গুরুত্ব' এবং দ্বিতীয় 'বাংলা বাঙালি নিয়ে পূর্বপাঠ'। বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়গুলো যে কতভাবে বিশ্লেষিত-মূল্যায়িত হওয়ার যোগ্য এবং দাবি রাখে, বিশেষ করে এই দুটি রচনায় আহমদ রফিকের সেই মুনশিয়ানা সহজেই লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে এতে মনস্তাত্ত্বিক কিছু ব্যাখ্যা-বিবরণ বিধৃত হয়েছে, যার মধ্যে আমাদের ঔপনিবেশিক মানসক্ষয়িষ্ণুতার ক্ষতিগুলো চিহ্নিত হতে প্রয়াস পেয়েছে। যেমন : "আশ্চর্য যে নবাব আবদুল লতিফও ছিলেন বঙ্গীয় মুসলমান সন্তানদের বাংলার বদলে মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষপাতী, অবশ্য ইংরেজির বিরোধী না হয়েও। ফলে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে আর্থসামাজিক বৈষম্য বড় হয়ে দেখা দেয় যে বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ তাঁর একাধিক রচনায় সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন, 'আমরা গোড়া হইতে ইংরেজের ইস্কুলে বেশি মনোযোগের সঙ্গে পড়া মুখস্থ করিয়াছি বলিয়া গবর্মেন্টের চাকরি ও সম্মানের ভাগ মুসলমান ভ্রাতাদের চেয়ে আমাদের অংশে বেশি পড়িয়াছে'।" এ রকম আরো উদ্ধৃতি বইয়ে এসেছে লেখকের নিজস্ব ব্যাখ্যার আনুকূল্য অর্জনের লক্ষ্যে। স্বাভাবিকভাবেই এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, নেতা-প্রশাসকদের কথা এতে উঠে এসেছে। আরেকটি কথা, যা এই গ্রন্থখানিকে বিশেষত্ব দিয়েছে, তা হলো ঢাকার বাইরে কোথায় কিভাবে কতটা ভাষা আন্দোলন দানা বেঁধেছিল। সব মিলিয়ে বইটি পাঠকের এবং গবেষক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই সহায়ক একটা গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। - বিলু কবীর