এ বছরের শুরুতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন প্রচণ্ড অস্থির হয়ে ওঠে। প্রায় ১০০ দিন হরতাল-অবরোধে আমরা যখন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায়, ঠিক তখন ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঘোষণা খাঁখাঁ চৈত্রে এক পশলা বৃষ্টির মতো জনজীবনে স্বস্তি বয়ে আনে। বিশ দলীয় জোট হরতাল-অবরোধের মতো অপ্রিয় রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার সম্মানজনক পরিস্থিতি খুঁজে পায়, আর সরকারও নির্বাচনের ঘোষণার মাধ্যমে গণমুখী কার্যকলাপ বাস্তবায়ন করার সুযোগ পায়। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সিদ্ধান্ত সরকার ও বিশ দলীয় জোট উভয়কে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একে অন্যের কাছে আসার সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে এবং এ পথে বৃহত্তর উন্নয়নের জাতীয় ঐক্যের প্রেক্ষিত তৈরি করেছে। কেবল জাতীয় ঐক্যই আমাদের ভয়ংকর ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। হরতাল-অবরোধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের সমূহ ক্ষতি হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রায় শূন্যে নেমেছে, নিরাপত্তাহীনতা, পেট্রলবোমার আতঙ্ক, আইনবহির্ভূত গ্রেপ্তার ও হত্যা প্রভৃতি বিষয় আমাদের মানস জগতে এমন এক হতাশা যুক্ত করেছিল, যা থেকে মুক্তির আশা খুবই ক্ষীণ হয়ে উঠেছিল। অবশেষে সিটি নির্বাচন টানেলের এক প্রান্তে মৃদু আশার আলো জ্বেলে দিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ক্ষীণ আলোকরশ্মি নিভিয়ে দেওয়ার বহুমুখী তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত কিছুদিনে নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালে যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে, তার নিরসনে ত্বরিত ব্যবস্থা না নিলে আমরা আবারও দুর্ভাগ্যের বিস্বাদ শর্বরীতে নিক্ষিপ্ত হব। নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদপ্রার্থী মির্জা আব্বাসের সহধর্মিণী নানা অনিয়মের অভিযোগ করে আসছিলেন। চট্টগ্রামের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরও এমন অভিযোগ ছিল। প্রথম দিকে আমরা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা শুধু বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু গত ১৯ ও ২০ এপ্রিল উত্তরা ও কারওয়ান বাজারে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে বিশ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া এবং তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাবহর বেশ প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে। বিষয়টি সব মহলে বেশ দুশ্চিন্তার জন্ম দিচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। গত ২০ এপ্রিলের পত্রপত্রিকার খবর মুহূর্তে উদ্বিগ্নতা ছড়িয়ে দেয়। ঢাকা উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পক্ষে উত্তরায় প্রচারণা চালাতে গেলে উত্তরা-৭ সেক্টরে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে একদল যুবক কালো পতাকা ও ইটপাথর নিয়ে তেড়ে আসে। অগত্যা সন্ধ্যা ৭টায় খালেদা জিয়ার গাড়ি এয়ারপোর্ট রোডের দিকে ঘুরে যায়। খবরে দাবি করা হয়েছে, উত্তরা থানার শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী নেতাদের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারণায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে। এক দিন যেতে না যেতেই ২১ এপ্রিলের পত্রপত্রিকার আরেকটি খবরের শিরোনাম আমাদের আবারও উদ্বিগ্নতা বাড়িয়ে দেয়। এক দিন আগে খালেদার গাড়িবহরে 'বিঘ্ন' সৃষ্টি করার কাজটি উন্নীত হয়ে এক দিন পর তা 'আক্রান্ত' হয়েছে। এবার উদ্বিগ্নতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারওয়ান বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে প্রচারণা চালানোর সময় খালেদা জিয়ার বুলেটপ্রুফ গাড়িও ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০ জন আহত হয়েছে, ছয়টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খবরে দাবি করা হয়েছে, কারওয়ান বাজারের ঘটনাটি কমপক্ষে ১৫০ জন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগকর্মীদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবরে জেনেছি, সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উল্লিখিত ঘটনা দুটিকে হরতাল-অবরোধে অতিষ্ঠ জনগণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে বিশ দলীয় জোট এ ঘটনার প্রতিবাদে ২২ এপ্রিল ঢাকা ও চিটাগাং ছাড়া দেশের সর্বত্র হরতাল আহ্বান করেছে। পত্রিকার খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে এ মুহূর্তে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, এ কথা মানতে হবে। তবে পত্রিকার খবর মিথ্যা হলে আমরা আশ্বস্ত হব, খুশি হব। হয়তো বা সরকার বা নির্বাচন কমিশন ঘটনায় তদন্ত করবে, একটা সুবাহা হয়তো হবে। আমরা ভালো কিছু দেখব- এ আশা করে আছি। লিখতে চেয়েছিলাম নির্বাচন নিয়ে, কিভাবে আসন্ন নির্বাচনকে সফল করা যায় তা নিয়ে। আমাদের দেশে নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিজ্ঞজনরা 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' শব্দটি ব্যবহার করছেন অহরহ। বড় আকর্ষণীয়, বড় স্বস্তিদায়ক শব্দ! হ্যাঁ, এ মুহূর্তে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার কাজটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং আমাদের তা করতেই হবে। গত ২০ এপ্রিল বর্ষীয়ান জননেতা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সতীর্থ তোফায়েল আহমেদ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণা দিতে গিয়ে একটি বিশেষ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আসন্ন সিটি নির্বাচনে বিশ দলীয় জোটনেত্রী নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, অন্য নেতারাও তাঁর পাশাপাশি অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। কিন্তু নির্বাচনী বিধি রক্ষার নীতিতে আটকা পড়ছেন সরকারদলীয় জোটের নেতারা। তাঁরা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারছেন না। তিনি নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে চিন্তা করার পরামর্শ দিয়েছেন। জনাব তোফায়েল আহমেদের এ বিজ্ঞচিত পরামর্শ গ্রহণ করার ব্যাপারটি আইনগত এবং আইনের ব্যাখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। তবে যে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি তাঁর বক্তব্যে প্রোথিত আছে, তা হলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির শান্তিপূর্ণ সমাধানপ্রক্রিয়া। উত্তরা ও কারওয়ান বাজারের ঘটনার সূত্রপাত 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড'-এর অনুপস্থিতির হতাশা থেকে উৎসারিত হওয়া সম্ভব। যারা নির্বাচনী প্রচারণায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছে না, তারা সংক্ষুব্ধ এবং এ ঘটনাদ্বয় তার প্রতিক্রিয়ামাত্র। একদিকে বিশ দলীয় নেতা-নেত্রীরা ধুমছে প্রচারণার কাজ চালাচ্ছেন, অন্যদিকে আওয়ামী জোট নির্বাচনী রীতিনীতির প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই প্রচারণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে সেই জোটের উদীয়মান প্রভাবশালীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। তোফায়েল আহমেদ অবশ্য এমন অবস্থায় শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাঁর রাজনৈতিক জোট নেতাদের শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে এবং তা তাহলে আমাদের রাজনীতিতে অস্থিরতা স্তিমিত হতে পারে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব এখন অনেক বেশি। নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় অনভিপ্রেত এ দুটো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করা যায়। বিশ দলীয় জোট এ মুহূর্তে হরতাল দিয়ে কী প্রাপ্তি অর্জন করতে চায়, তা বোঝা মুশকিল। তবে হরতাল-অবরোধে অতিষ্ঠ জনগণ এ নব আহূত হরতালে যে খুশি হবে না, তা অচিরেই টের পাওয়া যাবে। হরতাল না দিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ, মিছিল, গণসংযোগ করার সুযোগ দিন। তাতে নির্বাচনী প্রচারণা আরো তুঙ্গে আনতে পারত বিশ দলীয় জোট। সুধীসমাজের যে অংশ নির্বাচনের কথা বারবার বলে আসছিল, তাদের অনেক সময় ভুল বোঝা হয়েছে। তারা নির্বাচনের পক্ষে কথা বলে মূলত গণমানুষের মনের গহিন কন্দরে লুক্কায়িত প্রত্যাশাটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। তারা কোনো রাজনৈতিক জোটের পক্ষ-বিপক্ষ নয়; বরং তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কৌশল হিসেবে নির্বাচনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত অন্তত সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত করে সরকার স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারে। তাতে অনেক দিক থেকে সরকারের লাভ। সবচেয়ে বড় অর্জন হবে ৫ জানুয়ারির বহু বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে সৃষ্ট নেতিবাচক ইমেজ থেকে সরকার নিজকে পরিচ্ছন্ন করার সুযোগ পাবে। দ্বিতীয়ত, এ সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব, তাও প্রমাণ করার সুযোগ থাকবে। তৃতীয়ত, বিশ দলীয় জোট সরকারবিরোধী যেসব বক্তব্য দিয়ে জনগণের সমবেদনা কেড়ে নিচ্ছে, আসন্ন নির্বাচন বিশ দলীয় জোটকে সে সুযোগ লাভ থেকে বিরত রাখতে পারবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আসন্ন নির্বাচনের সফলতার জন্য সরকারকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। বিশ দলীয় জোটের নির্বাচনী প্রচারণায় যারা অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্ন সৃষ্টি করছে, তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারের স্বচ্ছতার প্রতি কালিমা লেপন করছে। দ্রুত এসব ঘটনার ইতি টেনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ কাজে ব্যর্থ হলে বা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে আমাদের রাজনীতিতে এমন অস্থিতিশীলতার অভিশাপ নেমে আসবে, যা দূর করা অসম্ভব হবে। আমরা কেউই চাই না আমাদের দেশ, প্রিয় মাতৃভূমি আবারও অশান্ত হোক, আবারও অস্থির হোক! আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আসন্ন নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দিকে তাকিয়ে থাকব অপলক নেত্রে। লেখক : প্রফেসর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিন, স্কুল অব বিজনেস সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি mramin68@yahoo.com