পৃথিবীর তর্ক করার ক্ষমতা নেই। সে কোনো দর-কষাকষিও করতে পারে না। কিন্তু তার আছে সংকেত দেওয়ার ক্ষমতা। তাই সে সংকেত পাঠায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভয়াবহ দাবানল, তাপপ্রবাহ, হিমবাহ গলে যাওয়া—এগুলোই তার সংকেত। মূলত পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই সংকেত। ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ২১) সিদ্ধান্ত হয়েছিল, পৃথিবীর তাপমাত্রা শিল্প বিপ্লব পূর্ব সময়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি—সম্ভব হলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার। কিন্তু এরই মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিভ্রান্তি, বিলম্ব, মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া, অস্বীকার করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আর এসব কারণে পৃথিবী তার বিপৎসংকেত নম্বর বৃদ্ধি করে চলেছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনপি) থেকে গত বছর (২০২৫) প্রকাশিত গ্লোবাল ‘এনভায়রনমেন্ট আউটলুক ৭’-এ বলা হয়েছে, পৃথিবী বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ভূমি অবক্ষয় এবং দূষণ-বর্জ্য সংকটের মতো পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পযুগের তুলনায় অন্তত ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৪ সালে তা ১.৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। পৃথিবীর প্রায় ৮০ লাখ জীব প্রজাতির মধ্যে ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সময়ে প্রতিবছর ১০ কোটি হেক্টর উর্বর ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে বছরে ২০০ কোটিরও বেশি টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যা ২০৫০ সালে ৩৮০ কোটি টনে পৌঁছতে পারে। বৈশ্বিক মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০২৩ সালে ৫৩ গিগা টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্যে পৌঁছে রেকর্ড করেছে।
উল্লিখিত প্রতিবেদনটিতে যুদ্ধের কথাও বলা হয়েছে। সর্বনাশা এই যুদ্ধে মৃত্যু হচ্ছে নিরপরাধ মানুষের। যুদ্ধের অভিঘাতে বিধ্বস্ত দেশগুলোসহ এসব দেশের বাইরেও যুদ্ধজনিত বিনষ্ট পরিবেশের কারণে আরো বহু মানুষের মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের পরিবেশ বিধ্বংসী পরিসংখ্যান রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। ২০২৬ সালে শুরু হওয়া ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ফলে মানুষের মৃত্যু ও স্থাপনা ধ্বংস ছাড়াও বিপুল পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ঘটেছে। যুদ্ধের প্রথম ১৪ দিনেই ৫০ লাখ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিবেশগত অভিঘাতও অত্যন্ত গুরুতর। গত বছর (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ : আর্থ অর্গানাইজেশন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২৩ কোটি টন গ্রিনহাউস গ্যাস সমতুল্য নিঃসরণ ঘটেছে। গাজা যুদ্ধে নিঃসরণ ঘটেছে তিন কোটি টনেরও বেশি গ্রিনহাউস গ্যাসের। যুদ্ধ জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। অবিলম্বে সব ধরনের সংঘাত ও যুদ্ধ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের (৫ জুন ২০২৬) প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ বা ‘জলবায়ু পদক্ষেপ’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের জলবায়ুসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে যেসব কথা বলেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা; বন, জলাভূমি, মহাসাগর ও মাটির পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ; জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ; মিথেন গ্যাসের নির্গমন হ্রাস; খাদ্যের অপচয় কমানো; টেকসই ও জ্বালানি সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণ; শহরগুলোতে সবুজ অবকাঠামো গড়ে তোলাসহ জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি সতর্ক করে বলেছে যে এগুলো করা না হলে এই গ্রহের প্রাণ ও প্রকৃতির জন্য তা বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর আয়োজক দেশ আজারবাইজান দিবসটি উপলক্ষে একটি উপপ্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। সেটি হচ্ছে, ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’ (ইনস্পায়ার্ড বাই নেচার, ফর ক্লাইমেট, ফর আওয়ার ফিউচার)। এটি একটি চমৎকার ধারণা। প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খুঁজতে দিনশেষে আমাদের প্রকৃতির কাছেই ফিরে যেতে হবে। আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃতি হচ্ছে অপরিহার্য। এই উপপ্রতিপাদ্য স্পষ্ট করে যে জলবায়ু পদক্ষেপ শুধু কার্বন নির্গমন কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি পরিচালনার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা এবং জলবায়ুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মেরামত করার বিষয়ও।
আশার কথা হচ্ছে এই যে এখন পৃথিবীর অনেক জায়গায় ছাদের পর ছাদজুড়ে বিস্তৃত হচ্ছে সোলার প্যানেল। দিগন্তজুড়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে উইন্ড টারবাইন। গত ১০০ বছরের মধ্যে গত বছর (২০২৫) প্রথমবারের মতো নবায়নযোগ্য শক্তি (৩৩.৮ শতাংশ) বৈশ্বিক বিদ্যুৎ মিশ্রণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকে (৩৩ শতাংশ) অতিক্রম করেছে।
শহরগুলো নতুনভাবে নকশা করা হচ্ছে। পুনরায় রোপণ করা হচ্ছে বনভূমি। ইতিবাচক টিপিং পয়েন্টগুলো (ভালো পরিবর্তন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া) পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তে শিকড় গাঁথতে শুরু করেছে। এগুলো হচ্ছে পৃথিবীর পাঠানো সংকেতের উত্তর। এখন আর প্রশ্ন এটি নয় যে পরিবর্তন আসবে কি না? বরং প্রশ্ন হলো, আমরা সেই পরিবর্তনকে কিভাবে পরিচালনা করব এবং কত দ্রুত তা করতে পারব?
পৃথিবীর নানা জায়গায় এখন প্রাকৃতিক উপায়ে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অসহ্য তাপ মোকাবেলার জন্য নেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রকৃতিনির্ভর উদ্যোগ। গবেষণায় দেখা গেছে যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বসতি (অলিগলিযুক্ত জায়গায় ছকহীন বাড়িঘর) এলাকায় আধুনিক গ্রিড-লে আউট (ছকের মতো ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট) এলাকার তুলনায় দিনের সর্বোচ্চ বায়ু তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম। আলজেরিয়ায় রাস্তার জ্যামিতি পরিবর্তন ও শেডিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পিইটি (ফিজিওলজিক্যাল ইকুইভ্যালেন্ট টেম্পারেচার : অনুভূত তাপমাত্রা) প্রায় ৩.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে।
ইরান, মিসর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে তাপমাত্রা ব্যবস্থাপনার জন্য একসময় ‘বাদগির’ বহুলভাবে ব্যবহৃত হতো। বাদগির হলো গরম ও শুষ্ক অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে ব্যবহৃত একটি বিশেষ বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, যা প্রাকৃতিকভাবে ঠাণ্ডা বাতাস ঘরের ভেতরে প্রবেশ করায় এবং গরম বাতাস বাইরে বের করে দেয়। ভারতেও আগে এ ধরনের ভবন (যেমন—হাওয়া মহল, জয়পুর) তৈরি হতো। বর্তমানে চেন্নাইয়ে কয়েকটি স্কুলে কুল রুফ কৌশল ব্যবহার, গাছ ও সবুজ আচ্ছাদন তৈরি, পার্গোলা (গাছে ঢাকা মাচা) ও আচ্ছাদিত হাঁটার পথ সৃষ্টি, জানালায় ছায়া তৈরি, প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের (ক্রস ভেন্টিলেশন, ছাদে বায়ু নির্গমনকারী ছিদ্র তৈরি এবং জালি ইট ব্যবহার) ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে স্কুল ভবনগুলোর ভেতর ও বাইরে তাপমাত্রা কমানো সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকারের জলবায়ু পরিবর্তন কমিটি দেশটিতে সবুজ ছায়া তৈরি এবং বাড়িঘরসহ অন্যান্য অবকাঠামো জলবায়ুসহিষ্ণু করার পরামর্শ দিয়েছে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য অতীতে স্থানীয় জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক বিদেশি ধাঁচের নির্মাণ ও তথাকথিত ‘মডার্ন’ উপকরণের প্রভাবে সেই বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে আবারও দেশজ স্থাপত্যের জ্ঞান ও কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদনে (২০২৬) বাংলাদেশে পরিবেশগত সমস্যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, দূষণ, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, মাটিক্ষয়, পানিসংকট, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, ভূমিধস, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ চেষ্টা করছে। তবে এসব বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে আরো অনেক দূর যেতে হবে। যেমন—সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা হচ্ছে মোট জ্বালানি সক্ষমতার (৩২ হাজার ৪৩৬ মে.ও) মাত্র ৫.৪৬ শতাংশ। এটি বৈশ্বিক চিত্র (প্রায় ৩৪ শতাংশ) থেকে অনেক পেছনে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সুস্থায়ী সাফল্য পেতে হলে প্রয়োজন নিবিড় গবেষণা, দেশের উপযোগী জ্ঞান সৃষ্টি ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ এবং প্রমাণভিত্তিক ফলাফল নিশ্চিত করা।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়




দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান নির্দেশক হচ্ছে দেশজ আয়ের প্রবৃদ্ধির হার। প্রতিটি বাজেটেই এই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। চলতি অর্থবছর জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৫.৫ শতাংশ। তবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস হচ্ছে অনেক কম। বিশ্বব্যাংক যে পূর্বাভাস দিচ্ছে, তাতে এ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৩.১ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস হলো ৪.৭ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪.০ শতাংশ। এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম অনুমিত হওয়ার কারণ হলো নির্বাচন-পূর্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ হ্রাস, জ্বালানি খাতের সমস্যা, বৈশ্বিক ঘটনাবলির নেতিবাচক প্রভাব এবং উৎপাদনে স্থবিরতা। অর্থবছরের শেষ প্রান্তে হাওরে ভয়াবহ বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে বোরো ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া সার্বিকভাবে কর্মসংস্থান হ্রাস পায়। মানুষের আয় কমে যায়। আগামী বছর প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রধান নিয়ামক হবে সুস্থির সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ। 
সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, গণমাধ্যমে আমরা যে চিত্রটা দেখি তা মূল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ আর প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে অসংখ্য ঘটনা অন্ধকারেই থেকে যায়, কোনো দিন আলোর মুখ দেখে না। যে সমাজ নিজের সবচেয়ে অবোধ, নিষ্পাপ আর চার থেকে ১০ বছরের কোমল শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সমাজের সামগ্রিক সুস্থতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গেছে। আমাদের চারপাশের চেনা জগত্টা শিশুদের জন্য এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের উপত্যকা হয়ে উঠছে।