• ই-পেপার

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র—বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের গৌরবগাথা

  • কর্নেল মো. তৌহিদ উজ্জামান, বিএসপি, পিএসসি

বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো দরকার

ড. জাহাঙ্গীর আলম

বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো দরকার

নয়া বাজেট আসন্ন। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় তা হবে এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি। নিঃসন্দেহে এই বাজেট হবে সম্প্রসারণমূলক। তবে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি ও বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবহেতু একটি আঁটসাঁট বাজেটই আমাদের কাম্য। এর লক্ষ্য হতে হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘব ও দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টেনে ধরা। উৎপাদনশীল কৃষি খাত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতগুলোর খরচ হ্রাস করা এখন খুবই প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধি বাজেটের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এই পরিপ্রেক্ষিতে অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এখন আমাদের প্রয়োজন সরকারের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে এবং খরচের গুণগত মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি বাস্তবসম্মত বাজেট অনুসরণ করা।

বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো দরকার  দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান নির্দেশক হচ্ছে দেশজ আয়ের প্রবৃদ্ধির হার। প্রতিটি বাজেটেই এই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। চলতি অর্থবছর জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৫.৫ শতাংশ। তবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস হচ্ছে অনেক কম। বিশ্বব্যাংক যে পূর্বাভাস দিচ্ছে, তাতে এ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৩.১ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস হলো ৪.৭ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪.০ শতাংশ। এবার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম অনুমিত হওয়ার কারণ হলো নির্বাচন-পূর্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ হ্রাস, জ্বালানি খাতের সমস্যা, বৈশ্বিক ঘটনাবলির নেতিবাচক প্রভাব এবং উৎপাদনে স্থবিরতা। অর্থবছরের শেষ প্রান্তে হাওরে ভয়াবহ বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে বোরো ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া সার্বিকভাবে কর্মসংস্থান হ্রাস পায়। মানুষের আয় কমে যায়। আগামী বছর প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রধান নিয়ামক হবে সুস্থির সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ।

প্রবৃদ্ধির হার মাঝারি গোছের হলেও জনজীবনে স্বস্তি থাকতে পারে, যদি তা উচ্চ মূল্যস্ফীতির অতলে তলিয়ে না যায়। অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুষ্টক্ষত হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা গরিব ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে চরমভাবে ভোগান্তিতে ফেলে। জনজীবনে কষ্ট ও দুর্ভোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে প্রায় চার বছর ধরে বিরাজ করছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এর মাত্রা গড়ে ৯ শতাংশের ওপরে। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে কয়েক মাস ধরে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রণীত বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৬.৫ শতাংশ। গত ১০ মাসের গড় অর্জন প্রায় ৯ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি, যা গরিব মানুষের কষ্ট অনেক বাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি সম্পর্কিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে চার বছর ধরে লাগাতার ঝুঁকির লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাসের প্রধান শর্ত হলো কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি। সম্প্রতি কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এর প্রবৃদ্ধির হার এগিয়ে চলছে অনেক ধীরগতিতে। এখন কৃষি খাতে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি খুবই কম। ২০০৯-১০ অর্থবছরে অর্জিত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫৫ শতাংশ। সেখান থেকে কমে বর্তমানে ২.৪২ শতাংশে অবস্থান করছে। সার্বিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩.৩ শতাংশ। এই হার ২০০৯-১০ অর্থবছরে অর্জিত ৬.৫৫ শতাংশের অর্ধেক মাত্র। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষি খাতের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ৪-৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এ জন্য কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। ২০১১-১২ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪.৮৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সে তুলনায় কৃষি বাজেট বাড়েনি। এ সময় কৃষি বাজেট বেড়েছে ৩.৬৯ গুণ। ২০১১-১২ অর্থবছরের মোট বাজেটে কৃষি বাজেটের হিস্যা ছিল ১০.৬৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা নেমে আসে ৫.৮৬ শতাংশে।

চলতি অর্থবছরে কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শস্য কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেট বরাদ্দের ৩.৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২.৩৭ শতাংশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। এটি ছিল অপ্রতুল। ফসল কৃষি খাতের বরাদ্দে আগের বছরের সংশোধিত বরাদ্দ থেকে ১৮.২১ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা কমিয়ে রাখা হয় ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে কৃষি খাতের হিস্যা বাড়ানো উচিত। বৃহত্তর কৃষি খাতে মোট বাজেটের ন্যূনপক্ষে ১০ শতাংশ এবং ভর্তুকিতে মোট কৃষি উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে বৃহত্তর কৃষি খাতে বরাদ্দ করতে হবে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকির জন্য রাখতে হবে ন্যূনতম ৪০ হাজার কোটি টাকা।

কৃষি গবেষণায় সরকারি ব্যয় অপ্রতুল। ন্যূনপক্ষে কৃষি জিডিপির ১ শতাংশ গবেষণা পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত। চীন, ভিয়েতনাম, জাপানসহ পৃথিবীর অনেক দেশে গবেষণা ব্যয় ৩ থেকে ৫ শতাংশ। আমাদের ক্ষেত্রে তা ০.৪ শতাংশ। কৃষিবিজ্ঞানীদের বেতন-ভাতা কম। মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন ও পদোন্নতির সুযোগের অভাব। অনেক প্রতিষ্ঠানে পেনশনের সুযোগ নেই। চাকরিকালীন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক মেধাবী বিজ্ঞানী দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। অনেকে গবেষণা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ভিন্ন পেশায়। এমন পরিস্থিতিতে কৃষি গবেষণায় প্রণোদনাকাঠামো পরিবর্তন করা উচিত।

বাজেট প্রণয়নের সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কত হবে, তা বলা হয় না। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কৃষি খাতে ২০২৪-২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরের গড় প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৪ শতাংশ। অর্জিত হয়েছে ৩ শতাংশ। এই হার বাড়ানো দরকার। ন্যূনপক্ষে তা ৪ শতাংশ অর্জন করা উচিত। অন্যথায় মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দেশের কৃষকদের জন্য পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি একটি বড় সমস্যা। বাজারের নিয়ন্ত্রণ এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর হাতে। তাঁদের কারসাজিতে একদিকে কৃষক তাঁর পণ্যের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না; অন্যদিকে ভোক্তা অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করে দারুণভাবে ঠকছেন। এ ক্ষেত্রে বিপণন খরচ ও মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি করা দরকার। ধান-চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ যৌক্তিক পর্যায়ে হওয়া উচিত। এবার বোরো ফসলের আবাদ উপকরণ সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তদুপরি হাওরে অকালবন্যায় প্রায় ২৫ শতাংশ ধান বিনষ্ট হয়েছে। ফলে প্রতি ইউনিট ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের মূল্য প্রতি কেজি গত বছরের সমানই রয়ে গেছে। ধান ৩৬ টাকা এবং সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা। এটি পরিমার্জন করা উচিত। উৎপাদন খরচের ওপর ন্যূনপক্ষে ২০ শতাংশ মুনাফা দিয়ে সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করা উচিত।  দুই বছর ধরে আলু ও পেঁয়াজের উৎপাদন অনেক বেড়েছে। কিন্তু এগুলোর বাজারদর দ্রুত কমে গেছে। এমতাবস্থায় সরকারিভাবে ফসল সংগ্রহের তালিকা বৃদ্ধি করতে হবে। ন্যূনপক্ষে ১০ শতাংশ উৎপাদিত ফসল কৃষকদের কাছ থেকে সরকারকে সরাসরিভাবে কিনে নিয়ে গুদামে বা কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণ করতে হবে। এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

বর্তমান উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে প্রান্তিক কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক চাপ পড়েছে। তাদের জন্য ভর্তুকি ও সহায়তা বাড়ানো দরকার। তাদের সুরক্ষাকাঠামো সম্প্রসারণ করা দরকার। খাদ্য ও পুষ্টি মানুষের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। এই অধিকারের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।  গ্রাম ও নগর উভয় ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়ন এবং কৃষি বিনিয়োগে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে বাজেটে। মৌসুমি কর্মহীনতার সময় কর্মসংস্থান গ্যারান্টি স্কিম চালু করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড প্রদান শুরু করেছে। এর আওতা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করতে প্রায় পাঁচ বছর লেগে যাবে। ফলে দেশের এক প্রান্তের দরিদ্র মানুষ যখন এসব কার্ডের সুবিধা ভোগ করবে, তখন অন্য প্রান্তের মানুষ শুধু আশায় বুক বাঁধবে। এতে সমতা লঙ্ঘিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বঞ্চিত এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রই কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কয়েক বছর ধরে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষির উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে দারুণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকরা। তাঁদের সহায়তার জন্য দুর্যোগ মোকাবেলা তহবিল গঠন করা দরকার। আসন্ন বাজেটটি কৃষি ও কৃষক বান্ধব হবে, এটিই প্রত্যাশা।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি) সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)

নিষ্পাপ শৈশবের রক্তাক্ত মানচিত্র

ড. আলা উদ্দিন

নিষ্পাপ শৈশবের রক্তাক্ত মানচিত্র

শিরোনামের নিষ্ঠুর সংখ্যাগুলো যখন খবরের কাগজের পাতায় ভেসে ওঠে তখন এক মুহূর্তের জন্য বুকটা কেঁপে ওঠে। চার মাসে ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার, খুন হয়েছে ১৭ জন। মিরপুরে সাত বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা, সিলেটে চার বছরের শিশু, ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশু এবং মুন্সীগঞ্জে ১০ বছরের আরেকটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। কী ভয়ংকর!

এখানেই শেষ নয়, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরো ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু ক্ষোভে ও অপমানে আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে।

নিষ্পাপ শৈশবের রক্তাক্ত মানচিত্রসবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, গণমাধ্যমে আমরা যে চিত্রটা দেখি তা মূল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ আর প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে অসংখ্য ঘটনা অন্ধকারেই থেকে যায়, কোনো দিন আলোর মুখ দেখে না। যে সমাজ নিজের সবচেয়ে অবোধ, নিষ্পাপ আর চার থেকে ১০ বছরের কোমল শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সমাজের সামগ্রিক সুস্থতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গেছে। আমাদের চারপাশের চেনা জগত্টা শিশুদের জন্য এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের উপত্যকা হয়ে উঠছে।

এখানে একটা জিনিস আমাদের বুঝতে হবে। এই যে মিরপুর, সিলেট বা ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনাগুলোএগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি নির্মম ও অস্বস্তিকর সত্য সামনে চলে আসে। সাম্প্রতিক সময়ের এই ঘটনাগুলোর সব কয়টিতেই দেখা গেছে, শিশুরা কোনো অপরিচিত লোকের হাতে নিগৃহীত হয়নি। তারা শিকার হয়েছে প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা কোনো না কোনো ঘনিষ্ঠজনের। যাকে বিশ্বাস করে শিশুটি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, যার কাছে পরিবার নিশ্চিন্তে সন্তানকে রেখে গিয়েছিল, সেই পরিচিত মানুষটিই রূপ নিয়েছে হিংস্র পশুর। এই চেনা মানুষের অবয়বে লুকিয়ে থাকা অপরাধীরা প্রমাণ করে যে সংকট শুধু বাইরের অজানা রাস্তায় নয়, সংকট আমাদের ঘরের খুব কাছে, আমাদের প্রাত্যহিক চেনা বৃত্তের ভেতরেই।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে শুধু কোনো ব্যক্তির তাৎক্ষণিক অপরাধপ্রবণতাকে দায়ী করলে ভুল হবে। এর শিকড় অনেক গভীরে, যা আমাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত। একটি সমাজ যখন ভেতর থেকে পচতে শুরু করে, তখন তার প্রথম আঘাতটা আসে তার সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত অংশের ওপর। আমাদের চারপাশে মাদকাসক্তির যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, তা মানুষের স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি ও বিবেককে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে যেকোনো বিকৃত ও পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট এখন হাতের মুঠোয়। এই অনিয়ন্ত্রিত বিকৃতি মানুষের মনস্তত্ত্বকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তারা নিজের আদিম ও পাশবিক প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।

একই সঙ্গে আমাদের পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার চরম ঘাটতি দৃশ্যমান। জিপিএ ফাইভ আর জাঁকজমকপূর্ণ ক্যারিয়ার গড়ার ইঁদুরদৌড়ে আমরা শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা আর অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছি। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেখানে হওয়ার কথা ছিল একজন সংবেদনশীল মানুষ তৈরি করা, সেখানে তা শুধুই তথ্য মুখস্থ করার যন্ত্র বানানোর কারখানায় পরিণত হয়েছে। যখন সমাজ থেকে যৌথ দায়বদ্ধতা উঠে যায় এবং শুধু ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন এ ধরনের বিকৃতির বিস্তার পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিচারহীনতা আর অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা। আমাদের দেশে এ ধরনের স্পর্শকাতর অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এতটাই দীর্ঘ এবং জটিল যে বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও অপরাধীরা শাস্তি পায় না। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা তদন্তের গাফিলতির কারণে দোষীরা পার পেয়ে যায়। অপরাধের যখন দৃষ্টান্তমূলক এবং দ্রুত শাস্তি হয় না, তখন অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। তারা ধরে নেয় যে অপরাধ করলেও কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। এই দায়মুক্তির নিশ্চয়তাই সমাজকে আরো বেশি সহিংস ও বিপজ্জনক করে তুলছে।

আরো বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই অসভ্য ও নির্মম সমাজে ধর্ষণের শিকার হওয়া শিশু এবং তাদের পরিবারকে যে সামাজিক লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা বেঁচে থাকাকে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন করে তোলে। আমাদের সমাজ এতটাই বিকৃত যে অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে সমাজচ্যুত বা হেয় প্রতিপন্ন করতে বেশি উৎসাহী থাকে। লোকলজ্জা আর অপবাদের আঙুলগুলো ঘুরে যায় সেই ক্ষতবিশেষ মানুষগুলোর দিকেই, যেন অপরাধটা তারা নিজেরা করেছেন। এই বৈরী পরিবেশে সন্তান হারিয়ে কিংবা সন্তানের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়ে মা-বাবাকে যে গ্লানি ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়, তাতে মনে হয় এই অসভ্য সমাজে সন্তানদের সামনে মুখ দেখিয়ে বেঁচে থাকাই যেন সবচেয়ে বড় দায়।

আমরা প্রায়শ পরিকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর আধুনিকতার গল্প বলি। কিন্তু যে রাষ্ট্র তার চার বছরের একটা শিশুকে নিরাপদ বিকেল উপহার দিতে পারে না, সেখানে সমস্ত উন্নয়নই অর্থহীন ঠেকে। শিশুদের ওপর চলা এই ধারাবাহিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর এক চূড়ান্ত ব্যর্থতার দলিল। আমরা যদি এখনই এই পচন রোধ করতে না পারি, তবে আগামী দিনে আমাদের পুরো প্রজন্ম এক চরম ট্রমা আর অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে বড় হবে।

এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে হলে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে। শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মানুষের প্রতি সম্মান এবং নৈতিকতার পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিকৃত কনটেন্ট এবং মাদকের বিরুদ্ধে নিতে হবে শূন্য সহনশীলতার নীতি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক মানসিকতা তৈরি করতে হবে, যাতে অপরাধী সমাজকে ভয় পায়, সমাজ যেন অপরাধীকে ভয় না পায়।

লেখক : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আইয়ামে জাহেলিয়াতের পর্যটকের ডায়েরি!

গোলাম মাওলা রনি

আইয়ামে জাহেলিয়াতের পর্যটকের ডায়েরি!

সে বহুকাল আগের কথা। মধ্যপ্রাচ্যে তখন আইয়ামে জাহেলিয়াতের রাজত্ব চলছিল। নজদ, হাইল ও ইয়েমেন ছাড়াও বালাদে শামের অন্যান্য অঞ্চলে জাহেলিয়াতের অত্যাচার চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। সামর্থ্যবান লোকেরা জাহেলিয়াতের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য অহরহ হিজরত করতেন। কেউ কেউ সপরিবারে আবার কেউ কেউ পরিবার-পরিজন হারিয়ে একাকী নিরুদ্দেশ হতেন অজানার উদ্দেশে। ফলে জাহেলি যুগে অনেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেশত্যাগ করতে গিয়ে পথেঘাটে চোর-ডাকাতদের হাতে যেমন বেঘোরে প্রাণ হারাতেন তেমনি কেউ কেউ আবার এক জাহেলিয়াত থেকে বাঁচতে গিয়ে আরো বড় জাহেলের কবলে পড়ে মারাত্মক মুসিবতে আবর্তিত হতে হতে ইহলীলা সাঙ্গ করতেন। হিজরত করা মজলুমদের মধ্যে কেউ কেউ নামকরা পর্যটকে পরিণত হতেন আবার কেউ কেউ সেই পর্যটনের বাস্তব অভিজ্ঞতা লিখে মানবেতিহাসে অমরত্ব লাভ করতেন। আমাদের আজকের নিবন্ধের নায়ক, যিনি একসময় আরবের মরু অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন এবং জাহেলদের কবলে পড়ে স্ত্রী-পুত্র, দাস-দাসী ও সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ইয়ামেনের সানা বন্দরে পৌঁছেন। তারপর জাহাজে চড়ে তিনি কোথায় গিয়ে পৌঁছালেন সেই কাহিনি তাঁর নিজের মুখ থেকেই শোনা যাক।

আইয়ামে জাহেলিয়াতের পর্যটকের ডায়েরি!লোকজন আমাকে ইবনে আইমান হিসেবেই চিনত। সূদূর চীন দেশ থেকে পারস্য হয়ে যে বাণিজ্য কাফেলাগুলো ইয়েমেন দেশে যেত সেই বাণিজ্য পথের নাম ছিল সিল্ক রুট বা রেশমি পথ। দক্ষিণ আরবের স্বপ্নপুরী বলে খ্যাত মরূদ্যান আল জাহরার পাশ দিয়ে সিল্ক রুটের কাফেলা যখন চলাচল করত, তখন আমি অন্যান্য বেদুইন বালক-বালিকার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে কাফেলা যাত্রীদের স্বাগত জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী আরবি গানের তালে তালে নাচতে থাকতাম। আমাদের উচ্ছ্বাস দেখে কাফেলা থেমে যেত এবং কাফেলার সর্দার এগিয়ে এসে আমাদের আদর করতেন এবং দেশ-বিদেশের মিঠাই দিয়ে ছেলে-মেয়েদের খুশি করতেন। ঐতিহাসিক সিল্ক রুটের সম্মানিত কাফেলা ঘিরে আল জাহরার অধিবাসীদের এই ঐতিহ্য শত বছর ধরে চলে আসছিল। কাফেলার সদস্যরা আমাদের মরূদ্যানে যাত্রাবিরতি করতেন এবং আমাদের সঙ্গে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক লেনদেন করতেন, তাতে আমাদের সারা বছর বেশ ভালোভাবেই কেটে যেত।

আমাদের এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে দারবিশ গোত্র কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল, যারা মূলত পারস্য সম্রাটদের প্রতি আনুগত্য দেখাত। আমি সে সময়টির কথা বলছি, যেটি ছিল খ্রিস্টীয় চার শ অব্দ যখন পুরো জাজিরাতুল আরব মূলত দুটি বৃহৎ পরাশক্তির তাঁবেদারি করত। উত্তর আরব ছিল রোমান সম্রাটদের অধীন এবং দক্ষিণ আরব পারস্য সম্রাটদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকত। রোমানশাসিত অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে আইন-শৃঙ্খলা ভালো ছিল এবং সেই সব অঞ্চলে অনেক নামকরা সভ্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। অন্যদিকে দক্ষিণ আরবের বিশাল অংশ ছিল দুর্গম, অনুর্বর এবং মরু ও শিলাময় পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত। এসব অঞ্চলে কোনো আইন-কানুনের বালাই ছিল না। মূলত গোত্র শাসন এবং গোত্রপতির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই সংশ্লিষ্ট এলাকার সব কিছু নির্ভর করত। কোনো গোত্রপতি যদি যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা ডাকাতি লুটতরাজের মাধ্যমে অঢেল অর্থকড়ি ও মাল-সামানার মালিক বনে যেত, তখন তারা মরুভূমির দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নিকটস্থ পারস্য সম্রাটের গভর্নরদের সঙ্গে দেখা করে আসতেন নিজেদের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। দারবিশ গোত্র এমনিতেই বনি গোত্র হিসেবে পুরো দক্ষিণ আরবে পরিচিত ছিল। অধিকন্তু আল জাহরা মরূদ্যানের মালিকানার কারণে এই গোত্রের লোকদের সভ্যতা-ভব্যতা অন্য বেদুইনদের মতো ছিল না। আমাদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত লোকজন ছিলেন এবং আমরা সবচেয়ে ভালো মানুষ এবং যোগ্যতম মানুষকেই বংশপরম্পরায় নিজেদের গোত্রপতি গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত করে আসছিলাম। ফলে আইয়ামে জাহেলিয়াতের অনেক অসভ্যতা আমাদের মধ্যে ছিল না। কিন্তু আমাদের শত বছরের সেই ঐতিহ্য হঠাৎ করে ধূলিসাৎ হয়ে গেল আমাদের গোত্রপতির অসভ্য এবং চরিত্রহীনা কন্যা উজায়নার কারণে। উজায়নার সঙ্গে কুখ্যাত মরু ডাকাত আবুল হোজ্জার অবৈধ সম্পর্ক ছিল, যা নিয়ে গোত্রপতির সঙ্গে তাঁর মেয়ে এবং মেয়ের নাগরের বিবাদ চরমে পৌঁছে। এ অবস্থায় ডাকাত আবুল হোজ্জা তাঁর দলবল নিয়ে হঠাৎ এক রাতে আমাদের গোত্রে আক্রমণ চালিয়ে সর্দার ও তাঁর পুত্রদের হত্যা করে এবং নিজের প্রেমিকা উজায়নাকে আমাদের রানি বানিয়ে দেয়। ফলে পুরো জাহেলি জামানার কয়েক শ বছরের কুখ্যাত ইতিহাসে সবচেয়ে সুসভ্য গোত্রটি একজন অসভ্য চরিত্রহীনা মহিলার খপ্পরে পড়ে যায়।

উজায়না ও তার প্রেমিক আবুল হোজ্জার কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের মরূদ্যানটি জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়। চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, লুটতরাজ, জুলুম, অত্যাচার এবং খুন-জখম ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। আবুল হোজ্জার দলবল কয়েকটি বাণিজ্য কাফেলার ওপর আক্রমণ চালায়, যা কিনা পারস্য সম্রাটকে খেপিয়ে তোলে। এ অবস্থায় পারসিক সৈন্যরা এসে আমাদের গোত্রকে মরূদ্যান থেকে বের করে দেয়। উজায়না তার নাগরের সঙ্গে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং দ্বিগুণ উৎসাহে অপকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে। আমরা যারা সাধারণ মানুষ ছিলাম, তারা উজায়না-আবুল বাহিনী এবং পারস্য বাহিনীর জাঁতাকলে পড়ে সর্বস্ব হারাতে থাকলাম। উজায়না যেদিন ক্ষমতা লাভ করল তখন আমি বালক বয়সী ছিলাম। আবার যে সময় সে মরূদ্যান থেকে উচ্ছেদ হলো, তখন আমি রীতিমতো যুবক এবং বিয়ে-থা করে পুত্র-কন্যার পিতা হয়ে সংসারধর্ম পালন করছিলাম। একজন ভদ্রলোক হিসেবে আমি আমার এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ছিলাম এবং এই কারণে আমাদের অঞ্চলে পারস্য সেনাপতি মাঝেমধ্যে তাঁর তাঁবুতে আমাকে ডেকে নিতেন। উজায়নার কানে যখন আমার ব্যাপারে খবর পৌঁছাল তখন সে সুযোগ বুঝে একদিন আমার পুরো পরিবারের ওপর আক্রমণ চালিয়ে সবাইকে মেরে ফেলল। শুধু আমি প্রাণ নিয়ে কোনোমতে পালাতে পারলাম।

আমি ইয়েমেনের সানা বন্দরে গিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই ভারতবর্ষগামী একটি জাহাজে চড়ে বসলাম এবং অনেক দিন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে অদ্ভুত এক রাজ্যে এসে পৌঁছালাম। রাজ্যটি ছিল সমুদ্রের উপকূলে। পাহাড়, নদ-নদী ও ঘন বনজঙ্গলে ঘেরা রাজ্যটিতে আমি বহুকাল ছিলাম। সেখানে আমি প্রায় প্রতিদিনই অদ্ভুত এবং অতি আশ্চর্য ঘটনাবলি দেখতাম। এমন সব কাহিনি শুনতাম, যা বিশ্বাস করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তার পরও আমি সেসব ভৌতিক কাহিনি আমার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে যাব, যাতে আগামী প্রজন্ম তাদের পৃথিবীর একটি অদ্ভুত ভূখণ্ড সম্পর্কে জানতে পারে। আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ করলাম যে আরব দেশের দুর্গম মরুভূমি, দুর্ধর্ষ বেদুইন এবং বহুবিধ অপকর্মের জন্য যে কুখ্যাতি রয়েছে তার চেয়েও অধিকমাত্রার কুখ্যাতি গিজগিজ করছিল সুবর্ণপুর নামক রাজ্যটিতে। আরবভূমি তথা জাজিরাতুল আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াতের সঙ্গে যদি সুবর্ণপুরের জাহেলিয়াতের তুলনা করি, তবে আমার বিবেচনায় সুবর্ণপুরের তুলনায় আরবকে রীতিমতো জান্নাত আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। আমি যদি দুটি দেশের লোকজন-পশুপাখি এবং রীতিনীতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করি, তবে আপনারা খুব সহজেই দুই অঞ্চলের জাহেলিয়াতের মিল-অমিল এবং জঘন্যতার মাপকাঠি নিরূপণ করতে পারবেন।

আরবভূমিতে রাজা-বাদশাহ বা গোত্রপতিরা সাধারণত মিথ্যা কথা বলেন না। কিন্তু সুবর্ণপুরের রাজা-বাদশাহ মিথ্যাচার ছাড়া বাঁচতে পারেন না। তাঁরা দৈনিক কয়েক শ মিথ্যা না বললে এবং মিথ্যা না শুনলে তাঁদের পেটের ভাত হজম হয় না, ঠিকমতো প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদিত হয় না এবং রাতে বা দিনে কোনো নিদ্রা হয় না। আরব দেশে মিথ্যাবাদীদের কাজ্জাব বলা হয়। কোনো লোকের নামের সঙ্গে যদি একবার কাজ্জাব শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়, তবে সে এবং তার পরিবার সমাজ থেকে এক ধরনের ঘৃণা-অসহযোগিতা এবং অভিশাপ পেতে থাকে যুগ যুগ ধরে। বেদুইনরা কোনো কাজ্জাবকে তাদের তাঁবুতে ঢোকায় না এবং কাজ্জাবদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। অন্যদিকে সুবর্ণপুরে এসে দেখলাম কাজ্জাবদের জয়জয়কার। সবচেয়ে বড় কাজ্জাবটি সিংহাসনে বসে এবং লোকজনদের মধ্যে যাদের রক্ত-মাংস কাজ্জাবীয় চরিত্র বেশি মাত্রায় প্রবল তারাই-উজির-নাজির-কোতোয়াল-সেনাপতি ইত্যাদি পদ-পদবি পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

আইয়ামে জাহেলিয়াতের সমাজে মোনাফেক শব্দটি অত্যন্ত ঘৃণিত। অন্যদিকে সুবর্ণপুরের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মোনাফেক শব্দের সমার্থক বা পরিপূরক শব্দ নেই। সুবর্ণপুরের লোকজন বাহাত্তুরি-চুয়াত্তুরি-চোগলখোর-প্রতারক ইত্যাদি শব্দ অহরহ ব্যবহার করে বটে, কিন্তু ওই সব শব্দের দ্বারা মোনাফেকির আসল বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে না। আমি যখন মোনাফেক ও মোনাফেকির বিষয়ে লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করলাম, তখন তারা আমার কথা শুনে হেসে গড়াগড়ি দেওয়ার মতো অবস্থা করল। তারা আমাকে জানাল যে মোনাফেকি কর্ম হলো সুবর্ণপুরের জাতীয় চরিত্র। যে লোক যত বড় মোনাফেক সেই লোকই সুবর্ণপুরের ব্যবসা-বাণিজ্য-রাজকার্য এবং সামাজিক কর্মে তত বেশি উন্নয়ন করতে পারে। সুবর্ণপুরের মানুষের হাঁটাচলা-কথাবার্তা-লেনদেন, পোশাক-পরিচ্ছদ, প্রেম-ভালোবাসা, আহার-নিদ্রা এবং বিনোদনের মতো কর্মে মোনাফেকির মূল্য হলো হীরে-মণি-মাণিক্য এবং জহরতের মতো। সুবর্ণপুরের রাজারা জনগণকে বলে এক কথা এবং করে অন্যটি। আবার জনগণও রাজাকে কলা দেখিয়ে মুলা ঢুকিয়ে দেয়। মোনাফেকির প্রকোপ সুবর্ণপুরের সর্বত্র এতটাই ব্যাপক যে ভাষাবিজ্ঞানীরা এটিকে কোনো ক্ষুদ্রতম অর্থের মধ্যে বন্দি করতে চাননি। ফলে শব্দটি এই দেশের কোনো ডিকশনারি বা ব্যাকরণে আলাদাভাবে নিবন্ধিত হয়নি।

আইয়ামে জাহেলিয়াতের সমাজে একটি শব্দ রয়েছে, যা সুবর্ণপুরে নেই, আর সেটি হলো হামিম। আরবিতে হামিম শব্দের অর্থ এমন বন্ধু, যে কিনা বিপদের দিনে তার বন্ধু বা সঙ্গী-সাথিকে ছেড়ে যায় না। হামিম ছাড়াও আরব দেশে মাহবুব বা মেহবুবা শব্দেরও যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। মাহবুব ও মেহবুবা শব্দের অর্থও বন্ধু এবং সেই রকম বন্ধু, যারা পার্থিব কোনো লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা-স্বার্থ অথবা অর্থকড়ির জন্য একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে না। আমাদের জাহেলিয়াত সমাজে অনেক মন্দ জিনিসের আধিক্য রয়েছে। কিন্তু তার পরও সেখানে অসংখ্য হামিম এবং মাহবুব-মেহবুবার দেখা পাওয়া যায়। আপনি যদি আইয়ামে জাহেলিয়ার বাসিন্দা হন এবং সুবর্ণপুরে এসে পরবর্তী সময়ে বসতি গড়েন, তবে আমি লাত-মানাত-উজ্জার কসম কেটে বলতে পারি যে আপনি আপনার সব সাহায্যকারীকে নিয়ে শত বছর অনুসন্ধান করেও সুবর্ণপুরের কোনো অঞ্চল থেকে একজন হামিম অথবা মাহবুব খুঁজে পাবেন না।

সুবর্ণপুরের লোকজন ধান্দা ছাড়া কারো সঙ্গে সম্পর্ক করে না। যত দিন স্বার্থ আছে তত দিন সম্পর্ক রাখে এবং স্বার্থ শেষে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যা দেখে আপনার মনে হবে যে ওরা হয়তো একে অপরকে কোনো দিন চিনতই না। সুবর্ণপুরের জ্ঞানীরা কথা বলে না এবং গর্দভ প্রকৃতির লোকেরা সারাক্ষণ উচ্চ স্বরে কথা বলতে থাকে। এই সমাজের শক্তিশালীরা সাধারণত অত্যাচারী এবং দুর্বলরা সন্দেহপ্রবণ ও কুৎসিত মনের অধিকারী হয়। অতিভোজন মাত্রাতিরিক্ত রঙ্গ-তামাশা এবং বিলাসিতা সুবর্ণপুরের ধনীদের সাধারণ রোগ। অন্যদিকে দরিদ্ররা খুবই হিংসুটে এবং ঝগড়াটে প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাদের নৈতিক চরিত্রও খুবই নিম্নমানের হয়ে থাকে। ধোঁকাবাজি, দুর্নীতি ও প্রতিপক্ষকে অহেতুক দুর্ভোগ-দুর্দশার মধ্যে ফেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবর্ণপুরের রাজকর্মচারীদের তুলনাআইয়ামে জাহেলিয়াতের শিয়াল বা শকুনের চেয়েও নির্মম ও ভয়ংকর। এখানকার রাজকর্মচারীদের স্বভাব-চরিত্র কেমন এবং রাজা বাদশাহদের রুচি ও অভিরুচি ও সাহস-শক্তি কেমন তা নিম্নের কাহিনিটি পড়লেও বুঝতে পারবেন।

রাজামশাইয়ের শখ হলো বনের সব বাঘ মেরে ফেলবেন। তিনি তাঁর পাইক-পেয়াদাদের হুকুম করলেন, বনে আক্রমণ করে প্রতিদিন এক শ বাঘ মারতে হবে এবং একটা বাঘকে গ্রেপ্তার করে রাজপ্রাসাদে আনতে হবে, যেটিকে রাজামশাই পাত্র-মিত্রদের সামনে মহাবিক্রমে হত্যা করে নিজের বীরত্ব জাহির করবেন। রাজার পাইক-পেয়াদারা ঢোল-বাদ্য-ঢাল-সড়কি-তীর এবং বড় বড় মাছ ধরার জাল নিয়ে বনে আক্রমণের জন্য রওনা দিল। তারা যখন বনের মধ্যে ঢুকছিল তখন কয়েকটি গাধা, রামছাগল এবং বনবিড়াল প্রাণভয়ে বন থেকে বের হয়ে এক কৃষকের গোয়ালঘরে আশ্রয় নিল। কৃষক প্রাণীগুলোকে তার গোয়ালে দেখে ভারি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন তোমরা বনভূমি থেকে পালিয়ে লোকালয়ে এসেছ? প্রাণীগুলো বলল, রাজার লোকেরা বাঘ মারার জন্য বনে ঢুকেছে। তারা বাঘ তো দূরের কথা, বাঘের পশমও ছুঁতে পারবে না। উল্টো বাঘ যাতে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারে এ জন্য বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে বনে ঢুকেছে। তারা আমাদের মতো প্রাণীদের মারবে এবং রাজার কাছে বনবিড়াল বা বাগডাশ ধরে নিয়ে বলবে, এটাই বাঘ! আমরা রাজার লোকদের মতিগতি ও স্বভাব-চরিত্র খুব ভালো করে জানি বলেই কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বনভূমি থেকে পালিয়ে আপনার গোয়ালে আশ্রয় নিয়েছি।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক

ফুটবলের গল্প অনেক বেশি নাটকীয় ও অদ্ভুত

ইকরামউজ্জমান

ফুটবলের গল্প অনেক বেশি নাটকীয় ও অদ্ভুত

দুনিয়াজুড়ে বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসবকে বরণ করে নেওয়ার সব প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। হাতে গোনা আর মাত্র কয়েকটি দিনের অপেক্ষা। দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও বয়স নির্বিশেষে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর খেলার আগমনী সুর এখন হৃদতন্ত্রে বাজছে, যা বিশ্ব মানবসমাজকে চঞ্চল করে তুলেছে। ফুটবল তো শুধু মাঠের একটি খেলা নয়, এটি ব্যক্তি, পরিবার ও বৃহত্তর সমাজের জীবনের খেলা। এটি একমাত্র খেলা, যার মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে গা ভাসাতে কারো আপত্তি বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। এই খেলার সৌন্দর্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মানবিক গুণাবলি মানবসমাজকে চুম্বকের মতো টানে। সত্যি ফুটবল খেলার জগতে রাজা। এই রাজাকে রাজস্ব দেওয়ার জন্য সারা বিশ্ব অস্থির হয়ে ওঠে। কাপ্তাই লেকের ট্রলারের মাঝি হাজি রহমতকে বলতে শুনলাম—‘সব খেলা যাক, শুধু ফুটবল থাক। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা উভয় দলের পতাকা লাগিয়েছেন রহমত। তাঁর কথা হলোআমাদের সব আনন্দ তো এই দুই দলকে ঘিরে। আর তাই কারো মনে দুঃখ দিতে চাই না। সবাই মিলে আনন্দ তো অন্য রকম। কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হয়েছে ফুটবলজগৎ এখনো অনেক গ্রাস থেকে মুক্ত। ফুটবল এখনো সহজ-সরল খেলা হিসেবে পরিচিত থেকে গেছে।

ফুটবল একক বিশ্বে বিশ্বাসী। বিশ্বাসী গণতন্ত্র এবং সমতায়। এই চত্বরে জোরাজুরির সুযোগ নেই। সবার সমান অধিকার। সবার সহাবস্থান একই লক্ষ্যেএক কাতারে। আসন্ন বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে আবার সুস্থ জীবনবোধ, আর এই খেলার কল্যাণময়ী আবেদনের জয় দেখল পুরো বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি, বিরোধিতা, আর অসুস্থ মানসিকতার বিপক্ষে জয় দেখল পুরো বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ। ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক চেষ্টা করেও এশিয়ার অন্যতম প্রতিনিধি ইরানকে তাঁর দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে পারেননি। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়, আর সুস্থ ফুটবল বিবেকের জয়। ইরান তো অধিকার নিশ্চিত করেই খেলবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের একনায়কসুলভ আচরণ ও অগণতান্ত্রিক চর্চার এটি পরাজয়। ইরান সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই প্রথম রাউন্ডের খেলায় অংশ নেবে। ইরান বেইস ক্যাম্প করেছে মেক্সিকোতে। প্রতিটি খেলা শেষে তারা ফিরে যাবে মেক্সিকোতে।

ফুটবলের গল্প অনেক বেশি নাটকীয় ও অদ্ভুতইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথম রাউন্ডের কঠিন বেড়া অতিক্রম করতে পারে, তাহলে সম্ভবত উভয় দেশ পরস্পরের মুখোমুখি হবে দ্বিতীয় রাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। বিষয়টি অনেক দূরেরএর পরও প্রচুর জল্পনাকল্পনা চলছে। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রবল উৎসাহ নিয়ে অনেকেই টিকিট কেটেছেন। যদি উভয় দেশ মাঠে মুখোমুখি হয়সেই আবেগ কেমন হবে বলতে পারছি না। তবে ফুটবল যে যুদ্ধ, হিংসা, বিদ্বেষকে দূরে ঠেলে রেখে মানুষকে একই চত্বরে একত্র করতে পারে, এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণের সাক্ষী বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানবসমাজ হতে পারবে। ফুটবলজীবনের প্রতি বাঁকেই থাকে নানা চমক আর আশ্চর্য করে দেওয়ার মতো গল্প, যা অনেক বেশি নাটকীয় ও অদ্ভুত। ফুটবল সব সময় বৃহত্তর ঐক্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। ফুটবল একনায়কতন্ত্র আর জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ২১০ দেশের বিশ্ব ফুটবল প্ল্যাটফর্ম ফিফা এখনো নতজানু হয়নি বিশ্বের পরাশক্তিদের লাল চোখ প্রদর্শনের কাছে। এটি এখন পর্যন্ত বড় সান্ত্বনা।

কলকাতা ক্লাবের সন্ধ্যার আড্ডায় ফুটবলের সম্রাট পেলেকে নিয়ে কথা বলছিলেন বন্ধু অলক মুখার্জি। পেলে বিশ্ব ফুটবলের প্রথম আন্তর্জাতিক নায়ক, আইকন আর কিংবদন্তি। বিশ্বজুড়ে যারা কোনো দিন ফুটবলের খবর রাখেনি, তারাও পেলেকে চিনেছে, আর চিনেছে পেলের ব্রাজিলকে। পেলে বিশ্বের সব ফুটবল মহাতারকার কাছে আইডল। ১৯৬৭ সালে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত নাইজেরিয়ায় যখন পেলে সান্তোসের হয়ে খেলতে যান, তাঁর খেলা দেখার জন্য দুই দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছিল। ফুটবল সব সময় ঘটনার জন্ম দিয়েছে এবং দেবে।

১৯৭১ সালে এক ফরাসি সাংবাদিক লিখেছিলেন, পেলে একজন অত্যুচ্চ ব্যক্তিত্ব সম্ভবত তদানীন্তন বিশ্বে পঞ্চম পোপ, নিক্সন, মাও ও দ্য গলের পরেই। খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে পৃথিবীজুড়ে এমন প্রভাব, খ্যাতি ও ভাবমূর্তি পেলের আগে কেউ তৈরি করতে পারেননি। পেলের জাতীয় নায়ক থেকে আন্তর্জাতিক আইকন হয়ে ওঠার মধ্যেই কোথাও যেন লুকিয়ে আছে ফুটবলের বিশ্বায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ ও মিডিয়াকরণের বীজ। পেলেই বিশ্ব ফুটবলের প্রথম সফল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড।

২০০২ সালে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের যৌথ উদ্যোগে এশিয়ায় প্রথম বিশ্বকাপ। যুদ্ধ, বৈরিতা, শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব ও অতীতের দুঃখজনক কালো অধ্যায়ের দিনগুলোকে ভুলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যৌথ উদ্যোগে একটি সফল বিশ্বকাপ উৎসব বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছে। সারা বিশ্ব দেখেছে, ফুটবল কিভাবে এই দুটি দেশকে একই মঞ্চে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সাংগঠনিক টিমের মিডিয়ার একজন সদস্য হিসেবে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তৎকালীন ফিফার সিনিয়র সহসভাপতি এবং দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও অর্গানাইজিং কমিটির দ্বিতীয় ব্যক্তি ড. চুংসুন-জুনের অধীনে আমরা প্রায় ৩০০ ফ্রিল্যান্স ও পেশাদার ফুটবল লেখক ও সাংবাদিক কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা ভীষণ আবেগময় এবং অসাধারণ। ফুটবল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মানুষকে একত্র করেছে অনেক অনেক বছর পর। তাদের মিলন ঘটিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান একসঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে হাসিমুখে হেঁটেছে। সত্যি ফুটবল নামের খেলাটি কী না পারে! বাতাসভর্তি গোলকপিণ্ড পুরো বিশ্বকে তার জাদুর খেলায় সহজেই বশ করে ফেলতে পারে। এই খেলার প্রেমে না পড়ে তো উপায় নেই। সবুজ মাঠে বল নিয়ে ২২ জন ফুটবল নায়কের কাড়াকাড়িবিষয়টি ভীষণ রোমাঞ্চকর। দুই পায়ের সাহায্যে মাঠের নায়করা যে অসাধারণ কবিতা লেখেন, সেগুলো শুধু খেলাকে মহিমান্বিত করে না, মানুষকে খেলার প্রতি আকৃষ্ট করে। খেলার প্রতি ভালোবাসা ও উন্মাদনা বাড়িয়ে দিচ্ছে সব সময়। তারকাদের পায়ের কারুকাজের প্রভাব যে কত বেশি হতে পারে, বিশ্বকাপ উৎসব এলে সেটি টের পাওয়া যায়আমাদের পিছিয়ে থাকা গ্রামবাংলার সমাজেও।

আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী ফুটবল দেশে দেশে প্রাচীর মানে না। হাজার হাজার মাইল দূরে খেলার ভেনু্যু, আর সেই ফুটবলের জ্বরে আমরা ভুগি। এই জ্বর সারানোর কোনো পথ্য নেই। বিশ্বকাপ ফুটবল সাঙ্গ হলেই জ্বর ছেড়ে যাবে।

চমক, অবাক, বিস্ময় ও অভাবনীয় কিছু ঘটাই বিশ্বকাপের বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে শুরুর আগে কেউ বলতে পারবে না তার সব হিসাব মিলবে! একটি আসরের সঙ্গে আরেকটির কোনো মিল নেই। এই চত্বর আলো ও আঁধারের লুকোচুরি খেলতে ভালোবাসে। মানুষের সৃষ্টি ফুটবল নিয়ে কত হৈচৈ। আর এই হৈচৈ যে সবাই পছন্দ করে। প্রখ্যাত কথাশিল্পী আলবের কাম্যুর কথা হলো, মানুষের দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতা সম্পর্কে সবকিছু জেনেছি, তার জন্য ঋণী ফুটবলের কাছে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া