• ই-পেপার

শিক্ষকদের মূল্যায়নে শিক্ষার্থীর ভূমিকা

  • ড. মো. শফিকুল ইসলাম

বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা ও আমাদের প্রস্তুতি

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা ও আমাদের প্রস্তুতি

মধ্য জুন ২০২৬ থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন ঘন সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্প মানুষের মনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা, জাপান, আফগানিস্তান, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, চীনের সিচুয়ান এবং বাংলাদেশের ভূমিকম্পমানুষের মনে ভয় জাগিয়ে তুলেছে। আমাদের দেশে যাঁরা বহুতল ইমারতে বসবাস করছেন, পুরনো ঘিঞ্জি এলাকায় নড়বড়ে দালানকোঠায় কোনো রকমে ঠাঁই নিয়ে পরিবার-পরিজনসহ বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁরা বেশ আতঙ্কিত জীবন যাপন করছেন। গেল মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প আসলে আমাদের কী বার্তা দিয়ে ফেলেছে, তা নিয়ে ভূমিকম্পবিশারদদের মধ্যে ভাবনার অন্ত নেই।

ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ। পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলো ক্রমাগত সঞ্চালিত হচ্ছে। যখন দুটি প্লেটের মধ্যে চাপ দীর্ঘদিন ধরে জমা হয় এবং হঠাৎ তা মুক্তি পায়, তখনই ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়ার উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এসব ভূমিকম্প মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তাও।

সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় একাধিক ভূমিকম্প স্থানীয় জনগণের সঙ্গে গোটা দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ২৪ জুন ২০২৬ দেশটিতে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩ জুলাই পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে এটিকে দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের দুই হাজার ছয় শর বেশি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং ভারী যন্ত্রপাতির সহায়তায় ভেনেজুয়েলার উদ্ধার দলগুলো কংক্রিট ও লোহার স্তূপের নিচে চাপা পড়া জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চার দিন পর আবারও ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় ৪.৬ মাত্রার একটি আফটারশক অনুভূত হওয়ায় উদ্ধারকর্মী ও বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। সেখানে সাড়ে চার হাজার মানুষ আহত এবং ৫২ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।

অন্যদিকে জাপান পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। প্রায় প্রতিবছরই দেশটি ছোট-বড় অসংখ্য ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়। তবু জাপানে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম। কারণ তারা ভূমিকম্পকে অস্বীকার করেনি, বরং বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে প্রস্তুতি নিয়েছে। ভূমিকম্প সহনশীল ভবন, উন্নত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং জনগণের সচেতনতা জাপানকে বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণে পরিণত করেছে।

আফগানিস্তানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক বছরে দেশটিতে সংঘটিত একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প কয়েক হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চল, দুর্বল আবাসনব্যবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমিত উদ্ধার সক্ষমতার কারণে ভূমিকম্প সেখানে মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়। আফগানিস্তানের ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুর্যোগের মাত্রা শুধু ভূমিকম্পের শক্তির ওপর নির্ভর করে না, একটি দেশের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।

বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। যদিও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের বিধ্বংসী ভূমিকম্প ঘটেনি, তবু মাঝেমধ্যে অনুভূত কম্পন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে বাংলাদেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থান করছে। দেশের দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্ব এই ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক প্রভাব বিদ্যমান। সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চলের আশপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তি কোনো এক সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্ম দিতে পারে। ইতিহাসও সে সাক্ষ্য দেয়। ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প এই অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল। ফলে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

ঢাকা মহানগরীকে কেন্দ্র করে যে ভয় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো একটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি। রাজধানীতে বহু ভবন যথাযথ প্রকৌশল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় সরু রাস্তা, অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা এবং অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো তাই বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের আগাম সতর্কসংকেত। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই নগরীতে সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং খোলা জায়গার অভাব বড় ধরনের দুর্যোগে উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। অনেক এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ বা উদ্ধারযান প্রবেশ করাই কঠিন। তাই নগর পরিকল্পনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্ধারণ এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

কোথাও ভূমিকম্প হলে আমরা প্রায়ই ভয়ে নানা কথা বলি, ভূমিকম্প মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে লেখালেখি, সেমিনার, টক শো শুরু করি। এসব তৎপরতা দুই দিন পরেই থেমে যায়। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট, হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালতে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া দেওয়ার কথা ভুলে যাই! তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি আমাদের আশপাশে ঘন ঘন ভূমিকম্পের প্রবণতা অনুধাবন করে আমাদের সদা সতর্ক থাকা উচিত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃতি বারবার সতর্ক করে। যারা সেই সতর্কবার্তা বুঝতে পারে, তারা টিকে থাকে; আর যারা উপেক্ষা করে, তারা বিপর্যয়ের মূল্য চোকায়। তাই এত ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নতুন কৌশল নিতে হবে। কারণ এসব ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প মানবসভ্যতার জন্য একটি বিশেষ জাগরণী বার্তা!

এ জন্য প্রথম বার্তা হলো, নগর পরিকল্পনার বিকল্প নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক শহরের মতো বাংলাদেশের শহরগুলোও এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কাজেই ভবন নির্মাণে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ, পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রণয়ন এবং নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং কী করা উচিত নয়এসব বিষয়ে এখনো দেশের বেশির ভাগ মানুষ পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না। আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে গিয়ে বা জানালা দিয়ে লাফ দেওয়ার কারণে অনেক সময় প্রাণহানি ঘটে। তাই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত এবং আবাসিক এলাকায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

তৃতীয়ত, নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু করা জরুরি। জাপান, নিউজিল্যান্ড, সুমাত্রা কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নিয়মিত মহড়া জনগণকে প্রস্তুত রাখে। বাংলাদেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিং মল এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বছরে কয়েকবার বাধ্যতামূলক মহড়ার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে মানুষ দুর্যোগের সময় কিভাবে দ্রুত ও নিরাপদভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, তা শিখতে পারবে।

চতুর্থত, আমাদের দেশে দুর্যোগ হলে উদ্ধার ও জরুরি সেবা ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করতে হবে। বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা গেলে প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এ জন্য ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আধুনিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং পর্যাপ্ত জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটি পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। ভূমিকম্পের পর প্রথম সহায়তা সাধারণত প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেই আসে। তাই ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কমিউনিটিভিত্তিক প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার চেয়েও দ্রুত কার্যকর হয়।

এ ক্ষেত্রে জাপান একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। দেশটি ভূমিকম্প বন্ধ করতে পারেনি, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সক্ষম হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায় যে দুর্যোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো প্রস্তুতি। অন্যদিকে আফগানিস্তান বা অন্য কিছু দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দুর্বল অবকাঠামো এবং অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত ইতিবাচক উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং দুর্বলতার জায়গাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা।

ভূমিকম্প কখন হবে, তা আমরা জানি না, কিন্তু এটি যেকোনো সময় ঘটতে পারে। এই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে। তাই দুর্যোগের পর উদ্ধার কার্যক্রমের চেয়ে দুর্যোগের আগে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ বেশি জরুরি। নিরাপদ অবকাঠামো, সচেতন নাগরিক, আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা, শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা এবং কার্যকর নগর পরিকল্পনাএই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প সহনশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে। প্রকৃতি কখন সতর্কবার্তাকে বাস্তবে রূপ দেবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। আর সেই প্রস্তুতি গ্রহণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো এখনই।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের বিশ্বকাপ এখনো সরব

ইকরামউজ্জমান

আমাদের বিশ্বকাপ এখনো সরব

বিশ্বকাপ ফুটবল দেখি আর ভাবি, খেলাটি মানুষের সৃষ্টি হলেও পুরোপুরি নিয়তির খেলা। মাঠে এত কৌশলের বাস্তবায়ন, এত দক্ষতার প্রদর্শনী, খেলোয়াড়রা শতভাগ উজাড় করে দেওয়া সত্ত্বেও সবাই এক জায়গায় ধরা। সৃষ্টিকর্তার ব্লেসিং ছাড়া উপায় নেই। সৃষ্টিকর্তা কাউকে তৃপ্তির হাসিতে হাসাচ্ছেন, আবার কাউকে কাঁদাচ্ছেন। সব তাঁর ফয়সালা। ফুটবল নিয়ে আমার-আপনার কত রকম চিন্তা-ভাবনা, হিসাব-নিকাশ, কিন্তু কেউ বলতে পারছে না শেষ পর্যন্ত কী অপেক্ষা করছে। বলা হয়, এটিই ফুটবলের সৌন্দর্য। সব হিসাব মিলে গেলে তো এটি বিশ্বকাপ থাকবে না।

ফুটবল নিয়ে অগণিত মানুষ মেতে আছে, অথচ এই ফুটবলের সঙ্গে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক নেই। তা সত্ত্বেও অন্যদের ফুটবল নিয়ে রীতিমতো উন্মাদনা। আবেগ আর উচ্ছ্বাসে ভেসে বেড়ানো। এখানেই ফুটবল নামের খেলাটির কল্যাণময়ী আকর্ষণের জয়। একবার ভাবুন তো, যখন আমাদের দেশ খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, তখন অবস্থাটা কেমন হতে পারে?

আমাদের বিশ্বকাপ এখনো সরবফুটবল গড়াচ্ছে তার ইচ্ছা-মর্জি মাফিক। খেলা দেখতে বসে কখনো কখনো এই ফুটবলকে অপরিচিত মনে হয়। এতে বাড়ে অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠা। সমর্থিত দল লড়াই থেকে বিদায় নেওয়ায় কেউ কেউ দল বদল করেছে। না, এই দলবদলের সঙ্গে রাজনীতির নেতা ও কর্মীদের দলবদলের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি নেহাত ফুটবল বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার জন্য। ফুটবলের আনন্দ সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। পরিচিত মহলে আমার বন্ধু জার্মানির বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলা আর দেখছেন না। এটি তাঁর আবেগ।

ফুটবলের সঙ্গে আছে জীবনের ভীষণ মিল। খেলাটি জীবনের ক্রীড়া সংস্করণ। জীবন কিভাবে পরিচালিত হবে, এটি তো আগাম বলা যাবে নাফুটবলেও ঠিক একই অবস্থা। আর তাই জীবনের নিয়মে ফুটবলকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। জীবনে যেমন ভালো খেলোয়াড় জিতবেনএর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফুটবলেও একই অবস্থা। ভালো খেলেও শেষ পর্যন্ত অশ্রুঝরা চোখ নিয়ে দেশে ফিরে যেতে হয়েছে। ফুটবলের নিষ্ঠুরতা বড় কঠিন।

ফিফার সাবেক প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার বলেছেন, জীবনের জন্য ফুটবল, জীবন উপভোগ করুন, সেই সঙ্গে ফুটবল। যদি ভেবে থাকেন, ফুটবলকে আপনার নিজের মতো করে দেখতে পারবেন, তাহলে ভুল হবে। ফুটবল চলে তার নিজস্বতা নিয়ে। এ ক্ষেত্রে কখনো প্রাপ্তি, আবার কখনো অপ্রাপ্তির স্বাদ মিলবে। দিনশেষে কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর খেলা ফুটবল। খেলাটি মানুষকে একত্র করে একের সঙ্গে অপরকে মেলায়। ফুটবলকে ভালোবাসাটাই আসল বিষয়।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফেভারিট নিয়ে সরাসরি ফুটবল পণ্ডিতরা কথা বলেননি। বিশ্বকাপে বিগত বছরগুলোতে যে আটটি দল শিরোপা জিতেছে, এই দলগুলোর বাইরে শিরোপা এবার যাবে না বলেছেন। বলছেন, নতুন কোনো দেশকে ফিফা ট্রফি উঁচিয়ে তুলে ধরার মতো অবস্থা তাঁরা দেখছেন না। ইউরোপ শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর থেকে এগিয়ে আছে। ২০২২ সালে কাতারে শিরোপা জিতেছে লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা। আর রানার্স আপ ইউরোপের ফ্রান্স। পণ্ডিতরা এবার প্রথম থেকেই তাঁদের দুর্বলতার পাল্লাটি ঝুঁকে রেখেছেন ফ্রান্স ও স্পেনের দিকে। তাঁরা লাতিন দেশের মধ্যে গতবার চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ব্রাজিলের চেয়ে একটু বেশি এগিয়ে রেখেছেন। এই সবকিছুই তথ্য এবং বিভিন্ন ধরনের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বলা। মাঠে তো খেলেন খেলোয়াড়রা। তাঁদের খেলান কোচরা। আর খেলার রং তো তাঁরাই পাল্টান। চলমান বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। অতীতে শিরোপা বিজয়ী আট দলের মধ্যে তো ইউরোপ অঞ্চল থেকে কোয়ালিফাই করতে পারেনি ইতালি। সাত দল নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল। উরুগুয়ে আর জার্মানি এরই মধ্যে বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ এবং গল্পের বাইরে চলে গেছে। এখনো লড়াইয়ে আছে ইউরোপের তিন দেশ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেন আর লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। ফুটবল যেভাবে গড়াচ্ছে, তাতে গতবারের মতো এবারও যদি ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার মধ্যে ফাইনাল ম্যাচ হয়, তাহলে অবাক হব না।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল নিয়ে মাতামাতি, উচ্ছ্বাস আর আবেগ প্রদর্শন। যেহেতু এই দুটি দল এখনো টিকে আছেঅতএব বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উপভোগের বিষয়টি এখনো সজীব এবং প্রাণবন্ত আছে। এই দুই দলের মধ্যে যখনই খেলার নিয়মে কেউ বিদায় নেবে, তখনই বাংলাদেশে ফুটবল উপভোগের জমকালো বিষয়গুলো অনেকাংশে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়বে। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে ১৬ দলের খেলা। ব্রাজিল খেলবে নরওয়ের সঙ্গে, আর আর্জেন্টিনা মিসরের বিপক্ষে। লাতিন আমেরিকার এই দুই প্রতিপক্ষ শক্তিশালী। তা ছাড়া বিশ্বকাপে তো সব দলই লড়াইয়ে সমানে সমান। জাপানকে হারাতে ব্রাজিলের অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। ট্যাকটিশিয়ানের কৌশলের কাছে জাপান হেরেছে। এদিকে আর্জেন্টিনা জিতেছে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ গোলে। তবে কেপ ভার্দের প্রতিরোধ, দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাস কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়েছে মেসির আর্জেন্টিনার। এবারের বিশ্বকাপে রিয়াল হিরো হলো কেপ ভার্দে। তারা বিগত দিনের দুটি বিশ্বকাপের বিজয়ী দলের সঙ্গে (উরুগুয়ে ও স্পেন) ড্র করেছে। ড্র করেছে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রথম রাউন্ডে। এরপর রাউন্ড অব ৩২-এ এসে আর্জেন্টিনাকে প্রায় ধরেই ফেলেছিল। বিশ্বকাপে তাদের প্রথম অভিযান সব সময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইতালিয়ান কোচ কি ষষ্ঠবারের মতো ব্রাজিলকে শিরোপা উপহার দিতে সক্ষম হবেন? যদি এটি হয়, তবে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ইতিহাসে একজন বিদেশি কোচ দলের জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবেন।

এবার একটি নতুন অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি নামকরা স্কুলে আয়োজিত ফুটবল উৎসবে যোগ দিয়ে লক্ষ করেছি, স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ের অনেকেই পর্তুগালের সমর্থক। তারা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে ভালোবাসে বলেই পর্তুগালের সমর্থক। সবাই জার্সি কিনেছে। বাড়িতে পতাকা ঝুলিয়েছে। রোনালদোর পর্তুগাল ষোলোতে খেলবে স্পেনের বিপক্ষে। পর্তুগাল ক্রোয়েশিয়াকে পরাজিত করে ষোলোতে এসেছে। এদিকে ফ্রান্সকে নিয়ে পণ্ডিতরা সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন প্রথম থেকেই। তাঁদের চিন্তায় ফ্রান্স সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল। দলে প্রতিভার ছড়াছড়ি। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বর। এমবাপ্পে নামটি দুনিয়াজুড়ে ফুটবল অনুরাগীদের মুখে মুখে। ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে শিরোপা জিতেছে ফ্রান্স। ২০২২ রানার্স আপ। ফ্রান্স চাইছে ২০২৬ ট্রফি জিততে। কোচ দিদিয়ের দেশম দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ফ্রান্সকে নিয়ে কাজ করছেন। এবারের বিশ্বকাপ শেষে বিদায় নেবেন। দেশম খেলোয়াড় হিসেবে, আবার কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন। ব্রাজিলের মারিও জাগালো ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপের খেলোয়াড় এবং ১৯৭০ সালে কোচ হিসেবে ট্রফি জিতেছেন। জার্মানির ফ্রাংক বেকেনবাওয়ার বিশ্বকাপ জিতেছেন খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৭৪ সালে, আর কোচ হিসেবে ১৯৯০ সালে। দিদিয়ের দেশম খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৯৮ সালে, আর কোচ হিসেবে ২০১৮ সালে। এবার যদি ফ্রান্স বিশ্বকাপে জয়ী হয়, তাহলে দেশম একটি রেকর্ডের জন্ম দেবেন। সেটি হলো কোচ হিসেবে দুইবার (২০১৮ ও ২০২৬) শিরোপা জয়।

৪৮ দল নিয়ে শুরু। প্রথমে বিদায় নিয়েছে ১৬ দল। এরপর ৩২ দলের নিষ্ঠুর লড়াইও শেষ হয়ে গেছে। এখন চলছে রাউন্ড অব ১৬। বিশ্বকাপ যত এগোবে, লড়াইয়ের মাঠে টান টান উত্তেজনা ততই বাড়বে। কোনো রকম ভুল করা যাবে না। কেননা ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ নেই। চলমান বিশ্বকাপ নিয়ে এর আগেই আমার কলামে বলেছি, মাঠের লড়াইয়ে ছোট-বড় দলের মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই কমে আসছে। ট্যাকটিশিয়ানরা তাঁদের প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে খেলার রং পাল্টে দিতে সক্ষম হয়েছেন। সঠিক সময় সঠিক খেলোয়াড়কে ব্যবহার করে তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশিত কাজটি আদায় করে নিয়েছেনবিষয়গুলো সত্যি অসাধারণ। শুধু ভালো খেললেই  জয়ের দেখা মিলবে না, এর কোনো গ্যারান্টি নেই। বেলজিয়াম ও সেনেগালের ম্যাচে সেনেগাল দারুণ খেলেও লক্ষ্যে পৌঁছতে পারল না। খেলতে হবে, কিন্তু ভাগ্যের সাহায্যের দরকার আছে। ইংল্যান্ড ডিআর কঙ্গোকে হারাতে অনেক বেশি বেগ পেয়েছে।

ফুটবলের বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। যাঁরা বলেছেন ৪৮ দল হয়ে গেছে, অতএব বিশ্বকাপ ঝুলে পড়বে। তাঁদের ধারণা সঠিক হয়নি। গোল হয়েছে প্রচুর, যেটি বিশ্বকাপকে আরো আকর্ষণীয় করেছে। গোলকিপাররা এবার প্রথম থেকেই আলোচিত হয়েছেন প্রতিদিন, যেটি বিগত বিশ্বকাপগুলোতে এভাবে চোখে পড়েনি। গোলকিপারের একার নৈপুণ্যে দল ড্র করেছে। দল জিতেছে। দল পরবর্তী রাউন্ডে পৌঁছে গেছে। এবার আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতেই হবে, সেটি হলো তিন স্বাগতিক দেশই রাউন্ড অব ষোলোতে স্থান করে নিয়েছে। বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিদায় সবাইকে অবাক করেছে। এই দলটি অতীতে তিনবার রানার্স আপ হয়েছে। ভারসাম্যপূর্ণ দল নিয়েও তারা বিদায় নিয়েছে। 

কিছুদিন আগে ভারতের একসময়ের কৃতী ফুটবলার সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্তের অনেক বছর আগের একটি লেখা পড়েছি। সুরঞ্জিৎ লিখেছেন, ফুটবল একমাত্র খেলা, যেখানে বলটিকে খেলতে হচ্ছে মূলত পা দিয়ে। যেকোনো কাজ যেহেতু আমরা হাত দিয়ে করি, তাই আমাদের নিয়ন্ত্রণ হাতেই বেশি। এক পা দিয়ে বলকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেখে আমরা খুব অবাক হই। সে কারণেই এই খেলা আমাদের আরো বেশি মুগ্ধ করে। শুধু তা-ই নয়, ফুটবল মাঠকে আমরা যদি একটি বড় ক্যানভাস ভাবি, তাহলে খেলা চলাকালীন সেখানে ৯০ মিনিট ধরে যে ছবি আঁকা হতে থাকে, তাতে সরলরেখা, আবার কার্ভসও আছে। ৯০ মিনিট ধরে চলতে থাকা ছবিগুলোকে যদি আমরা প্রতি সেকেন্ডে স্থির করে ছবি তুলে রাখি, তাহলে একাধিক মাস্টারপিসও বেরিয়ে আসতে পারে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে ফুটবল খেলাটিই ছবির মতো সুন্দর। সেটিকে আরো সুন্দর করে তোলেন ফুটবলশিল্পীরা, অর্থাৎ প্রতিভাবান ফুটবলাররা।

ফুটবলকে জনপ্রিয় করার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান হলো ফুটবলের জাত শিল্পীদের। চলমান বিশ্বকাপের ৩২-এর খেলা শেষ হয়েছে। শুরু হয়ে গেছে ষোলোর লড়াই। লক্ষ করছি, কিছু ফুটবলশিল্পীকে নিয়ে মানুষের কী উচ্ছ্বাস। মানুষ তাঁদের নিয়ে কথা বলতে আনন্দ পাচ্ছে। তাঁরা পেরেছেন দল সমর্থনের ঊর্ধ্বে উঠতে। তাঁরা হলেন লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা), কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স), আর্লিং হালান্ড (নরওয়ে), হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড), উসমান দেম্বেলে (ফ্রান্স) ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল)। কী মনে হয়, শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বল কে পেতে যাচ্ছেন?

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

মূল্যস্ফীতির হার কমলেও মানুষের কষ্ট কমে না

ড. হারুন রশীদ

মূল্যস্ফীতির হার কমলেও মানুষের কষ্ট কমে না

অর্থনীতির ভাষা ও মানুষের ভাষা সব সময় এক নয়। অর্থনীতিবিদরা যখন বলেন মূল্যস্ফীতি কমেছে, তখন সাধারণ মানুষ বাজারের ব্যাগ হাতে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা বলছে অন্য কথা। কাঁচাবাজারে ঢুকলে, ওষুধ কিনতে গেলে কিংবা সন্তানের স্কুলের বেতন পরিশোধ করতে গেলে কোথাও যেন সেই প্রত্যাশিত স্বস্তির দেখা মেলে না। ফলে একটি প্রশ্ন ক্রমেই উচ্চকিত হয়, যদি মূল্যস্ফীতি কমেই থাকে, তাহলে মানুষের কষ্ট কমছে না কেন?

মূল্যস্ফীতি কমেছেএই বাক্যটি প্রায়ই ভুলভাবে গ্রহণ করা হয়। অনেকেই মনে করে, মূল্যস্ফীতি কমা মানে দ্রব্যমূল্য কমে যাওয়া। বাস্তবে তা নয়। মূল্যস্ফীতি হলো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার। অর্থাৎ গত বছর যদি কোনো পণ্যের মূল্য ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায় এবং এ বছর যদি তা ৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা হবে। কিন্তু পণ্যের দাম তো কমেনি, বরং আরো বেড়েছে, যদিও আগের তুলনায় ধীরগতিতে। এই জায়গায়ই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি মৌলিক ব্যবধান তৈরি হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ব্যবধান আরো প্রকট। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সেই চাপের বড় অংশ রয়ে গেছে। কারণ মানুষ বর্তমান দামের সঙ্গে নয়, বরং অতীতের তুলনায় বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়কে বিচার করে।

অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো প্রকৃত আয় বা রিয়াল ইনকাম। কোনো ব্যক্তির বেতন বা আয় বৃদ্ধি পেলেই তাঁর জীবনমান উন্নত হয় না, বরং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় বাড়লে তবেই প্রকৃত উন্নতি ঘটে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বহু চাকরিজীবীর বেতন কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় যে গতিতে বেড়েছে, তার সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আয়ের বৃদ্ধি তাল মেলাতে পারেনি।

বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আছে, ধনী শ্রেণির জন্য মূল্যস্ফীতি খুব বড় সমস্যা নয়, কিন্তু মাঝখানে থাকা বৃহৎ জনগোষ্ঠীটি অনেক সময় নীতিনির্ধারণের আলোচনায় উপেক্ষিত থেকে যায়। তাদের আয় সীমিত, কিন্তু সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত। ফলে মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করে এই শ্রেণি।

আরেকটি বিষয় হলো মানুষের অনুভূত মূল্যস্ফীতি বা পারসিভড ইনফ্লেশন। অর্থনীতির পরিসংখ্যান একটি গড় চিত্র তুলে ধরে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা গড়ে ওঠে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মূল্য দেখে। একজন সাধারণ ভোক্তা প্রতিদিন চাল, ডাল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি কিংবা রান্নার তেলের দাম দেখেন। তিনি টেলিভিশন, ফ্রিজ বা আসবাবের দাম প্রতিদিন দেখেন না। ফলে যেসব পণ্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, সেগুলোর দাম বেশি থাকলে মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক হার কমলেও মানুষ তা অনুভব করতে পারে না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খাদ্য মূল্যস্ফীতির গুরুত্ব এখানেই। উন্নত দেশগুলোতে পরিবারের মোট ব্যয়ের একটি তুলনামূলক ছোট অংশ খাদ্য খাতে ব্যয় হয়। কিন্তু বাংলাদেশে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যপণ্যের পেছনে যায়। তাই খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রায় সরাসরি আঘাত হানে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন। গত কয়েক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। জ্বালানি, ভোজ্যতেল, গম, ডাল, শিল্পের কাঁচামালসহ বহু প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে, আর সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই এসে পড়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক অস্থিরতাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। কভিড-পরবর্তী সরবরাহ সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও এসব সংকটের কিছুটা প্রশমন হয়েছে, কিন্তু সৃষ্ট মূল্যস্তর এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি।

অন্যদিকে আয়বৈষম্যের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামষ্টিক অর্থনীতির অনেক সূচক ইতিবাচক হতে পারে, কিন্তু সেই সুফল যদি সমাজের সব স্তরে সমানভাবে না পৌঁছে, তাহলে মানুষের কষ্ট কমবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়েই দেখা গেছে, সম্পদ ও আয়ের একটি বড় অংশ ক্রমেই সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশও এই প্রবণতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।

যখন অর্থনীতির একটি অংশ দ্রুত সমৃদ্ধ হয় কিন্তু বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আয় স্থবির থাকে, তখন মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরো তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ বাজারের চাহিদা ও মূল্য নির্ধারণে উচ্চ আয়ের মানুষের ব্যয়ক্ষমতা প্রভাব ফেললেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কষ্ট সেখানে প্রতিফলিত হয় না।

মানুষের কষ্ট না কমার আরেকটি কারণ হলো জীবনযাত্রার ব্যয়ের বহুমাত্রিক বৃদ্ধি। বাড়িভাড়া একবার বাড়লে সহজে কমে না। স্কুল-কলেজের বেতন একবার বাড়লে তা সাধারণত স্থায়ী হয়ে যায়। চিকিৎসা ব্যয়ও একইভাবে ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। অর্থাৎ খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও জীবনের অন্যান্য খাতের ব্যয় মানুষকে চাপে রাখে।

এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের আচরণ ও মানসিকতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরিবারগুলো সঞ্চয় কমিয়ে দেয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, প্রয়োজনীয় ব্যয়ও অনেক সময় স্থগিত রাখে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে পরিসংখ্যানগত উন্নতি ঘটলেও সেই আস্থার সংকট দ্রুত দূর হয় না।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংখ্যার অর্থনীতি ও মানুষের অর্থনীতির মধ্যে ব্যবধান কমানো। শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো নয়, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোই হতে হবে নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কৃষি ও শিল্প খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছবে না।

একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, মজুদদারি, কৃত্রিম সংকট এবং অস্বচ্ছ বাণিজ্যিক আচরণ অনেক সময় মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি ক্ষতি করে। ভোক্তারা তখন মনে করেন, অর্থনীতির নিয়ম নয়, বরং বাজারের ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলোই দাম নির্ধারণ করছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকেও আরো কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সহায়তা জোরদার করা জরুরি। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য কোনো সূচকের সাফল্য নয়, মানুষের জীবনের সাফল্য।

রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত মানুষের জীবনে স্বস্তি কতটা ফিরেছে, অনিশ্চয়তা কতটা কমেছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস কতটা বেড়েছে। কারণ অর্থনীতির শেষ গন্তব্য কোনো পরিসংখ্যান নয়, মানুষ। মূল্যস্ফীতি কমার প্রকৃত অর্থও তখনই তৈরি হবে, যখন বাজার থেকে ফিরে একজন মানুষ অনুভব করবেসংবাদপত্রের শিরোনামে নয়, তার নিজের জীবনেই সত্যি কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

অরণ্য, বন ও ফরেস্ট : শব্দের ইতিহাস, বিবর্তন ও বিতর্ক

ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান

অরণ্য, বন ও ফরেস্ট : শব্দের ইতিহাস, বিবর্তন ও বিতর্ক

মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো শুধু ভাষার অংশ নয়, বরং মানুষের চিন্তা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কের বিবর্তনের সাক্ষী। বন বা ফরেস্ট তেমনই একটি শব্দ। আজকের পৃথিবীতে বন বলতে আমরা সাধারণত গাছপালায় আচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে বুঝি। কিন্তু এই শব্দটি কি আদি কাল থেকেই সেই অর্থ বহন করত? ফরেস্ট শব্দটি কি মূলত প্রাকৃতিক অরণ্য বোঝানোর জন্য তৈরি হয়েছিল, নাকি এটি মানুষের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ ব্যবহারের ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছিল?

কৃষিভিত্তিক সভ্যতার শুরুর দিকে পৃথিবীর বেশির ভাগ ভূখণ্ডই ছিল অনাবাদি, অনিয়ন্ত্রিত এবং মানবপ্রশাসনের বাইরে। এগুলোকে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন নামে ডাকা হতোজঙ্গল, অরণ্য ইত্যাদি। এসব ভূমির মূল্য তখনো মানুষের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। কৃষি সম্প্রসারণের যুগে অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোকে অনুৎপাদনশীল বা সভ্যতার বাইরে অবস্থিত এলাকা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করল যে এই ভূখণ্ড শুধু বন্য প্রকৃতির আশ্রয়স্থল নয়, এগুলো কাঠ, জ্বালানি, শিকার, ঔষধি উদ্ভিদ, পানির উৎস এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভাণ্ডার। আর তখনই বন্য ভূমি ধীরে ধীরে ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালিত বন সম্পদ-এ রূপান্তরিত হতে শুরু করে।

ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ইংরেজি ফরেস্ট শব্দটি এসেছে পুরনো ফরাসি ভড়ত্ল্গং থেকে, যার উৎস মধ্যযুগীয় লাতিন forestis silva। সে সময় শব্দটি দিয়ে এমন এক ধরনের ভূমিকে বোঝানো হতো, যা বসতির বাইরের হলেও রাষ্ট্রীয় বা রাজকীয় আইনের অধীনে সংরক্ষিত। অর্থাৎ ফরেস্ট শব্দটি প্রথম থেকেই কোনো নির্দিষ্ট উদ্ভিদতাত্ত্বিক বা পরিবেশগত শ্রেণিকে নির্দেশ করত না, বরং এটি ছিল প্রশাসনিক ধারণা, ভূমি ব্যবস্থাপনার ধারণা। বনের ধারণা কেন বদলে গেল? আঠারো ও উনিশ শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে কাঠের চাহিদা বাড়তে থাকে। জাহাজ নির্মাণ, খনি, রেলপথ, ঘরবাড়ি, কাগজশিল্পসব ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ কাঠ প্রয়োজন হয়। এই সময় বন আর শুধু শিকারক্ষেত্র রইল না, এটি হয়ে উঠল রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সম্পদ। এর ফলে বনবিজ্ঞানের জন্ম হয়। বনকে প্রথমবারের মতো একটি উৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবে দেখা শুরু হয়। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেবনকে সংজ্ঞায়িত করা শুরু হয় তার উৎপত্তি দিয়ে নয়, বরং তার কার্যকারিতা দিয়ে।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী বনের সংজ্ঞা ব্যবহার করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও। সর্বশেষ বনকে সংজ্ঞায়িত করা হয় প্রধানত বৃক্ষ আচ্ছাদন, বৃক্ষের উচ্চতা, ভূমি ব্যবহার এবং বনভিত্তিক কার্যকারিতার ভিত্তিতে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এফএও স্পষ্টভাবে বনকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছে১. যেখানে গাছপালা মূলত প্রাকৃতিকভাবে জন্মেছে। ২. যেখানে বেশির ভাগ গাছ মানুষের রোপণ বা পরিকল্পিত বপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বনবিজ্ঞানে মানুষের লাগানো বন কোনো বিরোধপূর্ণ ধারণা নয়, বরং এটি বহু দশক ধরে স্বীকৃত।

নতুন গবেষণা কী বলছে? সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আরো সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৫ সালের গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে যে অনেক ক্ষেত্রে পুনর্জন্মশীল বন জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক প্রজাতি নির্বাচন করে পুনর্বনায়ন করলে উষ্ণমণ্ডলীয় বন দ্রুত পুনরুদ্ধার হতে পারে এবং এর কার্বন ধারণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আধুনিক বনবিজ্ঞান প্রাকৃতিক বন বনাম কৃত্রিম বন ধরনের দ্বৈত বিভাজন থেকে অনেকটাই সরে এসেছে।

২০২৫ সালে এফএও জোর দিচ্ছে বনকে একটি বৃহত্তর সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার ওপর। সেখানে বনকে শুধু গাছের সমষ্টি নয়, বরং জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু, ভূমি ব্যবহার ও মানবজীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ এতে বন শব্দটি আরো বেশি কার্যকর ও ব্যবস্থাপনাভিত্তিক ধারণায় পরিণত হয়েছে।

বনায়ন শব্দটি কি বৈজ্ঞানিকভাবে বৈধ? আন্তর্জাতিক পরিভাষা অনুযায়ী উত্তর হলো, হ্যাঁ। যদি বন শব্দটি শুধু প্রাকৃতিক অরণ্যের জন্য সংরক্ষিত হতো, তাহলে ‘afforestation’ শব্দটির অস্তিত্বই থাকত না। কারণ afforestation-এর আক্ষরিক অর্থই হলো যেখানে আগে বন ছিল না, সেখানে বন সৃষ্টি করা।

বিতর্কের প্রকৃত সমাধান কোথায়? বাস্তবিক অর্থে কোন ভূমিসত্তা বন কি না প্রশ্নটি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি কি প্রাকৃতিক বন? এটি কি পুনরুদ্ধারকৃত বন? এটি কি সামাজিক বন? বন একটি প্রাকৃতিক সত্তা, আবার মানবিক নির্মাণও। শব্দের ইতিহাস আমাদের একটি চমকপ্রদ সত্য শেখায়। ফরেস্ট শব্দটির জন্ম হয়েছিল মানুষের ভূমি ব্যবস্থাপনার ভাষা হিসেবে। পরে বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং পরিবেশচিন্তার বিকাশের সঙ্গে এর অর্থ বিস্তৃত হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে বন বলতে আমরা যেমন প্রাচীন অরণ্য বুঝি, তেমনি বুঝি পুনর্জন্মশীল বন, পুনর্বনায়নকৃত ভূখণ্ড, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা বৃক্ষ-বাস্তুতন্ত্রও। তাই বৈজ্ঞানিকভাবে অধিকতর সঠিক বক্তব্য হলো, সব বন সমান নয়, কিন্তু সব বনই যে প্রাকৃতিক হতে হবে এমন কোনো আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নেই।

লেখক : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষকদের মূল্যায়নে শিক্ষার্থীর ভূমিকা | কালের কণ্ঠ