মধ্য জুন ২০২৬ থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন ঘন সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্প মানুষের মনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা, জাপান, আফগানিস্তান, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, চীনের সিচুয়ান এবং বাংলাদেশের ভূমিকম্প—মানুষের মনে ভয় জাগিয়ে তুলেছে। আমাদের দেশে যাঁরা বহুতল ইমারতে বসবাস করছেন, পুরনো ঘিঞ্জি এলাকায় নড়বড়ে দালানকোঠায় কোনো রকমে ঠাঁই নিয়ে পরিবার-পরিজনসহ বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁরা বেশ আতঙ্কিত জীবন যাপন করছেন। গেল মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প আসলে আমাদের কী বার্তা দিয়ে ফেলেছে, তা নিয়ে ভূমিকম্পবিশারদদের মধ্যে ভাবনার অন্ত নেই।
ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ। পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলো ক্রমাগত সঞ্চালিত হচ্ছে। যখন দুটি প্লেটের মধ্যে চাপ দীর্ঘদিন ধরে জমা হয় এবং হঠাৎ তা মুক্তি পায়, তখনই ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়ার উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এসব ভূমিকম্প মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তাও।
সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় একাধিক ভূমিকম্প স্থানীয় জনগণের সঙ্গে গোটা দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ২৪ জুন ২০২৬ দেশটিতে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩ জুলাই পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে এটিকে দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের দুই হাজার ছয় শর বেশি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং ভারী যন্ত্রপাতির সহায়তায় ভেনেজুয়েলার উদ্ধার দলগুলো কংক্রিট ও লোহার স্তূপের নিচে চাপা পড়া জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চার দিন পর আবারও ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় ৪.৬ মাত্রার একটি আফটারশক অনুভূত হওয়ায় উদ্ধারকর্মী ও বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। সেখানে সাড়ে চার হাজার মানুষ আহত এবং ৫২ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
অন্যদিকে জাপান পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। প্রায় প্রতিবছরই দেশটি ছোট-বড় অসংখ্য ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়। তবু জাপানে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম। কারণ তারা ভূমিকম্পকে অস্বীকার করেনি, বরং বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে প্রস্তুতি নিয়েছে। ভূমিকম্প সহনশীল ভবন, উন্নত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং জনগণের সচেতনতা জাপানকে বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণে পরিণত করেছে।
আফগানিস্তানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক বছরে দেশটিতে সংঘটিত একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প কয়েক হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চল, দুর্বল আবাসনব্যবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমিত উদ্ধার সক্ষমতার কারণে ভূমিকম্প সেখানে মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়। আফগানিস্তানের ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুর্যোগের মাত্রা শুধু ভূমিকম্পের শক্তির ওপর নির্ভর করে না, একটি দেশের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।
বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। যদিও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের বিধ্বংসী ভূমিকম্প ঘটেনি, তবু মাঝেমধ্যে অনুভূত কম্পন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে বাংলাদেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থান করছে। দেশের দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্ব এই ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক প্রভাব বিদ্যমান। সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চলের আশপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তি কোনো এক সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্ম দিতে পারে। ইতিহাসও সে সাক্ষ্য দেয়। ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প এই অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল। ফলে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
ঢাকা মহানগরীকে কেন্দ্র করে যে ভয় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো একটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি। রাজধানীতে বহু ভবন যথাযথ প্রকৌশল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় সরু রাস্তা, অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা এবং অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো তাই বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের আগাম সতর্কসংকেত। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই নগরীতে সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং খোলা জায়গার অভাব বড় ধরনের দুর্যোগে উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। অনেক এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ বা উদ্ধারযান প্রবেশ করাই কঠিন। তাই নগর পরিকল্পনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্ধারণ এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কোথাও ভূমিকম্প হলে আমরা প্রায়ই ভয়ে নানা কথা বলি, ভূমিকম্প মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে লেখালেখি, সেমিনার, টক শো শুরু করি। এসব তৎপরতা দুই দিন পরেই থেমে যায়। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট, হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালতে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া দেওয়ার কথা ভুলে যাই! তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি আমাদের আশপাশে ঘন ঘন ভূমিকম্পের প্রবণতা অনুধাবন করে আমাদের সদা সতর্ক থাকা উচিত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃতি বারবার সতর্ক করে। যারা সেই সতর্কবার্তা বুঝতে পারে, তারা টিকে থাকে; আর যারা উপেক্ষা করে, তারা বিপর্যয়ের মূল্য চোকায়। তাই এত ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নতুন কৌশল নিতে হবে। কারণ এসব ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প মানবসভ্যতার জন্য একটি বিশেষ জাগরণী বার্তা!
এ জন্য প্রথম বার্তা হলো, নগর পরিকল্পনার বিকল্প নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক শহরের মতো বাংলাদেশের শহরগুলোও এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কাজেই ভবন নির্মাণে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ, পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রণয়ন এবং নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং কী করা উচিত নয়—এসব বিষয়ে এখনো দেশের বেশির ভাগ মানুষ পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না। আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে গিয়ে বা জানালা দিয়ে লাফ দেওয়ার কারণে অনেক সময় প্রাণহানি ঘটে। তাই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত এবং আবাসিক এলাকায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
তৃতীয়ত, নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু করা জরুরি। জাপান, নিউজিল্যান্ড, সুমাত্রা কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নিয়মিত মহড়া জনগণকে প্রস্তুত রাখে। বাংলাদেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিং মল এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বছরে কয়েকবার বাধ্যতামূলক মহড়ার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে মানুষ দুর্যোগের সময় কিভাবে দ্রুত ও নিরাপদভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, তা শিখতে পারবে।
চতুর্থত, আমাদের দেশে দুর্যোগ হলে উদ্ধার ও জরুরি সেবা ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করতে হবে। বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা গেলে প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এ জন্য ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আধুনিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং পর্যাপ্ত জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটি পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। ভূমিকম্পের পর প্রথম সহায়তা সাধারণত প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেই আসে। তাই ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কমিউনিটিভিত্তিক প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার চেয়েও দ্রুত কার্যকর হয়।
এ ক্ষেত্রে জাপান একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। দেশটি ভূমিকম্প বন্ধ করতে পারেনি, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সক্ষম হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায় যে দুর্যোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো প্রস্তুতি। অন্যদিকে আফগানিস্তান বা অন্য কিছু দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দুর্বল অবকাঠামো এবং অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত ইতিবাচক উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং দুর্বলতার জায়গাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা।
ভূমিকম্প কখন হবে, তা আমরা জানি না, কিন্তু এটি যেকোনো সময় ঘটতে পারে। এই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে। তাই দুর্যোগের পর উদ্ধার কার্যক্রমের চেয়ে দুর্যোগের আগে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ বেশি জরুরি। নিরাপদ অবকাঠামো, সচেতন নাগরিক, আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা, শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা এবং কার্যকর নগর পরিকল্পনা—এই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প সহনশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে। প্রকৃতি কখন সতর্কবার্তাকে বাস্তবে রূপ দেবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। আর সেই প্রস্তুতি গ্রহণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো এখনই।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



ফুটবল গড়াচ্ছে তার ইচ্ছা-মর্জি মাফিক। খেলা দেখতে বসে কখনো কখনো এই ফুটবলকে অপরিচিত মনে হয়। এতে বাড়ে অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠা। সমর্থিত দল লড়াই থেকে বিদায় নেওয়ায় কেউ কেউ দল বদল করেছে। না, এই দলবদলের সঙ্গে রাজনীতির নেতা ও কর্মীদের দলবদলের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি নেহাত ফুটবল বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার জন্য। ফুটবলের আনন্দ সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। পরিচিত মহলে আমার বন্ধু জার্মানির বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলা আর দেখছেন না। এটি তাঁর আবেগ।
