• ই-পেপার

সুইফট থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কারের পরিণতি

  • নিরঞ্জন রায়

পূর্বমুখী কূটনীতি : জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন থেকে নতুন দিগন্ত

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

পূর্বমুখী কূটনীতি : জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন থেকে নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য গৃহীত হয়, আবার কিছু সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনীতি ছিল দ্বিতীয় ধরনের একটি রাষ্ট্রদর্শনের অংশ। এটি শুধু চীন বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের একটি নীতি ছিল না, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একমুখী নির্ভরশীলতার গণ্ডি থেকে বের করে এনে একটি বহুমাত্রিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর কূটনৈতিক কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। আজ যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শ্রমবাজার ও কৌশলগত অংশীদারির নতুন দিগন্ত উন্মোচনের চেষ্টা করছেন, তখন সেই সফরকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বিচার করলে দেখা যায়—বাংলাদেশের পূর্বমুখী কূটনীতির যে বীজ জিয়াউর রহমান রোপণ করেছিলেন, বর্তমান সময়ে তা নতুন বাস্তবতার আলোকে আরো বিস্তৃত রূপ লাভ করছে।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সব সময়ই তাকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দুই মেরুকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় বিভক্ত। এমন বাস্তবতায় একটি নবীন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই চ্যালেঞ্জকে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি আবেগের পরিবর্তে বাস্তববাদ, জাতীয় স্বার্থ এবং কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হ্যান্স জে মরগেনথাও (১৯৪৮) যেমন বলেছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূলভিত্তি হলো জাতীয় স্বার্থ; কেনেথ ওয়াল্টজ (১৯৭৯) দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অরাজক চরিত্র রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করতে বাধ্য করে। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রদর্শন এই বাস্তববাদী তত্ত্বগুলোর সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তাঁর উপলব্ধি ছিল—বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ নয়। ফলে তিনি একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম বিশ্ব এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি, মাল্টিভেক্টর ফরেন পলিসি এবং স্ট্র্যাটিজিক ডাইভার্সিভিকেশন বলা হয়। এভলিন গুহ (২০০৫)-এর হেজিং স্ট্র্যাটেজি ধারণা অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখে। জিয়াউর রহমানের পূর্বমুখী কূটনীতি ছিল এই নীতির একটি অগ্রগামী প্রয়োগ।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীন ভবিষ্যতে একটি প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হবে। ডেং শিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনাকালে চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেন, তা শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি স্থাপন করেছিল। আজ বাংলাদেশের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে চীনের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি অনেকাংশেই সেই সময়ে নির্মিত হয়।

পূর্বমুখী কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং আসিয়ান অঞ্চলের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান সামনে রেখে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে এই উদীয়মান অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজারে পরিণত হয় এবং বিনিয়োগ ও শিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প সহযোগিতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, তা পূর্বমুখী কূটনীতির ধারাবাহিকতাকেই নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রদর্শনের আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-এর ধারণা। আর্নস্ট বি. হাস (১৯৫৮)-এর নিও-ফাংশনালিজম তত্ত্ব অনুসারে অর্থনৈতিক, কারিগরি ও সামাজিক সহযোগিতা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে। হাস এই প্রক্রিয়াকে স্পিলওভার ইফেক্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো যদি কৃষি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগে একসঙ্গে কাজ করে, তবে আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নের নতুন ভিত্তি গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি বহুপক্ষীয় কাঠামো কল্পনা করেছিলেন, যেখানে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোও সম্মিলিতভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক হবে সহযোগিতানির্ভর, একক প্রভাবনির্ভর নয়।

বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রবার্ট কিওহান ও জোসেফ নেই (১৯৭৭)-এর কমপ্লেক্স ইন্টারডিপেনডেন্ট তত্ত্ব আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁদের মতে, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফরের আলোচ্য বিষয়গুলো—বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শ্রমবাজার, শিক্ষা ও বাণিজ্য এই তত্ত্বেরই বাস্তব প্রতিফলন।

এই সফরের একটি বড় অর্জন হলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার প্রচেষ্টা। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, শিল্প বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকেও আরো সুদৃঢ় করেছে। বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের মধ্যে বাংলাদেশকে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শনের মূল শিক্ষা—জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই সফর সেই নীতিরই একটি বাস্তব প্রতিফলন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো আঞ্চলিক সংযোগ, উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ। মালয়েশিয়া ও চীন এই চারটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক করিডরে পরিণত করেছে। সঠিক কূটনৈতিক কৌশল, উন্নত অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

পরিশেষে বলা যায়, পূর্বমুখী কূটনীতি কোনো সাময়িক কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রকৌশলের একটি মৌলিক ভিত্তি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে খালেদা জিয়া সেই ধারার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যান। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই ধারাবাহিকতাকে নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। যদি এই সফরের সম্ভাবনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমাত্রিক ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ অব্যাহত রাখে, তবে পূর্বমুখী কূটনীতি আগামী দিনের বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র, কৌশলগত অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরো মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

 

উদ্বৃত্ত শ্রম, দ্বৈত অর্থনীতি ও বাজেটের ফাঁদ

এম এম মুসা

উদ্বৃত্ত শ্রম, দ্বৈত অর্থনীতি ও বাজেটের ফাঁদ

১৯৫৪ সালে স্যার আর্থার লুইস যখন ‘ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট উইথ আনলিমিটেড সাপ্লাইজ অব লেবার’  শিরোনামে তাঁর ঐতিহাসিক প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন, তখন বিশ্বের কেউ ভাবেননি যে ৭০ বছর পরও দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ তাঁর সেই তত্ত্বের জীবন্ত পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করতে বসলে লুইসের দ্বি-পথ কাঠামো যেন দর্পণের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়।

লুইস বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে দুটি সমান্তরাল পথ থাকে। একদিকে থাকে ‘ঐতিহ্যবাহী পথ’—কৃষি, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, গ্রামীণ শ্রম, যেখানে প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শূন্যের কাছাকাছি, কিন্তু মানুষ টিকে থাকে। অন্যদিকে থাকে ‘আধুনিক পথ’—কারখানা, রপ্তানিমুখী শিল্প, শহরের নতুন পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা যেখানে শ্রমের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এই দুটি পথের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনাই হলো উন্নয়নের মূল রহস্য বা সূত্র।

লুইস তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হলো ‘টার্নিং পয়েন্ট’, যখন ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হয়ে যায় এবং মজুরি বাড়তে শুরু করে। এই বিন্দু অতিক্রম করলে দেশটি প্রকৃত উন্নয়নের পথে প্রবেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা এই টার্নিং পয়েন্টের সামনে এসে থমকে আছি—এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু নীতিকাঠামো সেই সুযোগ ধরতে পারছে না।

দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৮ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত। তাদের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শিল্প বা সেবা খাতের তুলনায় চার থেকে ছয় গুণ কম। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৫.৮ শতাংশ। লুইসের ভাষায়, এই বরাদ্দ ঐতিহ্যবাহী পথ আরো দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখবে।

বাজেটে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু এই বৃদ্ধির গঠন দেখলে লুইসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর উদ্বেগ জাগায়। বরাদ্দের বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে বিদ্যমান বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের করছাড় ও প্রণোদনায়, কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নয়।

লুইস দেখিয়েছেন যে আধুনিক পথ শুধু তখনই ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে শ্রম আকর্ষণ করতে পারে, যখন সেখানে মজুরির পার্থক্য বজায় থাকে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি শ্রম সরবরাহের গতির চেয়ে বেশি হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত লাখ। বাকিরা কোথায় যাচ্ছে? তারা ভিড় করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, রিকশায়, ফুটপাতে, মৌসুমি কৃষিতে—লুইসের ঐতিহ্যবাহী পথের গভীরে।

মানবপুঁজির রূপান্তরের পূর্বশর্ত পূরণ হচ্ছে কি? লুইসের তত্ত্বে একটি প্রায়-উপেক্ষিত দিক হলো ‘সক্ষমতা-সেতু’। শুধু শ্রম স্থানান্তরিত হলেই হয় না—সেই শ্রমকে আধুনিক পথে উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকতে হয়। এই সেতু না থাকলে শহরে মানুষ আসে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ে না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সহজ ঋণ, ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থার হয়রানি থেকে মুক্তি—এই তিনটি বিষয় অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক খাতের দিকে টেনে আনতে পারে। বাজেটে এর প্রতিফলন কোথায়? ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকর করার জন্য প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরিতে কোনো বিনিয়োগ নেই।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স একটি অনন্য মাত্রা যোগ করেছে, যা লুইস নিজে কল্পনা করেননি। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকরা মূলত ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে আসেন এবং তাঁদের পাঠানো অর্থ পরিবারের ভোগব্যয় বাড়ায়, কিন্তু উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সব সময় হয় না। ভোগব্যয় অন্যভাবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে, কিন্তু টেকসই রূপান্তরে দ্রুত প্রভাব রাখে না।

লুইস দেখিয়েছেন, উন্নয়নের চালিকাশক্তি হলো একটি বিনিয়োগ চক্র : আধুনিক পথ মুনাফা করে, সেই মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ হয়, আরো মুনাফা আসে। এই চক্রের গতি বাড়াতে হলে আধুনিক খাতকে মুনাফা ধরে রাখার সুযোগ দিতে হবে—সেই সঙ্গে সেই মুনাফার উৎপাদনশীল খাতে পুনর্বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের করপোরেট ট্যাক্সের কাঠামো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কিছুটা পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে, কিন্তু বড় সমস্যা রয়ে গেছে—দেশীয় মুনাফার একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে বা বিদেশে চলে যাচ্ছে। পুঁজিপাচারের এই সমস্যার বিরুদ্ধে বাজেটে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেই। লুইসের বিনিয়োগচক্র তাই সম্পূর্ণ হচ্ছে না।

নারীশ্রমের রূপান্তর : লুইসের তত্ত্বের অপূর্ণ অধ্যায়—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাফল্য মূলত নারীশ্রমের আধুনিক পথে প্রবেশের ফসল, এটি একটি সত্যিকারের লুইসীয় রূপান্তর। ৪০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক ঐতিহ্যবাহী পথের গৃহস্থালি ও অনানুষ্ঠানিক কাজ ছেড়ে আনুষ্ঠানিক শিল্পে এসেছেন। এই রূপান্তর শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। 

স্যার আর্থার লুইস নোবেল বক্তৃতায় সতর্ক করেছেন, ‘উন্নয়নের কোনো স্বয়ংক্রিয় পথ নেই। প্রতিটি দেশকে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই সিদ্ধান্তগুলো এখন নিতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি সন্ধিক্ষণের বাজেট। দেশের সামনে সুযোগ আছে লুইসের টার্নিং পয়েন্ট অতিক্রম করার। কিন্তু সে জন্য দরকার তিনটি জিনিস : আধুনিক খাতে কর্মসংস্থান সৃজন, মানবপুঁজিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক রূপান্তর।

লুইস একবার বলেছিলেন, ‘উন্নয়নের অর্থ হলো মানুষকে সুযোগ দেওয়া।’ বাংলাদেশের বাজেট সেই সুযোগের কাঠামো তৈরি করছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে নীতিনির্ধারকদের। সংখ্যার আড়ালে যে মানুষগুলো লুকিয়ে আছেন গ্রামের মাঠে, শহরের ফুটপাতে, কারখানার সারিতে—তাঁদের জীবনের গল্পই বলবে এই বাজেট সত্যিকারের উন্নয়নের বাজেট ছিল কি না।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

এল নিনোর প্রভাব মোকাবেলায় প্রস্তুতি প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস

এল নিনোর প্রভাব মোকাবেলায় প্রস্তুতি প্রয়োজন

‘এল নিনো ছুটে আসে...উপকূলে আছড়ে পড়ে, উত্তপ্ত আলিঙ্গনে মাছ ও শৈবালকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারে। সে বিষুবীয় অঞ্চলের জীবনদায়ী নাইট্রেট ও ফসফেট অপহরণ করে নিয়ে যায়, ভেঙে দেয় বিশাল সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল এবং বৃহৎ সামুদ্রিক মাছগুলোর প্রজননচক্র। ভারী ও ঘর্মাক্ত এল নিনো সাঁতরে চলে, মৃত মাছগুলোকে মহাদেশের তীরে ছুড়ে মারে; সবকিছুকে স্তব্ধ, বিকল ও পচনশীল করে তোলে। জল ডুবিয়ে দেয় জলকে; সমুদ্র নিজ মৃত জোয়ারের মধ্যেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে। শীতল সমুদ্র ডুবে যায় উষ্ণ সমুদ্রের নিচে; বাতাস উন্মত্ত হয়ে ওঠে এবং পথচ্যুত হয়। ধ্বংসাত্মক ও অপরাধীর মতো এল নিনো...উপকূলকে বিপর্যস্ত করে,...সমভূমিকে শুষ্ক করে তোলে...নিম্নভূমিকে কাদামাটির বন্যায় প্লাবিত করে...।’

এভাবেই বিখ্যাত মেক্সিকান লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস তাঁর ‘ক্রিস্টোফার আনবর্ন’ উপন্যাসে এল নিনোর অভিঘাত বর্ণনা করেছেন। ইউনেসকো থেকে প্রকাশিত (২০০০) এক গ্রন্থের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯৭-৯৮ সালে সংঘটিত অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোর অভিঘাতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত হয়েছিল। মৃত্যু হয়েছিল কয়েক হাজার মানুষের। বাস্তুচ্যুত হয়েছিল কয়েক লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিমাণ ছিল প্রায় আড়াই লাখ বর্গকিলোমিটার।

এল নিনোর প্রভাব মোকাবেলায় প্রস্তুতি প্রয়োজনগত ২ জুন ২০২৬ ‘ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকে ‘এল নিনোর জন্য সতর্ক হোন’ শিরোনামে সাবধান করেছে। সংস্থার মহাসচিব সম্ভাব্য খরা, ভারি বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন। ১১ জুন ২০২৬ ‘ন্যাশনাল ওশিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ ঘোষণা করেছে, এল নিনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং শরৎকালে এটি মাঝারি থেকে শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। গত ১৬ জুন রয়টার্স এবারের এল নিনো গত ‘সাত দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি’ হতে পারে বলে প্রতিবেদন ছেপেছে। প্রতিবেদনে এশিয়ায় গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া এবং খাদ্য উৎপাদনে ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এই একই তারিখে গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘শক্তিশালী এল নিনো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যুগপৎ প্রভাব অস্ট্রেলিয়ায় তাপপ্রবাহ, দাবানল ও প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’ এবারের এই এল নিনো নিয়ে বিবিসি (১১ জুন ২০২৬) লিখেছে, এটি শেষ পর্যন্ত ‘সুপার’ এল নিনোতে রূপ নিতে পারে—এমনকি এটি এযাবৎকালের রেকর্ডকৃত শক্তিশালী এল নিনোগুলোর মধ্যেও অন্যতম হতে পারে।

এল নিনো ও লা নিনা শব্দ দুটি স্প্যানিশ ভাষা থেকে এসেছে। এল নিনো অর্থ ‘ছোট বালক’ এবং লা নিনা অর্থ ‘ছোট বালিকা’। পেরুর উপকূলের জেলেরা বড়দিনের সময় সমুদ্রস্রোতের অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করে এ ঘটনাকে ‘এল নিনো ডি ন্যাভিডাড’ বা ‘খ্রিস্ট শিশু’ নামে অভিহিত করেছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী ‘বাণিজ্য বাতাস’ উষ্ণ পৃষ্ঠজলকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল থেকে এশিয়া-অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে গভীর সমুদ্রের পুষ্টিসমৃদ্ধ শীতল পানি ওপরে উঠে আসে, যা মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে। একই সঙ্গে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, আর দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে।

কয়েক বছর পর পর বাণিজ্য বাতাস দুর্বল হয়ে গেলে এল নিনো শুরু হয়। তখন উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে সরে আসে এবং শীতল, পুষ্টিসমৃদ্ধ পানির উত্থান বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে পেরু, ইকুয়েডর ও চিলির উপকূলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে যায় এবং মৎস্যশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও উপকূলীয় ক্ষয় দেখা দেয়; অন্যদিকে ভারত, বাংলাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার অনেক অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে খরা, দাবানল ও নানা পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি হয়।

লা নিনা হলো এল নিনোর বিপরীত অবস্থা। এ সময় ‘বাণিজ্য বাতাস’ স্বাভাবিকের তুলনায় আরো শক্তিশালী হয় এবং উষ্ণ পানি পুনরায় পশ্চিম দিকে সরে যায়। ফলে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বহু অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ঘটে, আর দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে পুষ্টিসমৃদ্ধ শীতল পানির উত্থান বৃদ্ধি পায়।

এল নিনো ও লা নিনার এই পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে সম্মিলিতভাবে ‘ইএনএসও’ বা এনসো (এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশন) বলা হয়। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পর পর এল নিনো দেখা দেয়; এটি প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়, আর লা নিনা সাধারণত এক থেকে তিন বছর স্থায়ী হতে পারে। নিকট অতীতের এল নিনোগুলোর মধ্যে ১৯৭২-৭৩, ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া ও জলবায়ু ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁদের মতে, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে এল নিনো যুক্ত হলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং অনেক অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা, দাবানল ও পানিসংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে কিছু অঞ্চলে অস্বাভাবিক ভারি বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আরো সতর্ক করেছে যে কৃষি উৎপাদন, বিশেষত ধান, গম, ভুট্টা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধির মতো অবস্থা তৈরি হতে পারে।

এল নিনোর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় কম মৌসুমি বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, খরার প্রবণতা এবং পানিসম্পদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও উচ্চ তাপমাত্রা কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস, সেচের পানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বর্তমান মূল্যায়নে ২০২৬-২৭ সালের এল নিনোর প্রধান সম্ভাব্য অভিঘাত হিসেবে উচ্চ তাপমাত্রা, দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টি, খরা, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং পানি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালে সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাব মোকাবেলায় পেরু, ফিলিপিন্স ও ইকুয়েডর বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পেরু সরকার নদী খনন ও পরিষ্কার, বন্যাঝুঁকি হ্রাস, জরুরি ত্রাণ মজুদ, স্থানীয় সরকারগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ-প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার সমন্বয় জোরদার করেছে। ফিলিপিন্সে কৃষি বিভাগ সম্ভাব্য খরা ও পানিসংকট মোকাবেলায় সেচব্যবস্থার মূল্যায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, কৃষি উৎপাদন সুরক্ষা এবং কৃষকদের সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করেছে। ইকুয়েডরে উপকূলীয় বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবেলায় দুর্যোগ-প্রস্তুতি ও ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলায় ভারত সরকার দেশের ১৯৭টি (সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে ৩২৬টি পর্যন্ত) ঝুঁকিপূর্ণ জেলা চিহ্নিত করে রাজ্যভিত্তিক ও জেলাভিত্তিক কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায় যে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব কমাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আগাম সতর্কতা, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ-ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় মৌসুমি বায়ু অঞ্চলের অংশ হওয়ায় কম বর্ষা, তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদনে চাপ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এখানে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এই শরৎকালে এল নিনো মাঝারি থেকে তীব্র হতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে, তবু বাংলাদেশের বেশ কিছু জরুরি প্রস্তুতি প্রয়োজন। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জুন থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত এবং আট থেকে ১০টি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এমতাবস্থায় সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সেই মোতাবেক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বিশেষ করে খরাসহিষ্ণু ফসল/জাতের সম্প্রসারণ, সেচ ও পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নতকরণ, খাদ্যশস্যের কৌশলগত মজুদ বজায় রাখা এবং জনস্বাস্থ্যসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

চীনের আস্থার ধারাবাহিকতায় বিএনপির বড় অর্জন

সাইমন মোহসিন

চীনের আস্থার ধারাবাহিকতায় বিএনপির বড় অর্জন

কোনো সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের সাফল্য শুধু কতগুলো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, কত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে কিংবা কতগুলো যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছেএসব দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি সফরের প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় সেই সফরসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কৌশলগত অগ্রাধিকার, পারস্পরিক প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথকে কতটা স্পষ্ট করে, তা থেকেও।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরও ঠিক তাই। এই সফর ঘিরে নানা ধরনের মূল্যায়ন হচ্ছে, হবেও। কেউ একে অর্থনৈতিক সাফল্য বলছেন, কেউ কূটনৈতিক অর্জন, আবার কেউ আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিচার করলে সফরটি তিনটি সমান্তরাল বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রথমত, চীন নিশ্চিত করেছে যে বাংলাদেশ তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবেই থাকবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আস্থার সংকেত খুঁজছিল, এই সফর তা অনেকাংশে এনে দিয়েছে। আর তৃতীয়ত এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণবাংলাদেশ নিজেই এখন একটি নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি। কারণ প্রতিশ্রুতি আদায় করা যত সহজ, তা বাস্তবায়নের পরিবেশ তৈরি করা ততটাই কঠিন।

চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। দ্বিপক্ষীয় গতিপথে কোনো পরিবর্তন আনা নয়। চীন সেটি পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করেছে এবং সফলতার সঙ্গে অর্জনও করেছে। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঐতিহাসিক ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্পাঞ্চল, বন্দর, সেতু, যোগাযোগপ্রায় প্রতিটি বড় উন্নয়ন খাতে চীনের উপস্থিতি ক্রমাগত বেড়েছে। এই সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য হলো, বেইজিং সাধারণত সরকার পরিবর্তনের চেয়ে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ চীন বিএনপিকে সমর্থন দেয়নি, বরং বাংলাদেশকে তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবেই পুনরায় নিশ্চিত করেছে।

এই বিষয়টি আমাদের পণ্ডিত ও নীতিনির্ধারকদের পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকে সফরটিকে বিএনপির প্রতি চীনের রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবে চীন ব্যক্তি বা দল নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। ফলে নতুন বিনিয়োগ, ঋণ প্রতিশ্রুতি এবং নতুন সমঝোতা স্মারকগুলো মূলত এই বার্তাই দেয় যে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক অব্যাহত রাখাই বেইজিংয়ের অগ্রাধিকার। তবে এটিও সত্য যে এই ধারাবাহিকতাই বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জনে পরিণত হয়েছে।

ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিকে স্পষ্ট বা প্রচ্ছন্নভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেটি হলো বিএনপি সরকার কতটা গ্রহণযোগ্য, কতটা স্থিতিশীল এবং বড় শক্তিগুলো তার সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে কতটা আগ্রহী।

চীন সফরকালে তারেক রহমানের সরকারের প্রতি বেইজিংয়ের উচ্চ পর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা এবং উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রতিশ্রুতি সেই প্রশ্নের অন্তত আংশিক উত্তর দিয়েছে। বিনিয়োগের অঙ্ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর রাজনৈতিক বার্তা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি এক ধরনের আস্থার বার্তা বহন করে। অর্থাৎ একটি বড় শক্তি বর্তমান সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রস্তুত। এটি বিএনপির জন্য নিঃসন্দেহে একটি কূটনৈতিক সাফল্য। কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে নতুন বাস্তবতা।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। কিন্তু এই সফরের পর সেই চ্যালেঞ্জ অনেকটাই বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই বিনিয়োগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা ও ব্যাবসায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে? এই অর্থে বলা যায়, সফরটি চীনের জন্য যতটা সুযোগ সৃষ্টি করেছে, বাংলাদেশের জন্য ততটাই পরীক্ষা তৈরি করেছে। চীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব এখন বাংলাদেশের।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের ওপর চাপ, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বাস্তব বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। চীন বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, কিন্তু সেই বিনিয়োগ টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতার ওপর। তিস্তা ইস্যুও এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে।

সফরের আগে অনেকেই আশা করেছিলেন, তিস্তা প্রকল্পে বড় ধরনের কৌশলগত ঘোষণা আসবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সমঝোতা স্মারকের সীমার মধ্যেই রয়ে গেছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে চীন অত্যন্ত সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেছে। বেইজিং কোনোভাবেই এই প্রকল্পকে ভারতবিরোধী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়নি। অর্থাৎ চীন নিজেই ভারতকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে উসকে দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিস্তা শুধু একটি নদী ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, এটি বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিএনপি ও তাদের সমর্থকমহলের একটি বড় অংশ ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে এসেছে। তিস্তা, সীমান্ত, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্যএসব ইস্যু সেই রাজনৈতিক বয়ানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে ভারতও গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই নতুন কোনো ইস্যু সামনে চলে এসেছে। কখনো সীমান্ত, কখনো রাজনৈতিক বক্তব্য, কখনো সংখ্যালঘু প্রশ্ন, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিএকটি সমস্যা শেষ না হতেই আরেকটি সামনে চলে আসছে।

ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনেকটা ইংরেজিতে যাকে বলে হোয়্যাক আ মোল খেলায় পরিণত হয়েছে! একটি সংকট সামলাতে না সামলাতেই আরেকটি সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় চীনের উপস্থিতি, চীনের বাড়ন্ত বিনিয়োগ ও বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন খাতে আরো গভীর সংযোগ ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ আরো বাড়াবেএটিই স্বাভাবিক। তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত দিকটি অন্যত্র। বাংলাদেশ এরই মধ্যে এমন কিছু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও সমঝোতায় যুক্ত হয়েছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক কৌশলগত বোঝাপড়ার, যা ভবিষ্যতে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক পরিচালনাকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনীতি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও সামুদ্রিক কৌশলএসব ক্ষেত্রের বিভিন্ন অঙ্গীকার একসময় পারস্পরিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

চীন এসব সম্বন্ধে অবগত। তবু তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ হলো, বেইজিং এখন বাংলাদেশের কাছ থেকে আরো বেশি নীতিগত ধারাবাহিকতা, কৌশলগত স্বচ্ছতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার সক্ষমতা প্রত্যাশা করবে। অর্থাৎ চীন শুধু অর্থ বিনিয়োগ করেনি, তারা তাদের কৌশলগত আস্থাও বিনিয়োগ করেছে। এখন সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের। সফরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।

বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। চীন তাদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারতের উদ্বেগ দূর হয়নি, বরং নতুন মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সফরের সাফল্য নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ নিজেই। কারণ কূটনৈতিক সফরে প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দিতে লাগে দক্ষ প্রশাসন, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা।

চীন তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে। বিএনপি তার কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্জন করেছে। কিন্তু এখন শুরু হয়েছে আসল পরীক্ষা! সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে এই সফর ইতিহাসে বড় অর্জন হিসেবে নয়, বরং অপূর্ণ সম্ভাবনার আরেকটি অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

লেখক :  রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক

সুইফট থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কারের পরিণতি | কালের কণ্ঠ