kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

মাদক নির্মূলে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাই মুখ্য

তাপস হালদার

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মাদক নির্মূলে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাই মুখ্য

গত ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাফিজুর রহমান নামের একজন ছাত্র কার্জন হল থেকে দৌড়ে এসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে এক ডাব বিক্রেতার ভ্যানে রাখা দা নিয়ে নিজের গলায় আঘাত করে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন, পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পুলিশ তদন্তে বেরিয়ে আসে তিনি ভয়ংকর এক মাদক গ্রহণ করেছিলেন, যার নাম এলএসডি (লাইসার্জিক এসিড ডাইথ্যালামাইড)। পুলিশের কাছে এ ধরনের মাদক সেদিনই প্রথম আবিষ্কৃত হয়। কী ভয়ানক কথা? এ ধরনের মাদক গ্রহণের ফলে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। এভাবে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ মাদকের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

মাদকের থাবায় নাস্তানাবুদ একটি প্রজন্ম। শহর থেকে গ্রাম, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—সর্বত্রই মাদক পাওয়া যাচ্ছে হাতের নাগালে। মাদক এক নীরব ঘাতক। ধর্ষণ, খুন, চুরি, ছিনতাই, বিয়েবিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার মূলে রয়েছে মাদক। পাড়া-মহল্লায় উঠতি বয়সের কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলো যে অপরাধমূলক কাজ করছে তার পেছনেও রয়েছে এই মাদক। এখন শুধু ছেলেরাই মাদক সেবন করছে তেমনটি নয়। গবেষণা বলছে, মাদকসেবীদের ১৬ শতাংশ নারী।

মাদকদ্রব্যের প্রতি আসক্তি কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, বর্তমানে তার প্রভাব অতটা বোঝা না গেলেও সুদূরপ্রসারী মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। একটি সময় ছিল যখন সমাজের বিত্তশালী পরিবারের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে মাদক সেবনের আসক্তি ছিল; কিন্তু বর্তমানে তা সব শ্রেণির মধ্যেই ছড়িয়ে গেছে। বিড়ি বা সিগারেট দিয়ে শুরু হয়ে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা দিয়ে শেষ হয়।

প্রথমে কেউ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কৌতূহলবশত সেবন করে, তারপর একটু একটু করে ভালো লাগা শুরু হয়, পরে আস্তে আস্তে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়—এ হচ্ছে মাদক গ্রহণের ধাপগুলো। সাধারণত মাদকাসক্ত বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনায়ই প্রথম ধাপে মাদক গ্রহণের সূচনা ঘটে। দেশে মাদকসেবীর ৮০ শতাংশ তরুণ-তরুণী, যাদের ৬১ শতাংশই বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে মাদকাসক্ত হয়েছে।

মাদকের কারণে বেড়ে যাচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়। তরুণসমাজের হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিক মূল্যেবোধ। এই ভয়াল মাদক তারুণ্য, মেধা, বিবেক, মনুষ্যত্ব—সব কিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন, নষ্ট হচ্ছে আস্থা-বিশ্বাস। পরিবার ও সমাজে তৈরি হচ্ছে নতুন আতঙ্ক। মাদকের কারণে ভাই খুন করছে ভাইকে, বোন-স্ত্রীও সেখানে নিরাপদ নয়। ছেলে খুন করছে বাবাকে, বাবা খুন করছে সন্তানকে।

কয়েক বছর আগে ঢাকার পুলিশ কর্মকর্তার কিশোরী মেয়ে ঐশী মাদকে আসক্ত হয়ে মা-বাবাকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। সন্তান মাদকে আসক্ত হওয়ার কারণেই সেদিন পুলিশ দম্পতিকে জীবন দিতে হয়েছিল নিজ সন্তানের হাতে। এ রকম অমানবিক ঘটনা অহরহ ঘটছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদকের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এ দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন। এর পাশাপাশি এখন অভিজাত এলাকার বিভিন্ন বার ও হোটেলে সিসা, আইস, এলএসডি ও ম্যাজিক মাশরুম নামের ব্যয়বহুল মাদকের নাম শোনা যায়। তবে আশ্চর্য বিষয় হলো, এসব মাদকের কোনোটাই বাংলাদেশে উৎপাদন বা তৈরি হয় না। প্রধান দুই মাদকের একটি ইয়াবা মিয়ানমার আর ফেনসিডিল আসছে ভারত থেকে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? মাদকের চাহিদা যত দিন আছে, তত দিন সরবরাহ একেবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই মাদক নির্মূলে একেবারে শিকড়ে হাত দিতে হবে। মাদক সেবন বন্ধ করতে হবে, ব্যবহার বন্ধ করতে পারলেই সরবরাহ এমনিতেই কমে যাবে।

সরকার মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ সালে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন পাস করা হয়েছে। মাদক চোরাচালানকারী, বিক্রেতা, সেবনকারীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে কেউ দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে পার পাচ্ছে না।

মাদক রোধকল্পে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। মাদকাসক্তদের জন্য চাকরির দরজা বন্ধ রেখে চূড়ান্ত করা হচ্ছে ডোপ টেস্ট বিধিমালা-২০২১। এমনকি ডোপ টেস্টে রিপোর্ট পজিটিভ এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হচ্ছে। এখন এটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট ব্যাধ্যতামূলক করা হবে। এ ছাড়া চাকরিরত অবস্থায় কেউ মাদক সেবন করেছে বলে সন্দেহ হলেও তাকে ডোপ টেস্টের আওতায় আনা যাবে।

চাকরি ছাড়াও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে, কর্মরত অবস্থায় গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের সন্দেহ এবং সরকারি-বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কারো বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণের সন্দেহ হলে ডোপ টেস্ট করা যাবে। এমনকি বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের ক্ষেত্রে এবং আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রেও ডোপ টেস্টের দরকার হবে। তবে এর বাইরেও সরকার নির্বাহী আদেশে ডোপ টেস্টের নতুন ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারবে।

গত বছর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে ডোপ টেস্ট চালু হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যাঁদের মাদকাসক্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে তাঁদেরকেই ডোপ টেস্ট করানো হচ্ছে। এরই মধ্যে ১০০ জন সদস্যকে শনাক্ত ও ৩০ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ডোপ টেস্ট করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখানো পথেই হয়তো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

মাদক প্রতিরোধে পরিবারকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ এক দিনে কেউ আসক্ত হয়ে পড়ে না, লেগে যেতে পারে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর। তাই পরিবার সচেতন হলে মাদকাসক্ত হওয়ার অনেক আগেই এটাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। পারিবারিকভাবে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে তাঁদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে। জীবনযাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন আসছে তাদের মধ্যে। কৈশোর থেকে যুবক বয়স পর্যন্ত মা-বাবাকে সন্তানদের বেশি বেশি সময় দিতে হবে। খেলাধুলাসহ নানা চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাদকাসক্তি একটি বহুমাত্রিক জটিল সমস্যা। এ ব্যাধি দূর করতে দরকার সমন্বিত কর্মপ্রয়াস। সরকারের একার পক্ষে এর নিরসন সম্ভব নয়। মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। পরিবার ও সমাজজীবন থেকে মাদকদ্রব্য উত্খাত এবং মাদকাসক্তি নির্মূল করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরকার মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধের জাগরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন।

লেখক : সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা

[email protected]



সাতদিনের সেরা