kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ধর্ষণের বিচারে দ্রুত আইন দরকার

ইসহাক খান

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ধর্ষণের বিচারে দ্রুত আইন দরকার

মাস কয়েক আগে এই কলামে ধর্ষণ বিষয়ে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম। সেখানে আমি ধর্ষণ বিষয়ে আইন পরিবর্তন করে ধর্ষণের শাস্তি আরো কঠোর করার দাবি জানিয়েছিলাম। আমার যুক্তি ছিল, একসময় দেশজুড়ে এসিড নিক্ষেপের ভয়াবহতা বেড়ে গিয়েছিল। যখনই এসিড নিক্ষেপকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হলো, দেখা গেল এসিড নিক্ষেপ রাতারাতি কমে গেছে।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে আইন সংশোধন করলে তাতে সুফল মিলবে বলে অনেকেই তেমনটি মনে করেন। এমনকি মাননীয় সংসদ সদস্যরা সংসদে ধর্ষণ নিয়ে আলোচনায় আরো জোরালো কণ্ঠে শাস্তিকে তাত্ক্ষণিক কার্যকরের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের কোনো সাক্ষী থাকে না। ধর্ষকরা পুলিশের কাছে অপরাধ স্বীকার করলেও আদালতে এসে অস্বীকার করে। তখন বিচারক সাক্ষীর অভাবে ধর্ষককে শাস্তি দিতে পারেন না। অপরাধী খালাস পেয়ে যায়।

১৪ জানুয়ারি সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় ধর্ষণ প্রসঙ্গে কথা তোলেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক। তিনি ধর্ষককে ক্রসফায়ারে হত্যার দাবি জানান। তাঁকে সমর্থন করে জাপার আরেক সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে ‘এনকাউন্টার মাস্ট’।”

ফিরোজ রশীদ আরো বলেন, সাম্প্রতিককালে ধর্ষণ মহামারি রূপ নিয়েছে। ছাত্রী, শিশু, নারী, শ্রমিক, প্রতিবন্ধী নারীও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। কেউ রক্ষা পাচ্ছেন না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ‘ক্লুলেস’ ঘটনায়ও ধর্ষককে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু তাতে ফল কী হচ্ছে। তিনি বলেন, ধর্ষণের ঘটনার বিচার হয় ১৫ থেকে ২০ বছর পর। মানুষ এটা মনে রাখে না। শাজনীন হত্যার পর ১৬ বছর লেগেছে সেই বিচার করতে। শাজনীনের বাবা একজন স্বনামধন্য শিল্পপতি। তাঁর মেয়ের এই ধর্ষণ হত্যার বিচার নিয়ে কোর্ট-কাছারি করতে করতে ১৬ বছর পার করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ধর্ষণকারী ধরা পড়েছে। ওই ছাত্রী তাকে শনাক্ত করেছেন। ধর্ষক পুলিশের কাছে আছে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাকে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মারা হোক।’

গুলি করে মারার পক্ষে যুক্তি দিয়ে ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘ধামরাইয়ে বাসে ধর্ষণ করে বাস থেকে ফেলে ধর্ষিতাকে হত্যা করা হলো। বাসের চালককে গ্রেপ্তার করা হলো। কী বিচার হবে? কোনো সাক্ষী নেই। এখন পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবে। যখন মামলায় যাবে, সাক্ষী থাকবে না। তাহলে কী করতে হবে? এই মুহূর্তে যদি এই সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে চান, তাহলে এনকাউন্টার মাস্ট।’

ফিরোজ রশীদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘এখানে দরকার কঠোর আইন করা। আর দ্বিতীয় হলো, যে এই কাজ করেছে তার পৃথিবীতে থাকার কোনো অধিকার নেই।’

তোফায়েল আহমেদ আরো বলেন, ‘ভারতে একজন নারী চিকিৎসক বাস থেকে নামার পর চারজন তাঁকে জোর করে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে। দুই দিন পর ক্রসফায়ারে তাদের হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর ভারতে আর কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।’

ধর্ষণের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে এ সবই মাননীয়দের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশির ভাগ ব্যক্তির মতামতও ধর্ষককে ক্রসফায়ারে দেওয়া হোক। বলা যায়, সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাক্ষীর অভাবে ধর্ষকের সাজা হয় না। তার ওপর রয়েছে মামলার দীর্ঘসূত্রতা। একসময় মানুষ বিষয়টি ভুলে যায়। ধর্ষক খালাস পেয়ে দিব্যি সমাজে বুক ফুলিয়ে বিচরণ করতে থাকে। শুধু তা-ই নয়, তার সাহস বেড়ে যায়। সে আবার অপরাধকর্মে লিপ্ত হয়।

একসময় ছিল ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে পুলিশি জেরার নামে বেশি বেশি নাস্তানাবুদ করা হতো। তাই নতুন করে ধর্ষিত হওয়ার জন্য ভিকটিম আইনের আশ্রয় নিতেন না। আইন পরিবর্তনের পর সেই ধারা খানিকটা কমেছে। এখন ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করছেন। মামলা করতে এগিয়ে আসছেন। এটা যৎসামান্য উন্নতি। এখন মোটা দাগে আইনের পরিবর্তন দরকার। কোনো তত্ত্ব কথা দিয়ে ওই নোংরা মানুষদের মানসিকতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ধর্মীয় বাণীও এখানে অকার্যকর। না হলে মাদরাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম জিনার মতো ভয়ংকর কবিরা গুনাহর কাজ করতে পারতেন না। যাঁরা ধর্মের অমীয় বাণী মানুষকে শুনিয়ে তাঁদের ঈমান শক্ত করবেন, তাঁরাই নাজায়েজ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। তাহলে মুক্তির পথ কোথায়?

তাই বলে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আমরা মেনে নিতে পারি না। ধর্ষণের বিচার দ্রুত আদালতে করতে হবে। সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে ধর্ষণের বিচার শেষ করতে হবে। এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কালক্ষেপণ না করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করতে হবে।

আরো একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। আমাদের দেশে ব্যক্তির গুরুত্ব বুঝে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ হয়। বুয়েটের ছাত্র আবরারের মতো আরো অনেক আবরার নির্মম হত্যার শিকার হচ্ছে; কিন্তু আবরারের মতো প্রতিবাদ কি সেই সব হত্যাকাণ্ডের শিকার মানুষরা পাচ্ছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তাঁকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশ যেভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছিল, তেমনটি কি ধামরাইয়ে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বেলায় হয়েছে? এই পক্ষপাতমূলক প্রতিবাদ বন্ধ হোক। আইন ব্যক্তিকে চেনে না। আইন অন্ধ। সেই অপরাধের মাত্রা বুঝে বিচার করবে। এখানে ধর্ষণের শিকার রাস্তার ভবঘুরে, প্রতিবন্ধী মেয়ে, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী—সেটা বিবেচ্য হতে পারে না। নির্যাতিতা মানুষ কি না, এই বিবেচনায় তার পক্ষে সর্বত্র প্রতিবাদ হোক।

আশা করি বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনপ্রণেতারা ভাববেন। না হলে সমাজ দ্রুতগতিতে অন্ধকারের দিকে নেমে যাচ্ছে। সেই নামার গতি ক্রমেই বাড়বে। বিখ্যাত লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ধর্ষণ বিষয়ে তাঁর কলাম কালান্তরের কড়চায় লিখেছেন, ‘আমরা কোনো রোগ মহামারির আকারে দেখা দিলে তার প্রতিকারের দ্রুত সচেষ্ট হই। ধর্ষণ মহামারির চেয়েও ভয়ানক সামাজিক ব্যাধির প্রকাশ। এর প্রতিকারের জন্য আমাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি—উভয়ই আজ সতর্ক ও সচেষ্ট হওয়া জরুরি দরকার।’

ধর্ষণের বিষয়ে কঠোর আইন না করায় সরকারের উদাসীনতাকে দায়ী করে আমার একজন মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমার মেয়ে বড় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ওকে নিয়ে আমি ভীষণ শঙ্কিত। যে হারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে তাতে কবে শুনব আমার মেয়েটিও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যদি এমন কিছু ঘটে, তাহলে আমি আইনের আশ্রয় না নিয়ে আমার যেটুকু সম্পদ আছে সব বিক্রি করে আমি একটি অটোমেটিক রাইফেল কিনব। তারপর ধর্ষকের বংশ নির্বংশ করে তারপর আদালতে গিয়ে আত্মসর্মণ করে বলব, ‘আমি এই দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু সেই দেশে আমার সন্তান নিরাপদ নয়। তাই আমি আইন হাতে তুলে নিয়েছি। এখন আমার বিচার করুন। যে শাস্তি দেবেন আমি কোনো প্রতিবাদ করব না।’

আমার সহযোদ্ধার ক্ষোভের কারণ কারো না বোঝার কথা নয়। সরকার, আইন, বিচার বিভাগ, সামাজিক সংগঠন—সবারই দায়িত্ব হয়েছে এই মহামারি ব্যাধি প্রতিরোধ করা। না হলে অনেক মূল্যে পাওয়া স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে। আশা করি সবাই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভিনাট্যকার

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা